Friday, March 29, 2024

মানব সদৃশ রোবট এবং হিউমেন ক্লোনিং প্রসঙ্গে?

 

দেখে শুনে মনে হচ্ছে এই বিকশিত মানব সভ্যতা একটি সমালোচনামূলক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং এখন এটি তার নিজস্ব উদ্ভাবনী পদ্ধতির দ্বারা আটকা পড়ে নিজেকে ধ্বংস করার চেষ্টায় লিপ্ত। সময় এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যখন আমরা মানুষের মতো রোবট প্রত্যাশা করছি। জাপানি রোবটিক্সে ইন্ডাস্ট্রি ইতিমধ্যে কিছু প্রোটোটাইপ উপহার দিয়েছে আর আপনাকে এসমস্ত অত্যাধুনিক যন্ত্রাংশের প্রমাণ দেখানোর জন্য বিবিসির ক্লিক অনুষ্ঠানই যথেষ্ট। ভিআর (ভার্চুয়াল রিয়েলিটি / অলীক বাস্তবতা) এবং এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স / কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) এবং রোবটিক্স এখন বাস্তবতার উদীয়মান চিত্রে অনিবার্য। VR সিমুলেশন এবং Ai ব্যবহার করা বাস্তব জীবনের অনেক সমস্যা সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি তা বলাই বাহুল্য। কৃত্রিম রোবট হাতগুলি অবিশ্বাস্য দ্রুত এবং বাল্ক মোডে প্রচুর কাজ করছে। যন্ত্র-মানবেরা সাধারণ মানুষের মত অসুস্থতায় পড়বে না, উৎপাদনশীলতাকে বাড়বে এবং তারা কর্পোরেট জগতে অনেক বেশি অবদান রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ যদি মনে করে যে রোবট বা যন্ত্রমানব বিশ্বের সমস্ত সমস্যার সমাধান করার জন্য যথেষ্ট আর আমরা সাধারণ মানুষ জন এই দ্রুত উন্নয়নশীল বিশ্বে যোগ্যতার বিচারে অযোগ্য হয়ে যাবো, আমারা তাতে দ্বিমত পোষণ করতে পারি  কি না? যদি তাই হয় তাহলে তা কিভাবে? এই ইস্যুটি উত্থাপন করার আমার পয়েন্টটি VR বা Ai-এর উন্নয়নকে প্রশ্ন করা নয়, বা এটি তাদের ব্যবহারিক অ্যাপ্লিকেশনগুলির উপর নয় এবং তা রোবট হাত বা রবোটিক অটোমেশন সম্পর্কেও নয়, এগুলো সত্যিই ভাল কাজ করছে। আমার উদ্বেগের বিষয় হল ক্লোনিং-এর মত মানুষের সদৃশ রোবট নির্মাণের মানব ইচ্ছা সম্পর্কিত আলোচনা।

 
কিছু দিন আগেও রোবটের ধারণাটি ছিল স্টিলের বডি ও বাক্সযুক্ত মেশিন টাইপের যান্ত্রিক কাঠামো যার Ai আছে এবং যা শুধুমাত্র মানুষের আদেশ শোনে। কিন্তু আজ এই চিত্র পাল্টে গেছে, আমরা দেখছি উদ্ভাবকরা রোবটকে মানুষের মতো করে তৈরি করার চেষ্টা করছেন। এই নতুন মডেলগুলির সিলিকন ভিত্তিক ত্বক মানবদেহের মতোই রয়েছে এবং তাদের মুখের এবং শরীরের নড়াচড়ার অভিব্যক্তি যেমন, তারা যেমন হাঁটে, কথা বলে সবকিছু এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি দেখতে হুবহু মানুষের মতো হয়। আমার উদ্বেগের বিষয়টি এখানেই।

 
আমরা কি মনে করতে পারি মানব ক্লোনিংয়ের বিরুদ্ধে কি কি সমস্যা উত্থাপিত হয়েছিল? এমন কি ছিল না যে, আমরা যদি আমার সামনে অন্য একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি যে হুবহু আমারই মত দেখতে, তাহলে আমি কেন ভয় বা অস্বাভাবিক বোধ করব ? অথবা মানব ক্লোনিং-কে প্রতিরোধ করার বিষয়টি কোন বিষয়ের উপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল? এটা কি পরিচয়ের প্রশ্ন ছিল যা আমরা ভয় পেয়েছিলাম, নাকি এটা এমন কিছু অস্বাভাবিকতা ছিল যেটাকে আমরা ভালো করে বুঝতে পারিনি এবং সেই জন্যই উদ্ভূত পরিস্থিতিকে অস্বীকার করতে চেয়েছি? আমার ধারণা অনুসারে, ক্লোনিং এত সহজ বা সফল ছিল না এবং এর গবেষণা কিছু শক্তিশালী লোকের মধ্যে এক ধরণের ভয় তৈরি করেছিল যে কারণে এটির গবেষণা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে । কমবেশি এটি মানুষের আত্ম গর্বকে আঘাত বা আহত করে। "আমি এটি করেছি, এবং  কেবল আমি করেছি এবং যা আগে অন্য কেউ করতে পারেনি", এগুলি হল আত্মগর্ব এবং আমরা যদি বিশদভাবে দেখি তবে এটি মানুষের মধ্যে আমিত্ব দাবি করার প্রবণতা যে তিনি বা তিনি অনন্য এবং অন্যরা তার বা তার মতো হতে পারে নি, এখন যদি এমন হয় যে তার মতই দেখতে অন্য একজন এবং একই রকম জিনিস করে তবে কীভাবে বোঝা যায় বা নিজের সাথে তুলনা করা যায় তাকে? আমি মনে করি এগুলিই ছিল মানব ক্লোনিং প্রত্যাখ্যানের মূল কারণগুলি? যতদূর মনে পরে তখন আর্নল্ড শোয়ারজনিগার অভিনীত দ্যা সিক্সথ ডে নামে একটা মুভি হয়েছিল এই ক্লোনিং এর সমস্যা গুলো নিয়ে। তাতে দেখান হয় যে বিজ্ঞানী বার বার নিজের ক্লোন করছিল, তার নতুন ক্লোন তাকে অবজ্ঞা ভরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছিল। আসলে ক্লোনিং হলে এমনও বলা হচ্ছিল যে উন্নত সভ্যতা গুলো বা দেশগুলো তাদের সেনাবাহিনীর তাগড়া সৈন্যদের ক্লোন করবে কিংবা হারিয়ে যাওয়া নিয়ানডারথালদের মত শক্তিশালী মানব বা সৈন্য বাহিনী তৈরির চেষ্টা করবে। বিষয়টা ওই পাগল বৈজ্ঞানিকের মত হয়ে গেছে যে চেয়েছিল মানব ও শিম্পাঞ্জির মধ্যে ক্রস ব্রিড করতে। তাকে বহু কষ্টে থামানো হয়েছে। কিন্তু ক্লোনিং সম্ভব হলে বাস্তবতাটা কি হতে পারতো তা আরো বিচার বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার ছিল। এক সভায় আমার এক জুনিয়র ভাই প্রশ্ন করেছিল, ধরুন পুর মানুষ না যদি মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ক্লোন করা যেত তা হলে কেমন হতো? এর উত্তর তখন কেউ দিতে পারে নাই। আমার ধারণা এই বিষয়টাতে গবেষণা গোপনে চলছে কিংবা পারমানবিক বোমার ব্যবহার যেমন মানব অস্তিত্বের প্রশ্নে হুমকি তাই নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছে তেমনি ক্লোনিংকেও হুমকি মনে করা হচ্ছে ও এই বিষয়ক গবেষণাকে বন্ধ করা হয়েছে।

আচ্ছা এখন আসুন মানুষের দেহের ক্লোনিং সম্পর্কে চিন্তা করা বন্ধ করে রবোটিক্সের দিকে মনোনিবেশ করি? আমি যদি আমার মতো একটি রোবট খুঁজে পাই এবং আমার ক্লোন না হয় তবে পার্থক্য কি? ঠিক আছে এটি মানব নয় এবং এটির কোন মানব আত্মা কিংবা স্বাধীন ইচ্ছা নেই যা নিজেকে আমি বলে দাবি করে। এই মানব সদৃশ যন্ত্রটিকে আমাকে মান্য করতে বাধ্য আর এটিকে এআই দ্বারা তৈরি করা হয়েছে, তাই আমি এখানে আমার দ্বারা পরিচালিত আমার আরেকটি শরীর নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাচ্ছি, তাহলে কেমন দাঁড়াচ্ছে বিষয়টা? সমস্যা যুক্ত কোন কিছু কি এখানে আছে?, বরং এটি এক ধরণের এক্সটেন্ডেড অন্য আমি, এটি আমাকে আমার কাজের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে, এখন যদি আমরা এই দুটি ভেরিয়েবলকে জ্বলন্ত প্রশ্নের সমীকরণে রাখি, আমি মনে করি আমরা এখন এটি সমাধান করতে পারি। একই আমি যদি ক্লোনিং দ্বারা তৈরি করা হয় তবে আমারে আত্ম কিংবা বুদ্ধি দ্বারা এটি গ্রহণযোগ্য নয় কিন্তু এটি যদি সম্পূর্ণরূপে একই রকম একটি রোবট দ্বারা করা হয় তবে আমার আত্মা কিংবা বুদ্ধির কোন সমস্যা নেই, তাই নই কি দৃশ্য কল্পটি? যদি তাই হয় তবে এটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় যে আমরা নিজের ক্লোনিংকে অস্বীকার করি কারণ এটি নিজের আত্মকে সংঘাতের মধ্যে ফেলতে পারে তবে আমরা যদি ক্লোন রোবট দ্বারা ক্ষমতা প্রসারিত করতে পারি তবে আমাদের বুদ্ধি বা আত্মা কোন সমস্যার দ্বন্দ্বে পরে না। তাই এটা খুবই স্পষ্ট যে এটা আমাদেরে আত্মগর্ব "আমার বা আমি এটা করেছি, এটা আমি তৈরি করেছি এবং আমি অনন্য" সম্পর্কিত প্যারাডক্সটি সমাধান করে দেয়।


খুব বেশি দিন আগে নয়, একটি কনফারেন্সে একটি অল্প বয়স্ক ছেলে প্যানেলকে জিজ্ঞাসা করেছিল যে ঠিক আছে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে ক্লোনিং নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাহলে মানবদেহের অঙ্গগুলির ক্লোনিং সম্পর্কে কি হবে? আমরা কখনও কখনও দেখি আমাদের একটি বাহু বা একটি ত্রুটিমুক্ত হার্টের প্রয়োজন, একটি নতুন দিয়ে ঠিক করার জন্য, ক্লোনিং যদি আমাদের একটি নতুন মাংসল শরীর বা নিখুঁত হার্ট দিতে পারে তবে সমস্যা কোথায়, বরং এটির প্রশংসা করা উচিত। আমার প্রশ্ন হল যদি ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে অন্য একজন মানুষ সম্ভব হয় এবং এটি মানব জাতির মধ্যে জন্ম দেওয়ার একটি নতুন উপায় হয়ে ওঠে তাহলে এটা বন্ধ করতে হবে কেন? কেন আমরা এখানে একটি পূর্ণ নেতিবাচকতা দেখাচ্ছি? জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি আবিষ্কারের পূর্বে একটি এলোমেলো অবস্থা ছিল। জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের পর এখন আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে একটি ভূমিকা আছে এবং মানব জাতি এটিকে স্বাভাবিকভাবেই মোকাবেলা করছে। জন্ম দেওয়ার বিকল্প নতুন উপায় থাকলে সমস্যা কোথায় দাঁড়ায়? আরেকটি সমালোচনামূলক প্রশ্ন আমি কি উত্থাপন করতে পারি? কেন মানুষ মানুষের মত একই রকম রোবট বানাতে চায়, কেন তারা মানুষের মত নয় কিন্তু তার চেয়েও উন্নত রোবট বানানোর কথা ভাবতে পারে না? কার্টুন এবং সিনেমায় তারা ইতিমধ্যে এসব চিন্তা ভাবনা নিয়ে এসেছে তবে এটি মানুষের অন্তর্নিহিত ইচ্ছা যে তারা মানুষের মতো রোবট তৈরি করতে চায় সম্ভবত তাদের নিজেদের স্রষ্টা হিসাবে অনুভব করতে চাওয়ার একটা প্রবণতা এটি। তারা মানুষকে তৈরি করতে চায় যেমন তারা বিশ্বাস করে যে তাদের স্রষ্টা তৈরি করেছেন তাদের নিজের প্রতিমূর্তিতে। নাকি যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, তাদের ইচ্ছা হয় পরমেশ্বর হওয়ার? এটা দ্বারা কি তারা বিদ্যমান মহাবিশ্বের একটি অর্থ প্রকাশ করতে ইচ্ছুক? নাকি মানুষের আকৃতির গন্ডির বাইরে চিন্তা করার ক্ষমতাই তাদের নেই? প্রশ্নগুলো নতুন কিন্তু ভেবে দেখার মতো।

