গতানুগতিক ধারার মত সরাসরি গুরু গম্ভির বিষয় ভিত্তিক পাঠ্য পুস্তকের মত কোন লেখা লিখতে আমার মন সায় দেয় না, যে লেখার মধ্যে মনের ইচ্ছাটা মিশে না তা আমার কাছে অযত্নে রান্না করা তরকারির মত বিস্বাদ। আমি যেমন পাঠকের জন্য লিখি তেমনি আমার নিজের আনন্দ ও বুঝার জন্যও লিখি। কেউ যদি কেবল তথ্য উপাত্তে ভরা পাঠ্য পুস্তক চান তবে বাজার থেকে খুঁজে নিতে অনুরোধ করবো। আমি আগডুম বাগডুম অনেক কথাই বলবো তার মধ্যে দিয়ে আপনার কাছে মূল বিষয়টির জ্ঞান চলে যাবে তা বলতে পারি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “সেই সময়” উপন্যাস আকারে ইতিহাস লিখেছেন, তা যতটা মন ধরে রেখেছে, যখন পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাস ছিল তখনকার সেই পড়া থেকে গোপালের সিংহাসন আরোহণ এর গল্পটা ছাড়া তেমন কিছুই আর মনে নাই। সরস মন খেজুরের রস খুঁজে আর নিরস মন নিমপাতা জোড়া জোড়া খুঁজে, তা তিতা হলেও তাদের কাছে ভালোই লাগে কারণ হয়তো তারা র্যাট রেইসে বা ইঁদুর দৌরে প্রথম সারিতে থাকতে চান। আমি আজীবনই অযথা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা প্রবণতা থেকে দুরে থেকেছি। অবসর পঠনে যে জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তা আমার প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্য পুস্তকের চেয়ে বেশি। তাই মন মাতান দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা আমার মনকে চিরায়ত আন্দোলিত করে আসছে আশৈশব, খড় খরা চৈত্রের কাঠ ফাটা রোদ্দুর তাই আমার কাছে বিরক্তিকর।
ফটো ক্রেডিটঃ জনাব শাজাহান আলী, আগস্ট, ২০২৫
এবার তবে প্রসঙ্গে আসা যাক, এর আগে সুকুক নিয়ে আমার লেখা পড়ে পাঠক প্রতিক্রিয়া ছিল, কই সুকুক সম্পর্কে আপনার লেখায় তো তেমন কিছু পেলাম না, অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেছেন, অনেক হাস্যরসও করেছেন কিন্তু সুকুকের সঞ্জা কই? বেশ কয়েকটা ভিন্ন ভিন্ন সোর্স থেকে আমি প্রায় একই রকম মন্তব্য পাওয়ার পর বুঝলাম, লেখাটা যারা পড়েছেন তারা সুকুক সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে পড়েছেন কিন্তু সরাসরি সুকুকের সঞ্জা না বলে আমি এর সামগ্রিক স্কোপ গুলো সম্পর্কে বেশি বলেছি আর এর প্রয়োজনয়িতার দিকে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। আমি সুকুক কি তা বলেছি ঠিকই লেখাটাতে, সাক এর বহুবচন যে সুকুক তাও বলেছি, এটা যে একটা হুন্ডি বা বন্ড তাও বলেছি, কিন্তু পাঠক মনের চাওয়া, ”আরে ভাই সংক্ষেপে বলেন, অত কথা শুনার সময় নাই, এটা কি জিনিস খায় না মাথায় দেয়, সেটা আগে বলেন” এই মানুষিকতার কাছে আমি ধরা খেয়ে গেছি ওই লেখাটাতে। সামগ্রিক প্রেক্ষিতটা না বুঝলে আপনি মূল বিষটা বুঝবেন কি করে? টবে যত্ন করে ফোটানো ফুল আর বনের ঝোপঝাড়ে অযত্নে ফুটে থাকা ফুলে তাই এত তফাত। একটা প্রকৃত জ্ঞান আরেকটা কৃত্রিম বটে, তবে আজকালকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রকৃত জ্ঞান আর কৃত্রিম জ্ঞানের তফাতটা কয় জন বুঝবে তা বলা মুশকিল। সবাই টু দি পয়েন্ট চায়, তাই চলেন টু দি পয়েন্ট ও অতি সংক্ষেপে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণনা দিয়েই শুরু করি।
