Sunday, September 22, 2019

লেখালেখির গুরুত্ব সম্পর্কে আমার ধারণা



বাপ্পা মজুমদার ও সামিনা চৌধারীর ‘এক মুঠো গানএ্যালবামের “আকাশ খুলে বসে আছি, তাও কেন দেখছো না” গানটা যারা শুনেছেন তারা এর জনপ্রিয়তার কথা জানেন। গানের এই লাইটি অন্য ভাবেও তো বলা যেত, যেমন “হাঁ করে বসে আছি তাও কেন আসছ নাকিংবা “পসরা সাজায়ে বসে আছি তাও কেন কিনছ না অথবা “সেজে-গুজে বেড়াতে এসেছি তাও কিছু বলছ না?” কিংবা ধরুন যদি বলি “এত এত লেখা লিখছি তাও কেন পড়ছ না?” ইত্যাদি, কিন্তু তাতে কি তা এত জনপ্রিয় হত? তাতে কি তা সাহিত্য হত? হত না কারণ সাহিত্যের ভাষা ভিন্ন, আর তা হল মানুষের মনের ভাষা, জ্ঞানের ভাষা নয়। সাহিত্য হল মানব মনের প্রতিচ্ছবি, এটি এমন এক আলোর পৃথিবী যেখানে যা আসে সব আলোকিত হয়ে আসে। এই আকাশ তো নীল আকাশ নয় বরং মনের আকাশ। এই গানের সাথে আমার বেশ কিছু স্মৃতি জড়িত তাই গানটা হঠা‌ৎ কানে আসলে সেই স্মৃতীগুলো মনে চলে আসে। গানটার গুরুত্বও আমার কাছে একটু অন্যরকম ও বিশেষ বটে। সেই স্মৃতি নিয়ে কিছু বলার ইচ্ছা নাই এখানে, বরং পারষ্পরিক ভাব বিনিময় মাধ্যম গুলো নিয়ে কয়েকটা বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যা সচরাচর বলা হয় না বা যে উদ্দেশ্য গুলোর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয় না। এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ “সাহিত্যের সামগ্রী” অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমি প্রবন্ধটি সাধু থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তর করেছিলাম ২০০৪ এ, এই উদ্দেশ্য নিয়ে যে তা আরো স্পষ্ট করে বুঝতে পারি। সাধু-তে লেখার চল ইদানীং উঠে গেছে কিন্তু সাধু ভাষা সেই সময় লেখালেখির ক্ষেত্রে সম্ভ্রান্ত ভাষা মনে করা হত। চলিত ভাষার সুবিধা এই যে, তা বিষয়বস্তুকে স্বচ্ছ ও দ্রুততার সাথে বুঝতে সহায়তা করে। যুগ-যুগান্তরে মানব মনোভঙ্গি পরিবর্তন হলেও মূল ভাবধারা একই থাকে। আলোচনার সুবিধার জন্য সাহিত্যের সামগ্রীর উপর লেখা রবীন্দ্রনাথের মূল্যবান প্রবন্ধটি এখানে সংযোজন করছি, তার পর আমার বক্তব্য উল্লেখ করব।


<উদ্ধৃতি> একেবারে খাঁটি ভাবে নিজের আনন্দের জন্য লেখা সাহিত্য নয়। অনেকে কবিত্ব করে বলেন যে, পাখি যেমন নিজের উল্লাসে গান করে লেখকের রচনার উচ্ছ্বাসও সেরকম আত্মগত, পাঠকেরা যেন তা আড়ি পেতে শুনে থাকেন। পাখির গানের মধ্যে পাখি সমাজের প্রতি যে কোন লক্ষ্য নাই, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। থাকুক বা না থাকুক তা নিয়ে তর্ক করা বৃথা। কিন্তু লেখকের রচনার প্রধান লক্ষ্য পাঠক সমাজ। আমাদের মনের ভাবের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি এই যে, সে নানা মনের মধ্যে নিজেকে অনুভূত করতে চায়, প্রকৃতিতে আমরা দেখি টিকে থাকার জন্য প্রাণীদের মধ্যে সব সময় একটা চেষ্টা চলছে, যে জীব বংশ বিস্তারের মাধ্যমে যত বেশী জায়গা জুড়তে পারে তার জীবনের অধিকার তত বেশী বেড়ে যায়, নিজের অস্তিত্বকে সে যেন তত অধিক সত্য করে তোলে। মানুষের মনোভাবের মধ্যে সেরকম একটা চেষ্টা আছে, তফাতের মধ্যে এই যে প্রাণের অধিকার দেশে কালে, মনোভাবের অধিকার মনে এবং কালে। মনোভাবের চেষ্টা বহু কাল ধরে মনকে আয়ত্ত করা। আমি যা চিন্তা করছি, যা অনুভব করেছি তা মরবে না, তা মন হতে মনে, কাল হতে কালে, চিন্তিত হয়ে, অনুভূত হয়ে প্রবাহিত হয়ে চলবে। আমরা যে মূর্তি গড়ছি, ছবি আঁকছি, কবিতা লিখছি, পাথরের মন্দির নির্মাণ করছি, দেশ বিদেশে চিরকাল ধরে অবিরাম এই যে একটা চেষ্টা চলছে এটা আর কিছুই নয়, মানুষের হৃদয় মানুষের হৃদয়ের মধ্যে অমরতা প্রার্থনা করছে।  সাহিত্যে এই চিরস্থায়িত্বের চেষ্টাই মানুষের প্রিয় চেষ্টা। যা জ্ঞানের কথা তা প্রচার হয়ে গেলেই তার উদ্দেশ্য সফল হয়ে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু হৃদয়ের ভাবের কথা প্রচারের মাধ্যমে পুরাতন হয় না। সূর্য যে পূর্ব দিকে উঠে, এ কথা আর আমাদের মন আকর্ষণ করে না কিন্তু সূর্যোদয়ের যে সৌন্দর্য ও আনন্দ তা জীবন সৃষ্টির পর হতে আজ পর্যন্ত আমাদের কাছে অম্লান আছে। রচনা বলতে গেলে, ভাবের সাথে ভাব প্রকাশের উপায় দুটোকেই সমান ভাবে বুঝায় কিন্তু বিশেষ করে উপায়টাই লেখকের। দীঘি বলতে জল এবং খনন করা আধার দুই-ই একসঙ্গে বুঝায়। জল মানুষের সৃষ্টি নয় তা চিরন্তন। সেই জলকে বিশেষ ভাবে সবার জন্য সুদীর্ঘকাল রক্ষা করবার যে উপায় তাই-ই কীর্তিমান মানুষের নিজের। অতএব দেখা যাচ্ছে যে, ভাবকে নিজের করে সকলের করাই সাহিত্য এবং তাই-ই ললিত কলা। সাধারণ জিনিসকে বিশেষ ভাবে নিজের করে সেই উপায়েই তাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করে তোলাই সাহিত্যের কাজ। যে সকল জিনিস অন্যের হৃদয়ে সঞ্চারিত হওয়ার জন্য প্রতিভাশালী হৃদয়ের কাছে সুর, রং, ইঙ্গিত, প্রার্থনা করে, যা আমাদের হৃদয়ের মাধ্যমে সৃষ্টি না হয়ে উঠলে অন্য হৃদয়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে না, তাই সাহিত্যের সামগ্রী। তা আকারে-প্রকারে, ভাবে-ভাষায়, সুরে-ছন্দে মিলে তবেই বাচতে পারে। তা মানুষের একান্ত আপনার – তা আবিষ্কার নয়, অনুকরণ নয়, তা সৃষ্টি। <অন-উদ্ধৃত>