একটি বৃহত্তর কোণ থেকে আমরা দেখতে পাই, এই মানব জাতি ঈশ্বর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির সমাধান করতে পারেনি। অনেক ব্যাখ্যা, তত্ত্ব, মিথ ধর্ম তৈরি করেছে এবং তারপরেও তাদের ধারণাগুলি বিভক্ত হয়েছে। দিনে দিনে আরও জটিল করে তুলেছে। ঈশ্বর একা না অনেক তা এখনও সর্বসম্মতভাবে সমাধান করা যায়নি বা কখনও সমাধান করা যাচ্ছেও না। কেউ কেউ এমনকি সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে অস্বীকার করেছেন এবং প্রকৃতির বিবর্তনে বিশ্বাস করেছেন। তারা সর্বসম্মতিক্রমে সৃষ্টির মূল প্রশ্নটি সমাধান করতে পারেনি উপরন্তু তারা এখন ঈশ্বরের চরিত্রে অভিনয় করতে চাচ্ছে। জেনোর বিখ্যাত প্যারাডক্স যা বলে, এক কখনো দুটি হতে পারে না বা এক কখনো একাধিক হতে পারে না, কারণ একাধিক হলে তা আরো অধিক হবে এবং এক হারায়ে যাবে অনেকের মাঝে। এক তখন অনন্তর মধ্যে দ্রবীভূত হতে থাকবে যেমন আয়নার ভিতরের আয়না অসীমতার দিকে প্রবাহিত হয়। সুতরাং এক এর ধারণা অনেকের ধারণার সাথে বসবাস করতে পারে না, তারা পরস্পর বিরোধী হয়ে উঠে।  যদি একজন একা থাকে এবং তিনি দুই বা বহু সৃষ্টি করেন, তবে তিনি কি অনেকের মধ্যে আছেন নাকি একা একজন? তিনি যদি একজন হন তাহলে সৃষ্টি কি তাঁর থেকে উদ্ভূত? আমাদের আলোচ্য বিষয়ে যদি ফোকাস করি উদাহরণস্বরূপ যদি একজন রাষ্ট্রনেতা তার সমগ্র সেনাবাহিনীকে ক্লোনিং-এর উপর ভিত্তি করে বা মানব সদৃশ রোবট দ্বারা তার সর্বকালের সেরা পারফরম্যান্সের উপর ভিত্তি করে তৈরি করতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে এখানে বাধা কোথায়? অথবা ধরুন সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরুষ বা মহিলা সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে, কেউ যদি তার পছন্দের ক্লোন বা মানুষের মতো রোবট বন্ধু পেতে চায় তবে সমস্যা কোথায়? তাছাড়া এটি যে কোন নতুন আপগ্রেড বা পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য যোগ্য (এডজাস্টেবল) হতে পারে এবং এআই ইন্টারফেসিং দ্বারা মনোভাব নিয়ন্ত্রণ সহ একাধিক মুখ বা শরীরের আকৃতি পরিবর্তনের সুবিধা থাকতে পারে। তাতে করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর অভিযোগ যে নারীরা এরকম হয়, ওরকম হয় কিন্তু কখনো মনের মত হয় না।তখন মানিক বন্দোপাধ্যায় তার মনের মত যন্ত্র মানবী খুঁজে পাতেও পারেন।



যন্ত্রমানব কিংবা ক্লোনিং যাই হোক না কেন তা যদি বাস্তবে আসে তবে পরিস্থিতিটা কি রকম হবে? আমরা কি এখানে মানুষের তৈরি বিশ্ব বাস্তবতার কথা বলছি না? বাস্তবে বিগত কয়েক দশকে যান্ত্রিক বিপ্লবে নাটকীয় সব পরিবর্তন স্পষ্টতই হয়ে গেছে  আমাদের জীবনে। শুধু টেলিফোনিক যোগাযোগের পরিবর্তন সম্পর্কে চিন্তা করুন, ভ্রমণ ব্যবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করুন এবং হ্যাঁ এই পরিবর্তনগুলি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় দুর্দান্ত প্রভাব ফেলেছে এবং নিশ্চিতভাবে উদীয়মান প্রবণতা গুলি আমাদের পরবর্তী যুগের জীবন শৈলী পরিবর্তন করার জন্য জোরালো ভাবে চেষ্টা করছে। জীবন শৈলীতে এই পরিবর্তন অবশ্যই আমাদের পটভূমি দর্শনের পরিবর্তনের দাবি করে। তবে প্রচুর মানুষের প্রবণতা হল যে তারা তাদের দর্শন সহজে পরিবর্তন করতে নারাজ কারণ তারা এটির প্রেমে পড়েছে বা তা দ্বারা আবিষ্ট হয়ে গেছে। এটি বাস্তবতার সাথে বিরোধিতা করুক বা না করুক, তারা তাদের দর্শন পরিবর্তন করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করবে। তাদের বিশ্বাস ব্যবস্থার প্রতি যে কোন হুমকি থেকে তারা তাকে রক্ষা করবে যেন সেই প্রথায় বিশ্বাস তাদের ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করে আসছে।

আমি এই নিবন্ধটি সম্পূর্ণ বিচারের সাথে শেষ করছি না কারণ আমি নিজেও এখনও স্পষ্ট নই যে পরবর্তীতে নতুন কি প্রযুক্তি আসতে পারে এবং আমার চিন্তা অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার বা কোনও বিশ্বাস ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বলার কোনও উদ্দেশ্যে আমার নেই। এখানে আমি বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছি মাত্র যা অন্যের মতামত জানার উদ্দেশ্য নিয়ে আমার মনের মধ্যে দিয়ে গেছে।

একটি ফেইসবুক পেইজ থেকে উলুবনে মুক্তর মত নিচের অনুবাদকৃত অংশটি সংগ্রহীত যা আমার লেখার বিষয়বস্তুর সাথে মিলে যায় বিধায় এখানে সংযুক্ত করলাম। 

”ভবিষ্যত, একটি গুপ্ত বিশ্ব এখনো আবিষ্কৃত হয়নি, নতুনত্ব, রূপান্তর, এবং অসীম সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি ধরে রেখেছে। এটি মানবতার জন্য একটি ক্যানভাস, অগ্রগতির অবিচ্ছিন্ন সাধনা দ্বারা অনুপ্রাণিত। সময়ের মধ্যে, ভবিষ্যত একটি বীকন হিসাবে দাঁড়ায় যা আমাদের অজানা মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রযুক্তির অগ্রগতি, বৈজ্ঞানিক সাফল্য, এবং সামাজিক রূপান্তর সামনে যা আছে তা আকৃতি দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি, মহাকাশ অনুসন্ধান, এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ভবিষ্যতের ক্যানভাসে কয়েকটি ব্রাশস্ট্রোক, যা একটি আরো আন্তঃসংযুক্ত এবং টেকসই বিশ্বের দিকে নির্দেশ করে। ভবিষ্যৎ হল চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগের একটি জটিল ইন্টারপ্লে, একটি গতিশীল আড়াআড়ি যেখানে স্থিতিস্থাপকতা এবং অভিযোজিততা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক গতিশীলতা, এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক পার্থক্য তাদের সামনের দিকে ছায়া সৃষ্টি করে, যার জন্য একটি যৌথ প্রচেষ্টা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কাজ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সেবার বিবর্তন একটি রূপান্তর প্রত্যক্ষ করছে, যা ডিজিটালকরণের শক্তি এবং উদীয়মান প্রযুক্তির একীকরণ দ্বারা পরিচালিত হয়। যেহেতু আমরা ভবিষ্যতের অজানা অঞ্চলগুলি নেভিগেট করি, নৈতিক বিবেচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠে। গোপনীয়তার প্রশ্ন, এআই এর নৈতিকতা, এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার আমাদের উন্নত সভ্যতার গল্প আকার দিচ্ছে। নতুনত্ব এবং নৈতিক বিবেচনার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা অপরিহার্য যাতে ভবিষ্যতে মানবতার উন্নতির জন্য একটি শক্তি হিসাবে প্রকাশিত হয়। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে, ভবিষ্যতে ব্যক্তিগতকৃত ওষুধ, উন্নত চিকিৎসা, এবং জটিল রোগ বোঝার ও চিকিৎসায় সাফল্য পাওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রযুক্তি এবং জীববিদ্যার একত্রীকরণ আমাদের দীর্ঘ, স্বাস্থ্যকর জীবনের সন্ধানে নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। শিক্ষাও একটি দৃষ্টান্তমূলক শিফ্ট প্রত্যক্ষ করছে, যেহেতু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, এবং ব্যক্তিগত শেখার অভিজ্ঞতা কিভাবে জ্ঞান অর্জন এবং ভাগ করা হয় তা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করে। তথ্য ডেমোক্র্যাটকরণ একটি চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে বিশ্বব্যাপী ব্যক্তিদের জ্ঞান অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের জন্য ক্ষমতায়ন করার জন্য। আমাদের মহাকাশ অনুসন্ধানের থেকে ভবিষ্যৎ অবিচ্ছেদ্য। আমরা যখন আমাদের স্বর্গীয় সীমানা অতিক্রম করি, অন্যান্য গ্রহের মানুষের উপনিবেশকরণের সম্ভাবনা এবং বহির্বিশ্ব জীবনের আবিষ্কার আমাদের গোষ্ঠিগত কল্পনাশক্তিকে মুগ্ধ করে। মহাকাশ অনুসন্ধান এখন আর শুধুমাত্র একটি বৈজ্ঞানিক সাধনা নয়, বরং মানুষের কৌতূহল এবং অজানা অন্বেষণের সহজ আকাঙ্ক্ষার একটি প্রমাণ। তবে, ভবিষ্যত একটি সংকলিত সত্ত্বা নয়; এটি একটি মোজাইক”

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ১৭এপ্রিল২০১৯>২১এপ্রিল২০১৯> ইংলিশ থেকে বাংলায় অনুবাদ ১২ফেব্রুয়ারী২০২৪> ২৮ফেব্রুয়ারী২০২৪> ২৫মার্চ২০২৪> ৩০মার্চ২০২৪>৬জুন২০২৫>

প্রাসঙ্গীক লেখাঃ-

নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ -উর্বশী প্রসঙ্গে
https://surzil.blogspot.com/2024/03/blog-post_21.html

প্লাস্টিক আর কনক্রিটের মানুষ আর তাহাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রসঙ্গে
https://surzil.blogspot.com/2023/12/blog-post_29.html

যথার্থতার মানদণ্ডই বিবেক
https://surzil.blogspot.com/2023/10/blog-post.html  

বাস্তবতার আন্তলীন গুণাবলী  Inherent attributes of reality
https://surzil.blogspot.com/2023/01/inherent-attributes-of-reality.html

মনের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে যা বন্ধ করে দেয় তাই অনিষ্টকর
https://surzil.blogspot.com/2023/07/blog-post_25.html  

 

 আমার কাছে অনেকের প্রশ্ন
https://surzil.blogspot.com/2024/02/blog-post_28.html 



Saturday, March 23, 2024

এবার উর্বশী নয়, নারী প্রসঙ্গে কিছু কথা

 

কয়েকদিন আগে “নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ, উর্বশী প্রসঙ্গে” লেখাটা শেষ করে দেখলাম নারী সম্পর্কে লেখার আরো কিছু কথা বাকি রয়ে গেছে। বিষয়টা হলো নারীকে নিয়ে লিখতেই ভয় লাগে, কে যে কি বলে বসবে তার কোন ঠিক নাই। তবে আগের লেখাটা সম্পর্কে আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী ভাই এর মন্তব্য ছিল লেখাটা আমার সব থেকে ভালো লেখা গুলোর মধ্যে একটা হয়েছে, তাই সাহস করে পরের কথাগুলো লিখছি। পুরুষ মাত্রেই নারীকে নিয়ে তার মনে অনেক চিন্তা, কল্পনা, ভাবনা রয়েছে যার অধিকাংশই সে পাবলিকলি বা জনসমক্ষে প্রকাশ করে না বা করতে চায় না। নারী পুরুষের সম্পর্কের বিষয়ে পৃথিবীতে যতগুলো সমাজ আছে তার প্রতিটিতে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

১৩-মার্চ-২০২৪ তারিখে আমার স্কুল গ্রুপে বন্ধু সোহেলের পোস্টঃ ”ভয়ংকর এক নারী প্রজন্মের অপেক্ষায় আমরা!! ৭৫% উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে ২৭ থেকে ৩০ বয়সেও বিয়েহীন। ক্যারিয়ার গড়তে গিয়ে এরা এমন এক সংকট তৈরি করেছে যে, আগামী ৫ বছরে লাখ লাখ মেয়ে বিয়েহীন থাকবে। তাদের যৌবনের চাহিদা, আবেগ, ভালোবাসা হারানোর ফলে। স্বামীর মন জয় করার পরিবর্তে স্বামীর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েই সংসারে দরকষাকষি করবে ৷ আর স্বামীও তাদের মাঝে আনুগত্য, কোমলত্ব, নারীত্ব না পেয়ে অসহ্য হয়ে উঠবে। তখন সংসার টিকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। কারণ তার স্ত্রী ৩০টা বছর পুরুষের ফিতরাতে টেক্কা দিয়ে সে নিজেই পুরুষে বিবর্তিত হয়ে গেছে। তার আস্ত দেহটাই নারীর বৈশিষ্ট্য হলেও সে মানসিক ভাবে পুরুষ। স্বামী তাকে দৈহিক ভাবে নারী পেলেও সে ম্যান্টল ভাবে পুরুষ, এমন একটা দিন আসতে যাচ্ছে। মেয়েরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে যৌবন থেকে যেমন বঞ্চিত হবে। বঞ্চিত হবে সংসার থেকেও। বঞ্চিত হবে আখিরাতের মুক্তি থেকেও।” -লিখেছেন ডাক্তার, জাকিয়া সুলতানা।

