Thursday, July 25, 2024

অস্তিত্বের সংকট ও আমাদের বাস্তবতা

 


আমার মেঝ মেয়ে সহজেই আনন্দে থাকে কিন্তু বড়টা ছোট বেলা থেকেই গম্ভীর, সবার ছোট ছেলেটাও হয়েছে বড়টার মত গম্ভীর প্রকৃতির, ও’রা যুক্তি খুব ভাল বুঝে তাই খামখা আনন্দ হলে তার অর্থ তারা বুঝতে পারেনা। ইউভাল নোয়া হারারী তার বই এর কোন এক জায়গায় লিখেছিলেন যে কিছু কিছু মানুষ খুব সহজেই আনন্দ পায় আবার কেউ কেউ আছেন যে অল্প দুখেই কাতর হয়ে পরেন। এই কয়েক মাস আগেও মনটা কাজে ব্যস্ত থাকত, কিন্তু হঠাত করে ইদানীং মাথাটা পুরা ফাঁকা হয়ে গেছে, কোন কাজেই মন সায় দেয় না। সারাক্ষণ কর্ম উদ্দিপনাহীন অলস সময় কাটাতে ইচ্ছা করে। এরকম ভয়ঙ্কর শূন্যতা আর অনিশ্চয়তা আগে আমাকে পেয়ে বসে নাই। এরকম মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করাও কঠিন। নিজের মানসিক অবস্থা খারাপ বা অসুস্থ মনে হয়, পাশাপাশি শারীরিক অবস্থাও মনে হয় খারাপের দিকে, নানা রকম আশঙ্কা, হতাশা, কর্মউদ্দমহীনতা সব এক সাথে পেয়ে বসেছে। কিচ্ছুই ভাল লাগে না, আমার অবশ্য সেই ছোটবেলা থেকেই এই ভাল না লাগার রোগ আছে। অবস্থা বুঝে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে এই ভালো না লাগা রোগ। করনার বছর ২০২০ সালে মনের এই অবস্থা হয়েছিল আমার। সকল কর্মকান্ডের মূল্য শূন্য মানে নেমে গিয়েছিল। বহু কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার নিরন্তর চেষ্টা ছিল তখন। ২০২০ সাল পার হয়ে এখন ২০২৪ চলছে কিন্তু মনের অবস্থার খুব সামান্যই পরিবর্তন হয়েছে যদিও অগ্র যাত্রা আবার শুরু হয়েছে । খোজ নিয়ে জেনেছি যাদের করনা হয়েছিল কিংবা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল তারাও ওই সময় একই রকম বিষণ্ণ একটা সময় কাটিয়েছেন। আমার বিষয়টা অন্যরকম, বাবা আর মা কে হারানর পর থেকেই বিষণ্ণতা রোগ আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে সময় পেলেই। বাবা আর মার মৃত্যু আমি সহজ ভাবে মেনে নিতে পারি নাই আর সহজ ভাবে মানতে চাচ্ছিও না। যখন অন্যরা সান্ত্বনা দেয়ার মত করে বলে বাবা-মা চিরকাল কার বেচে থাকে না, তখন আমার খুব রাগ হয়। মৃত্যুই যদি জীবনের একমাত্র পরিণতি হয় তবে এখনই মরে যাওয়াই তো ভাল, বেচে থেকে এত সব করে কি লাভ। বাবা-মা সারাজীবন স্বপ্ন দেখল এটা করবে ওটা করবে, সবেই করল কিন্তু সেগুলো ভোগ করার আগেই তাদের জীবনাবসান হয়ে গেল। এত কিছু করে তবে কি এমন হলো? বুঝলাম আমার জীবনটা সহজ করে দিয়ে গেছে। আমি তো ভবঘুরে হই নাই, চাকরি করছি, আমার সন্তানরাও ভাল ভাবে বড় হয়ে উঠছে। ওদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য তৈরি হচ্ছে। আমার স্ত্রী যথেষ্ট দায়িত্বশীল ও আমার ও বাচ্চাদের বিষয়ে যন্তশীল। কোথাও কোন সমস্যা দেখছি না এখন পর্যন্ত। সব সমস্যা আমার মনের মধ্যে। মা-বাবা কে হারানোর পর জীবনের মূল্য আমার কাছে অতি নগণ্য হয়ে গেছে। মরে গিয়ে বাবা-মা’র কাছে চলে যেতে ইচ্ছা করে কিন্তু মৃত্যুর পরে যে অনন্ত জীবনের কথা ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ আছে তাতে আমার বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে। বাবা-মা যখন ছিল তখন কতই না নিশ্চিন্ত থাকতাম। যা করার উনারাই করবে, আমি শুধু তাদের সাথে থাকব। হঠাত করে তারা নাই হয়ে গেল, এখন আমি কোথায় সেই নিশ্চয়তার ছাতা পাই? সন্তানকে তাই এতটা নির্ভরশীল করে বড় করা ঠিক না যাতে বাবা মার অবর্তমানে তারা এতটা অসহায় বোধ করে, আমার এখন তাই মত। আমি একমাত্র সন্তান হওয়ায় বাবা মার অতিরিক্ত যত্ন ও আদর পেয়েছি। আর ওটাই আমার মনের মধ্যে নিরন্তর অসহায়ত্বর জন্ম দিয়েছে। 