সাহিত্যের সামগ্রীতে কবিগুরু সাহিত্য সম্পর্কে যা বলেছেন তা হল গান, কবিতা, নাটক ইত্যাদির উদ্দেশ্য হল মানুষের মনে উদয় হওয়া বা সৃষ্টি হওয়া ভাব গুলো মন থেকে মনে প্রবাহিত করে দেয়া ও তাকে সময়ের মধ্যে স্থায়িত্ব দেয়া। সাহিত্য সমাজে মানুষের জীবনাচরণের বিষয়াবলী হতে বেছে নিয়ে তাকে আরো পরিশীলিত করে নতুন ভাবে প্রকাশ করে। অনেকটা ধুয়ে মুছে নতুন ভাবে প্রকাশ করে। সাহিত্যের সামগ্রী প্রবন্ধটি একটি মূল্যবান রচনা আর আমার সাহিত্য সম্পর্কে জ্ঞানের গোঁড়া বলা যায়। সাহিত্যের সামগ্রী প্রবন্ধে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তা ছাড়াও আর কয়েকটি উদ্দেশ্য আছে বলে আমার মনে হয়েছে আর তা হল চিন্তনের সাধারণীকরণ বা সার্বিকীকরণ (স্ট্যানডারডাইজেসন আফ থট্স), চিন্তা-চেতনার সার্বিকীকরণ। আমি যা ভাবছি তা সঠিক কিনা, কোথাও ভুল হচ্ছে কিনা? আর যদি ভুল থেকেই থাকে তা হলে সেটা কি? এই বিষয়ে সাধারণ স্বীকৃত মতটির যথার্থতা বিচার করা। এই সব প্রশ্নর সমাধানও লেখালেখির আরেকটি উদ্দেশ্য। সাহিত্য ও সংষ্কৃতি একটি জনগোষ্টির স্বাস্থ্য সম্পর্কে থারমমিটারের মত কাজ করে। অতি জনপ্রিয় ভারতীয় অভিনেতা আমিতাভ বচ্চনের একটি কথা আমাকে চমকে দিয়েছিল, সে বলছিল, অভিনেতারা মূলত একটি মাধ্যম বা মিডিয়া, তার কথায় চট করে একটা জট খুলে গেল, আগে ভাবতাম এত বিভিন্ন চরিত্র এক ব্যক্তি দারুন ভাবে অভিনয় করছে কি ভাবে আর তাকে অন্য চরিত্রে দেখা সত্যেও এই চরিত্রে আমিই বা কেন তা মেনে নিচ্ছি? অমিতাভ বচ্চনের কথায় বুঝলাম, অভিনেতা মূলত যে চরিত্রটি চিত্রণ করছে তা সাহিত্যের একটি ধারা বা বলা যায় অত্যন্ত শক্তিশালী ধারা যার মাধ্যমে একটি তথ্য বা ধারনা বিপুল পরিমাণে জনমনে সঞ্চার করা সম্ভব হয়। তাই চলচ্চিত্র বা মুভি হল সাহিত্যের সব থেকে বড় বাহন যাকে সর্ববৃহৎ কমপোজিট আর্টও বলা হয়। এই যে বৃহৎ বুলডোজার আর্ট এর কথা বললাম এটারও শুরু ঐ লেখালেখির মধ্য দিয়েই। তাই লেখালেখি সম্পর্কে হ্যারি পটারের লেখিকা বা রচয়িতা জে কে রাওলিং এর উক্তি, “লেখালেখি ভালোবাসার চেয়েও বেশি কিছু। এটা আবশ্যিকতা।

লেখালেখির প্রচলিত উদ্দেশ্যের পাশাপাশি আরেকটি উদ্দেশ্য আছে তা হল অন্য একটি বা একাধিক মনের সাথে কানেক্ট করা বা সংযোগ স্থাপন। অন্যর কাছে নিজের সুচিন্তাটা পৌছে দেয়া ও তার কাছ থেকে উত্তর প্রত্যাশা করা বা ওই বিষয়ে তার মতামত জানার প্রত্যাশা। লেখালেখিকে একমুখী ভাবা হলেও আসলে তা দ্বিমুখী (ইন্টার‍্যাক্টিভ) প্রক্রিয়া। ফেইসবুকের কোন post এ জানা অজানা কেউ লাইক দিলে মনে কেন আনন্দ উদ্দীপন হয় তা নিয়ে গবেষনা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে যে এতে আমাদের দেহ মনে রাসায়নিক পরিবর্তন হয় যা মানুষকে ক্ষণিক আনন্দ পুলক দেয়, তাই সে তা আরো পেতে চায় আর তার পর তাতে আবিষ্ট হয়ে যায়, মনস্তাত্ত্বিক গবেষকরা সেই কথাই বলেছেন। আমার কিন্তু আরেকটি কারণ মনে হয়েছে এর পিছনে কাজ করে আর তা হল, কোন আত্মা তার আকৃতি খুঁজে পায় না যতক্ষণ না সে তার প্রেরিত বার্তার প্রত্যুত্তর খুঁজে পায়, সে আরেকজনের কাছ থেকে তার কথার, ছবির, কাজের স্বীকৃতি চায় বা তার আলোকে নিজেকে বিচার করতে চায়। বিষয়টা অনেকটা রাডার স্ক্যানারের মত কাজ করে, ছুঁড়ে দেয়া আলোর প্রতিবিম্বে নিজের আকৃতি দেখতে পায়। যেহেতু নিজেকে মাপার বা দেখার আর কোন উপায় তার কাছে নাই। সে ঘুরে নিজেকে দেখতে পায় না তাই অন্যর চোখ দিয়ে নিজেকে দেখতে চায়। আয়নায় দেখা প্রতিচ্ছবির কথা ভাবছেন? আয়না সব সময় আপনার বিপরীত প্রতিচ্ছবি বা অপজিট প্যারেটি দেখাবে, ডান চোখ বন্ধ করে দেখবেন আয়নাতে আপনার প্রতিচ্ছবি বাম চোখ বন্ধ করে রেখেছে। অন্যের চোখই তাই নিজেকে দেখার সঠিক আয়না। লেখার বিষয়বস্তু নিয়ে পাঠক মহলে মন্তব্য, সমালোচনা তাই লেখকের আত্ম উপলব্ধিতে অনেক কাজে আসে, ক্রিটিক ভাল হোক বা মন্দ হোক তার লেখার মান উন্নত করে দেয়। এ বিষয়ে রাওলিং বলেছেন লেখকের সবচেয়ে বড় সমালোচক তার মনের মধ্যেই বাস করে। বাইরের সমালোচেকের চেয়ে ভিতরকার সমালোচকের প্রতি লেখকের ভয় বেশী, তাই লেখিকা তাকে বিস্কুট খেতে দেন। ক্লাস এইটে পড়ার সময় একটা চকচকে ছোট  নতুন কাচি দিয়ে সাদা কাগজের ঝালর কাটার অভ্যাস তৈরী হয়েছিল, শুধু ঝালর কাটাই নয় তার একটার চেয়ে আরেকটার সৌন্দর্য বিচার করতে যেয়ে তাকে শ্রেণীকরণ ও সবচেয়ে সুন্দরটি মাপতে গিয়ে যা বুঝেছিলাম তা হল পরিমাপাক নীতিমালা বা কোন মানদণ্ড ছাড়া কেবল মনের বিচারে সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ বা নির্বাচন সম্ভব নয়। মানবিক বিচার আর যুক্তির বিচারে বিস্তর পার্থক্য আর তাই সেইটাই সব থেকে ভাল যা মন তার নিজস্ব ভাব ধারায় সুন্দর বলে বিচার করে। এই বিচার বোধের সাধারণ মানদণ্ডের জনমত (কনসেনসাস) গঠন করতেও সাহিত্য বিশাল ভূমিকা পালন করে।