সোহেল আমার স্কুলের বন্ধুর বক্তব্য ছিল “মনে হয় বিয়ে বিষয়টাই উঠে যাবে।” আমি প্রত্যুতরে বলেছিলাম, বাংলা একাডেমীর ভাষা শহীদ গ্রন্থমালার বই “বিবাহ” আমি পড়েছি। আর বিবাহের ধারনায় ইতিমধ্যেই বিবর্তন হয়ে গেছে, সামনে আরো হবে। ডাক্তার জাকিয়া সুলতানার উপরোক্ত বক্তব্য আমি সোশাল মিডিয়ার আরেক জায়গাতেও পড়লাম কিন্তু তার বক্তব্যর সাথে আমি একমত হতে পারি নাই। আমার মা ছিলেন ১৯৭০ সালের হোম ইকনমিক্স গ্র্যাজুয়েট, বাবা ঢাকা শহরের একজন শিক্ষিত মহিলাকে বিয়ে করবেন তাই তার ভাইয়েরা বিক্রমপুরের মেয়েদের বিয়ে করতে চাইলেও বাবা বিয়ে করলেন শহুরে এক শিক্ষিত মেয়েকে। আমার বাবার ভাইদের পরিবার তা সহজে মেনে নিতে পারে নাই, তাই বাবা মাকে নিয়ে আলাদা সংসার করে সরে গিয়েছিলেন। আমার মা বাবাকে কখনো আপনি বলে সম্বোধন করেনি আর আমিও বাবা মাকে আপনি বলি নি, সব সময় তুমি বলেই সম্বোধন করেছি। ওই সময়ে এটা সামাজিক রীতি ছিল না। আমার মা শিক্ষিত ছিল দেখেই আমার বাবার অকাল মৃত্যুর পর তিনি আমাকে লেখা পাড়া শিখায়ে বড় করে আমার তিন সন্তানের জনক হতে দেখে তার পর পরপারে চলে গেছেন। বাবা-মা’র মধ্যে প্রচুর ঝগড়া আমি প্রত্যক্ষ করছে কিন্তু তাদের ভিতরকার ভালোবাসাও আমি অনুভব করেছি। আমি ছিলাম তাদের একমাত্র সন্তান তাই বাবা-ম আর আমার বন্ধন ছিল প্রায় একাত্মার মত। ১৯৯০ এ বাবা আর ২০১৬ তে মা কে হারায়ে আমার পুর পৃথিবী অর্থহীন হয়ে যায়। মা’র শিক্ষিত হওয়া আমার বাবা মা পরিবারকে নষ্ট করতে পারে নাই বরং পারিবারিক অগ্রযাত্রায় মা এর ভূমিকা বিচার করলে বলতে হবে তারা পরস্পরের সম্পূরক ছিল। বাবা যতদূর আগায়ে দিয়ে গেছে, মা তা ধরে রেখে পরিবারটাকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরো সুদৃঢ় বা পাকা পোক্ত করে গেছেন। 

 

নেপোলিয়ন বলে গেছেন তাকে শিক্ষিত মা দিলে তিনি শিক্ষিত জাতি দিতে পারবেন। অশিক্ষিত মা সন্তান জন্ম দিতে পারলেও তার সন্তানদের সঠিক পথে গাইড করতে পারেন না। সন্তানেরা হয় গাইড লেস বাউণ্ডুলের মত। তার কয়েকটা বড় বড় উদাহারণ দিতে পারি যা আমার জীবদ্দশাতেই দেখে গেলাম। নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গ্রামের পর গ্রাম খালি পায়ে হেটে প্রচার করেছেন অথচ আজকের জাকিয়া সুলতানা নারী হয়েও নারীর শিক্ষার বিরুদ্ধে বলছেন, এটা কি মেনে নেয়া যায়? শিক্ষিত নারী মানুষিক ভাবে পুরুষে পরিণত হয়ে যায় জাকিয়া সুলতানার এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরং ইদানীং তৃতীয় লিঙ্গ নামে আরেকটি ধারণা সমাজে চলে এসেছে যেখানে নারী দেহে পুরুষ ও পুরুষ দেহে নারীর মানুষিকতাকে বুঝায়। এটা দৈহিক ভাবে বিকৃত নারী পুরুষ নয় বরং মানুষিক ভাবে বিবর্তিত নারীদেহে পুরুষ মানুষিকতা আর পুরুষ দেহে নারী মানুষিকতা। যার কারণ হিসেবে মানব দেহেরে হরমোনাল ইমবেলেন্সকে দায়ী করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের পাতায় সমুদ্র সৈকতে প্রচুর লেডি বয় দেখতে পাওয়া যায় যারা দৈহিক ভাবে পরিবর্তিত হয়ে পুরুষ থেকে নারী হয়েছে জীবিকার প্রয়োজনে। শিক্ষিত নারী পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে তখনই যখন নারীকে ভুল শিক্ষায় শিক্ষিত করা হবে। পুরুষ নারীর মধ্যে আনুগত্য চাবে কেন? দুজনেই তো মানুষ আর দুজনের সহমতেই তো তারা সংসার গঠন করে। আগের দিন কি আছে? যে জানা নেই শুনা নেই ”উঠ ছেরি তোর বিয়া” কিংবা আমার মা’র মামা আমার বড় নানা ভাই কে তার বাবা ঢাকা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ঘাটাইলের কাজি বাড়ির এক মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। নানা ভাই জানতোও না যে তাকে বিয়ের জন্য ডেকে পাঠান হয়েছে। আজকের দিনের সংসার আর আগের দিনের সংসার এক নয়, ধারণাগত পার্থক্য আছে। আমার স্ত্রী শিক্ষিত বলে আর আমার সন্তানদের উপর তার নিয়ন্ত্রন থাকায় আমি অবাক হয়ে দেখেছি যে, প্রতিটা সন্তানই সঠিক ভাবে সব আদব কায়দা শিখে বড় হচ্ছে। অথচ হাতের কাছেই উদাহারণ আছে যে মা মানুষিক ভাবে সংসারে সময় দিতে অগোছালো হওয়ায় সন্তানদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আধুনিক পরিবারে শিক্ষিত মা’য়ের বিকল্প চিন্তাই করা যায় না। জাকিয়া সুলতানার বক্তব্য শিক্ষিত নারীরা অধিক বয়স পর্যন্ত বিয়ে করতে চায় না আর পুরুষকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, তার এ সব কথা তার ব্যক্তিগত চিন্তার ফল, বাস্তবে তা হলে আমার মা-বাবার পরিবার টিকতো না। বর্তমানের স্বামীদের স্ত্রীদের কাছ থেকে আনুগত্য পেতে হলে তাকে তার স্ত্রীর চেয়ে অধিকতর জ্ঞান সম্পন্ন প্রমাণ করতে হবে, তা না হলে সেটা সে আশা করতে পারে না। কোমলত্ব আর নারীর স্বভাবসুলভ কমনীয়তা তা যে কোন নারী মাত্রেই আছে, সেটা সে তার স্বামীকে দিবে যদি সে তার স্বামীকে সেই ভাবে ভালোবাসে। বিয়ে করলেই যে একটা মেয়ে তার কমনীয়তা তার স্বামীকে দিতে বাধ্য সেই দিন শেষ হয়ে গেছে। স্বামীকে তার স্ত্রীর কাছ থেকে সেই নারীত্ব বা কমনীয়তাও আদায় করে নিতে হবে। আগে যা ছিল ফাও বা ফ্রি এখন তা সহানুভূতি আর ভালোবাসার দামে কিনে নিতে হবে। পূর্বের অশিক্ষিত নারী ও শিক্ষিত পুরুষে এর দাম্পত্য জীবন আর আজকের আধুনিক নারী-পুরুষ উভয়ে শিক্ষিত এর দাম্পত্য জীবনে এতটুকুই পার্থক্য। এর চেয়ে বেশি কিছুই না।

শিক্ষিত নারী কে অনেক পুরুষ ভয় পায় যে তার কাছ থেকে আনুগত্য পাবে না, অনেক পুরুষ বিয়ে করতেই চায় না এই কারণে। এক্ষেত্রে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যটা একটা উদাহারণ।


মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কে বলতে চাই, অনেক বিয়ে না করা পুরুষের বক্তব্যই এরকম কারণ সে তার মনের উর্বশীকে মেয়ের মধ্যে দেখতে চায় কিন্তু পুরুষ মনের উর্বশীর ধারণা সব সময় অধরাই থেকে যাবে, উর্বশী একটি বিমূর্ত ধারণা তা বাস্তবের নারীর মধ্যে খুঁজতে যাওয়া ভুল। নারীকে তার আসল রূপেই গ্রহণ করতে হবে উর্বশী রূপে নয়। হ্যাঁ নারী আপনার কাছে উর্বশী রূপে ধরা দিবে যখন তার ইচ্ছা হয় তখন, আপনি চাইলেই তাকে সব সময় ওই রূপে পাবেন না। সব নারীর মধ্যেই উর্বশী লুকায়ে আছে আর সে যাকে ইচ্ছা তাকে সেই রূপ প্রদর্শন করে থাকে। আপনার মনের মত উর্বশীকে না খুঁজে যে কোন নারীকে নারী হিসেবে কিংবা স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করুন তার পর তার মধ্যের উর্বশীকে বের হয়ে আসার অমন্ত্রন জানান, আপনি ভালোবাসা দিয়েই সেই উর্বশীর দেখা পাবেন অন্যথায় নয়।

নিচের লেখাগুলো হুমায়ুন আজাদের উক্তির নামে সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচারিত হয়েছিল,

“নারীকে চাকরী দিবো কিন্তু সে মা হতে পারবেনা!!!  মা হবে এটা মেনে নিয়ে মাতৃত্বকালীন ছুটি দিলেও সন্তান সাথে আনা যাবেনা। এমন একটা পরিবেশ সব কর্মক্ষেত্রে বিরাজ করছে। কিন্তু কোন নারী তা স্পষ্ট করে, চিৎকার করে বলতে পারছে না। যদি চাকুরি খানা চলে যায়। কর্মক্ষেত্রে রাষ্ট্র নারী নিয়োগ দিলে সে একদিন মা হবে এটা কি তার অজানা?

নারী যদি মা হয় তবে তার সন্তানকে কে দেখবে যদি কর্মক্ষেত্র সন্তানবান্ধব না হয়!  নারী ডাক্তার হলে চিকিৎসা নিবেন, নার্স হলে সেবা নিবেন, শিক্ষক হলে শিক্ষা নিবেন,
পাইলট হলে বিমান চালায়ে নিবেন, ব্যাংকার হলে টাকার হিসাব কষাবেন শুধু নিবেন না তার সন্তানকে!! সবার জেগে ওঠা দরকার। জানতে চাওয়া দরকার বাচ্চাটা থাকবে কোথায়! রাষ্ট্র  কেন তার নাগরিকের দ্বায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে!

মাতৃত্বকে অবজ্ঞা করবেন না তাহলে নিজের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। যেখানে ভিনদেশী নারীরা সন্তান কাঁধে নিয়ে সংসদে। সেখানে আমাদের কর্মস্থলে সন্তান কাঁধে থাকলে নাকি শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হবে। রাষ্ট্রের উচিত অনতি বিলম্বে সব প্রতিষ্ঠানে নারীর সন্তানের জন্য উদ্যেগ গ্রহন করা। বুয়ার কাছে আলমারির চাবি রাখতে পারে না অথচ নিজের সন্তানকে রাখতে বাধ্য হচ্ছে কর্মজীবী সকল নারী।”

উপরের কথাগুলো কিন্তু একটা বিশাল আপত্তি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যান্টিনের উপরতলায় ”বেবিস ডে কেয়ার” বা কর্মজীবী মহিলাদের বাচ্চাদের দেখা শুনার জন্য ব্যবস্থা দেখেছি। দেখে হতাশ হয়েছি, এরকম বাজে পরিবেশে কেউ তার বাচ্চাকে রাখতে রাজি হবে কেন? আমার জানামতে এক চাকুরীজীবী দম্পতি তার বাসায় ১২ টা সিসিটিভি কেমেরা লাগিয়ে বুয়াদের কাছে বাচ্চা রেখে আসে, যাতে প্রয়োজনে সে বুয়াকে ডেকে বাচ্চাদের টেইক কেয়ারে সহযোগিতা করতে পারে। আমার খালা চলে গেলেন ক্যানাডায় আমার খালুকে একা বাসায় ফেলে রেখে কারণ তার ছোট মেয়ে দু দুটা বাচ্চা সামলে চাকুরী করতে পারছে না, মাকে দরকার বাচ্চাদের দেখাশুনার জন্য। মেয়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটিও যথেষ্ট নয় বাচ্চাদের দেখা শুনা করার জন্য। এই সমস্যার সমাধান আমারও জানা নাই।

“বাপরে বাপ লেখাটি পড়ে মনে হল কি যে এক দুরন্তপনা বয়স, মন চাইলেই রাজার রাজা আবার না চাইলেই বয়সের কষ্টে যেন ইঁদুর ছানা” মন্তব্যটা করেছেন আমার সমবয়সী ১৯৮৯ এ এসএসসি বেচের এক মহিলা বান্ধবী, তার কাছ থেকেই নিচের কবিতাটা সংগৃহীত। উনি আমার একটা লেখা পড়ে তার কিশোরী মেয়ের অবাধ্যপনা  নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তার করনীয় সম্পর্কে অনেক পরামর্শ জেনে নিয়েছিল। তখন নিচের কবিতাটা পাই তার মন্তব্য সহ তার সংগ্রহে। তখন তুলে রেখেছিলাম এই লেখার অংশ করবো বলে।  


 🌷পঞ্চাশের যুবতী🌷

কি সাহস রে বাবা মহিলার।
বয়সটা যে পঞ্চাশ ছুঁয়েছে সে দিকে
কোনো ভ্রুক্ষেপ ই নেই।
কি একটিভ স‍্যোশাল মিডিয়ায় !!
ফেসবুক,ইনস্টাগ্রাম কিছুতে--ই বাদ নেই।
সারা দিনে তার লাইক, কমেন্ট,আর শেয়ারের ছড়াছড়ি।
আবার টিকটকেও কখনো নায়িকা-, --তো কখনো গায়িকা !
বাপরে বা---প পারেও বটে।
নিজেকে একেবারে টিন এজারে এনে নামিয়েছে।
এই তো সেদিন দেখলাম
হৈ হৈ করতে করতে
পার্টিতে মেয়ের সাথে ডান্স করছে।
উঁঃ লজ্জার মাথা খেয়েছে এক্কেবারে।
           *     *    *
হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ বলুন। যত্ত খুশি বলুন।
এ সব শুনে শুনে গা সওয়া হয়ে গেছে, বুঝলেন।
কি হয়েছে পঞ্চাশ হয়েছে তো।
পঞ্চাশ হয়েছে বলে ঘরের কোণে
একটা সুতির ছাপা পরে বসে থাকব নাকি।
শুনুন,সারা জীবন শুধু
এটা করতে নেই, ওটা করতে নেই
এখানে যাওয়া হবে না, ওখানে যাওয়া হবে না
এই ই শুনে এসেছি।