তারও আগে বলে নেই, নিম্নে বর্ণিত বক্তব্য সমূহ আমার অর্জিত জ্ঞান থেকে প্রদত্ত বর্ণনা, যারা আরো অধিক জ্ঞানী তারা যদি দ্বিমত পোষণ করেন তবে অনুরোধ থাকবে এ নিয়ে অযথা বিতর্ক না করে যাহা সঠিক মনে করেন তাতে সন্তুষ্ট থাকতে ও আমার প্রদত্ত মতামতগুলো অগ্রাহ্য করতে। আমি যা জেনেছি তার প্রেক্ষিতে বর্ণনা করেছি। ব্যতিক্রম পেলে বা ভিন্ন মত পেলে সেটাই গ্রহণ করবেন আমার তাতে কোন আপত্তি থাকবে না।
এমন কি যা ইসলামী ব্যাংক করতে পারে অথচ কনভেনশনাল সুদী ব্যাংক গুলো পারে নাঃ-
এই প্রশ্নটা আমি ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর যতগুলো ক্লাস নিয়েছি তার প্রথমেই জানতে চেয়েছি। আগে কেউ বলতে পারতো না, ইদানীং দেখি বিষয়টা অনেকেরই সাধারণ জ্ঞানে চলে এসেছে। তার পরও জানতে চাই কারণ তাতে করে যারা জানে না তাদের তা জানা হয়ে যায়। কনভেনশনাল সুদি ব্যাংকের লেনদেনে একটা নিষেধাজ্ঞা আছে তা হলো সুদি ব্যাংক সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারে না। কনভেনশনাল সুদি ব্যাংক তার গ্রাহক গণকে ঋণ সুবিধা প্রদান করতে পারে মাত্র, অর্থাৎ কনভেনশনাল ব্যাংক সেই গ্রাহককে ঋণ প্রদান করে যার ব্যবসা বিনিয়োগ থেকে মুনাফা অর্জনের মধ্যমে গ্রাহক ব্যাংককে আর্থিক সুবিধা বা গ্রহণকৃত ঋণের অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সুদ প্রদান করতে পারে। তার মানে কনভেনশনাল ব্যাংক নিজে সরাসরি কোন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করতে অসমর্থ। অপর পক্ষে ইসলামী ব্যাংঙ্ক এর কাঠামই যেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর অনুরূপ আর ইসলামী শরীয়াতে প্রদত্ত নীতিমালার অধীনে গ্রাহকের সাথে অংশিদারিত্বর ভিত্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে তাই ইসলামী ব্যাংক সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে সমর্থ। সেই জন্যই বলা হয় ইসলামী ইতিহাসে ব্যাংকিং ছিল না তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল যা আজকে আমরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পুন চালু করেছি মাত্র। এক কথায় কনভেনশনাল ব্যাংক সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারে না কিন্তু ইসলামী ব্যাংক তা পারে।
শরীয়াহ্ র সোর্স গুলো প্রসঙ্গেঃ-