লেখালেখির আরেকটি উদ্দেশ্য, মনের ভাবকে ভাষায় রূপান্তর করা। ভাব প্রকাশের উপায়টাকে রবীন্দ্রনাথ দীঘির সাথে তুলনা করেছেন আর দিঘীর জলকে চিরায়ত জ্ঞানের বা ভাবধারার সাথে। ভাব প্রকাশের উপায় তা ভাষা হোক, চিত্র কর্ম হোক কিংবা চলচ্চিত্র, এই উপায়টাই মানুষের সৃষ্টি। সূর্যোদয়ের অনুভব একেক মনে একেক ভাবে প্রতিভাত হতে পারে তার প্রকাশে ভিন্নতা থকাটাই স্বাভাবিক আর এই শাশ্বত সৌন্দযের অভিব্যাক্তিই সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ ‘ভাষা ও ছন্দ কবিতায় মনে উদয় হওয়া ভাবকে প্রকৃত সত্য বলে উল্লেখ করেছেন, আসলে প্রকৃত মানুষ তো তার মনের ভাবেই বিরাজ করে, ভাষা দিয়ে সে নিজেকে প্রকাশ করতে চায় অন্যের কাছে। অনেক সীমাবদ্ধতা সত্যেও ভাষার শক্তি তাই অনেক। মনের ভাবকে ভাষায় রূপান্তর লেখালেখির অন্যতম উদ্দেশ্য বলে আমার মনে হয়েছে। নিজে বুঝা ও অন্যকে বুঝান বা তার মনের ভাবের সাথে মিলায়ে দেখা। মনের বার্তা অন্য মনের কাছে পৌছে দেওয়া। মনের ভাব তো যুক্তির নীতিতে চলে না আবার যুক্তি ছাড়া তাকে অপরের কাছে বা সবার কাছে গ্রহনযোগ্যও করা যায় না। এই প্যারাডক্স সমাধানের একমাত্র উপায় এই ভাব বিনিময়ের মিথষ্ক্রিয়া। যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন বাদ-প্রতিবাদ-সংবাদ বা সংলাপ (ডায়ালেকটিক্স)। নতুন কিছুর উদ্ভাবনই হয় এই ডায়ালেকটিক্সের মাধ্যমে। পুরাতনের সাথে নতুন সম্ভাবনার মিশ্রণেই ধারাবাহিক উন্নতি সম্ভব। “কলি ফুটেছি কি ফুটে নাই, অলি বার বার ফিরে যায় আর “আকাশ খুলে বসে আছি, তাও কেন দেখছনা গান দুটির ভাবার্থ প্রায় একই কিন্তু একটি অতি পুরাতন আরেকটি নতুন। একমাত্র মানুষ নামক প্রাণীরই একঘেয়েমি জনিত বিরোক্তি বোধের সামর্থ্য আছে, তাই সে সব সময় নতুন কিছু সৃষ্টির উন্মাদনায় ভুগে। নতুন উদ্ভাবন তাই মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। লেখালেখির মাধ্যমেই নতুন উদ্ভাবন সম্ভব হয়। এক জায়গায় পড়েছিলাম “কেউ মনে করে না যে, অশ্ব মানব, পরি, কল্প রাষ্ট্র (ইউটোপিয়া) বাস্তব, তবে মনে করা হয় যে, বাস্তব জগত হতে স্বতন্ত্র কোন জগতে তাদের অস্তিত্ব আছে আর এভাবেই আলোচনার জগত ধারনাটির উদ্ভব হয়।‍ একঘেয়েমি জনিত বিরোক্তি বোধের সামর্থ্যর মত কল্পনা করার শিক্তও একমাত্র মানুষেরই আছে। কল্পনায় ভর করে পুরাতন যুগের অশ্ব মানব হতে আজকের যুগের স্পাইডার ম্যান, সুপারম্যান এ্যাভেনজারস আর ড্রাকুলারাও বিশ্ব সাহিত্যের জীবন্ত চরিত্র। হলপ করে বলতে পারবেন টম এন্ড জেরির কোন বাস্তব অস্তিত্ব নেই? বরং তারা এতটাই জীবন্ত যে তার কখনও বিনাস হবে না। অস্তিত্বের দার্শনিক সত্যাসত্য অত্যন্ত বিতর্কিত একটি বিষয়। বাহ্য আর অন্তস্থ কিংবা যদি বলি ব্রাক্ষণ ও আত্মন ইংরেজিতে যাকে বলে ‘এ্যাপিয়ারেন্স আর ‘দ্যা থিং ইন ইটসেল্ফ এর প্যারাডক্সটা এই বিশ্বজগতে কখনই সমাধান যোগ্য হবে বলে মনে হয় না। এই দ্বন্দ্ব না থাকলে সকলের মন একই রকম হয়ে যেত অনেকটা জীবন শূন্য ধুসর মরুর মত। তাই খানিকটা অসংগতি ও তন্ময়তার ভাব মানব সঞ্জায় সংযুক্ত করা আছে। থাকাটাই ভাল, মানব মনের তন্ময়তাকে কেটে ছেঁটে বাদ দিয়ে যান্ত্রিক মানব সৃষ্টি করা যাবে ঠিকই কিন্তু তাতে মানবতা ধ্বংস হয়ে যাবে।

মনের গভীরতায় বা চিন্তার জগতে ডাইভ বা ড্রাইভ দেয়া একটি চমকপ্রদ ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাও বটে। যার মন যত তথ্য বহুল তার তত বিস্তৃত বিচরণ ক্ষমতা। সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পের সেই বই পড়া আর মাছির পুঞ্জাক্ষীর সাথে তুলনা করা এর সাথে মিলে যায়। লেখালেখির পাশাপাশি বই পড়ার অভ্যাসটাও তাই জরুরী। বই পড়া ছাড়া যদি আপনি চিন্তার জগতে ডাইভ দেন তবে নির্ঘাত পথ হারাবেন। মনের ভুবন হাজার কোটি মহাবিশ্বর চেয়েও বড় বলে মানব মন ভাবতে পছন্দ করে। এক সময়কার সাহিত্য আরেক সময়ের সাহিত্যের সাথে মিলবে না আবার এক এলাকার সাহিত্য অন্য এলাকার সাহিত্যর সাথেও মিলবে না কিন্তু বিশ্বসাহিত্যর সাধারনিকৃত রূপ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ের ও বিভিন্ন এলাকার মানুষের চিন্তুা ভাবনা একই রকম হওয়ার ও তো কথা নয়। তবে মনে রেখাপাত করে সেই সাহিত্য যা সাম্প্রতিক বাস্তবতা ও মানুষের জীবনাচরণের সাথে মিলে যায়। রবীন্দ্র রচনা আর নজরুল রচনার পার্থক্যটা খেয়াল করলেই বুঝা যায় প্রত্যেক মানুষের মনোভঙ্গির একটি স্বাতন্ত্র্য আছে, হুবহু একই রকম কখনই হবে না তার পরও বিশ্বায়নের এই যুগে সকল মানুষের জীবনাচরণের ও চিন্তা ভাবনার মধ্যে একটি একক ধারায় বিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। মহাকালের ধারায় বিশ্ব সাহিত্যের এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়াই এখন সাহিত্যের প্রকৃত বাস্তবতা। গানে যা বলা হচ্ছে কিংবা গল্প, নাটক, চলচ্চিত্র এ সবের আরেক দিক শিক্ষাদান এই আর্থে যে তা স্টেনডারডাইজ করে ও নতুন রূপকল্প প্রস্তাব করে। আমরা অনেকে মন খুলে কথা বলি না হয়ত এই কারনে যে, কে কি মনে করে, পাছে লোকে আময় মূর্খ ভাবে, অবমূল্যায়ন করে কিংবা আমার মনের কথা বুঝে আমার ক্ষতিসাধন করে, এইসব হাবিজাবি অযথা কারণে, অনেকের অবশ্য অভ্যাস আছে মনটাকে চিন্তামুক্ত রাখার, তারা মন চিন্তুাশুন্য করে মনকে প্রশান্ত রাখার চেষ্টা করে। আমার এক বন্ধু বলতো চিন্তা করলেই তার মাথা ধরে, ও মূলত সকল চিন্তাকেই দুশ্চিন্তা মনে করত। এ রকম যারা তারা কি জীবনের মৌলিক চিন্তু গুলো যা মানব সভ্যতা আজও সমাধান করতে পারেনি তা থেকে মুক্তি পায়? জনাব হকিংস তার শেষ গ্রন্থ ‘থিওরি অফ এভরিথিং এ বার বার স্রষ্টার প্রসঙ্গে টেনে এনেছে বলে সমালোচিত হল, আর অতি ব্যক্তিত্ব, বা উচ্চতর মানব হওয়ার চেষ্টা রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, মাদার তেরেসারা করেছেন কিন্তু মানব সভ্যতার এই ২০০০ বছরের লিখত ইতিহাস ছাড়াও আরও প্রায় ৬০০০ বছরের পুরাতন প্রত্নতত্ত্ব যুগের মানুষ আর এখনকার মানুষে পার্থক্যটা ভেবে দেখুন? চিন্তা-চেতনায় এখনকার মানুষেরা কতটাই না এগিয়ে গেছে। মত প্রকাশে অনীহা মানে হল আপনি নিজেকে ও অন্যকে অবহেলা করছেন আর সভ্যতার বিকাশে আপনার অংশগ্রহণকে অস্বীকার করছেন। মানব যোগাযোগের ক্ষেত্রে মৌন থাকাটা তাই একটা অপরাধ।