যখন ষোলোই ছিলাম
ছেলে বন্ধু তো দূরের কথা
কোনো মেয়ে বন্ধুর বাড়িতে গেলেও
মা কে সঙ্গে নিয়ে যেতে হতো।
আর পিকনিক, ঘোরাফেরা, সিনেমা !
এ সব তো অলীক কল্পনা ছিল মশাই---
অলীক কল্পনা।

তারপর যখন কুড়ি হল---
বেশ রাঙা টুকটুকে বৌ সেজে শ্বশুরবাড়িতে এলাম।
বাপ রে বা---প !!!
সেখানেও আবার এমন নজরদারি,
কি বলি  !! ---
কোনটা খাইনা, কেন খাইনা?
হাতে কেন বড় বড় নখ রেখেছি?
সকলের সামনে নাইটি পড়তে আমার লজ্জা করে কিনা,---
মেয়ে মানুষ হয়ে এত হৈ হৈ কিসের,
ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি।
আর বাইরে গেলে  !
শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, জা -ননদ হাজারটা কৈফিয়ত।

তারপর পঁচিশে---,  যখন মা হলাম,
ছেলেকে খাওয়াতে অসুবিধা হবে বলে
নাইটি ছেড়ে সুতির ছাপা পড়া ধরলাম।
কোমরে আঁচল গুঁজে এমন দশভুজা হয়ে গেলাম যে----
কোথায় সিনেমা,কোথায় বেড়ানো,
আর কোথায় যে আনন্দ সব ভুলে গেলাম।
না না এটার জন‍্য আক্ষেপ করছি না।
এটা তো আমার কর্তব্য।

দেখতে দেখতে আরো পঁচিশটা বছ--র কেটে গেল।
ছেলে আর মেয়ের পড়াশোনা, গানবাজনা
আর ওদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা নিয়ে।
ওদের সংসারও গড়ে দিয়েছি নিজের হাতে।
ওরা এখন যে যার মত ---
বন্ধু বান্ধব, হৈ হুল্লোড়,পার্টি, ভ্রমণ এসব নিয়ে ব‍্যস্ত।

তাই আমিও একটা প্রফাইল খুললাম
খুঁজে নিলাম নিজের একটা জগৎ।
জানেন? আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডের সংখ‍্যা এখন দু-হাজার ছাড়িয়েছে!
আমা---র আবার ফেসবুকে ভেসে ওঠা
ঐ সব রেডিমেড  কমেন্টে মন ভরেনা।
তাই ভালো কোনো পোষ্ট পেলেই
ইয়া---ব্বড় একটা কমেন্ট লিখি।
কত খুশি হয় ওরা জানেন?
আর আমার কবিতা গুলো যখন
শেয়ারের পর শেয়ার হয়,
তখন মনটা আনন্দে উথলে ওঠে।
এই নিয়েই তো আমার একার দুপুর টা কাটিয়ে দিই রোজ।
মেয়ে, জামাই, ছেলে, বৌমা ওরা যখন দু-দিনের জন‍্য এসে আবার চলে যায়
তখন ঐ খারাপ মনটা ভোলাতে খুব বেশি সময় লাগে না আমার।
জানেন,আমি এখন নিজের পছন্দের মাছ কিনি বাজার থেকে।
আর যে খাবারটা খেতে ইচ্ছে সেটাই বানাই।
যেখানে যেতে ইচ্ছে করে সেখানে যাই।
আর তো কটা মাত্র দিন পড়ে আছে তাই না।
নিজেকে কি করে ঠকাই বলুন তো?
মর্নিং ওয়াক করি, কিটো ডায়েট করি,
ঘন ঘন পার্লারে যাই।
শরীর চর্চা থেকে মনের চর্চা
স---ব সব করি এখন।
এই তো আমার যুবতি হওয়ার বয়স।
তাই যে যাই বলুক
চলুন, মনের বয়স বাড়তে না দিয়ে
এই পঞ্চাশেই আবার না হয় যুবতি হয়ে যাই।


✍ কলমেঃ গোপা গরাইন মন্ডল।

গোপা গরাইন মন্ডল আপনি যে ই হন না কেন, আপনার “পঞ্চাশের যুবতী” কবিতার কথাগুলোর সাথে শতভাগ একমত হওয়া ছাড়া কারো কোন গত্যন্তর নাই। আমাদের দেশের মেয়েদের জীবনের পুরটাই বর্ণনা করেছেন আপনি। বর্তমান সময়ে এটাই সর্বতোভাবে স্বাভাবিক কথন।

নারী দিবসে আমাদের গোপী নাথ দাস স্যার (সোনালী ব্যাংক পিএলসি’র এক্স জিএম) অবসরে নিচের কবিতা গুলো ফেইসবুকে পোস্ট করেছেন। প্রাসঙ্গিক বলে তুলে আনলাম।

। ১ ।
নারীবাদী ভাবেন এবং বলেন,
সমাজের প্রধান ভুমিকায়
পুরুষেরা নিজেদের ভাবে মুখ্য
তারা নারীদের ভাবে গৌণ
সম্পুর্ন প্রতিপক্ষ যেন
নারী ঠিক মানুষ নয়
ভিন্নকিছু।
পুরুষ নারীর সিংহী শক্তিরে
দুর্বল করে অলংকারের শৃঙ্খলে
মনি-কাঞ্চন প্রিয়তমা দেবী বলে।
নারী মুক্তি মুচ্কি হাসে আড়ালে।

৷ ২ ।
আইন কানুন সংবিধান
নারী ও পুরুষের অধিকার সমান।
তবে বাস্তবে তা
ভোগ করতে পারে না নারী, কেননা
সবকিছুতেই নারীকে
তাকিয়ে থাকতে হয় পুরুষের দিকে।

 । ৩ ।  
হাজার হাজার বছর ধরে
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে
পুরুষের অন্যায় নিপীড়নে
ব্যবহৃত অসহায় নারী।
দুর্বল নারী রক্তে হীনমন্যতা
প্রতিশোধ আর ক্ষমতার স্পৃহা
সুযোগে জ্বলে ওঠা
নিরবে খেলা করে মনে।

। ৪ ।
শিকল ভেঙে ঘুমটা ফেলে
অবরোধের পাহাড় পেরিয়ে
নারী আজ
বেরিয়ে পড়েছে প্রগতির পথে।
অবদান রেখে চলেছে সভ্যতা বিনির্মানে
জয়তু জয়িতা কীর্তিময়ী নারী তাঁর
জয়ৈষণায় জয়টিকা
সাহসী বুদ্ধিদীপ্ত মন-মননে
বাজুক জয়শঙ্খ চরনে চরনে।

 । ৫ ।
ইরানী ফুলের সুগন্ধি
নার্গিস মোহাম্মদি
জান জিন্দেগী
চাহে
নারী জীবনের আজাদি।

উপরের গোপিনাথ স্যারের পাঁচটি কণিকা পদ্য পড়ে মনে হলো সবটাই বুঝেছি শুধু পঞ্চমটা বাদে। আমি এত এত লেখা লিখে যা বুঝাতে চাচ্ছি তা স্যার মাত্র পাঁচটা কণিকা কবিতায় বর্ণনা করে দিলেন, অবাক ব্যাপার। ৫২ বছরের এই জীবনে প্রায় সব ধরনের নারী সম্পর্কেই কিছু না কিছু ধারণা হয়েছে। দুই কন্যা সন্তানের জনকও হয়ে গেছি ইতিমধ্যে। আমার কাছে নারী পুরুষ আসলে মানবেরই দুটো ভিন্ন রূপ। সব শিশুই নাকি প্রথমে নারী তার পর নারী বা পুরুষে পরিবর্তিত হয় মাতৃগর্ভে। আগে বন্ধ্যা নারীর জন্য কেবল নারীকে দায়ী করা হতো এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানের বদৌলতে জানা গেলে সন্তান না হওয়ার জন্য পুরুষকেও দায়ী করা যায়। ছেলে সন্তানের জন্ম দিতে পারে না বলে নারীকে দায়ী করা হতো আগে, আজ সবাই জানে ছেলে হবে না মেয়ে হবে সন্তান তা নির্ভর করে পুরুষটার বীজের উপর। নারীকে পুরুষে কিংবা পুরুষকে নারীতে রূপান্তর করা সম্ভব তার শরীরের হরমন পরিবর্তন করে যা আজকের পৃথিবীতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। পুরুষ দেহে নারীর মন কিংবা নারীদেহে পুরুষ মনও মনস্তাত্ত্বিক ভাবে প্রমাণিত সত্য আজকের জমানায়। তাই নারীর পরাজিত অবস্থাটা এখন আর নাই। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এর সেই নারী মুক্তি আন্দোলন আজকের সময়ে বাস্তব রূপ পেয়েছে। নারীরা সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সমানে সমান প্রমাণ করে ছেড়েছে। নারী পুরুষের সেই ব্যবধানটা এখন আর নাই বললেই চলে। তবে প্রকৃতিগত ভাবে নারীত্ব (উর্বশী) আর পৌরুষ (হারকিউলিস) টিকে থাকবে যতদিন মানব সভ্যতা টিকে থাকে।  নারী নিয়ে অনেক কিছু লিখলাম এই দুটো লেখাতে, আমার আর কিছু বলার নাই। ভবিষ্যতের নারী পুরুষের সমান সমান সেটা সব পুরুষ মেনে নিক, পাশাপাশি নারী যেন তার নারীত্বকে ভুলে না বসে তার দিকে খেয়াল রাখুক এ দুটো কথাই এতকিছু লেখার সারমর্ম।

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ২৮ফেব্রুয়ারী২০২৪> ১৪মার্চ২০২৪> ২৪মার্চ২০২৪>

প্রাসঙ্গীক লেখাঃ-

নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ -উর্বশী প্রসঙ্গে
https://surzil.blogspot.com/2024/03/blog-post_21.html

প্লাস্টিক আর কনক্রিটের মানুষ আর তাহাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রসঙ্গে
https://surzil.blogspot.com/2023/12/blog-post_29.html

যথার্থতার মানদণ্ডই বিবেক
https://surzil.blogspot.com/2023/10/blog-post.html  

বাস্তবতার আন্তলীন গুণাবলী  Inherent attributes of reality
https://surzil.blogspot.com/2023/01/inherent-attributes-of-reality.html

মনের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে যা বন্ধ করে দেয় তাই অনিষ্টকর
https://surzil.blogspot.com/2023/07/blog-post_25.html  

 

 আমার কাছে অনেকের প্রশ্ন
https://surzil.blogspot.com/2024/02/blog-post_28.html 

Thursday, March 21, 2024

নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ -উর্বশী প্রসঙ্গে

রবীন্দ্রনাথ নারীর বিমূর্ত রূপের নামকরণ করেছেন উর্বশী তার কবিতার মাধ্যমে। যারা চিত্রা কাব্যগ্রন্থের উর্বশী কবিতাটা পড়েননি তারা এই লেখার ভুল অর্থ করতে পারেন তাই তাদের উর্বশী কবিতা ও এ সংক্রান্ত আলোচনাটা পড়ে তার পর লেখাটা পড়ার আনুরোধ রইলো। নিচের লিংক দুটাতে কবিতাটি ও ইউটিউবে এর আলোচনা রয়েছে। 

ইউ টিউব এর আলোচনাঃ https://www.youtube.com/watch?v=dt9v97gnB3o
 
চিত্রা কাব্যগ্রন্থে উর্বশী কবিতাটি  https://banglasahitya.net/উর্বশী-urvashi-by-rabindranath-tagore

আমি নারী নিয়ে লিখছি না বরং বিমূর্ত নারী নিয়ে লিখেছি তাই কেউ দয়া করে ভুল বুঝবেন না। এই বিমূর্ত নারী যা সকল পুরুষ প্রাণের আরাধ্য তাকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করে তার স্বরূপ প্রকাশ করার মত উচ্চতর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাতে কোন সন্দেহ নাই। এই নারী ও নারীর পোশাক হিসেবে সারিকে নিয়ে লিখা লিখে আবদুল্লা আবু সাঈদের মত বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বও নানা মহলের তিরস্কার পেয়েছেন বলে শুনেছি। তিনি স্রেফ বলেছিলেন সারিতে নারীকে অধিক রমণীয় লাগে, ব্যাস হয়ে গেল কেন তিনি নারীকে রমণী বললেন? রমণ থেকে রমণী শব্দের উৎপত্তি তাই তার কথায় অশ্লীলতার ছোঁয়া লেগে গিয়েছিল মনে হয়। বিমূর্ত নারী কিংবা বিমূর্ত পুরুষ কিন্তু ব্যক্তি নারী কিংবা ব্যক্তি পুরুষ থেকে পৃথক, বিষয়টা আগে স্পষ্ট করে বুঝে নিয়ে পাঠককে লেখাটা পড়তে অনুরোধ করবো। আমি মা, বোনকে উদ্দেশ্য করে এ লেখায় কিছু লিখি নাই, নারীর যে বিমূর্ত রূপ যাকে রবীন্দ্রনাথ উর্বশী বলেছেন সে সম্পর্কে লিখেছি। পাঠককে তাই লিখার বিষয়বস্তু সম্পর্কে সতর্ক করছি যাতে সে ভুল না বুঝে।