অনেকেই ইসলামী ব্যাংকিং কি শরীয়াহ্ সম্মত কিনা তা জানতে চায় কিন্তু কেউ স্বচ্ছ ভাবে জানে না শরীয়াহ্ কি বা অন্তত এর সোর্স কিংবা ম্যাক্সিম গুলো কি কি? ইসলামকে পূর্নাঙ্গ জীবন বিধান বলা হয় যাকে আরবিতে দীন বলে আর যে নীতিমালার ভিত্তিতে ইসলামী উম্মার খলিফা দেশ চালান তার সংবিধিবদ্ধ ব্যবস্থাই হলো শরীয়াহ্ । যত সামাজিক লেনদেন বা আরবিতে মুয়ামালাহ্ আছে তা সঠিক ভাবে করার নীতিমালার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া আছে শরীয়াহতে। এর সোর্স বা ভিত্তি হলো গুরুত্বর ক্রমানুসারে ১) পবিত্র কোরআন, ২) সুন্নাহ্ বা হাদিস, ৩) ইজমা আস সাহাবা (সাহাবা (রাঃ) গণের ঐক্যমত্য) আর ৪) কিয়াস (ভারডিক্ট বেইজড অন রিজেম্বেলেন্স – সমানরূপ উদাহরণের ভিত্তিতে গৃহীত নীতি) এই চারটি। এছাড়া শরীয়াহ্’র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাক্সিম আছে যার ভিত্তিতে আইন গুলো বিধি বদ্ধ ও বৈধ হয়। শরীয়াহ তে নতুন আইন সন্নিবেশের বা সংযোজনার উপায় আছে কেবল ইজতিহাদ এর মাধ্যমে যা সম্মানিত মুজতাহিদ গন এর প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান খলিফা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে অন্যথায় নয়।
ইজতিহাদ ও মুজতাহিদ প্রসঙ্গঃ-
ইজতিহাদ বলতে বুঝায় উম্মাহ বা সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জাতির সামনে যদি কোন নতুন মুয়ামালাত (পারষ্পরিক লেনদেন) সংক্রান্ত জটিল প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তখন যে বিজ্ঞ জন কোরআন, সুন্নাহ্, ইজমা আর কিয়াসের মাধ্যমে তার গবেষণার প্রেক্ষিতে ফয়সালা প্রদান করেন যা মাসালাহ্ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে সুরা বোর্ড ও খলিফা কর্তৃক সমর্থিত হয়ে চূড়ান্ত ভারডিক্টে আকারে শরীয়ার আইনে সন্নিবেশিত হয়। ইজতিহাদ করতে পারেন কেবল মুজতাহিদগণ যারা অত্যন্ত সম্মানিত ও বিজ্ঞ, যারা কোরআনে হাফেজ তো বটেই, তার চাইতেও তাদের লক্ষাধিক হাদিস মুখস্থ কিংবা নখদর্পণে থাকে। যে কেউ তাই মুজতাহিদ হতে পারেন না। তাই আজকাল ফতোয়ার ভিত্তিতে যে সকল বিতর্ক গুলোর ঝড় শুনা যায় তা শরীয়াহ্’র অংশ নয় মোটেও। ফতোয়া মূলত কোন আলেম কর্তৃক তার জ্ঞান লব্ধ বিচারের ফলাফল কিন্তু মাসালাহ্ হলো কোন মুজতাহিদ কর্তৃক ইজতিহাদ প্রদত্ত তার গবেষণা লব্ধ মীমাংসা। মাসালাহ্ যতই গবেষণা সিদ্ধ হোক না কেন তা যদি সুরা বোর্ড কর্তৃক সুপারিশকৃত হয়ে খলিফার চূড়ান্ত সমর্থন বা স্বাক্ষর না পায় তবে তা শরীয়াহ’র অন্তর্ভুক্ত হয় না। তাই যতদিন মুসলিম উম্মাহ (বিশ্বজনীন মুসলিম জাতি)র খলিফা থাকছে না ততদিন শেষ খলিফা কর্তৃক চুড়ান্তকৃত শরিয়াহ্ ই বর্তমান মুসলিমদের জন্য অবশ্য পালনীয় নথি যার অন্যথা করার মানে শরীয়াহর লঙ্ঘন বা ভায়োলেশন অব শরীয়াহ।
শরীয়াহ্’র ৫টি মৌলিক নীতিসূত্র বা ম্যাকসিম (Sariah’s 5 Maxims) নিন্মে অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলোঃ
নীতিসূত্র ১: বিষয়গুলি তাদের উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল।
Maxim 1: Matters are determined to their intentions.