লিখালিখির আরেকটি উদ্দেশ্য আত্মপ্রকাশের বাসনা যা একটি শক্তিশালী মানব প্রবৃত্তি বা ইনিসটিং। বারট্রান্ড রাসেলের বই ‘অরাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বৃত্তি-প্রবৃত্তিবইটি ছাড়াও ম্যকিয়াভেলি বা ম্যাসলস হাইয়ারারকী অব নিড্স, কিংবা ইমাম গাজ্জালীর মানব প্রবৃত্তির উপর বক্তব্য গুলো ম্যাস আপ করলেও এই বক্তব্যই পাওয়া যাবে। আত্মপ্রকাশ বা নিজেকে অন্যর কাছে প্রকাশ করার চিরন্তন মানব প্রবণতাও লিখালিখির আরেকটি উদ্দেশ্য। আত্মপ্রকাশ, মানব সংযোগ, সমাজ গঠন, আত্মউন্নয়ন এরকম প্রায় সব মানবিক ক্ষেত্রেই লেখালেখির বিশেষ অবদান আছে। আত্মপ্রকাশ না করলে একের মতের সাথে অন্যর মত মিলবে কিভাবে ? সমাজ বা সংঘ সংগঠনের প্রথম ধাপই তাই এই লেখালেখি। আমার খালার ঘনিষ্ট বান্ধবীর মামা তখনকার জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আহসান আলীর ‘পূর্ব বাংলা কবিতার সেই লাইনটা এখনও মনে রেখাপাত করে, “আমার পূর্ব বাংলা, অনেক পাতার ঘনিষ্টতায় এক প্রগাড় নিকুঞ্জ। ভাগ্য ভাল উনি লিখেন নাই আমার সোনার বাংলা অনেক নৌকার ঘনঘটায় এক প্রকাণ্ড কর্মযজ্ঞ। সাহিত্যের রাজনীতিকরন করা উচিত না আর তা করলে প্রকৃত সাহিত্য হবে না। উদ্দেশ্য প্রণদিত ভাবে লেখালেখিকে ব্যবহার করে যারা রাজনৈতিক মত প্রতিষ্ঠা করতে চায় কিংবা কিছু অসাধু সাংবাদিক যারা অন্যের দুর্বলতা প্রকাশ করে তাকে বিপদের ভয় দেখিয়ে টাকা কামাই করেত চায় তারা সাহিত্যের কাল বাজারী। আর যারা লেখালেখিকে বানিজ্যিকী করণ করেছেন, যুব মানসকে পুঁজি করে প্রকাশক ও নিজের জন্য বিপুল সম্পদ আয়ত্ত করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন তাদের সম্পর্কে আমার কিছুই বলার নাই। সমাজের সুস্থ মানুষ গুলোই তার বিচার করবে আর কালের বিচারে তাদের কাজের গুরুত্বও কমে যাবে। তন্ময়তার ভাষাই প্রকৃত সাহিত্য, তা-ই আমাদের সংস্কার বা সংস্কৃতি হওয়া উচিত।

আমার লেখা-লেখির উদ্দেশ্যটা এবার বলে ফেলি? মনে অনেক কথা আর চিন্তার জটাজাল, এই চিন্তার জটিলতা সরলীকরণের জন্যই লিখে চিন্তা করার চেষ্টা, বিশ্লেষনে সময় লাগে, লিখলে তা সহজ হয়। আত্মসমালচনা, আত্মকথন আর যথার্থতার মানদণ্ড বা বিবেক গঠনের প্রয়োজনেই লিখতে থাকি। তাছাড়া মানুষ প্রকৃতিগত ভাবে নিষঙ্গ, সে বড় একা, তার বসবাস মনোজগতে আবদ্ধ, বহির্বিশ্বে তার বিস্তারের একটাই উপায় আছে আর তা হল অন্যের মনের সাথে ভাব বিনিময় করা। শেষ করতে চাই এই বলে, মন খুলে কথা বলুন, নিজের মতকে সবার কাছে প্রকাশ করে দিন তা ভাল হোক আর মন্দ হোক কিচ্ছু যায় আসে না, আপনার আমার সবার জন্য তা অবশেষে ভালই হবে। এতে করে সম্মিলিত ও সামগ্রিক মানব আত্মা তথা মানব সভ্যতা সমৃদ্ধ হবে। কিছু দিনের মধ্যেই আমি আপনি মহাকালের চোরাবালীতে বিলীন হয়ে যাব কিন্তু আমাদের কথাগুলো বা ভাবনা গুলো হয়ত মন থেকে মনে বিরাজ করতে থাকবে, আর এটাই চিরন্তন বিশ্ব মানবতা। 
 
 
এডিট ও আপডেট হিস্ট্রিঃ ০৩সেপ্টেম্বর২০১৯> ১৯সেপ্টেম্বর২০১৯> ১১ডিসেম্বর২০২৩>

Tuesday, September 10, 2019

সাক, সুকুক ও ইসলামী ব্যাংকিং


মূসক যদি বুঝে থাকেন তাহলেও সুকুক বুঝেন কিনা তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। খেয়াল রাখবেন, এটা শুশুক বা শামুক নয় সুকুক, সাকের বহুবচন সুকুক। যখন প্রথম মূসক বলা চালু হল, অর্থাৎ যখন ভ্যাট বা ভ্যালু এ্যাডেড ট্যাক্স এর বদলে “মূল্য সংযোজন কর” বা মুসক বালা শুরু হল তখন নতুন যারা শুনেছেন তাদের মূষিক বা মিশুক জাতীয় কোন প্রাণীর কথাই প্রথম প্রথম হয়ত মনে হত । বিষয়টা অনেকটা এরকম, আগে জানতাম Source Tax  এখন বলি TDS বা Tax Deducted at Source মোদ্দা কথা একই তবে একটু ঘুরায়ে বলা হয়েছে আরকি। সুকুক বা সাক শব্দটা নতুন মনে হলেও তা নতুন নয় বরং সাক থেকেই চেক শব্দের উৎপত্তি – কথাটা শুনে চমকে যাওয়ার মতই বিষয়, এতো পুরাতন? ! সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের ফ্যাকাল্টি শামীম ভাই সাককে একটু ভিন্ন ভাবে উচ্চারণ করে তাকে আলাদা করতে চাচ্ছিল, আমি পরিষ্কার করে বললাম, ডেটা বা ডাটা হল ডাটা শাক তাই না? আর এটা হল শুধু শাক বা সাক যার উচ্চারণটাও কাছাকাছিই হবে।

আমি বেশ কবার মারাত্মক রকম চমকেছি জীবনে, প্রথমবার বোধহয় রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের একটি গল্পের পাঞ্চ লাইন “হৃদয়টা যদি লোহার বয়লার হইত তবে দপ করিয়া ফাটিয়া যাইত” পড়ে যে বিরামহীন হfশি হেসেছিলাম ছাত্রজীবনে তা ছিল আমার জীবনের রেকর্ড পরিমাণ হাশির চমক আর ইদানীং যখন জানলাম ব্রিফ হিষ্ট্রি অব টাইম বইটা লিখার সময় বা তার আগে হকিংস মহাশয় জেকব ব্রাওনস্কি’র তাত্ত্বিক টিভি সিরিয়াল “দি এ্যাসেন্ট অব ম্যান” দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে, আরে  হকিংস সাহেব তো তা হলে এই সেদিনকার কথা বলছেন, ১৯৮৭ সাল, আর আমি তো তখন ক্লাস এইটের স্কুল ছাত্র, আমারও তো প্রিয় ডকুমেন্টারি ছিল ওটা, বিবিসি থেকে নিয়ে বিটিভি সাপ্তাহিক প্রচার করত। তখন অবশ্য ওই একটা টিভি চ্যানেল বিটিভিই ছিল অন্ধের যোষ্ঠি। জেকব ব্রাওনস্কির বই “দ্যা কমন সেন্স অব সাইন্স” এর বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ মেলা থেকে কিনতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছিলাম আর তা পড়ে নিজেকে মহা পণ্ডিত পণ্ডিত ভাবতাম ছাত্রাবস্থায়, বলা বাহুল্য বইটা দুই বার পড়েছি, আর দ্বিতীয়বার দাগায়ে নাস্তানাভুত করে ছেড়েছি। এই হকিংস ভদ্র মহোদয়ও তাঁর ভক্ত ছিলেন?!, বলে কি !! এর পরেরর বিস্ময়কর খবরটি ছিল ১৯৮৩ সালের পূর্বে এম আজিজুল হক স্যার, সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের প্রথম অধ্যাপক কর্তৃক ইসলামী ব্যাংকিং এ দেশে সূত্রপাতের কথা জানতে পারা। বলে কি এরা, ইসলামী ব্যাংকিং এর শুরুটা সোনালী ব্যাংকে?! অবাক না হয়ে যাই কই। তেমনই চমকপ্রদ হল সাক থেকে চেক শব্দের উ‌ৎপত্তির কথা জানতে পারার চমক। বিআইবিএম এর ক্লাসে আলমগির স্যার যখন কথাটা বলল, তখন মাথার ভিতর ঢং করে একটা ঘন্টা বেজেছিল, হলপ করে বলতে পারি আপনিও চমকের মধ্যে আছেন, না চমকালও অবাক হয়েছেন ত বটেই।