কম বয়স্কদের মধ্যে যে উদ্যম আর উদ্দীপনা দেখি, মনে হয় তারাও এক সময় না এক সময় নিভু নিভু প্রদীপ হয়ে যাবে। কেউকারাডং পাহাড়ে উঠেছিলাম সোনালী ব্যাংকের ১৮ জন সহকর্মীর এক ট্র্যাকিং টিমের সঙ্গে। যখন নামছিলাম তখন উঠার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছিল। চিংড়ি ঝরনার কাছে বিশ্রাম নেয়ার সময় যারা নতুন উপরের দিকে উঠছে তাদের দেখা গেল অতি জল জল চোখ সামনে না জানি কি আছে তা দেখার উদ্দীপনা। জীবনের এই পড়ন্ত বয়সে তাই মনে হয় যৌবন এর উঠতি বয়সের উদ্দীপনা এই ‍উপরে চড়ার মত না জানি কত কি আছে সামনে। সব জানা হয়ে গেলে যখন পড়ন্ত সময় আসে তখন আর কিছুই ভাল লাগে না। মনে হয় সবই তো দেখা হল এর পর আর কি-ই বা আছে। তার চেয়ে যত তাড়াতাড়ি এই জীবন থেকে বিদায় নেয়াই শ্রেয়। অস্তিত্বের সংকট এবং লোগো থেরাপি প্রসঙ্গে ভিক্টর এমিল ফ্র্যাঙ্কেল এর বই “জীবনের তাৎপর্যের সন্ধানে [ম্যানস সার্চ ফর মিনিং]” বইটা পড়ার পর বুঝলাম মানুষের সব মানসিক সমস্যার মূলে এই অস্তিত্বের সংকট সম্পর্কে মনের অত্যন্ত গভীরে প্রথিত একটি চিরন্তন অনিশ্চয়তা রয়েছে। তারই প্রেক্ষিতে এই লেখাটি লিখবো বলে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু অনেক সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও লেখাটা শেষ করতে না পারায় লেখার আগ্রহও হারায়ে বসেছি। তবে এটা ঠিক যে, ভিক্টর এমিল ফ্র্যাঙ্কেল যে কঠিন কষ্টকর জীবন পার করেছেন তার পর তার যে গবেষণা ও বক্তব্য তা অত্যন্ত গভীর চিন্তার ফল। আমি এখন বুঝতে পারি আমার ছোট বেলা থেকে যে ভালো না লাগা রোগ, তা মূলত এই অস্তিত্বের সংকট থেকে উদ্ভূত। এই সংকটটি মনের এত গভীরে কাজ করে যে তা হয়তো অনেকেই বুঝতে পারেন বলে আমার মনে হয় না। আমাদের তথা মানব সম্প্রদায় সমূহের বৃত্তি প্রবৃত্তিগুলো বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তাদের প্রথমটাই হলো সারভাইভাল বা বেচে থাকার বাসনা, দ্বিতীয়টা হলো বংশ বৃদ্ধি আর তার পরই আসে সেল্ফ একচুয়ালাইজেশন বা পূর্ণাঙ্গতার বাসনা। ধার্মীকদের জন্য এই বাসনা চরিতার্থ করা সহজ, কারণ তাদের ধর্মেই এর সমাধান দেয়া আছে কিন্তু যারা ধর্মের দেয়া ব্যবস্থাপত্রে আস্থা রাখতে পারেন না তাদের জন্য এই জীবনকে সার্থক করার প্রয়াস অত্যন্ত দুরূহ। বংশ পরম্পরায় টিকে থাকাই হলো তাদের জন্য জীবনের সার্বিকীকিকরন বলে মনে হয়। আমি থাকবো না কিন্তু আমার সন্তানেরা টিকে থাকবে এটাই যেন তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বা পরিণতি। বহু প্রজাতি এই পৃথিবী থেকে বিলীন হয়ে গেছে, ডাইনোসররাও তো আর এই পৃথিবীর মধ্যে টিকে নাই। ডাইনোসররা তো চিন্তা করতে অপারগ ছিল, তারা তাই তা নিয়ে মাথাও ঘামায় নাই। কেবল মানব মাত্রই চিন্তাশীল প্রাণী আর তাই তাদের মধ্যে এত ধর্ম ও অধর্ম নিয়ে বাক বিতন্ডা। বেচে থাকা ও টিকে থাকার জন্য লড়াই করার ক্ষেত্রেও তাদের এত ভাবের আদান প্রদান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। মানব সাহিত্যের কয়েকটা উদাহরণ নিচে উল্লেখ করছি যাতে দেখা যাবে এই বাসনাই বার বার প্রতিফলিত হয়েছে স্বনামধন্য লেখকদের লেখনীর মধ্য দিয়ে।

আমাদের দেশের জনপ্রিয় লেখক মাসরুর আরেফিনের “আগস্ট আবছায়া” বই এর পৃষ্ঠা ১৪: “আইয়ার বললেন,‘স্যার জীবন অনেক কষ্টের, অনেক। বেঁচে থাকা একটা ভার, একটা বোঝা। ষাটের পরে শরীরে যে কী সব শুরু হয়, তা কাউকে বোঝানো যাবে না যদি না তার বয়সও ষাট হয়ে থাকে। কিন্তু শুধু শরীরের অনেক ব্যথা-অসুখ-কষ্টই না, ব্যাপারটা সে করম না মোটেই। মনের বিমর্ষতা, সার্বিক উদ্যমহীনতা ও মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা, মৃত্যুর ইচ্ছা, প্রতিদিন চাওয়া যে সব শেষ হয়ে গেলে কত ভালো হতো – ষাটের পরের এই পৃথিবী ভয়ানক, স্যার।’” পৃষ্ঠা ১৬: “আমরা এর নাম দিয়েছি জীবনসংগ্রাম, বলছি এই সংগ্রামে তোমাকে জিততে হবে, জেতার ওই চেষ্টাটাই তোমার জীবনের মানে। কমিউনিস্টরা তখন এসে বলছে, না জীবনের মানে ওটা না, জীবনের মানে হচ্ছে তাদের উৎখাত করা যারা তোমাকে এই ভয়ংকর সংগ্রামের মধ্যে পুরে নিঃশেষ হতে বাধ্য করছে। তখন ধর্ম এসে বলছে, না মারামারি কোর না, খোদার প্রতি ভরসা রাখো এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাও, কষ্ট তাহলে অনেক কম হবে, দেখো। আমার মনে পড়ল নবোকভের কথাটা: ‘শিশু বয়সের দোলনাটা দুলছে এক অতল গহ্বরের ওপরে। জীবনের দীর্ঘ দাগটার দুপাশে দুই অন্ধকার—জন্মের আগে অন্ধকার, এবং মৃত্যুর পরে আবার অন্ধকার। আমাদের বেঁচে থাকাটা দুই প্রান্তের এই দুই অনন্ত অন্ধকারের মাঝখানে এক আলোর সামান্য ঝলকানি মাত্র।’ আইয়ারের দৈনন্দিন জীবনের এই গল্প শুনে মনে হলো, নবোকভ ভুল। দুই প্রান্তের দুই অন্ধকারের মাঝখানে যে জীবন সেটার আলোটুকুও আমাদের চোখের ওপরে এত নিষ্ঠুরভাবে ধরা যে সেই আলো, চোখ ধাঁধানো এক বর্বর আলো, আদতে অন্ধকারই।” পৃষ্ঠা ৬২: আমার ধর্মবিশ্বাস কতটা গাঢ় তা নিয়ে আমি, এই পৃথিবীর অন্য অনেক বিশ্বাসী মানুষের মতোই, সংশয়ে থাকি। মনে হলো, আহা, সামান্য এক মানুষ হিসেবে আমি যদি শুধু নিশ্চিত করে জানতাম অসামান্য ও বিশাল খোদা সব সময়েই আমাদের পাশে আছেন সবকিছুর ওপরে তাঁর বদান্যতা ও সুবিচারের বিশাল হাতটা মেলে, তার উর্ধ্বারোহী গান ও উড্ডয়নশীল সুরের গূঢ় অর্থদ্যোতক প্রসাদগুণ আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে, সব মানুষ ও পশুপাখি, পতঙ্গ ও বৃক্ষের জন্য তার ন্যায়নিষ্ঠত্বের স্পষ্ট অঙ্গীকারের তরঙ্গ তুলে, আহা, তাহলে কীভাবে আমি অর্থ খুঁজে পেতাম এই অন্ধকার ঘরের আলোকশূন্যতার মাঝেও। কীভাবে উতরে যেতাম আমার মনের অসুখ ও শরীরের গতিশূন্যতার এই জেলহাজতটাকে।  -------- কারণ আর পারিছিলাম না আমি –আল্লাহ, খোদা, ইয়ওয়েহ, কৃষ্ণ, পরব্রহ্ম, জিউস, আহুরা মাজদার সঙ্গে। কিন্তু আকাশে-বাতাসে আমার সেই নিঃশব্দ অন্বেষা অন্বেষাই থেকে গেল আপাতত “