নারী নামের গবেষণা ধর্মী বই লিখেছেন হুমায়ুন আজাদ। এই হুমায়ুন আজাদ হুমায়ূন আহমেদের সব লেখাকেই হালকা লেখা বলতেন। বাস্তবে দেখা গেল হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস নারীদের কাছে অধিক জনপ্রিয়তা পেয়েছে হুমায়ূন আজাদের গবেষণা গ্রন্থ নারীর চেয়ে। পাক সাফ জমিন সাদ বাদ বইটি হুমায়ূন আজাদের লেখা, আমি পড়েছি। বইটি নিয়ে তৎকালীন জামাত এর সংসদ সদস্য প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সংসদে। তার পরবর্তীতে বই মেলার কাছে এক অন্ধ গলিতে তাকে বেদম প্রহার করে ফেলে রেখে যায় সম্ভবত জামাত শিবিরের ছোকরারা। তার পর তার চিকিৎসা হয় জার্মানিতে ও সে ফিরে এসে দু একটা সভায় বক্তব্য দেয়ার পর মারা যান। আমি সেই সময় ঢাকা ইউনিভার্সিটির কমার্স ফ্যাকাল্টিতে অর্থনীতির ক্লাসে উৎপাদন খাতে ইনভারটেড ইউ এর মতবাদ শুনছিলাম। স্যার বললেন হুমায়ূন আজাদ এসেছেন নিচে, এই ক্লাসের চেয়ে বরং নিচে নেমে উনার দু একটা কথা শুনাও মহা মূল্যবান হবে। বলে উনি ক্লাস সংক্ষিপ্ত করে চলে গিয়েছিলেন। নারীকে নিয়ে কথা বলতে গেলে এত বিপত্তি হবে কেন? নারীরা তো তেমন কোন ভুত প্রেত নয় যে তাদের নিয়ে কথা বললেই সমাজে তুল কালাম কান্ড বেধে যাবে। বর্তমানের নারী একদল উন্মুক্ত আর এক দল বোরখা আর নেকাবের অন্তরালে সমাজের এক অদৃশ্য রূপ ধারণ করতে চাইছে। একটা সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন? টম এন্ড জেরি ছাড়া এমন কোন নাটক, মুভি, গল্প, উপন্যাস কি আছে যেখানে নারী চরিত্র নেই। কিংবা নারীকে বাদ দিয়ে এমনকি কোন যুদ্ধের ছবিও নির্মিত হয়েছে? বরং নারীর জন্যই যেন নির্মিত হয়েছে মুভিগুলো। যারা নারীবাদী তারা বলবে পুরুষরাই নির্মাণ করেছে সব ছায়াছবি আর তারা তাদের মত করে নির্মাণ করেছে নারী চরিত্র তাই সেটা নারীর আসল রূপ নয় বরং পুরুষ রচিত নারী রূপ।

এবার তবে আমার এক বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা বলি, ১৯৯৯ সালে আমি তখন আমার ছোট মামার ডেক্সটপ পাবলিশিং হাউজ কালার রুটসে কর্মরত। তো একদিন মামা ডেকে বললো একজন ক্লায়েন্ট এসেছে যে ইমেইল করবে। তখন সবার বাসায় কম্পিউটার ছিল না আর ইমেইল করা মানে তো বিশাল ব্যাপার। তখন পাড়ায় পাড়ায় সাইবার ক্যাফের যুগ চলছে। ইন্টারনেট কি জিনিস মানুষ শিখছে। ফেইসবুক, টুইটার, হোয়াটসএপ, ভাইবার এগুলোর জন্মই হয়নি তখন। তো আমি সেই ক্লায়েন্টকে ইমেইলের ইউডোরা ওপেন করে দিলাম। সে তাতে কাজ করলো। বালক সদৃশ সার্ট পেন্ট পড়া দেখতে মেয়ে মেয়ে ভাব আছে চেহারায়, সেটাই ছিল আমার প্রথম দেখার বিশ্বাস। এই ক্লায়েন্ট পরেও বেশ কয়েক বার আসে আর আমি দ্বিতীয় ও তৃতীয় বারে নিশ্চিত হই যে, সে আসলে মেয়েলী চেহারার ছেলে নয় বরং সে একজন নারী। তার বাবা তাকে শার্ট পেন্ট পড়ায়েই মানুষ করেছে। তার মনেও নারী পুরুষ ভেদাভেদ নেই। বিষয়টি আমার তরুণ মনে দারুণ ধাক্কা দিয়েছিল। নারী সম্পর্কে আমার ধারণায় একটা উৎপটাং ধাক্কা খেয়েছিলাম। 

 

বাঙ্গালী নারীর মন ও চারিত্রিক রূপরেখা রবীন্দ্রনাথ অংকন করেছেন তার কব্য রচনায় কোন আজগুবি কল্পনা থেকে নয় বরং যা ছিল তখনকার সমাজে ভালো তাকেই তিনি উঠায়ে এনে সবার মাঝে ছাড়ায়ে দিয়েছেন। নব্য আধুনিক বাংগালীআনার জন্ম শুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের “সেই সময়” উপন্যাস পড়লেই পরিষ্কার ছায়া ছবির মত দেখতে পাওয়া যায়। সেই সময় বইটা নিয়ে সিনেমা হওয়া উচিত। এত সুন্দর করে তিনি বাঙ্গালীদের জাগরণ ও নব্য আধুনিক বাঙ্গালীর উদ্ভব তুলে ধরেছেন যা অন্য কোন লেখক করেছেন বলে আমার জানা নাই। হুমায়ুন আজাদের নারী বইটা পড়লাম তা কেনার বহু বছর পর, প্রথম যখন কিনি তখন কয়েক পাতা পড়ার পর আগ্রহ হারেয়ে ফেলি।  এত বছর পর পড়া হচ্ছে তা’ও ধীরে ধীরে।  যত পড়ছি তত কয়েকটা শব্দ বার বার আসছে, নরীর পরাজয় আর পুরষতন্ত্র দ্বারা নারীকে অবদমিত করা। যখন কন্ট্রাসেভটিভ আবিষ্কার হলো তখন একটা নরী মুক্তি ঘটেছে বলে আমার বিশ্বাস আর এদেশে নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী সংসদের স্পীকার, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অগ্রাধিকার, নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ দান এ সব দেখার পর হুমায়ুন আজাদের নারীর পরাজয় আর পুরুষ কর্তৃক নারীর প্রতি বা নারীত্বের প্রতি অত্যাচার এর কথা ঠিক মানা যায় না। তবে ঐতিহাসিক ভাবে নারীর পরাজয়টা হয়েছিল যখন থেকে পুরুষ বুঝতে পেরেছিল যে নারীর পেটে যে বাচ্চাটা আসে সেটার আসল বীজ থাকে তার অণ্ডকোষে। হিন্দু ধর্মে শিবের লিঙ্গ পূজা কেন করে তা আমার বোধগম্য নয়। কলশি কলশি দুধ কেন শিবলিঙ্গে ঢালতে হবে তার কাণ্ডকারখানাও আমার কাছে আজগুবি লাগে। তাদের কাছে শিব সত্য, শিব সুন্দর আর যা সুন্দর তাই সত্য, তাই তারা বলে সত্যম-শিবম-সুন্দরম। হুমায়ূন আজাদের নারী গ্রন্থটি একটা গবেষণা ধর্মী বই আর তার ধরণ ধারণও ভিন্ন। লিটারেচারের বদলে তাতে থিসিস রূপটা বেশি। ওই বই থেকে নারীর প্রকৃত চিত্রটি ফুটে উঠে বলে মনে হয় না বরং নারী (রমণী) শব্দটা যে পুরুষ রচিত ও পুরুষ কর্তৃক নির্মিত তা বুঝা যায়। ইসলাম ধর্মে নারীকে পাজরের হাড়ের সাথে তুলনা করেছে, যাকে বেশি বাঁকালে ভেঙ্গে যাবে আর ছেড়ে দিলে পুরাই সোজা হয়ে যাবে। যে হাদিসে এটা বলা হয়েছে সেটাও আমি পড়েছি তাই নারী গ্রন্থে এর উল্লেখ যথার্থ হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ সব ধর্মে নারীকে কিভাবে নিম্নস্তরে নামানো হয়েছে তার তথ্য উপাত্ত দলিল আকারে উপস্থাপন করেছেন তার বইয়ে। তিনি বলেছেন ইসলাম ধর্মে নারীকে পূর্নাঙ্গ মানুষই মনে করা হয় না বরং তাকে আদমের পাজরের হারের থেকে বানান একটি অপূর্ণাঙ্গ মানবী বলে মনে করে থাকে। তার এ কথার যুক্তি কিন্তু মুসলিমরা খন্ডাতে পারবে না। ওরা পারবে জোর খাটায়ে, যেমন সালমান রুশদির মাথার দাম ধরেছিল কয়েক লক্ষ দিনার, সেরকম প্রতিবাদ তারা করতে পারবে কিন্তু যুক্তি খন্ডান অত সহজ না। কারণ এর লিখিত দলিল আছে সবার কাছেই। পুরুষের পৌরুষ আর নারীর নারীত্বকে নানা লেখক নানা ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। নারীর ক্ষমতাকে কেউ বলেছেন ছদ্ম ক্ষমতা বা পর্দার পিছনের ক্ষমতা। দাউদ আঃ কে নিয়ে একটা মুভি দেখেছিলাম অনেক আগে সেখানে দেখানো হয় সম্রাট সুলেমান বা কিং সলোমন কে মসনদে বসায়ে পেছন থেকে তার মা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। কিংবদন্তী ক্লিওপেট্রার কথা কে না জানে, জুলিয়াস সিজার আর রোমান সম্রাজ্য সম্পর্কে ইতিহাসের ছাত্ররা তো জানবে অবশ্যই। এই ক্লিওপেট্রাকে কারপেটে মুড়ে এক নফর লুকায়ে নিয়ে গিয়েছিল জুলিয়াস সিজারের ঘরে। তার পরের ঘটনা গুলোই বলে দেয় ক্লিওপেট্রার আর জুলিয়াস সিজারের কাহিনীগুলো। এমনও অনেক ভাস্কর ছিল যারা জীবনে ক্লিওপেট্রাকে দেখেনি কিন্তু তার মূর্তি নির্মাণ করেছেন। ট্রয় এর যুদ্ধের হেলেন এর কথা কে না জানে। বলা হয় হেলেন ছিলেন একটা উপলক্ষ মাত্র কিন্তু যুদ্ধটা ছিল বহু দিনের রেষা রেষির ফল। সেমেটিক ধর্মত্রয় যথা ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলাম (মিল্লাতে ইব্রাহিম) এর আদি ঘটনাগুলো দেখলেও দেখা যাবে দুই নারীর বিষয়। ইব্রাহিম আঃ এর বিবি হাজেরার গর্ভে ইসমাইল আঃ আর সারাহ্’র গর্ভে ইসহাক আঃ এই দুই ধারার বিষয় স্পষ্ট। সারাহ্ আঃ এর প্রতি বিধাতার এতই কৃপা ছিল যে তার গর্ভে আসা ইসহাক আঃ ও তার অনুসারীদের মানে ইহুদিদের মাঝে বহু পয়গম্বর আসলো ও তারা তাদের অবহেলা করলো এমনকি হত্যা পর্যন্ত করলো। অথচ বিবি হাজেরার গর্ভে আসা ইসমাইল আঃ এর বংশে শেষে ইসলামের মহানবীর আগমন হলো। বিধাতার এই একচোখা নিতি কেন হলো তা কিন্তু কোন মুসল্লি প্রশ্ন তোলেন না, তুললে তো হুজুরদের কোপানলে পড়তে হবে। অপরদিকে ইহুদি রাবাইরা ইসমাইল আঃ কে অবাধ্য ও দুষ্ট চরিত্রের সন্তান বলে প্রচার করে থাকে। এখানেও ওই নারীর ছদ্ম ক্ষমতা আর তা ঈশ্বর পর্যন্ত সুতা টানা। খ্রিষ্টানদের ইস্টার সানডে নিয়ে একটা মুভি দেখেছিলাম সেখানেও সেই নারীর ছদ্মক্ষমতায়ন দেখান হয়। ধর্মের যুগ শেষ হয়ে গেছে বহু আগেই সেই ফরাসী বিপ্লবের সময়কালে তাই ধর্মগ্রন্থের নারীদের টেনে আনতে চাইনা। ইসলাম নারী নেতৃত্বকে স্বীকারই করে না আর চীন দেশে নারী নেতৃত্ব হাস্যকর রকম একটি ধারণা। জগদ্বিখ্যাত সাহিত্যিকরাই নারীর সঠিক রূপটা ব্যাখ্যা করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।

আমি সেক্সপিয়ারের হেমলেট আর ওথেল ছাড়া বেশি কিছু পড়ি নাই তাই সেক্সপিয়ার কি ভাবে নারীকে চিত্রায়ন করেছেন তা জানি না তবে রবীন্দ্রনাথের নারী প্রকৃত অর্থেই বাঙ্গালী নারী। নজরুলও কম যায় না। নিচে নজরুলের কুহেলিকা থেকে তুলে নেয়া কিছু কথা উল্লেখ করছি।