আমাদের ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোতে নতুন প্রডাক্ট দরকার, কিন্তু তা কি হতে পারে তা নিয়ে ভাবতে হয়েছে অনেক। এটা, সেটা, অন্যরা কি করছে, আমরা কি করতে পারি ভেবে অস্থির, নতুন কিছু মাথায় আসছিল না, কিন্তু যখন সুকুক সম্পর্কে জানলাম, তখন বুঝলাম এই খানেই দরজা খুলবে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে সুকুকের সম্ভাবনা অনেক, আরব ইসলামি বিশ্বে সুকুক অতি পরিচিত একটি আর্থিক ইনসট্রুমেন্ট। আলমগির স্যার তার ক্লাসে আমাদের কোরআনের জ্ঞান কত তা মাপতে মাপতেই সময় পার করে দিলেন, অথচ তাঁর লেকচার সিট পরে দেখি, ওরে বাবা !! কত কি যে আছে এই সুকুক নিয়ে। উনি প্রচুর সুকুকের স্ট্রাকচার দিয়েছেন তার স্লাইড গুলোতে। ক্লাস শেষে যাওয়ার সময় স্যার বলে গিয়েছিলেন লেকচার সিট গুলো পড়তে রিডিং গ্লাস লাগবে, তা লেগেছিল ঠিকই, চারটা করে স্লাইড একটা পেইজে প্রিন্ট দেয়া। ছোট হয়েছে ঠিকই তবে সুকুক স্ট্রাকচার গুলো খুব ভাল ভাবেই বুঝা যাচ্ছে। লেকচারে বা লেকচার সিটেই হোক কিংবা পড়াশুনার জন্যই হোক, ফ্লো চার্ট , স্ট্রাকচার, হাইয়ারআরকি ট্রি স্ক্যামেটিক বা স্টেটিসটিকাল ডেটার গ্রাফিকাল রিপ্রেজেনটেশন ইলাসট্রেশন গুলো দারুণ ভাবে কাজে আসে। বিষয়টা বুঝতে এতটাই সহজ হয় যে, এক ঝটকায় অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যায়। রিডিং গ্লাসে আলমগির স্যারের দেয়া সুকুক স্ট্রাকচার গুলো যতই দেখি ততই নানা রকম প্রডাক্ট একটার পর একটা মাথায় উদয় হতে থাকল। এতদিন আতিপাতি করে খুঁজেও নতুন ইসলামী প্রডাক্টের প ও পাই নাই আর এখন ঝুড়ি ঝুড়ি আইডিয়া। সুকুক নিয়ে গুগল সার্চ দিলাম সেখানে এক ব্যাংক গ্রিন সুকুক পর্যন্ত চলে গেছে বলে পত্রিকায় পেলাম। অথচ এখন পর্যন্ত আমরা সাদা মানে সাধারণ সুকুক কি তাই জানি না।

সুকুক নিয়ে এতটা খোঁজা খুঁজি হয়ত করা হতনা যদি না এর উপর লেকচার দেওয়ার চাপ থাকত। গত দুই বছরের মত এবারও সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের (এসবিএসসি’র) মিজান স্যার এর ফোন আসল ঠিক যখন ভাবছিলাম এবছর তো ক্লাস নেয়ার ডাক পরল না । মিজান স্যার যে বিষয় গুলোর উপর ক্লাস নিতে বলল তা গত বছরও নিয়েছি, তাই তাতে নতুন কিছু প্রস্তুতি নেয়ার  ছিল না, কিন্তু প্রথম ক্লাসের শেষে বেখাপ্পা একটা শব্দ এই সুকুক দেয়া আছে কেন তা প্রথমে মাথায় ঢুকল না। ক্লাস দুটোর একটা লাঞ্চ ব্রেকের আগে আরেকটা পরে। দুটো ক্লাসের বিষয়বস্তু ধারাবাহিক বটে কিন্তু মাঝখানে এই সুকুক কেন? আর সুকুক প্রথম ক্লাসের শেষে বললে পরের ক্লাসে বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা কিভাবে ধরে রাখা যাবে তা নিয়ে ভাবনায় পরেছিলাম। যা হোক, কি মনে করে মিজান সার সুকুক কে ঐ যায়গায় প্লেস করেছে জানিনা কিন্তু আমি এই বার সুকুক নিয়ে অনেক কিছুই জানি ও প্রচুর বলতে পারব বলে মনে হল। আমাকে দুইটি ক্লাসের প্রথমটির শেষাংশে দেয়া হয়েছে সুকুকের বিষয়ে বলার জন্য কিন্তু আমার যা রসদ তাতে সারা দিন বক্তব্য রাখলেও শেষ হবে না। সব কিছুই নির্ভর করছিল ক্লাসে অংশগ্রহণকারীদের ব্যাংকিং বিষয়ে অভিজ্ঞতার উপর, যদি তারা পুরাতন হয় তবে অন্য বিষয় গুলো অত বিস্তারিত না বলে বরং সুকুকে সময়টা টেনে আনা যাবে, এই ভেবেই গিয়েছিলাম ক্লাস নিতে, কিন্তু তা হয়নি। অংশগ্রহণকারীদের সবাই প্রায় নতুন তাই তাদের কোন বিষয়ই কম বলা যাবে না, বরঞ্চ সুকুক সম্পর্কে পরিচিতিমূলক স্বল্প বক্তব্যই তাদের জন্য ভাল হবে, বেশী বললে দুটি ক্লাসের মূল ধারার সাথে তা গোলমেলে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। সুকুক নিয়ে সেই বিশাল বক্তব্য সংক্ষেপ করতে করতে মাত্র ১০ মিনিটে সুকুকের বক্তব্য শেষ করতে হয়েছিল সেদিনকার ক্লাসে। কে কি বুঝেছে জানি না তবে সুকুক যে ইসলামী ব্যাংকিং এর একটি সম্ভাবনাময় ইনসট্রমেন্ট তা সবাই বোধ হয়ে জেনে গেছে।

সুকুক নিয়ে আমি যত সম্ভাবনাই দেখি না কেন উপর মহল থেকে যতক্ষণ না কোন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে ততক্ষণ এই নতুন সম্ভাবনার কোন দাম নাই। সেদিন একজন বলছিল বন্দর সংলগ্ন শাখা গুলোতে দৈনিক এমন সব ব্যবসা আছে যে এক লোক সকালে চেক ছাড়া প্রচুর টাকা নিয়ে যায় আর বিকালে তার অধিক জমা দিয়ে যায়, সমস্যা হল সে সকালে কোন ভাউচার ছাড়াই টাকাটা নেয় যেহেতু তার একাউন্টে কোন টাকাই থাকে না। ব্যাংকিং হিসাবে এটা অবৈধ, ম্যানেজার পরিচিত বিধায় কাজটা সে করে আসছিল বেশ কিছুদিন ধরে, কিন্তু একদিন অডিট এসে ভোল্টের টাকা আর ক্যাশ বই এর ব্যালেন্সে ব্যাপক অমিল পাওয়ায় সেই ম্যানেজার সাসপেন্ড হয়ে যায়। এখানে কেউ কিন্তু অর্থ তসরুপ করেনি বরং এটি বৈধ ব্যবসা যা ব্যাংকের কোন প্রক্রিয়ায় প্রনালীবদ্ধ করা যায়নি। যায়নি কারণ কনভেনশনাল ব্যাংক সরাসরি ব্যবসা করতে পারবে না, কিন্তু এই সমস্যা ইসলামী ব্যাংকে নাই বরং মুসারাকা সুকুক এর মাধ্যমে এই ব্যবসা ইসলামী ব্যাংকিং করতে পারবে। সুকুক অথরিটির মাধ্যমে উক্ত শাখা ঐ ব্যক্তিকে এক দিনের জন্য বড় মাপের টাকা ঋণ দিতে পারবে যা সে দিন শেষে মুনাফা সহ প্রদান করবে আর বিনিময়ে সে কমিশন নিবে বা মুনাফার একটা অংশ যা সুকুক চুক্তিতে থাকবে তা নিয়ে যাবে। সেই পুরন প্রবাদটা আবার বলতে হয়, ব্যবসার প্রয়জনে ব্যাংকিং, ব্যাংকিং এর প্রয়জনে ব্যাবসা নয়। সাবজেক্টিভিটি আর অবজেক্টিভিটি নিয়ে এই যে গোলমাল তা বহুবছর ধরেই চলে আসছে। একদিকে জট খুলে তো আর এক দিকে নতুন করে জট লাগে। জীবনের জন্য ধর্ম  না ধর্মের জন্য জীবন? বাচর জন্য খাওয়া না কি খাওয়ার জন্য বাচা? ঘোড়ার জন্য গাড়ী নাকি গাড়ির জন্য ঘোড়া। এই হাতি ঘোড়ার বিভ্রান্তি মানব সমাজে চলতেই থাকবে। উন্নত বিশ্বে অবশ্য এই বিভ্রান্তি কমে গেছে, যাবেই তো, তা না হলে তারা উন্নত হল কি করে।