আমেরিকার একজন জনপ্রিয় বিজ্ঞান কল্প কাহিনীর লেখক এর বই এর পরিচিত মূলক পোস্ট থেকে পরের কথা গুলো নেয়া। তাতেও দেখা যাবে আমার উপরোক্ত আলোচনাটির প্রতিফলন, “জন্মের মুহূর্ত থেকে আমরা অস্তিত্বের চেতনার অগাধ গভীরতায় নিমজ্জিত ও বাস্তবতার অমোঘ পরিস্থিতি দ্বারা বেষ্টিত। আমাদের নিজস্ব চেতনার সীমাবদ্ধতা থেকে যেন কোন রেহাই নেই। আমাদের পার্থিব অস্তিত্বের চেতনার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার কোন উপায়ও নেই। এমনকি মৃত্যুও  এই তমসাচ্ছন্ন অস্তিত্বের খপ্পর থেকে আমাদের রেহাই দেয় না। আমরা চলতে থাকি এবং কবরে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কিছু গঠন করতে থাকি বা কেবল এই সত্যটির সাথে সমঝতা করতে থাকি যে বাস্তবতার বুননে আমরা নিতান্তই অসহায়। অনেকের জন্যই অস্তিত্বের এই সংকট একটি প্রাথমিক এবং গভীরভাবে প্রথিত অস্থির অভিজ্ঞতা। এটা এমন একটা ভয় এই উপলব্ধি থেকে জন্মায় যে আমরা বিশাল মহাবিশ্বের মধ্যে অতি নগণ্য এবং অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার মহাসমুদ্রে প্রবাহমান। জন্মের মুহূর্ত থেকেই আমরা জীবনের জটিলতাগুলির সম্মুখীন হয়ে দুঃসাধ্য কাজের মুখোমুখি হই। আমাদের সামনে থাকা অগণিত চ্যালেঞ্জ এবং অনিশ্চয়তার সাথে মোকাবিলা করা এবং উপলব্ধি করার জন্য আমাদের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অস্তিত্বের সমস্ত মৌলিক রহস্যগুলি আমাদেরকে এমন এক মহাবিশ্বে একাকীত্বের অনুভূতি প্রদান করে চলে যা একধারে সুন্দর এবং ভয়ঙ্কর।

মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বৈজ্ঞানিক এবং গাণিতিক বোধগম্যতা প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে অস্তিত্বের বোধগম্য প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের সচেতনতাও বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি নতুন আবিষ্কারের সাথে আমরা অনির্ধারিত উপলব্ধির মুখোমুখি হই যে বাস্তবতা আমাদের কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি অপরিচিত এবং আরও জটিল। তবুও এটি অন্তত সচেতনতা যা আমাদেরকে অনিশ্চয়তার মুখে অর্থ এবং বোঝার সন্ধান দেয়, আমাদের অস্তিত্বের মৌলিক রহস্যের মুখোমুখি হতে ঠেলে দেয়। আমরা ধর্ম, দর্শন এবং মতাদর্শের সান্ত্বনাদায়ক বিভ্রমকে দাবি করি এমন একটি অনিশ্চিত বিশ্বে অর্থ এবং উদ্দেশ্যের কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়ার আশায় যা প্রায়শই আমাদের সংগ্রামের প্রতি সম্পূরক বলে প্রতীয়মান হয়। তবুও এই সান্ত্বনাদায়ক বিভ্রমগুলি মানুষের অবস্থার কেন্দ্রস্থলে থাকা অস্তিত্বের সংকটের মুখে সামান্য সান্ত্বনা স্বরূপ। প্রকৃতপক্ষে অস্তিত্ব সম্পর্কে বলা যায় এটি কারণ এবং এর প্রভাবক সমূহের পরিবর্তনশীল আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি নির্ধারক ঘটনা। সময়ের সূচনা থেকে বর্তমান মুহূর্ত পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা কার্যকারণের একটি বিশাল এবং আন্তঃ সংযুক্ত জালের অংশ যা আমরা আজ যে বাস্তবতায় বাস করি তার মধ্যে দিয়ে অনির্দিষ্টভাবে টেনে নিয়ে চলেছে। আমাদের জন্মের মুহূর্ত থেকে আমরা অস্তিত্বের চাকায় নিবন্ধিত সময় এবং স্থানের স্রোত দ্বারা পরিত্রাণের কোন আশা ছাড়াই চলমান থাকি। তার পরও এই অপ্রতিরোধ্য অনিবার্যতার মুখে আশার ঝিলিক রয়েছে। একটি স্বীকৃতি যে এই মহাজাগতিক ট্যাপেস্ট্রির একটি অংশ হিসাবে বিদ্যমান থাকার কাজটি অজানাকে আলিঙ্গন করার এবং জীবনের অনিশ্চয়তাকে আলিঙ্গন করার একটি সুযোগ। যদিও অস্তিত্বের ভয় জীবনের অনিশ্চয়তায় স্বাভাবিক এবং সহজাত প্রতিক্রিয়া হতে পারে, এটি আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে থাকা গভীর সম্ভাবনারও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমাদের ভয়ের মোকাবিলা করার মাধ্যমে আমরা আমাদের অচেতনতার সীমাবদ্ধতা গুলো অতিক্রম করার চেষ্টা করতে পারি এবং মহাবিশ্বের সীমাহীন সম্ভাবনাকে আলিঙ্গন করতে পারি, শেষ পর্যন্ত অজানাকে মোকাবেলা করার জন্য আমাদের অস্তিত্বের অনিশ্চয়তাকে আলিঙ্গন করার ইচ্ছা যা আমাদেরকে সংজ্ঞায়িত করে অনুসন্ধানী সত্তা হিসেবে এবং আমাদের জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে দেয় পরিবর্তনশীল ট্যাপেস্ট্রিতে । “