”নারী শুধুই  ইঙ্গিত, সে প্রকাশ নয়, নারীকে দেখি আমরা বেলা ভূমে দাড়িয়ে! মহা সিন্ধু দেখার মত!  তীরে দাড়িয়ে সমুদ্রের যতটুকু দেখা যায়, আমরা নারীকে দেখি ঠিক ততটুকুই! সমুদ্রের জলে, আমরা যতটুকু নামতে পারি নারীর মাঝে ডুবি ততটুকুই! সে সর্বদা রহস্যের পর রহস্য জাল দিয়ে নিজেকে গোপন করে রাখে! এই তার স্বভাব! কি রহস্য ওদের চোখে -মুখে,  ওরা চাঁদের মত মায়াবী, তারার মত সুদূর!  ছাঁয়া পথের মত রহস্য! শুধু আবছাঁয়া শুধু গোপন! ওদের হয়ত শুধু দেখা যায়, ধরা যায় না! রাখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায়না! ওরা যেন চাঁদের শোভা দু,দন্ডের তরে! তার পর মিলিয়ে যায়! ওরা যেন জলের ঢেউ, ফুলের গন্ধ, পাতার শ্যামলিমা, ওদের অনুভব কর, দেখ, সাবধান কিন্তু ধরতে যেয়ো না! যেমন- ঢেউ ধরতে গেলেই জলে ডুববে, ফুলের গন্ধ শুঁকতে গেলেই কাঁটা বিঁধবে! তাই নারী সারা জীবনেই অধরা।” কুহেলিকা --✍️কাজী নজরুল  ইসলাম

রবীন্দ্রনাথ নাম দিলেন উর্বশী আর নজরুল বললেন কুহেলিকা, মোট কথা তারা নারীকে নির্দিষ্ট করে ব্যাখ্যা করবেন না যেন পণ করে বসে আছেন। মানুষ যেমন তার নিজের মনকে সব সময় তন্ময় তমসাচ্ছন্ন করে ব্যাখ্যা করতে পছন্দ করে তেমনি নারীকেও তারা নির্দিষ্ট করে রূপ দান করতে চান না। নারীরাই কি তবে নারীদের নির্দিষ্ট রূপটা নিরূপণ করবেন? নারীকে নারীর রূপ নিরূপণ করতে দিলে তা নারীর রূপ হবে না হবে মানুষীর রূপ আর একমাত্র পুরুষই পারে নারীর রূপকে নিরূপণ করতে। হ্যাঁ পুরুষের চোখেই নারীরা সুন্দর নারীর চোখে নয়। নারীর চোখে নারী আরেকটি সাধারণ মানসী, মানুষের আরেকটি রূপ মাত্র কিন্তু পুরুষের চোখেই সে উর্বশী কিংবা কুহেলিকা কিংবা আলেয়া যা ধরা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়।


উপরের ছবিটি শাশ্বত বাঙ্গালী নারীর চিরন্তন বৈশিষ্ট্যের চমৎকার উদাহরণ। বাঙ্গালী নারীদের আমারা এমনই প্রাণবন্ত ও উৎফুল্ল দেখে অভ্যস্ত, কিন্তু ইদানীং একদল সালোয়ার কামিজ (পাকিস্তানি স্টাইল থ্রি পিস) আর আরেক দল হিজাবের দৌরাত্বে বাঙ্গালী নারী তার হাজার বছরের ঐতিহ্য হারায়ে ফেলছে। হিজাবীদের মধ্যেও আবার কেউ কেউ চেহারাটা অন্তত দেখায় বাকিরা তাও দেখাবে না ধর্মীয় বিধি নিষেধের কারণে। আমার এমন এক সহকর্মী নারী আছেন তার চেহারা আমি আজ পর্যন্ত দেখি নাই, শুধু কণ্ঠ শুনে কি মানুষকে আলাদাভাবে সনাক্ত করা যায়? এর মধ্যে আবার কিছু কিছু বাঙ্গালী নারীরা তাদের ভোল একেবারে পাল্টে ফেলছে। তারা ওয়েস্টার্ন টি সার্ট আর পেন্ট পড়ে পশ্চিমা রূপ ধারণ করতে চাইছে। তিনটা নরী রূপ পাশাপাশি দেখলে কেমন উদ্ভট লাগে দেখুন।
 

 
উপরের কোনটাই বাঙ্গালী নারীর প্রকৃত রূপ বলে মনে হয় না আমার কাছে। এগুলো যেন বাঙ্গালী নারীত্বের কিম্ভুত কিমাকার বিকৃতি। নারীকে তার রূপ নিরূপণ করতে দিলে তারা যে এরকম উদ্ভট কান্ড কারখানা করবে তা বলাই বাহুল্য। বাঙ্গালী নারীদের উর্বশী এসপেক্টটা বুঝতে হবে। উর্বশী ফ্যাক্টরটা সব নারীতে বিদ্যমান আছে তারা যদি তাকে অস্বীকার করে তবে সেই নারী হবে হয় ধার্মীক নারী, না হয় ওয়েস্টার্ন নারী না হয় পাকিস্তানী নারী। বাঙ্গালী নারীর চিরন্তন বৈশিষ্ট্য সে হারায়ে ফেলবে। ফেলবে বলাটা ভুল হবে, তারা তা হারায়ে ফেলেছে এবং সে সম্পর্কে তারা অসচেতন। উর্বশী কবিতার শেষ স্তবকে কবির হতাশা আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। কবিতাটা থেকেই  উল্লেখ করছি।
 
”ফিরিবে না, ফিরিবে না - অস্ত গেছে সে গৌরবশশী
অস্তাচলবাসিনী উর্বশী
তাই আজি ধরাতলে বসন্তের আনন্দ-উচ্ছাসে
কার চিরবিরহের দীর্ঘশ্বাস মিশে বহে আসে” 
 
সত্যিকারের নারীর রূপটা কিন্তু আরো কঠিন, তার একটা ছবি নিচে দেখাচ্ছি। শহুরে নারীরা অফিসের কাজের পর বাসায় গিয়ে রান্না বান্না করে ও বাচ্চাদের দেখাশুনা করে তাই বলে গ্রাম্য নারীরা যে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে আছে তাও নয়। নিচের ছবিটাই বলে দেয় বাচ্চা সামলানোর পাশাপাশি তাদের রান্নাবান্নাও করতে হয় আর স্বামীকে খুশি করার অমোঘ দায়িত্ব তারা জন্মগত ভাবেই পেয়ে বসে আছে। গ্রাম্য নারীরা স্বামীর অযথা মানুষিক ও শারীরিক নির্যাতনেও টু শব্দ করার সাহস করে না বলে শুনেছি। 

 
উপরের এই ছবিটা নারী দিবসের আইকন হতে পারে। নারীর পুর রূপটা ব্যাখ্যা করেছে এই মহিলা। এ উর্বশী না, কুহেলিকাও না। এ ধার্মীক নারীও না ওয়েস্টার্ন নারীও না। এ হচ্ছে প্রকৃত নারী যার কোলে বাচ্চা, মাথায় রান্নার লাকড়ি। এ বাঙ্গালী নারীও না, এ হচ্ছে প্রকৃত নারীর সত্যিকারের রূপ। বাঙ্গালী নারী রবীন্দ্রনাথের লাবন্য, কেতকী কিংবা জীবনানন্দ দাশের নাটোরের বনলতা সেন। নারীবাদীদের তাই বলতে চাই সিদ্ধান্ত আপনাদেরই নিতে হবে, হয় আপনারা নারীকে শতধা বিভক্ত করে কিম্ভুত কিমাকার করে ছাড়বেন না হয় পুরুষের চোখে নারীর সৌন্দর্য রূপায়নকে মেনে নিবেন। পুরুষই নারীর সৌন্দর্যের একমাত্র আয়না, নারী তার রূপ বিচারে অপারগ, পুরুষের চোখেই নারী চিরন্তন সুন্দর।

বাঙ্গালী নারীর প্রকৃত রূপটি তবে কিরকম হওয়া উচিত সে বিষয়ে না বললে লেখাটা সম্পূর্ণ হবে না। আমার মতে প্রকৃত নারী সে বালিকা হোক বা সাবালিকা হোক তাকে যদি বাঙ্গালী হতে হয় তবে তার রূপটা নিচের ছবি দুটার যে কোন একটার মত হতে হবে। 



আমরা পারসিয়ানও না আমরা আরব বেদুইন কিংবা পশ্চিমাও না, আমরা বাঙ্গালী। পশ্চিমারা এশিয়ান বলতে চায়নিজদের বুঝায় আর সাব কন্টিনেন্টকে বুঝাতে হলে বলে ইন্ডিয়ান। আমাদের বাঙ্গালীয়ানা সম্পর্কে পশ্চিমারা জানে না কারণ আমাদের নারীরা তাদের ঐতিহ্য রক্ষা করতে পারে নাই। আমার মা ও খালাকে চিরকাল সরি পড়তে দেখেছি কিন্তু এখনকার মহিলারা সারি পরে বিশেষ অনুষ্ঠানে যেন সারি একটা পার্টি ড্রেস। বিয়ের অনুষ্ঠান, পহেলা ফাল্গুন, নববর্ষে পড়ার জন্য সারি আর বাকি সময় ম্যাক্সি না হয় সালোয়ার কামিজ। এটা কোন কথা হলো? বাংলা ভাষার ও বাঙ্গালীয়ানার উত্থান আর তার পতন এত দ্রুত হয়ে যাবে? বিদেশী সংস্কৃতির এতই প্রভাব যে তা আমাদের ঐতিহ্যবাহী ধারাকে অতিক্রম করে যাবে? আমার মনে হয় বাঙ্গালী মেয়েদের মনে করিয়ে দেওয়া লাগবে যে তারা পাকিস্তানী নয়, আরবের বেদুইনও নয় তারা বাঙ্গালী। বাংলা কালচার ধরে রাখার মত বিদগ্ধ জন কমে যাওয়াতেই কি এই বিপর্যয় তা গবেষণার বিষয়। কিন্তু বাঙ্গালী নারীদের এই ভিন্ন কালচারে মাইগ্রেট করাটা একটা প্রশ্নবোধক বিষয়।

আর পুরুষের চোখে নারীর কল্পনা সর্বদাই আবেদনময়ী তাকে সে ধরতে চায়না কেবল বরং তাকে সে ভোগ করতেও চায়। তাই তার চোখে নারীর কল্পনা নিচের ছবিটার মত। তাকে সে দেবী রূপে কল্পনা করে তার পর তাকে ভোগ করতে চায়। পুরুষের চোখে তাই নারী নিম্নরূপ কল্পনার। এখানে বিচার্য বিষয় নারী কি তাকে ভোগ করতে দিতে চায় কিংবা সেও কি পুরুষকে ভোগ করতে চায়। প্রকৃত পক্ষে উভয় উভয়কেই ভোগ করে ও করতে চায়। নারী প্রকৃতিগত ভাবেই পুরুষের কাছে ধরা দিতে চায় না। এটা উট পাখির একটা ঝাঁককে দুর থেকে কিছুক্ষণ দেখলেই টের পাবেন। ছেলে উটপাখি যখন কোন মেয়ে উট পাখির দিকে আগায় তখন মেয়েটা দেয় দৌর, এই দৌর প্রতিযোগিতায় সে পরাজিত হয় পুরুষটার কাছে, কেন হয় তা কে জানে, হয়তো ইচ্ছা করেই পরাজিত হয়। তার পর যা হয় তা নেট জিও (ন্যাশনাল জিওগ্রাফি) চ্যানেলের ওয়াইল্ড সেক্স ডকুমেন্টারিতে দেখে নিয়েন। প্রকৃতির মধ্যেই খোদিত আছে যে নারী পুরুষের কাছে সহজে ধরা দিবে না, ভাবটা তাদের ওই রকমই দেখাবে, পুরুষের কাছে সে ধরা ঠিকই দেয় তবে পুরুষটাকে নাকে দরি দিয়ে ঘোলা জল খাইয়ে তার পর তার কাছে ধরা দেয়। 

 
”সুরসভাতলে যবে নৃত্য কর পুলকে উল্লাসি
হে বিলোলহিল্লোল উর্বশী”
 
এ কথা চিরন্তন সত্য যে, এ বিশ্বে যা কিছু সুন্দর ও ভালো অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক করেছে নর। এই দুই ভাগের মিলে একভাগ হওয়াটা প্রাকৃতিক সত্য। এই দুয়ে মিলেই তো নতুন এর জন্ম হয় তা হলে বিষয়টাকে এতটা দুর্বোধ্য করে রাখতে হবে কেন? নারী পুরুষ একে অপরের পরিচ্ছদ স্বরূপ ইসলামের ধর্মগ্রন্থেই তো বলা আছে কথাটা। তা হলে এই বিষয়টাকে নিয়ে এত বিদগ্ধ জনের এত বিশাল বিশাল গ্রন্থ রচনার কি এমন আছে? হ্যাঁ আছে বৈকি, বুঝার আছে। নারীদের বুঝতে হবে তারা নরের কাছে ঋণী আর নরকে বুঝতে হবে তারা নারীর কাছে ঋণী, উভয়েরই সমান অধিকার আছে পৃথিবীর সম্পদে। এটুকু বুঝতে ধর্মগ্রন্থ বা আসমানি কিতাবের ঐশী বাণী লাগে না, মানব সভ্যতার সাধারণ জ্ঞানই যথেষ্ট মনে হয় আমার কাছে। সভ্যতাই আমাদের শিখিয়েছে নারী পুরুষের সম্পর্ক কি রকম হওয়া উচিত। হয়তো সভ্যতার কোন পর্যায়ে নারী পুরুষের কাছে নতি স্বীকার করে পরাজয় বরন করে থাকতে পারে কিন্তু আজকের বাস্তবতায় তারা সমান সম্মান ও সম্পদের অধিকারী। আজকের শহুরে কালচারে মা খালাদের পরিবারে সন্তানেরা যতটা আপন তার চাচাদের পরিবারে ততটা নয় প্রমাণ করে সেই আদি মাতৃ তান্ত্রিক পরিবারের ছায়া যেন ফিরে আসছে আবার। মানব সভ্যতাই নারী পুরুষের সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেয় আর সময় ভেদে তা উত্তর উত্তর উন্নতই হবে। নারী পুরুষের সম অধিকারেই আজকের পৃথিবীর বিচারে সর্বত ভাবে যুক্তি যুক্ত এবং অধিকাংশেরও তাই মত বলে আমার ধারণা। বাঙ্গালী নারী তার প্রকৃত রূপে ফেরত আসুক এই প্রত্যাশা রইলো। নারীকে নিয়ে এত অল্পে লেখা শেষ করা সহজ নয়, তাই আরেকটি লেখায় আরো কিছু কথা যোগ করছি।
 
সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ২আগষ্ট২০২৩> ৩০আগস্ট২০২৩> ২৩জানুয়ারী২০২৪> ১০ফেব্রুয়ারী২০২৪> ২৮ফেব্রুয়ারী২০২৪> ১৮মার্চ২০২৪> ২১মার্চ২০২৪> 
 
 
 
 
 

Monday, March 18, 2024

ব্যাংকিং সেক্টর ডাটা এনালিসিস ২০২৩ – ২৪ অর্থ বছর


২০২৪ এর শুরুতেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরের কিছু প্রাইমারি আর সেকেন্ডারি ডাটা হাতে চলে আসায় মনে হলো একটু বুঝে দেখি। সাম্প্রতিক ব্যাংকিং সেক্টরে একটা অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলে সবাই বলা বলি করছে। ডাটা গুলোর মানের উত্থান পতন তার ভিত্তিতে আমরা কি ধরনের সিদ্ধান্তে পৌছতে পারি তাই বুঝে দেখার চেষ্টা করবো এই লেখায়। এর আগেও আমি একটা ফিনানসিয়াল এনালিসিস করেছিলাম তবে তা কেবল এ দেশের ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টরের একটি মাত্র উইন্ডোর ডাটা এনালিসিস ছিল। সমসাময়িক ব্যাংকিং পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক বলা যায় না অনেকের মত। লোকজন ব্যাংকে টাকা রাখতে ভয় পাচ্ছে। নিজে ব্যাংকার হওয়ায় নানা জনকে বুঝায়ে বলতে হচ্ছে সমস্যা গুলো কোথায় এবং কোন ব্যাংকে টাকা রাখা নির্ভরযোগ্য। আমি ভাবতে ছিলাম ব্যাংকিং অঙ্গনের এই পরিস্থিতিটা সাময়িক এবং সহসাই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে কিন্তু এই সেদিন মনে ২৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৪ তারিখেও যখন লস-এঞ্জেলস এ বসবাসরত এক বয়স্ক প্রবাসী দম্পতি  ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি তে রক্ষিত তাদের বিপুল পরিমাণ অর্থের কিয়দংশ আমাদের ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডোতে এমটিডিআর (ইসলামিক এফডিআর) করতে আসলেন তখন বুঝলাম সংকট এখনও কটে নাই আর রিউমারটা সুদূর লস এঞ্জেলস প্রবাসীদের কাছেও পৌঁছে গেছে। ব্যাংক ব্যবসা হলো বিশ্বাসের ব্যবসা বা ট্রাস্ট এর ব্যবসা তাই ব্যাংকারদের ট্রাস্টি বলা হয়। কোন ভাবে যদি এই বিশ্বাস ভেঙ্গে যায় তবে ব্যাংকারদের মূলধন ধরে টান পরে যা আজকের পরিস্থিতি দেখে প্রমাণ পাওয়া যায়। 

বারচার্ট-১

উপরের গ্রাফটা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় সোনালী ব্যাংক পিএলসি ২০২৩ সালে তার আগরে সব রেকর্ড ছাড়ায়ে সবার উপরে চলে গেছে। হতে পারে তার নন পারফর্মিং এসেট বেশি, হতে পারে খেলাপি ঋণ বা সিএল হিসাবায়নে আনলে মুনাফার চিত্রটা বদলে যাবে, তার পরও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, যে কোন ভাবেই হোক সোনালী ব্যাংকে বিশাল পরিবর্তন এসেছে যা ইতিবাচক। অপরপক্ষে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি বিগত দুই বছরের তুলনায় এ বছর ভালো করেছে কিন্তু কিছু রিউমারের কারণে লোকজন টাকা সরায়ে ফেলছে ব্যাংকটা থেকে। আমার শিক্ষা জীবনের গুরু হাবিব স্যার আছে এই ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন পদে উনার সাথে আলাপে যা বুঝেছি তা হলো, ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’র এসেট অনেক। এত বিশাল একটা ব্যাংক জনমত যেমন মনে করছে তেমন ভাবে নিঃশেষ হয়ে যাবে না কিংবা যাওয়ার কথাও না। পত্রপত্রিকাতে নানা রকম খবরাখবর আসছে ব্যাংকিং সেক্টর নিয়ে যার কিছু নিয়ে নিচে আলোচনা করবো।

নিউজ সার্ভেঃ (সেকেন্ডারি ডাটা ) ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে সমসাময়িক মিডিয়া কি বলছে একটু দেখা যাক, আমি কতগুলো পেপার কাটিং এখানে নিয়ে এসেছি যাতে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করা যায়। 


Daily Sun Report, Dhaka Sunday, 24 December, 2023

Around Tk92,261 crore has been plundered from the country’s banking sector in 24 major scams over the past 15 years – from 2008 to 2023, according to a report of the Centre for Policy Dialogue (CPD).

The amount was more than 12% of the budget for FY24, which means it would have been possible to meet the budget deficit easily if the money was not stolen from the banks.

The country’s banking sector has plunged into the grip of a particular group of people and the situation is worsening gradually. Despite the worsening condition, there is a lack of effective measures to address the problems in this sector, said the CPD in a media briefing titled “Economy of Bangladesh 2023-24: Ongoing Crisis and Actions” at its Dhanmondi office in Dhaka on Saturday.

At the programme, CPD Executive Director Fahmida Khatun said financial irregularities, including sanctioning loans against fake documents, loans for non-existent institutions, and embezzlement of money took place over the past 15 years. The money taken illegally from the banks during the period is about 2% of the current gross domestic product (GDP).

মুনাফা খেয়ে ফেলেছে খেলাপি ঋণ: সোনালী ব্যাংকের এমডি
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। কিন্তু ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়,  খেলাপিসহ সব ধরনের ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) এবং সরকারি ট্যাক্স হিসাব করা হয়নি। খরচ বাদ দিয়ে মূলত নিট মুনাফা হিসাব করা হয়। খরচ বাদ দিলে ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা আসলে কিছুই থাকবে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ফেডারেল বা প্রভিশন রাখতে অতিরিক্ত সময় নিয়েছে সোনালী ব্যাংক। অর্থাৎ খেলাপির বিপরীতে এসব প্রভিশন রাখার পর নিট মুনাফার বিপরীতে লোকসানে পড়বে ব্যাংকটি। সোমবার সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আফজাল করিম। ০১ জানুয়ারি ২০২৪, https://www.jugantor.com

নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ২১,৬৫৮ কোটি টাকা
নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে ঋণ বিতরণ করা হয়, তার প্রায় ৩০ শতাংশ ঋণ ইতোমধ্যেই খেলাপি হয়ে গেছে। এর মধ্যে ১৬টি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খুবই নাজুক। এসব প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা ঋণের ৪৩ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ০৮ জানুয়ারি ২০২৪, https://www.jugantor.com  

নির্ধারিত দামে মিলছে না নগদ ডলার
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে নির্ধারিত দামে নগদ ডলার মিলছে না। তবে কিছু ব্যাংকে চড়া দাম দিয়ে সীমিত পরিমাণে ডলার পাওয়া যাচ্ছে। খোলাবাজারে ডলার কিছুটা পাওয়া গেলেও দাম বেশ চড়া। ব্যাংকগুলোতে নগদ ডলারের নির্ধারিত সর্বোচ্চ দাম হচ্ছে ১১৭ টাকা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ১২২ থেকে ১২৫ টাকা করে। খোলাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৫ থেকে ১২৬ টাকা করে। ১0 জানুয়ারি ২০২৪, https://www.jugantor.com

নগদ টাকার টানাটানি, লাফিয়ে বাড়ছে সুদ
অনিয়ম, দুর্নীতি এবং আস্থাহীনতায় তীব্র তারল্য সংকটে পড়েছে অন্তত এক ডজন ব্যাংক। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংকের অবস্থা খুবই নাজুক।  বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়াও এসব ব্যাংক প্রতিদিন একে অপরের থেকে নগদ টাকা ধার করে চলে। সবল ব্যাংক দুর্বল ব্যাংককে ধার দিয়ে থাকে। আন্তঃব্যাংকের ধারের এই পদ্ধতিতে ব্যাংকিং ভাষায় কলমানি মার্কেট বলা হয়। সে কলমানি মার্কেটে লাফিয়ে বাড়ছে সুদহার। জানা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহার বাড়ানোকে অন্যতম টুল হিসাবে ব্যবহার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সে কারণেই চলতি অর্থবছরের (২০২৩-২৪) শুরু থেকেই সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা প্রত্যাহার করা হয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব দ্রুত কলমানি মার্কেটেও পড়েছে।“ ১৪জানুয়ারি২০২৪, https://www.jugantor.com

শরীয়াহ ব্যাংকের কারণে তারল্য ঘাটতিতে পুরো ব্যাংক খাত
গ্রাহকের জমা টাকা বা আমানত সুরক্ষায় ব্যাংকগুলোকে আমানতের একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। তবে ইসলামী ব্যাংকসহ ছয়টি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ও দুটি প্রচলিত ধারার ব্যাংক চাহিদা মতো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সেই অর্থ জমা রাখতে পারছে না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা এসব ব্যাংকের চলতি হিসাব মাঝেমধ্যে বড় ঘাটতিতে পড়ছে। কয়েকটি ব্যাংকের বড় এই ঘাটতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখা ব্যাংকগুলোর আমানত সুরক্ষার অর্থে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গত নভেম্বর শেষে এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিসেম্বরভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

দেশের ব্যাংকগুলোকে গত নভেম্বরে নগদ জমা বাবদ (সিআরআর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ৭১ হাজার ৫২ কোটি টাকা জমা রাখার বাধ্যবাধকতা ছিল; কিন্তু ব্যাংকগুলো জমা রাখতে পেরেছিল ৬৫ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা। তারল্য–সংকটে না থাকা ব্যাংকগুলো সিআরআর বাবদ প্রয়োজনের বেশি অর্থ জমা রাখলেও সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এ বাবদ ঘাটতি ছিল পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি। মূলত শরিয়াহভিত্তিক কিছু ব্যাংক সিআরআর বাবদ অর্থ জমা রাখতে না পারায় সার্বিকভাবে এ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সিআরআরের অর্থ জমা রাখতে না পারা ব্যাংকগুলো জরিমানা গুনছে, জরিমানার সেই টাকাও তারা জমা দিতে পারছে না। https://www.prothomalo.com/business/bank/v1n208u561

ব্যাংকে রাখা আমানত কমছে, সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন পোশাককর্মীরা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী ২০২৩ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে পোশাকশ্রমিকদের ৯ লাখ ৩ হাজার ৭৫৩টি ব্যাংক হিসাবে সর্বমোট জমা ছিল ৩০০ কোটি টাকা। এর আগের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে যা ছিল ৩৩০ কোটি টাকা। ওই প্রান্তিকে হিসাবসংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৭৩ হাজার ৫০৩টি। অর্থাৎ তিন মাসে পোশাকশ্রমিকদের হিসাবসংখ্যা বাড়লেও আমানত কমেছে ৩০ কোটি টাকা বা ৯ শতাংশ। https://www.prothomalo.com/business/bank/vx9vnuy68c 

ডলারের কারণে মুনাফা কমতে পারে ব্যাংকগুলোর, বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক
ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও তহবিল খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমতে পারে। কারণ, বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় টাকার অবমূল্যায়নের কারণে যাঁরা বিদেশি ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের বেশি মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়ানোর ফলে অভ্যন্তরীণ ঋণের তহবিল খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, সাম্প্রতিক কালে খেলাপি ঋণের হার সামান্য কমলেও ক্রমাগত খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নজরদারি আরও জোরদার করার ইঙ্গিত বহন করছে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিতকরণ, তাঁদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নপূর্বক আইন গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। https://www.prothomalo.com/business/bank/a0wnt4ir48  

রেড জোনে ৯ ব্যাংক, ইয়োলোতে ২৯
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকস হেলথ ইনডেক্স (বিএইচআই) অ্যান্ড হিট ম্যাপ’শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দেশের ৯টি ব্যাংক রেড জোনে আছে। আর ইয়েলো জোনে আছে ২৯টি এবং গ্রিন জোনে আছে ১৬টি ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বিভাগ অর্ধবার্ষিক পারফরেমেন্সের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে ভঙ্গুর আর্থিক দশা বোঝানো হয়েছে রেড জোন দিয়ে। গ্রিন জোন সূচকের দিক থেকে ভাল পারফরমেন্সকে বোঝায় এবং ইয়োলো জোন মধ্যবর্তী অবস্থানকে বোঝায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী রেড জোনে আছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড, পদ্মা ব্যাংক লিমিটেড, বেসিক ব্যাংক লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড, জনতা ব্যাংক পিএলসি, অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক লিমিটেড ও এবি ব্যাংক লিমিটেড।

ইয়োলো জোনে আছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ওয়ান ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, দ্য সিটি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংক।

গ্রিন জোনে আছে, প্রাইম ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, হাবিব ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ব্যাংক আলফালাহ, ব্যাংক এশিয়া, সীমান্ত ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, উরি ব্যাংক, এইচএসবিসি, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, সিটি ব্যাংক এনএ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশ ও স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া।

https://www.itvbd.com/economy/135659/রেড-জোনে-৯-ব্যাংক-ইয়োলোতে-২৯
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৪