কনভেনশনাল ব্যাংক বাজারে সরাসরি ব্যবসা করতে পারে না কিন্তু ইসলামী ব্যাংক পারে কারণ তার নীতিমালাই ব্যবসার উপর প্রতিষ্ঠিত, সে অর্থে এটি একটি আর্থিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বটে। এই একটি কারণে ইসলামী ব্যাংকিং নীতিগত ভাবে একধাপ এগিয়ে, কোন ইহুদী ব্যাংকার আমার সাথে একমত হবেন না, কারণ তিনি ব্যাংকিং বলতে বুঝেন বসে বসে টাকা উপার্জন, কিন্তু ইসলামী ব্যাংকিং তা মানে না। বসে বসে টাকা উপার্জন অস্বাভাবিকই শুধু নয় অনৈতিকও বটে। টাকা বাড়াতে হলে তাকে অবশ্যই ব্যবসায় খাটতে হবে এটা হল একজন মুসলিম ব্যাংকারের দৃঢ় বিশ্বাস। ইহুদি ব্যাংকিং নীতি অন্যকে বা অন্যর টাকার কৌশলগত ব্যবহার করে অন্যকে দিয়ে ফয়দা উঠায়ে নেওয়াকে ব্যাংকিং দক্ষতা মনে করে।  সরলীকরণ করলে দাড়ায় অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাওয়া বা কৈ মাছের তেলেই কৈ মাছটি ভাজা। ইসলামী ব্যাংকিং নীতি অন্যের টাকা তার অনুমোদনে ব্যবহার করে অন্যের সম্পৃক্ততায় বা নিজে ব্যবসায় খাটান নিশ্চিত করে অন্যকে মুনাফা করে দেওয়া ও তার সম্মতিতে নিজের জন্য লভ্যাংশের একটা ভাগ নেওয়া। প্রথমটি বৈধ কৃত গণপ্রতারণার কৌশল আর পরেরটি স্বাভাবিক ব্যবসা।

সুকুকের আরেকটি চমকপ্রদ ফিচার হল এর বন্ড মার্কেট ফ্লেভার বা শেয়ার মার্কেট ফ্লেভার। ব্যাংক কারবারকে যদি বলা হয় পরের টাকায় পোদ্দারী তবে শেয়ার মার্কেট হল পরের টাকায় জুয়া চুরি। এই বক্তব্য হয়ত কার কার মধ্যে বিচিত্র অনুভূতির সৃষ্টি করতে পারে তবে এই কথার বিপক্ষে যদি কেউ বেট ধরে তবে আমার কাছে যে তথ্য সম্ভার আছে তাতে আমার জিতে যাওযার সম্ভাবনাই বেশী। তুরুপের তাস বা ট্রাম্প কার্ড আমার হতে তাই ভয় নাই। ইসলামের মুয়ামালাতে শেয়ার মার্কেটকে মানা করা আছে !! এবার কেউ কেউ সত্যি সত্যি আমার উপর খেপে যাবেন মনে হয়। ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা সমর্পকে আমারই এক স্যার বলতেন ‍‍তখনকি আর মুদ্রার চল ছিল? তখনত বারটার চলত !! আমি হতবাক!! সে আমাকে এর বিপক্ষে প্রমাণ দেখাতে বলেছিল। খুঁজাখুঁজি করে যা দেখলাম তাতে দেখা যায় তখন দুটোই চালু ছিল। মুদ্রার এক্সচেঞ্জ রেটের পার্থক্য মুসলমান বা প্রকৃত খ্রীষ্টানরা মানে না কারণ তাতেও রিবা বা সুদ হয়ে যায়। ইসা (আঃ) এ রকম যারা করছিল তাদের উপর মারাত্মক রেগে গিয়েছিলেন বলে কথিত আছে। আর ইজিপ্টে ইউসুফ (আঃ) কে তো কয়েক দেরহামে বিক্রি করে দেয়ার কথা আর স্পষ্ট ভাবেই পবিত্র কোরআনে উল্লেখ আছে। তা হলে কেন স্যার বললেন তখন কেবল বারটার প্রথা ছিল মুদ্রার প্রচলন ছিল না? বা মুদ্রায় কেনা বেচা হত না !! বাস্তবতা বড়ই বিচিত্র। এ থেকে বুঝা যায় অনেকেই মনে করেন সেই সময় এত পুরাতন যে, তখন আধুনিক একাউন্টিং ছিল না, কিংবা ধরুন ডেরিভেটিভ এর মত এত জটিল অংক তারা করতে পারত না আর তাই এ বিষয়ে সেই ১৪০০ বছর আগে আইন করে এসব মানা করার প্রসঙ্গই আসে না। এইবার তবে তুরুপের তাসটা দেখাই ? আপনাদের তথাকথিত পশ্চিমা পণ্ডিত মহাশয়েরা যাদের আধুনিক একাউন্টিং এর গুরু মানা হয় তারা ত শূন্যর ব্যবহারই জানত না,  যদি না আল খারেজমী গণিতে শূন্যর ব্যবহার শিখায়ে দিত। ১৪০০ বছর আগের সেই আরব দেশে উটের কেনা বেচার উপর একটি হাদিসে ডেরিভেটিভের উপর আইন দেয়া আছে খুঁজে দেখবেন। তুরুপের আরেকটি তাস হল, ইসলাম আপনাকে আপনার ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি আছে এমন সকল আর্থিক লেনদেন চুক্তি বা পদ্ধতিকে বাতিল করেছে। ইসলাম ব্যবসায় স্বতন্ত্র সত্ত্বা হিসেবে লিমিটেড কোম্পানিকেও স্বীকার করে না কারণ একমাত্র মানব – মানব চুক্তি সম্ভব, বা ফান্ড – ফান্ড চুক্তি সম্ভব ইসলামে, মানব – ফান্ড চুক্তিকে ইসলাম কখনই সমর্থন করে নাই, এর মনে হল ব্যবসা একটি ব্যক্তি নিরপেক্ষ পৃথক স্বত্বা তা ইসলাম মানে না । যে সম্পদের উপর বিক্রেতার অধিকার নাই তার উপরও চুক্তি কিংবা ভবিষ্যতে হতে পারে সেই সম্ভাবনার উপর ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি সমূহ ইসলাম মানা করে। কেবল স্পেকুলেশনের উপর ভিত্তি করে ব্যবসা করা ইসলামে নাই। আর এতে যে কোন পক্ষের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তা নাকচ করে দেয়া হয়েছে। যা-হোক, চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী, উলু বনে মুক্তা ছিটানর মত বোকমি না করাই ভাল। কার সাথে এ নিয়ে বিশাল বিতর্ক করার ইচ্ছা নাই আমার, যাদের এই নীতিগুলো আপত্তিকর লাগছে তাদের অনুরোধ করব ইসলামী অর্থনীতির প্রাথমিক বই গুলো পড়তে, তা হলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।  এই লেখা লেখার সময় আমার এক সহকর্মীর বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেনিং চলছিল বন্ড এর উপর, সে ফিরে যখন বলল যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি সুকুক নিয়ে তেমন কোন চিন্তা-ভাবনা নাই। সুকুক নিয়ে তার প্রশ্নের জবাবে প্রশিক্ষণে তাই বলা হয়েছে। এই কথা শুনে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। এত ভাল একটা ইনসট্রমেন্ট অথচ এদেশের মানুষ জানেই না আবার উপর থেকেও কেউ এর জন্য কিছু করছে না। যা বলছিলাম, সুকুকের শেয়ার মার্কেট ফ্লেভার রয়েছে, অর্থাৎ বন্ড মার্কেটের মত এটাকে চালনা করা যায় আবার শেয়ার মার্কেটেও তাকে প্লট করা সম্ভব। উদাহারণ স্বরূপ পদ্মা সেতুর উপর সুকুক ছাড়া যেত, কিংবা মেট্র-রেলের উপরও করা যেত। কর্তার  ইচ্ছায় কর্ম, কর্তা ব্যক্তিরা চায় না, আমরা হাউ কাউ করে আর কি করতে পারব। তবে এই কথাটা জানা থাকা প্রয়জন যে, বর্তমান শেয়ার মার্কেট ইসলাম অনুমোদন করে না নীতিগত কারণে কিন্তু সুকুকে সেই নীতিগত প্রতিবন্ধকতা থাকে না। তাই ইসলামী বন্ড সুকুকে বিনিয়োগ সুদ মুক্ত হবে ও সমাজে কোন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না। শেয়ার মার্কেটে ধস গুলো যারা অনুভব ও উপভোগ করেছেন তারা বুঝেন শেয়ার মার্কেট সমাজে কত খানি ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। সুকুক সেই ঝুঁকি থেকে মুক্ত।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, যারা অনেক কিছু জেনে যায় তারা তা সহজেই সরলীকরণ করে অন্যকে বুঝতে সহযোগীতা করতে পারে, কিন্তু তখন তারা সহজ করে আর অন্যদের বলতে চায় না । মনে হয় তাতে করে তাদের কষ্টার্জিত জ্ঞানের অসম্মানের সম্ভাবনা থাকে। ধরুন যদি বলি হুন্ডি এর বহু পূর্ব সংস্করণ হল সাক আর তারই সমরূপ প্রতিশব্দ হল বন্ড। আব্বাসীয় আমলের সেই খলিফা হারুন অর রশিদের সময় বিপদজনক রাজ্যের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার জন্য নগদ অর্থ না নিয়ে একটি লিখিত আর্থিক ডকুমেন্ট বা বন্ড সার্টিফিকেট নিয়ে যাওয়া আর হুন্ডি নিয়ে যাওয়া বলা কি ভুল বলা হবে? কেন যে খামাখা সহজ বিষয় গুলোকে জটিল ভাবে উপস্থাপন করা হয় তা আমার বোধগম্যতার বাইরে। সাক বা হুন্ডির বৈধ ও সারবীকিকৃত (ষ্ট্যাণ্ডার্ডাইজড) ফরমেটই পরবর্তীতে চেক বা বন্ড ইনুষ্ট্রমেন্ট। ইতিহাস আর উদ্দেশ্য অবজ্ঞা করা হয় বলেই আজকালকার নব্য প্রজন্মের কার কার মধ্যে সংকীর্ণ মনোভাব দেখেতে পাওয়া যায়। পুরন দিনের সেই সব বড় মনের, বড় মাপের মানুষ ইদানীং কমই দেখতে পাওয়া যায়। সেই পুরাতন প্যারাডক্স এখানেও কাজ করে, জ্ঞানার্জনের জন্য পড়াশুনা না পড়াশুনার জন্য জ্ঞান, ইদানীং তো ক্যারিয়ার এর জন্য পড়াশুনা তাতে জ্ঞান থাকুক আরা না থাকুক কিচ্ছু আসে যায় না। ব্যাপারটা এখন এরকম, পড়াশুনা কর পরীক্ষার জন্য, চাকরী কর আর্থ উপার্জনের জন্য, কেউ বলে না পড়াশুনা কর  জ্ঞানার্জনের জন্য আর চাকরী কর আনন্দময় জীবনযাপনের জন্য। যে তার পড়াশুনা আর চাকরী একই ধারায় করে তার আনন্দ চিন্তা করে দেখেছেন? ওরকম একজন মানুষ বোধহয় আমাদের সোনালী ব্যাংকের প্রাক্তন এমডি স্যার, জনাব ওবায়েদউল্লাহ আল মাসুদ, উনি টিভি সাক্ষাৎকারেও বলেছেন, ছাত্রাবস্থায় উনি স্বপ্ন দেখেছেন ব্যাংকার হওয়ার, পড়াশুনাও করেছেন ওই লাইনে আর কর্মক্ষেত্রও তিনি অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়ে আসছেন ব্যাংকিঙে। ইসলামী ব্যাংকিঙে সুকুক একটি ভাল বিনিয়োগ মাধ্যম তা সম্পর্কে নিজের অভিমত জানানই ছিল এই লেখার উদ্দেশ্য। একটু মজা করে লিখেছি, তাই তা যদি খানিকটা আনন্দ দিতে পারে তাতেই খুশি।