আমাদের বাস্তবতার চিন্তায় অস্তিত্বের সংকটটি কতটা গভীর তা উপরের লেখকবৃন্দের লেখা থেকে কিন্তু স্পষ্ট বুঝা যায়। মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রা কিন্তু এই অস্পষ্ট অস্তিত্বর ধারণা নিয়েই আগায়ে চলেছে। ফ্র্যাঙ্ক ক্লোজ লিখিত আ্যান্টিম্যাটার, ভাষান্তর উচ্ছ্বাস তৌসিফ বই থেকে নিচের উদ্ধৃতি গুলো তুলে ধরছি, যাতে বুঝা যাবে এই সংকট উত্তরণে মানব সভ্যতা আজ কতটা জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

পৃষ্ঠা ৪৭ “নিখাদ শক্তি কিংবা বলা যায়, নিখাদ শক্তির সবচেয়ে নিখাদ রূপ ‘আলো’থেকে বস্তুর জন্ম নেয়াকে এক কথায় বলতে হবে ঐশ্বরিক। প্রতিপদার্থের সঙ্গে পদার্থের যোগকে বলা যায় সবকিছুর শুরু। সৃষ্টির শুরু। কেমন করে বিগ ব্যাং থেকে এই মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছিল তা আমরা এখান থেকেই বুঝতে শুরু করতে পারি। প্রচন্ড উত্তাপ ও অনেক উচ্চশক্তির আলো মিলে জমাট বেঁধে জন্ম নিয়েছিল পদার্থ এবং প্রতিপদার্থ। ”

পৃষ্ঠা ১৬৬ ”সব সংস্কৃতির মানুষেরই মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে ভেবেছে। কীভাবে শূন্য থেকে এত কিছু এল, সে হেঁয়ালি আমাদের বিহ্বল করে রেখেছে আজও। বিগ ব্যাং কেন হয়েছে, তা এখনো কেউ জানে না। কিন্তু এর শক্তি থেকেই জন্ম নিয়েছে আমাদের আজকের এ মহাবিশ্ব ও এর মধ্যকার সবকিছু। আর প্রতিপদার্থের রশ্মিই – প্রথমে প্রতি-প্রোটন ও পরে পজিট্রন – আমাদের গবেষণাগারে সেই শিশু মহাবিশ্বের সিমুলেশন তৈরি করে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা এক সেকেন্ডের এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ বয়সী শিশু মহাবিশ্বে ফিরে যেতে পারি, তাকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। মানুষের মেধার এক অবিস্মরণীয় অর্জন এটি। একতাল পরমাণু এক হয়েছে, চিন্তা করতে পারছে এবং প্রবল বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে তাকাচ্ছে মহাবিশ্বের দিকে। বানাতে পারছে এমন যন্ত্র, যা আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে বিগ ব্যাংয়ের অসম্ভব কাছের মুহূর্তে। এই সব কিছুই সম্ভব হয়েছে প্রতিপদার্থ গবেষণার মাধ্যমে। বাস্তবতাই যদি এত চমৎকার হয়, তাহলে কল্প গল্পের কী দরকার?”

উপরের তিনটি উদ্ধৃতি থেকে বুঝা যায় মানব সভ্যতার অস্তিত্বের সংকট নিয়ে একটি সর্বজনীন অতি গভীর বিশ্লেষণ সকল সাহিত্য ও মানব কর্মের অন্তরালে কাজ করে আসছে। বিভিন্ন ধর্মে মানব সভ্যতার বিশ্বাস মূলত এই সংকটের একটা সমাধান দেয় কিন্তু তা বিশ্বাস নির্ভর, চিন্তাশীল মানুষ কেউ কেউ তাতে আস্থা রেখে শান্তি খুঁজে কিন্তু আরো মানুষ আছে যারা ধর্মের প্রদত্ত সমাধানে আস্থা রাখতে পারে না। যারা আস্থা রাখছে তাদের প্রতি আমার কিছু বলার নেই। যে যার যার মত করে তার অস্তিত্বের সংকটের সমাধান করবে, তাতে কার কিই বা বলার আছে। তবে এই প্রসঙ্গে ভিক্টর এমিল ফ্র্যাঙ্কেল এর জীবনের তাৎপর্যের সন্ধানে বইটি পড়ে দেখার অনুরোধ রেখে এই লেখাটা শেষ করছি।

জীবনের তাৎপর্যের সন্ধানে [ম্যান’স সার্চ ফর মিনিং] মূলঃ ভিক্টর এমিল ফ্র্যাঙ্কেল ভাষান্তর এহসান উল হক, প্রকাশকঃ আতাউল কবির খান, বিন্দুতে সিন্ধু, প্রথম প্রকাশ আগস্ট ২০১৯।