নিউজ মিডিয়া থেকে প্রাপ্ত সেকেন্ডারি ডাটা এনালিসিসঃ-

বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে যে পর্যালোচনা পাওয়া যায় তাতে সবসময় একটা ডাউট ফ্যাক্টর কাজ করে তার পরও একটা সাম্যক চিত্র পাওয়ার জন্য তা যথেষ্ট পরিমাণে নির্ভরযোগ্য ধরে নেয়া যেতে পারে। খেলাপি ঋণ এর রোগটা এদেশে নতুন নয়, যা নতুন তা হলো ডলার ক্রাইসিস। এই ক্রাইসিসের কারণে বৈদেশিক বাণিজ্য যেমন মারত্মক ভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি যে সব ছাত্র ছাত্রী বিদেশে পড়তে যেতে চাচ্ছে তারাও যেতে পারছে না। উপায়ান্তর না পেয়ে তারা হুন্ডি করে হলেও বিদেশে যাচ্ছে। শরিয়া ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক গুলোর মালিকানায় মনোপলি হয়ে গেছে, দেশের একটি বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বেশিরভাগ শরিয়া ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক কিনে তার মূলধন থেকে টাকা সরায়ে ফেলার খবর রিউমার আকারে গণমাধ্যমে চলে আসায় যারা ওই সব ইসলামী ব্যাংকে টাকা রেখেছিল তারা তা সরায়ে নিয়ে আসে নির্ভর যোগ্য ব্যাংক গুলোতে। সেকেন্ডারি ডাটা থেকে পাওয়া চিত্র বলে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা মোটেও স্বাভাবিক অবস্থায় নাই কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সেরকম কোন রেড এলার্ট জারী করা হয় নাই বরং তারা সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবহিত ও তা দক্ষতার সাথে সামাল দিচ্ছে বলে আমার মনে হয়েছে।

নন ব্যাংকিং হোক আর ব্যাংকিংই হোক না কেন, এই খেলাপি ঋণ যেন একটা কালচারে পরিণত হয়ে গেছে এ দেশে। ঋণ নিব কিন্তু ফেরত দিব না এরকম একটা মানসিকতা কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মধ্যে আছে। সৎ ব্যবসা করে লাভ করা না গেলে তারা এই পথ ধরে বলে আমার ধারণা। ব্যাংকে সঞ্চিত অন্যের টাকা নিয়ে এরা মেরে দিচ্ছে সবার চোখের সামনে। কানাডায় শুনেছি ওখানে যদি কেউ তার কোন ঋণ এর কিস্তি ডিফল্টার হয় তবে তার ক্রেডিট / ডেবিট কার্ডের সকল লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। তাই তাদের কোন কিস্তি খেলাপি হওয়ার সুযোগ নাই। এরকম ব্যবস্থা আমাদের দেশেও করা উচিত। ইদানীং দেয়াল লেখন দেখা যাচ্ছে ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে চীনের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হোক। আমিও মনে করি ঋণ খেলাপি ব্যাংকারের দৃষ্টিতে একজন ক্রিমিনাল তাকে বার বার লোন ক্লাসিফিকেশনের সুযোগ না দিয়ে বরং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করলে এই খেলাপি ঋণের প্রবণতা কমে যাবে।

আমার কাছে সিপিডি আর টিআইবি’র গবেষণা পত্র গুলো থেকে উঠে আসা পেরামিটিার গুলোকে সঠিক বা নির্ভরযোগ্য বলে সব সময় মনে হয়েছে। আমার কথা হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য উপাত্ত তো গবেষণার মাধ্যমে আসে আর তা তারা প্রকাশ করতেই পারে। জনগণ তা গ্রহণ করবে কি করবে না তা তাদের বিষয়। তাদের কথাগুলো সত্য তা আমরা সবাই জানি, যা বলেছে যে ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে লোন দেয়া কিংবা কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে লোন দেয়া, যে লোন আদায় হয় না, কুঋণ হয়ে যায় তা তো সত্য আর তাতে যে ২০০৮ হতে ২০২৩ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাট হয়েছে তাতে কার সন্দেহ থাকার কথা না। তবে তা ফিগারে বা পরিমাণে পাওয়া গেল ওদের গবেষণার মাধ্যমে। এই তথ্য  এলার্মিং এদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবেচনায়।

প্রাথমিক উপাত্ত বা প্রাইমারি  ডাটা এনালিসিসঃ-
প্রাথমিক উপাত্ত সব থেকে নির্ভর যোগ্য সোর্স কোন বিশ্লেষণে কিংবা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য। তাই সেকেন্ডারি ডাটার চেয়ে আমরা প্রাইমারি ডাটার উপর নির্ভর করতে পারি বেশি।

নিচে বিভিন্ন ব্যাংকে একটি ইসলামী ব্যাংকিং ইউনিটের সারপ্লাস ফান্ড ফ্লো এনালিসিস করলে দেখা যায় ২০১৯ সালে ও ২০২০ সালে বিভিন্ন শরীয়া ভিত্তিক ব্যাংকে কম বেশি ফান্ড ফ্লো করলেও ২০২৩ সালে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে ফান্ড ফ্লো একদম নাই অথচ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ফান্ড রাখা হয়েছে যা ২০১৯ কিংবা ২০২০ সালে রাখা হয়নি। দুই বছরের ব্যবধানে ফান্ড ফ্লোর এই তথ্যটা বলে দেয় যে, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিশেষ করে ইসলামী শরীয়া ভিত্তিক ব্যাংক গুলোতে একটা তোলপাড় চলছে।  

পাই চার্ট-১


 পাই চার্ট-২


  পাই চার্ট-৩

পই চার্ট ১, ২ ও ৩ বিবেচনায় আনলে দেখা যায় যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক আর ইউনিয়ন ব্যাংকে কোন ফান্ডই রাখা হয়নি অথচ ২০১৯ ও ২০২০ সালে কিন্তু এই দুটি ব্যাংকে বিশাল অংশ ফান্ড রাখা হয়েছিল। প্রশ্ন হতেই পারে যে কি এমন হলো যে এই দুটো ব্যাংক থেকে ফান্ড সরায়ে নেয়া হলো? এটা প্রায় স্পষ্ট যে শরীয়া ভিত্তিক ব্যাংকিং সেক্টরে একটা পরিবর্তন এসেছে যা সবাই জানে আর তারই প্রেক্ষিতে এই চিত্রটি পাওয়া যায়।

লাইন চার্ট-১

দেশের ইসলামী ব্যাংক গুলোর কল মনি মার্কেট না থাকায় ইসলামী ব্যাংকিং ইউনিটগুলো তাদের অতিরিক্ত বা আইডেল ফান্ড অন্য ইসলামী ব্যাংকে স্থায়ী আমানত হিসেবে সংরক্ষণ করে বা বিনিয়োগ করে। উপরের লাইন চার্ট থেকে দেখা যায় একটি ইসলামী ব্যাংকিং ইউনিটের আদার ব্যাংক এমটিডিআর (ইসলামী এফডিআর) সংরক্ষণের ক্ষেত্রে জুলাই ২০২৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২৩ এর রেখাচিত্রে যে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। উপরের চিত্র থেকে বুঝা যায় সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ফান্ড পুরটাই সরায়ে তা ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি আর আল আরাফাহ্ ব্যাংকে রাখা হয়েছে যেখানে এক্সিম ব্যাংকে রক্ষিত আমানত কিছুটা কমলেও তা টিকে গেছে।

বার চার্ট-২

বারচার্ট ২ এ বিগত ৮ বছরে একটি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর ডিপোজিট ও ইনভেস্টমেন্টের তুলনা চিত্র দেখানো হয়েছে। বাস্তবতা অনুযায়ী কিন্তু এই এডি রেশিও অনেক ভালো। যা আমানত তাই বিনিয়োগ করা হয়েছে। এটা প্রমাণ হয় যে ব্যাংক ব্যবসায় কিন্তু তেমন কোন বাধা পায় নাই বিচার্য ব্যাংকিং ইউনিটটির কিন্তু ২০১৮ থেকে ২০১৯ এ একটা বিশাল পরিবর্তন হয়েছে তা বুঝা যায়। ডিপোজিট আর ইনভেস্টমেন্ট দুটাই বিশাল ব্যবধানে বেড়ে গেছে আর তার পর  যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো ২০২২ এর ব্যবসায়িক অবস্থার অবনতি হয়েছে ২০২৩ সালে। নিচের চার্ট গুলোতে এই অবনতির কিছুটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।


বার চার্ট-৩

বিগত আট বছরে আমানত সংগ্রহে প্রদত্ত টার্গেটের বিপরীতে অর্জন বিবেচনা করলে দেখা যায় অন্যান্য বছর আশানুরূপ অর্জন হলেও ২০২৩ সালে প্রদত্ত টার্গেটের অনুপাতে অর্জন মারাত্মক ভাবে নিচে নেমে গেছে। এই অধঃপতনের জন্য কি আমরা দেশের ব্যাংকিং অঙ্গনের অস্বাভাবিক অবস্থাকে দায়ী ভাবতে পারি? নিচে বিনিয়োগের চিত্রটা বিচার করা যাক।

বার চার্ট-৪

টার্গেটের বিপরীতে অর্জন বিবেচনায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও উপরের বার চার্ট-৪ থেকে দেখা যায় ২০২২ সালে প্রস্তাবিত টার্গেটের চেয়ে বিনিয়োগ বেশি অথচ ২০২৩ সালে টার্গেট রিচ করতে পারে নি ব্যাংকিং ইউনিটটি। এটা স্পষ্টতই প্রমাণ করে ব্যাংকিং ব্যবসায় একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

 

বার চার্ট-৫

বিস্ময়কর চিত্রটি হলো যদিও আমানত ও বিনিয়োগে একটা অধঃপতন আমার উপরের চার্ট গুলোতে লক্ষ্য করেছি কিন্তু মুনাফা অর্জনে ব্যাংকিং ইউনিট কিন্তু আগের বছর গুলোর তুলনায় প্রস্তাবিত টার্গেটের চেয়ে পূর্বের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলেছে। আমানত ও বিনিয়োগে প্রস্তাবিত টার্গেটে ব্যর্থ হয়েও মুনাফায় পূর্বের সকল রেকর্ড অতিক্রম করাটাও কিন্তু একটা অস্বাভাবিক অবস্থাই নির্দেশ করে। 

সর্বশেষ বিবেচনায়ঃ-
দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে যদি এরকম অস্বাভাবিক অবস্থা থাকে তবে বুঝতে হবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও একটা অস্বাভাবিকতা আছে। অর্থনৈতিক সমীকরণগুলোতে বলা হয়ে থাকে যখন দেশের অন্যান্য সেক্টর স্বাভাবিক থাকবে তবে সূত্র গুলো কাজ করবে, দেশের অন্যান্য সেক্টর বলতে ব্যাংকিং সেক্টরকেও বিবেচনায় আনা যায়। যেহেতু তা অস্বাভাবিক তাই অর্থনীতির সূত্রগুলোর স্বাভাবিক কার্যকর থাকার কথা না। আমরা শুনি দেশ থেকে প্রচুর অর্থ অন্যত্র পাচার হয়ে যাচ্ছে, আমরা শুনি মুদ্রা স্ফীতির কথা কিন্তু বাজার বিবেচনা করলে অবাক হই। এত অর্থ পাচার, এত মুদ্রাস্ফীতি অথচ বাজারে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি নাই আবার ক্রেতাও কমে নাই। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যর ঊর্ধ্বগতি অথচ তা ক্রেতার পারচেজিং পাওয়ার পেরটি বা ক্রয় ক্ষমতাকে অতিক্রম করে নাই। তা যদি করতো তবে জনগণ রাজ পথে নেমে আসতো এর প্রতিবাদে, তা তো দেখা যাচ্ছে না। তা হলে আমরা কি বুঝবো? অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও কোন এক অজানা ফেক্টরে দেশের অর্থনীতিতে ভারসাম্য বিদ্যমান আছে? রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কাড়নেই হোক কিংবা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের কারনেই হোক ডলার ক্রাইসিস দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে একটা অস্বাভাবিক অবস্থা নিয়ে এসেছে তার সাথে যোগ হয়েছে শরীয়া ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক গুলোর মালিকানায় একক কোন প্রতিষ্ঠানের একছত্র আধিপত্য। এই দুটা ফ্যাক্টরের পাশাপাশি দেশীয় কালচার ঋণ খেলাপির কারণেও দেশের ব্যাংকিং অঙ্গনে ২০২৩ - ২০২৪ অর্থ বছরে একটা অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলে আমার মনে হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিতকরণ, তালিকা প্রকাশ ও তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ একান্ত জরুরী ও সময়ের দাবী বলে আমি মনে করি।

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ০১জানুয়ারী২০২৪> ০৩জানুয়ারী২০২৪> ১৪জানুয়ারী২০২৪> ১৭ফেব্রুয়ারী২০২৪> ২৮ফেব্রুয়ারী২০২৪> ১৮মার্চ২০২৪

Related Write ups  প্রাসঙ্গিক লেখা

Islamic banking window in current context
https://surzil.blogspot.com/2023/01/islamic-banking-window-in-current.html

দেঁকি না কিঁ করে – সব ব্যাংক লুটেরার দল
https://surzil.blogspot.com/2022/12/blog-post_25.html

প্রশ্ন উত্তরে ইসলামী ব্যাংকিং – মোহাম্মদ মোস্তফা সার্জিল
https://surzil.blogspot.com/2020/11/blog-post.html

সাক, সুকুক ও ইসলামী ব্যাংকিং
https://surzil.blogspot.com/2019/09/blog-post.html

ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
https://surzil.blogspot.com/2019/08/blog-post_14.html

ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোতে দেড় বছর
https://surzil.blogspot.com/2018/12/blog-post_28.html

ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো- একটি কেইস স্টাডি
https://surzil.blogspot.com/2021/02/blog-post_11.html

আমার কাছে অনেকের প্রশ্ন
https://surzil.blogspot.com/2024/02/blog-post_28.html