১৯আগষ্ট১৯>৪সেপ্টেম্বর১৯>০৯সেপ্টেম্বর১৯>

Wednesday, August 14, 2019

ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো ও বর্তমান প্রেক্ষাপট


বাংলাদেশ ব্যাংকিং অঙ্গনে সর্বপ্রথম ইসলামী ব্যাংকিং এর ধারণার সূত্রপাত ঘটে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে। সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল জনাব এম আজিজুল হক পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম  পর্যালোচনা করে এ দেশে কি ভাবে তা প্রবর্তন করা যায় তার উপর একটি কর্মশালার আয়োজন করেছিলেন। কর্মশালার অংশগ্রহণকারীদের সংগঠিত করে তিনি বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ইসলামী ব্যাংকিং এর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ দেশে ১৯৮৩ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর মালিকানা ও কর্মপদ্ধতি বিভিন্ন হাত বদল হয়ে আজকের অবস্থায় এসেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে দশটির অধিক ইসলামী ব্যাংক ও এনবিএফআই শরীয়া ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও জনমনে ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়টি নিয়ে নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা বিদ্যমান দেখেতে  পাওয়া যায়। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কেবল ইসলামী ব্যাংকিংই নয়, একক নেতৃত্বহীনতার কারণে মুসলিম উম্মায় নানাবিধ বিষয়ে মতভেদ ও বাকবিতণ্ডা বহমান রয়েছে । ইসলামের অন্যান্য বিষয় নয় কেবল ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর জনমনে যে বিভ্রান্তিকর বিষয়গুলো রয়েছে তা নিয়ে এখানে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো।

জনমত পর্যালোচনায় ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে যে বক্তব্যটি সবার আগে পাওয়া যাবে তা হলো “এরা ঘুরায়ে খায়”, কি খায় সে বিষয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই, এই বক্তব্যের পর পরই এক হাসিতে সব কথা বলা হয়ে যায়। সাধারণ জনমতের বিস্ময়কর প্রবণতা এই যে, সকলেই হাস্যমুখে বলবে আসলে তো সুদ নেয় না তবে ঘুরায়ে খায়, বক্তব্যটি সরলীকরণ করলে বুঝা যায় যে, তারা এক কথায় বলতে চায় ইসলামের নামে এরা মূলত প্রতারণা করছে। শরীয়ার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত গভীরভাবে না জেনে এরূপ নেতিবাচক মতামত প্রদান করাটা সমীচীন নয়। ইসলামী প্রডাক্টগুলো নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালনা করলে তা সম্পূর্ণ রূপে সুদ মুক্ত কিন্তু যদি কেউ অন্যথা করে তবে তা সঠিক হবে না, এই কার কার করা ভুলের জন্য ইসলামী প্রডাক্টসমূহই সূদমুক্ত নয় ভাবাটা অনুচিত। যে ভুল করছে সে তার অপকর্মের জন্য দায়ী হবে কিন্তু গ্রাহক সম্পূর্ণ রূপে সুদের ঝুঁকি মুক্ত থাকবে, কারণ সে ব্যাংকের সাথে সুদ-মুক্ত চুক্তিতে আবদ্ধ। অনেকে কনভেনশনাল ব্যাংকের সেভিংস একাউন্ট নন-ইন্টারেস্ট বেয়ারিং করে মনে করে সে সুদ-মুক্ত আছে, তিনি কি বুঝতে পারেন না যে, সেভিংস একাউন্ট এর চুক্তিটি নিজেই সুদের চুক্তি? এমনও অনেককে বলতে শুনেছি, সে সুদের টাকা দরিদ্রদের সাদাকা করে বা দান করে দেন, ইনিও মনে করেন এভাবে সে তার টাকাকে পরিশুদ্ধ রাখছেন। উনি হয়ত বুঝতে পারছেন না যে, টাকা রাখার মূল চুক্তিটি কিন্তু সুদের সাথে সম্পর্কযুক্ত আর এভাবে সে সুদের মধ্যেই রয়ে গেল। সুদ কি এবং কিভাবে অর্থনৈতিক লেনদেনে সুদের সৃষ্টি হতে পারে না জেনেই ঘুরায়ে খাওয়া বলাটা অনৈতিক বটে।