আরবিতে যাকে নিয়ত বলা হয়, অর্থাৎ কাজটির উদ্দেশ্য কি, কিংবা লেনদেনের উদ্দেশ্য কি সেটা বিচার্য বিষয়। যদি উদ্দেশ্য হয় খারাপ কিংবা বৈষম্য পূর্ণ কিংবা অসাধুতা বা অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করা তবে তা সঠিক নিয়মে করলেও তা গ্রহণ যোগ্যতার বিচার অনুপযুক্ত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। তাই সবার আগে উদ্দেশ্য বিচার করা জরুরী।
নীতিসূত্র ২: সন্দেহ দ্বারা নিশ্চয়তাকে প্রতিস্থাপন যায় না।
Maxim 2: Certainty can not be overruled by doubt.
যে বিষয়টি নিশ্চিত তাকে অযথা সন্দেহ দ্বারা দ্বিধান্বিত করা যাবে না। অনেক সময় আমাদের সমকালীন জুরিসপ্রডেন্সে ”বেনিফিট অফ ডাউট” কিংবা ”সন্দেহের সুবিধা” টার্মটি শুনে থাকি, যাকে আইনের ফাঁক ফোকর বলে অনেকে, শরিয়াহ্ আইনে এরকম বেনিফিট অব ডাউট সুযোগটি থাকে না। যা নিশ্চিত তাতে সন্দেহ প্রবেশ না করা আর যার মধ্যে সন্দেহ আছে তা নির্মূল না করা পর্যন্ত ভারডিক্ট দেয়া হয় না।
নীতিসূত্র ৩: কষ্ট থেকেই সকল সুযোগ-সুবিধা বুঝা যায়।
Maxim 3: Hardship begets facility.
সমস্যাটির জটিলাটা কিংবা লেনদেনটির জটিলতা প্রকট আকারে বিচার করলেই এর আভ্যন্তরীণ ভুল ত্রুটি গুলো স্পষ্টতর হয়। তাই কোন মাইক্রো ইকনমিক সমস্যাকে অধিকতর গভীরতায় চিন্তা করে এর প্রতিকারের উপায় গুলো নির্ধারণ করা হয়।
নীতিসূত্র ৪: প্রথা, রীতি, রেওয়াজ হলো সালিসকারী বা ফয়সালাকারী (সমাধানকারী)।
Maxim 4: Custom is an arbitrator.
সমাজে প্রচলিত রীতি ও রেওয়াজ সমূহ যা ইসলামের মৌলিক ধারনা সমূহের সাথে সাংঘর্ষিক নয় সেগুলোকে সমাধান হিসেবে শরিয়াহ্ সমর্থন করে থাকে।
নীতিসূত্র ৫: লা দিহারার ওয়ালা ধিরার। ( ضِرَارَ وَلَا ضَرَرَ لَا )
Maxim 5: Laa diharara walaa dhirar
"ক্ষতিও করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না।"
এর সহজ অর্থ হলো কারো ক্ষতি করা যাবে না এবং কারো মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না। ইসলামে নিজের বা অন্যের কোনো প্রকার ক্ষতি করা বা অনিষ্ট সাধন করা নিষিদ্ধ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এটি ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি (আইনি নীতি) এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিস, ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত কিছু বিধি-নিষেধ, ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, হাদিস নং ২৫০১ । এটি মূলত সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষতিকর কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকার এবং পারস্পরিক সহানুভূতি বজায় রাখার শিক্ষা দেয়।
নীতিসূত্র ৫ এর উপ- নীতি (১): ক্ষতি দূর করতে হবে।
Sub Maxim of 5 (1): Harm shall be dispelled.
লেনদেনে হতে পারে এমন সকল ক্ষতির সম্ভাবনাকে আগেই নির্মূল করতে হবে।
নীতিসূত্র ৫ এর উপ- নীতি (২): এক ক্ষতি অন্য আরেকটি ক্ষতির মাধ্যমে দূর করা যাবে না।
Sub Maxim of 5 (2): Harm can't be eliminated by another harm.