এডিট ও আপডেট হিস্ট্রিঃ ২৭অক্টবর ২০২২> ২৫মে২০২৩> ১৮আগস্ট২০২৩>৩১আগস্ট২০২৩> ২২জুলাই২০২৪>

 আমার কাছে অনেকের প্রশ্ন

https://surzil.blogspot.com/2024/02/blog-post_28.html
ব্লগ লিংকঃ https://surzil.blogspot.com
ফেইসবুক প্রফাইলঃ https://www.facebook.com/mustafa.surzil.rawnak

সুস্থ – অসুস্থ রাজনৈতিক আন্দোলন প্রসঙ্গে


আমি পঞ্চাশ ঊর্ধ্ব একজন এদেশীয় নাগরিক যে ছাত্র জীবনে কিংবা চাকুরী জীবনে কোন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ গ্রহণ করেনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত কোন একপেশে রাজনৈতিক মনোভাবও পোষণ করিনি। আমার জীবদ্দশায় ১৯৮৫ সাল থেকে এরশাদ সরকার এর শাসন আমল ও তার পতন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, প্রধান দুটি দলের পালা বদলে ক্ষমতায়ন ও বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় তাদরে আসা সহ বেশ কিছু রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক উত্থান পতনের সাক্ষী হয়েছি। । আমি যখন নিশ্চিত হই যে, আমি এদেশ ছেড়ে অন্যত্র যাবো না ও আমার তিন সন্তানও এদেশেই তাদের জীবন অতিবাহিত করবে তখন স্বাভাবিক ভাবেই রাজনৈতিক ভাবে নিজে ও পরিবারকে সচেতন করা আমার কর্তব্য ধার্য করি। সেই লক্ষ্যই আমি নিজে ও আমার সন্তানদের কে দেশের ইতিহাস, জাতীয়তা বোধ ও রাজনৈতিক ভাবে সচেতন করতে প্রয়াস পাই। পাশাপাশি আমার চিন্তা ভাবনা গুলোও লিপিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেই। এরকম সময়ে ১লা জুলাই থেকে ছাত্রদের মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় ও তা এক পর্যায়ে, অর্থাৎ ১৬ তারিখ তা তুঙ্গে উঠে যায়। সরকারের তাদের পক্ষে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল ও আদালতের ৮ই আগস্ট শুনানির দিন ধার্য করলেও ছাত্ররা রাষ্ট্রপতি বরাবর তাদের স্মারক লিপি প্রদান করে ২৪ ঘন্টার মধ্যে একটি সমাধান চায়। তারা ১৮ তারিখ পুর দেশে লকডাউন (ধর্মঘট বা হরতাল) এর ঘোষণা দেয়। আমি তিন দিন (১৪ থেকে ১৬ জুলাই, ২০২৪) বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ব্যস্ত ছিলাম। এর মধ্যেই হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপ গুলোতে আলোচনা হচ্ছিল। আমি আমার মতামতও দিচ্ছিলাম। অনেকেই আমার মতামতের সমালোচনা করে কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায় আমার অনুমানই সঠিক হয়ে দেখা দেয়। ছাত্রদের এই আন্দোলনকে পিছন থেকে উস্কে দিয়ে তৃতীয় পক্ষ যারা বর্তমান রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধাচরণ করে ব্যর্থ হয়েছে তারা উপরে উঠে আসে। ১৯শে জুলাইয়ে তাদের চেহারা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। যা ছিল ছাত্রদের নৈতিক আন্দোলন আর যার প্রতি পাবলিক সেন্টিমেন্টও ছিল পক্ষে, সেই সুযোগে বিরোধী মতাদর্শের লোকজন সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদে আগুন দেয়া শুরু করে। পুর দেশে ২৫০ প্লাটুন বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ –আধা সামরিক বাহিনী) ও ঢাকা শহরে ২৫ প্লাটুন বিজিবি নামান হয়। পুলিশ আর র‌্যাব ঢাকা ও সারা দেশে সক্রিয় হয় ও সহিংস আন্দোলনকারীদের দমনে কাজ করে। সংবাদ মাধ্যমে বলা হয় সারা দেশে ৩৫ জন লোক এই সহিংসতায় নিহত হয় জুলাইয়ের ১৯ তারিখ পর্যন্ত।

১৬ জুলাই ২০২৪ সন্ধ্যায় মেট্রোরেলে বাসায় আসতে গিয়ে সেক্রেটারিয়েট স্টেশনে নামলাম, শুনলাম বাসে আগুন দিচ্ছে দেখে স্টেশন থেকে বের হওয়ার সব দরজা ওরা বন্ধ করে দিয়েছে, তাই পুনরায় উপরে উঠে মেট্রোরেলে মতিঝিল যেয়ে নেমে রিক্সায় করে বাসায় পৌঁছলাম। সব টিভি চ্যানেল ঘেঁটে ও ইউটিউব থেকে সব পক্ষের সব সংবাদ শুনলাম। প্রধান মন্ত্রীর ও ওবায়েদুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী সহ সময় টিভির লাইভ টক শোতে ছাত্র নেতাদের বক্তব্যও শুনলাম। সময় টিভির সব খবরে সারা দেশে ছাত্রদের তন্ডবও দেখলাম একের পর এক। আমার বুদ্ধিতে যা কুলায়। যা বুঝলাম তা হলো পুর ছাত্র আন্দোলনটা শুরু হইছে আকস্মিক, কিন্তু হাইকোর্টের পূর্বের রায় স্থগিত করে আগস্টের ৮ তারিখ শুনানির কথা বলার পরও ছাত্রদের আন্দোলন ত্যাগ না করা এবং প্রধান মন্ত্রীর একটি সাধারণ মন্তব্যকে নিজের ঘারে নিয়ে নেয়া মোটেও সমর্থনযোগ্য মনে হলো না আমার কাছে। অপর পক্ষে ছাত্রলীগকে ক্ষেপায়ে তাদের সংঘর্ষে লিপ্ত করাটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। পুর ব্যাপারটাই ম্যানুফেকচার্ড বা কারো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে আমার মনে হয়। দেশের সংবিধান ও জন প্রশাসন সংবিধান মতই চলবে, সেই মতই সকল বিপত্তি নিষ্পত্তি হবে, এটা ছাত্র সহ সকল যোগ্য শিক্ষিত ও শিক্ষারত নাগরিককে মেনে নিতে হবে সেটাই কাম্য। ”গুলির ঘটনা ও মৃত্যু” দুটাই ছাত্র নামধারীদের কাজ বলে আমার মনে হলো যাদের অন্যকেউ নিয়োগ দিয়েছে হয়তো। এটা পুরটাই বানানো একটা খেলা যাতে ছাত্রদের হুজুগে অংশগ্রহণ ঠিক হচ্ছে বলে আমার মনে হয়নি। -যদিও বিষয়টি আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিমত। আমার ধারনা কিছুদিন আগে বিগত সামরিক প্রধান ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ প্রধান সহ একসময়কার প্রচুর ক্ষমাতাবন অনেক অসাধু ব্যক্তির অসৎ উপায়ে বিপুল সম্পদ অর্জন ধরা পরে যাচ্ছিল জনগণের সামনে ও সংবাদ মাধ্যমে। তারা বর্তমান সরকারের কাছে আশ্রয় না পেয়ে বিরোধী শক্তির সাথে হাত মিলায়ে এই পরিকল্পনা ফেঁদেছে বলে আমার অনুমান হলো। আমি নিশ্চিত নই তবে আমার ধারনা এসব অসাধু লোকেরাই, যারা বর্তমান সরকারের পতন চায় তারা সুকৌশলে এই দেশিয় ছাত্রদের ইমোশনকে কাজে লাগিয়ে থাকতে পারে। আমি বহু আগে ইউরোপে সম্ভবত বেলজিয়ামে অরেঞ্জ বিপ্লব সংগঠিত করার উপর একটা ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম আর ২০০২ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এমপিএফ নামক একটি অরাজনৈতিক সংগঠন এর সাথে সম্পৃক্ত থাকার সময় তাদের আন্দোলন এর সূত্রপাত কারার কৌশল গত আলোচনা শুনেছিলাম, তার প্রেক্ষিতে বলতে হয় যে দেশ জোড়া এসব বড় ধরনের আন্দোলনের পিছনে থাকে ২ থেকে ৩ জন ক্ষুরধার তরুণ রাজনীতিবিদ, তারা মারাত্মক বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যে কোন জনগোষ্ঠীর মৌলিক ইমোশনগুলো খুঁজে কার্যকর একটাকে বেছে নেয় ও তাতে ফুয়েল দেয়। ঠিক নাভিটা খুঁজে বের করে তাতে তেল ঢালে, তার পর যা হয়, জনগোষ্ঠী দাউ দাউ করে জলে উঠে। এই আন্দোলনটাকে আমার প্রথম থেকেই সেই রকম মনে হয়েছে । একসাথে দুটো আন্দোলন চলছিল জুলাই এর শুরু থেকেই। শিক্ষকদের পেনশন নিয়ে আন্দোলনে তারা কর্মবিরতিতে ছিল, যার কারণে আমার সিম্বা এলুমনাই এসোসিয়েশন এর জন্য তাদের সাথে যোগাযোগের তারিখ স্থগিত করি, তার পরপরই ছাত্রদের এই আন্দোলন উত্তর উত্তর জনসমর্থন পেতে থাকে। এই ঘটনায় চাপা পরে যায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন এবং অসাধু সরকারী কর্মকর্তাদের দুর্নীতির খবরাখবরও। যারা পিছন থেকে কল কাঠি নাড়ছিল তারা বুঝে যায়, তাদের ১ম উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, জনগণের দৃষ্টি অসাধু চোর ধরা থেকে অন্যত্র সরান গেছে, এখন দরকার চরম এক আঘাতে লক্ষ্য অর্জন তথা সরকারের পতন। সরকার যখন ছাত্রদের পক্ষে আদালতে আপিল করলো ও আদালত ৮ই আগস্ট শুনানির দিন ধার্য করে দিল, তখন ছাত্ররা অধৈর্য হয়ে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি পেশ করে ও ২৪ ঘন্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত দেয়ার কথা বলাটা একটা ওদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ মনে হয়েছে আমার কাছে এবং তা তারা কোন অদৃশ্য দুষ্ট চক্রের পরামর্শে করেছে বলে আমার ধারনা। এর মধ্যে প্রধান মন্ত্রী তার চীন সফর সংক্ষিপ্ত করে ঢাকায় এসে প্রেস কনফারেন্স করার সময় এক সাংবাদিক তাকে ছাত্রদের এই প্রসঙ্গে একটা কৌশলী প্রশ্ন করে, যার প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী উত্তর দেন, যোগ্যতার বিচারে যে উঠে আসল তাকে চাকুরী না দিয়ে কি রাজাকার এর নাতি পুতিকে দেয়া হবে? এটা তার একটা প্রশ্ন ছিল অথচ ছাত্ররা এটাকে ভুল ব্যাখ্যা করে বানাল যে, প্রধান মন্ত্রী আন্দোলন রত ছাত্রদের রাজাকার বলেছে। এই ভুল ব্যাখ্যাটাও সেই দুষ্ট চক্রের মাথা থেকে এসেছে বলে আমার বিশ্বাস, তাদের স্লোগান, ”তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার, কে বলেছে?, কে বলেছে?, স্বৈরাচার, স্বৈরাচার, চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার”। কিংবা এর পরে বিভিন্ন জায়গাও ৬ জন ছাত্র চলমান সংঘাতে মৃত্যুবরণ করার পর আসলো স্লোগান “বুকের ভিতর দারুণ ঝর, বুক পেতেছি গুলি কর”। এগুলোর পিছনে সেই অদৃশ্য দুষ্ট চক্রর হাত আছে বলে আমার ধারণা। ১৮ তারিখ পর্যন্ত ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন ছিল কিন্তু ১৯ তারিখ শুক্রবার যে দেশ জোড়া ও ঢাকা শহরের রাষ্ট্রীয় সম্পদে অগ্নি সন্ত্রাস ও ধ্বংশাত্বক কার্যাবলী শুরু হলো তাতে ছাত্ররা ঘোষণা দিয়ে বললো এই সব সহিংস ঘটনায় তারা জড়িত নয় এবং তাদের আন্দোলন কোন রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের আন্দোলনও নয়। আমার কথা হচ্ছে, এত বাড় বাড়াটা কি ঠিক হলো। আন্দোলন কর ঠিক আছে কিন্তু দেশের সম্পদ নষ্ট করার জন্য দুষ্ট চক্রকে সুযোগ করে দিতে তোমাদের কে বলেছে? এত সাহস তোমরা কোথায় পাও যে দেশের সর্বচ্চো সম্মানিত রাষ্ট্রপতিকে সময় বেধে দাও তোমাদের দাবী পূরণের? আমার বড় মেয়ে যে ডাক্তারি ৫ম বর্ষের ছাত্রী আমার সাথে বেয়াদবি করে বসলো যখন বললাম যে, প্রধান মন্ত্রী যা বলেছে তা ঠিক আছে। সে  পরদিন সকালে বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কার এর ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিতে চেয়েছিল, পরে সে তার অপরাধ বুঝতে পেরে আমার কাছে ক্ষমা চায় ও অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। এই কোমল মতি ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহার করে যে সকল কুচক্রী ব্যক্তিবর্গ রাজনীতি করে তাদের বলতে চাই আপনাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শান্তি দেয়া উচিত। আর এদেশের সাদা সিধা জনগণের ভাগ্য নিয়ে খেলা করা আপনাদের মোটেও উচিত নয়। দেশটায় বেশির ভাগ মানুষই হুজুগে, ইমোশনালি বায়াস্ড, সেই সুযোগ নিয়ে কিছু অতি কুবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ পিছন থেকে কল কাঠি নারে, এটা এদেশের সকল মানুষকে বুঝতে হবে ও সজাগ থাকতে হবে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন এর এই ছাত্র আন্দোলনের বিপরীতে কাজ না করে এর পক্ষে কাজ করে এদের সঠিক ভাবে পরিচালিত করতে পারতো তা না করে এর বিরুদ্ধতা করে তারা সঠিক কাজ করেছে বলতে পারছি না।  