একটি ক্ষতি নির্মূল করতে গিয়ে যদি আরেকটি ক্ষতির সৃষ্টি হয় তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। বর্তমান সময়ে যেমন বলা হয় বৃহত্তর ভালোর জন্য সামান্য ক্ষতি হলে দোষ নাই, এই বক্তব্যটি শরিয়াহ্ অস্বীকার করে এই ম্যাক্সিম এর মাধ্যমে।
উপরোক্ত পাঁচটি ম্যাক্সিম বা নীতিসূত্র বুঝতে পারলে এটা পরিষ্কার হয় যে, শরীয়া নীতিমালা অন্যান্য যে কোন নীতিশাস্ত্র থেকে স্বতন্ত্র ও মানব কল্যাণে অত্যন্ত কার্যকর। এই ম্যাক্মিম সমূহ অনুসরণ করে যে পদ্ধতি প্রণালীবদ্ধ হয় তা কখনই মানবতার বিরুদ্ধে যাবে না। আর্থিক লেনদেনে যত প্রকার জুলুম কিংবা অন্যায্যতা হতে পারে তা শরীয়াহ নীতিমালা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। এই কারণেই শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা মানব কল্যাণে নিবেদিত বলে দাবি করতে পারে।
শরীয়াহ্ স্ট্যান্ডার্ড নীতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমূহঃ-
সমকালীন প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনের শরীয়াহ্ স্ট্যান্ডার্ড যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হলো ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং সংস্থা বা এএওআইএফআই, AAOIFI = Accounting and Auditiong Organization for Islamic Financial Institutions যাকে সংক্ষেপে বলা হয় আইওফাই। এটি বাহরাইন ভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা যা শরীয়াহ মান বজায় রাখা এবং প্রচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে। ১৯৯১ সালের ২৭ মার্চ এটি বাহরাইনে নিবন্ধিত হয় যাতে ৪৫টিরও বেশি দেশের সদস্যপদ রয়েছে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরীয়া সুপারভাইজারী বোর্ড (SSB) মূলত সেই ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের ক্ষেত্রে শরীয়ার নীতিমালা কতটা পরিপালিত হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার নীতিমালা প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কল্পে সেন্ট্রাল শরীয়াহ্ বোর্ড ফর ইসলামী ব্যাংকস অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাকে সিএসবিআইবি CSBIB “Central Shariah Board for Islamic Banks of Bangladesh” বলা হয়। সঠিকতার সাথে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিএসবিআইবি বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ কর্মশালা সহ নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে।
জনাব শাহ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর বই “ইসলামী ব্যাংকিং বৈশিষ্ট্য ও কর্মপদ্ধতি” থেকে জানা যায় বেসরকারি পর্যায়ে এদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গণসচেতনতা ও প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু হয় ১৯৭৯ সালের শুরু থেকে। ওই বছরই জুলাই মাসে ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর (IERB) উদ্যোগে ইসলামী অর্থনীতির উপর তিন দিন ব্যাপী এক সফল আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে নভেম্বর, ১৯৮১ তে এটি বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকার্স এ্যাসোসিয়েশন (BIBA) নামে পুনর্গঠিত হয় যার শ্লোগান ছিল “BIBA to fight against RIBA” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রিবা মানে সুদ, আরবিতে সুদকে রিবা বলা হয় যা ইসলামী শরীয়াহ্ ও অর্থনীতিতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ১৯৮১ সালে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজ ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর এক মাস মেয়াদী আন্তঃব্যাংক আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এই প্রশিক্ষণ কোর্সে বাংলাদেশ ব্যাংক, সকল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিআইবিএম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ হতে সর্বমোট ৩৭ জন অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশে বর্তমানের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম মূলত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালা থেকেই বিস্তার শুরু করে। একে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং এর বীজ (Seed) বলা যায় যা থেকে আজকের বিশাল ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সবাই আমারা দেখেতে পাচ্ছি।
সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ১৫আগস্ট২০২৫>১৮জানুয়ারী ২০২৬>২৫জানুয়ারী২০২৬>১৯ফেব্রুয়ারী২০২৬>



