গণজাগরণ হতে হবে ভ্যালিড রিজনের উপর, এটা এমন একটা রিজন যেটাকে ডাই হার্ড রিজন বলা যায় না। এটা এমন একটা ইস্যু যা আমাদের জাতির জন্য এখনই জন গুরুত্বপূর্ণও না। এমনতর একটা বিষয়কে ইস্যু বানায়ে গণ অভ্যুত্থান ঘটায়ে ফেলবে এমন যদি কেউ মনে করে থাকে তবে সে বোকার স্বর্গে বসবাস করছে। এর আগেও শাপলা চত্বর হেফাজতে ইসলাম সাদা টুপি দিয়ে ঘেরাও করে পুর মতিঝিল অচল করে বসে ছিল দুই দিন । তারপর যা হয়েছে তা আমরা সকলেই জানি। সরকার একসময় তার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করবেই। ওই মোল্লাদের আত্মবিশ্বাস এতই বেড়ে গিয়েছিল যে বলছিল সরকার পালাবার পথ পাবে না। ওদের মত গর্ধব ওই আত্ম অহংকারেই মরেছে। র‌্যাব যে অপারেশন চালিয়েছিল তাতে তারা ছত্র ভঙ্গ হয়ে যায়। বিরোধী দলের দাবি র‌্যাব নাকি রক্ত গঙ্গা বানায়ে দিয়েছিল সেখানে, কিন্তু নিদিষ্ট কিছু লোককে তারা হতে পারে সরায়ে দিয়েছে কিন্তু বিশাল জমায়েত ছত্র ভঙ্গ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। এগুলো আমাদের চোখের সামনেই হয়েছে। আমার এক কলিগ বললেন হেফাজতে ইসলামের সেদিনকার আন্দোলন ছত্রভঙ্গ করতে যে র‍্যাবের বাহিনী কাজ করেছিল তার নেতৃত্বে ছিল বেনজির আহমেদ, যার নজির বিহীন দুর্নীতি এখন লোকজনের অবগত।

সুস্থ রাজনৈতিক আন্দোলন কিরকম হওয়া উচিত? এরশাদ পতনের সময় বক্তৃতায় বলেছিল “আমি আপনাদের রাজনীতি শিখাবো”, এর পরপরই সে জাতীয় পার্টি গঠন করে, যে পার্টির কোন ছাত্র সংগঠন নাই বা ছিল না। আজ আমরা দেখি জাতিয় পার্টির নেতাদের অনেকেই দুশ্চরিত্র। যা হোক, দেশের প্রচলিত আইন, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল, সংসদের অধিবেশন, ৩০০ আসনের এমপি গন এরা যদি জনস্বার্থের কোন দাবি আমলে না নেয়, তখন জনগণ তার জন্য রাজপথে আন্দোলনে নামবে ও তাদের দাবি পেশ করবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে কিংবা রাষ্ট্রপতি বরাবরে স্মারকলিপি পেশ করবে। সেটা শান্তিপূর্ণ ভাবে করা সম্ভব এদেশে। কিন্তু রাষ্ট্রপতিকে সময় বেধে দেয়া একটা উদ্ধত্তপূর্ণ কাজ এটা তো সবারই বুঝার কথা, কেন সেটা ছাত্ররা বুঝল না সেটা আমার একটা বিশ্বয় বটে। দেশ যখন কার্যকর থাকে, দেশের চারটি মূল মাথা, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, নির্বাচন কমিশনার ও অডিট জেনারেল যখন সজীব ও সক্রিয় থাকে। দেশের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যখন সচল ও স্বাভাবিক থাকে তখন শান্তিপূর্ণ উপায়েই দাবি আদায় সম্ভব। দেশের সংসদ যখন চলমান তখন ৩০০ জন এমপির যে কোন একজন জনগণের দাবি সংসদে উত্থাপন করতে পারে যা নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে। আরবিট্রেশনের (আপদ নিষ্পত্তির) এতগুলো উপায় থাকতে কেন আগেই রাজপথে হট্টগোল করতে হবে? যখনই তা করা হয় তখন স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় নিয়ম ভঙ্গ করে কোন কুচক্রী মহল তাতে ইন্ধন যোগাচ্ছে তা সমাজের বিজ্ঞ মহল, শিক্ষিত মহলের বুঝার কথা। তা কেন এ ক্ষেত্রে জনগণ বুঝলো না সেটা কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণার একটা বিষয় হতে পারে। আমার মতে এদেশের জনগণ হুজুগে আর রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রকৃত জ্ঞান সম্পর্কে তারা প্রকৃত ধারনা রাখে না। উচ্চ শিক্ষিতরা বেশিরভাগই ডাক্তার না হয় ইঞ্জিনিয়ার যারা রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখে বলে আমার মনে হয় নি, তা যদি থাকতো তা হলে তারা এই চক্রান্ত শুরুতেই ধরে ফেলতে পারতো। আমার স্কুলের বন্ধু মহল আমার সমবয়সী, তাদের যে সকল মতামত আমি সোশাল মিডিয়া আমাদের হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপে পেলাম, তাতে আমার আশ্চর্য হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এদের মধ্যে, আর্মির উচ্চতর পদমর্যাদার অফিসার, উচ্চ শিক্ষিত ডাক্তার, আর্কিটেক্ট ইঞ্জিনিয়ার, নন ব্যাংকিং ফিনানশিয়াল অর্গানাইজেশনের প্রাক্তন এমডি, আরএমজির ব্যবসায়ীরা ছিল। তাদের বক্তব্যগুলো বিচার বিশ্লেষণ করলে এদেশের আপামর শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটা স্যাম্পল এনালিসিস পাওয়া যায়। আমার বিচারে তাদের মতামত গুলো ছিল পুরটাই অর্বাচীনের মত। তারা কেউ রাজনীতি বুঝে বলে মনে হয়নি, উড়ো খবর, হুজুগ, স্বেচ্ছাচারী মনভঙ্গী, এসবের এক মিশ্রণ বলে মনে হয়েছে। সুদূর অষ্ট্রিলিয়া থেকে আমার এক প্রিয় বন্ধু যে মন্তব্য করলো তাতেও আমি হতবাক হয়েছি। যখন ঘটনা প্রবাহ আমার মতের পক্ষেই আসলো তখন তারা কিন্তু আমার বলা কথা গুলো সম্পূর্ণই ভুলে গেল, বরং আমার মতামত যে সঠিক ছিল সে বিষয়কে সমর্থন জানানো তাদের ইগোইস্টিক বিষয় মনে হলো বোধ হয়। সাধারণ জনসাধারণের এই জনমত তাই সর্বদাই ভ্রান্ত পথ ধরে আগায়। ঘটনা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তখন তাদের হায় হায় করা ছাড়া পথ থাকে না। আমি যখন বললাম, সরকার শুনানির দিন ৮ই আগস্ট থেকে ২১ জুলাই রবিবার উচ্চ আদালতে প্রস্তাব করে আগায়ে এনেছে ও সাধারণ মেধার কোটা ৮০ শতাংশ ও ২০ শতাংশ অন্যান্য কোটা করার প্রস্তাব করবে বলে ঘোষণা দিলো। প্রধান মন্ত্রী যেখানে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের সাথে আলোচনার জন্য আইনমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে দায়িত্ব দিলো, তারাও তা প্রেস মাধ্যমে সবাইকে জানালো তখন তো তাদের আন্দোলন স্থগিত করা উচিত ছিল। আমার স্কুলের বন্ধু মহল তখনও আমার কথায় সায় দেয় নাই। এ থেকে বুঝা যায় দেশের মানুষজন শিক্ষিত হয়েছে ঠিকই, উচ্চ শিক্ষিতও হয়েছে কিন্তু তাদের বিবেক বোধ ও নৈতিকতা বুঝার এখনও অনেক বাকি আছে। অশিক্ষিতদের তো এরাই পথ দেখাবে, কিন্তু যখন এদের শিক্ষাই পূর্ণতা পায় নাই তখন সে আশা করা দুরাশা।

এর পর আমরা যা দেখি তা খুব স্বাভাবিক, পুর দেশে কারফিউ জারি করা হয় ও সেনা মোতায়েন করা হয়। ছাত্রদের তিন জন সমন্বয়কারী তাদের ৮ দফা দাবি পেশ করে ও সরকারের তিন মন্ত্রী তা গ্রহণ করে। পরের দিন সকালে সর্বোচ্চ আদালতের রায় হবে। আমার কথা হলো, এমন একটা আন্দোলন করে দেশ ও জাতিকে থামায়ে দেয়া ও জাতীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করতে বিরোধী শক্তিকে সুযোগ করে দেয়ার দায় কে নিবে। বুঝলাম বেশ কিছু তরুণ প্রাণ ঝড়ে গেছে তার দায় কি শুধু সরকারের? যারা অনিমতান্ত্রিক ভাবে হুজ্জতি আন্দোলন করলো তাদের ঘারে বর্তাবে না তা তো হতে পারে না। ছাত্রদের সামনে আগায়ে দিয়ে যারা পেছনে ওত পেতে ছিল তারাই মূলত দায়ী বলে আমি মনে করি। দেশের মূল প্রায়োরিটি এখন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, এই ধারাকে যারা বুঝতে না পারে তারা মূলত দেশের অগ্রযাত্রায় অযথা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এই বোধটা ছাত্র সমাজ থেকে শুরু করে দেশের সকল সুস্থ জনগণকে বুঝতে হবে। যারা এই সরকারের প্রতি বিরক্ত ও নতুন ব্যবস্থা চায় তাদের বুঝতে হবে বিকল্প কি আছে আমাদের হাতে। দেশকে চালানোর মত দক্ষ বিরোধী কোন শক্তি আছে কি না? আমার মতে নাই। এই মুহূর্তে এই সরকার অপসারণ করা হলে দেশে প্রতিস্থাপক আরেকটি যোগ্য সরকার গঠনের মত যথেষ্ট শক্তিশালী জনগোষ্ঠী আছে কিনা তা নিশ্চিত করেই সরকারের পতন চাওয়া উচিত বলে আমার ধারণা।

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ১৬জুলই২০২৪>২১জুলাই২০২৪> ২৩জুলাই২০২৪> ১৪আগস্ট২০২৪>


আমার কাছে অনেকের প্রশ্ন

https://surzil.blogspot.com/2024/02/blog-post_28.html

ব্লগ লিংকঃ https://surzil.blogspot.com

ফেইসবুক প্রফাইলঃ https://www.facebook.com/mustafa.surzil.rawnak