এর পর রয়েছ আরেকটি বিশাল বিভ্রান্ত জনমত, অনেকের ধারণা ইসলামী ব্যাংকিং শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্যই, অন্যরা তা হতে সেবা নিতে পারবে না। আমি যখন ২০১৭ সনে মিরপুর প্রিন্সিপাল অফিসে ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে উঠলাম তখন যারা হিন্দু ছিল তারা চলে গেল। এদের বেশ কয়জন আমার পরিচিতও ছিল। এই আর্থ-ব্যবস্থার সাথে ধর্মের নামটা থাকায় এই ব্যবস্থাটিকে অনেকে কেবলমাত্র ঐ ধর্মের লোকদের জন্যই বলে মনে করে। এটি মুসলমানদের ব্যর্থতা যে তারা ইসলামকে সকলের জন্য ও সকলের মঙ্গলের জন্য একটি জীবন ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। মদিনাতে তো সবাই প্রথমেই মুসলিম হয় নাই কিন্তু মুসাব বিন উমায়ের (রাঃ) তো সব ঘরে ঘরে ইসলাম পৌছে দিয়েছিলেন, সেটি কোন ইসলাম ছিল যা আজ ঘরে ঘরে পৌছান যাচ্ছে না? যে সম্প্রদায় নিজেদের ভুল চিহ্নিত করতে পারে না তারা তা সংশোধন করে পূর্বাবস্থায় পৌছাবে কোন পথে আমার জানা নাই। ইসলাম যেমন কেবলমাত্র মুসলমানদের জন্য নয় বরং সমগ্র মানব কল্যাণে, সেরূপ ইসলামী ব্যাংকিংও সকলের সেবা দানের জন্য উন্মুক্ত।

তৃতীয় বিভ্রান্তিটি অনেকটা এরকম যে, ইসলাম শব্দটি শুনলে কিংবা কোন কিছুর সাথে ইসলাম শব্দটি যুক্ত করলে জনমনে  পবিত্র কোরান ও হাদিস হতে বয়ান, তার ব্যাখ্যা ও তার আলোকে বিস্তর আলোচনা প্রত্যাশা করে থাকে, মূলত পবিত্র কোরান ও হাদিস হতে বর্ণিত তথ্য সমূহ জনসাধারণের হাতের কাছেই আছে, প্রচার পত্র সমূহেও বহুবার, বহুভাবে তা বর্ণনা করা হয়েছে। তার পরও সাধারণ জনমত কেন বিভ্রান্তিতে রয়েছে তা বিস্ময়ের অবকাশ রাখে। ইসলামের মূল উদ্দেশ্যর বদলে জনমত মনে হয় এর গন্ধটা বেশী পছন্দ করে । ইংরেজিতে যাকে বলে ফ্লেভার, সুবাস নিয়ে, সুগন্ধ গায়ে মেখেই অনেকে খুশি, মূল বিষয় পর্যন্ত যাওয়ার ইচ্ছাও নাই আর মনে হয় ইদানীং উপায়ও নাই। উপায় নাই কারণ এর প্রচারকরা গন্ধ প্রচার করে উপার্জন করে তাই উদ্দেশ্য প্রচারে তাদের আগ্রহ কম। কয়েকদিন আগে একজন মাদ্রাসার খাদেমের  সাথে পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়েছিল, তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন মাদ্রাসার খরচ এত বেড়েছে যে গত বছর দেড় লাখ টাকা তার নিজের পকেট থেকে দিতে হয়েছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম তার আয়ের উৎস সম্পর্কে, তিনি বললেন, তিনি চান না তবে কোন মাহফিলে বক্তব্য রাখলে তাকে ২০, ৩০ হাজার টাকা অনায়াসেই দিয়ে দেয়। মানে হল তিনি ধর্ম প্রচার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সারা জীবন প্রচুর ইবাদত করেছেন অথচ মুয়ামালাত বা লেনদেনে ভুল ছিল, সে ক্ষেত্রে যে পাহার পরিমাণ ইবাদত কোন কাজে আসবে না তা কিন্তু নামকাওয়াস্তে ধর্ম প্রচারকেরা জনসাধারণকে বলেন না। ইসলাম ধর্মে পুরোহিত প্রথা নাই, শুধুমাত্র ধর্মকে অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ এ ধর্মে  শুরুতে ছিল না, কিন্তু আজ তা প্রচলিত হয়েছে নানা ভাবে। এই তথাকথিত পুরহিত সদ্রস্য সম্প্রদায় সুদের ক্ষতির বিষয়ে জনগণকে কিছুই কি বলার প্রয়োজন মনে করেন না? যা জানা যায় তাদের বলার সুযোগ মসজিদ কমিটি থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শত হলেও এই কমিটিই তাদের নিয়োগ দাতা ও বেতন দাতা। তাদের অসন্তুষ্ট করা সম্ভব নয় বলেই তারাও এ সকল বিষয়ে নীরব থাকেন। সুদ তো শুধু ইসলাম ধর্মে নয়, বরং সকল সেমেটিক ধর্মে নিষিদ্ধ। সুধু সুদ কেন মুয়ামালাত কিংবা ইসলামের রাষ্ট্র ব্যবস্থা বা অর্থনীতির বিষয়ে মসজিদে কমই আলোচনার অনুমোদন দেয়া হয়, যা এ সময়কার মুসলমানদের জন্য একটি দুর্ভাগ্য বটে।

ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা ইসলামী জীবন বিধান প্রবর্তিত সর্বসাধারণের জন্য কল্যাণকর একটি ব্যবস্থা। কোন বিশেষ গোষ্ঠী কিংবা গোত্র বা কোন বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা নয়। কনভেনশনাল ব্যাংকিং সুদকে ব্যবসার প্রণোদনা মনে করে আর ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুদকে অর্থনীতিতে একটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করে, বৃহৎ পার্থক্যটা কেবল এখানেই। পবিত্র কোরান ও হাদিস হতে সূত্র কিংবা ব্যাখ্যা গ্রহণের আগেই এই বোধটি জনমনে নিয়ে আসা প্রয়োজন যে, সুদ অর্থনীতিতে জুলুমের বীজ বপন করে। ইসলামী ব্যাংকাররা সমাজে সুদের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানে এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তা প্রতিহত করণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন। ইসলামী নীতি আদর্শ সম্পর্কে বর্ণনার পূর্বে  সেই নীতির উদ্দেশ্য ও সমাজে তার প্রভাব সম্পর্কে সকলকে সচেতন হতে হবে এবং তার পরই পবিত্র কোরান ও হাদিস হতে তার স্বপক্ষে জানার প্রয়োজনীয়তা জনমনে সঞ্চার হবে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থাটি ধর্ম প্রচারণার একটি বাহন নয়, বরং এটি জনকল্যাণে পরিচালিত একটি সঠিক লেনদেন প্রক্রিয়া, এই মতটি জনমত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

সোনালী ব্যাংকের গ্রাহকের একটি বৃহৎ অংশ ইসলামী মূল্যবোধে শ্রদ্ধাশীল হওয়ায় দেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন মাননীয় সিইও এবং এমডি জনাব এস এ চৌধুরী মহোদয়ের সময়কালে বাংলাদেশ ব্যাংক হতে প্রধান কার্যালয়ের বিআরপিডি (পি-৩) ৭৪৪৫(১)/২০০৯-১১৮০ তাং ১৯-এপ্রিল-২০০৯ পাঁচটি উইন্ডোর অনুমোদন পায়। ২৯-জন-২০১০ তারিখে তৎকালীন মাননীয় সিইও এবং এমডি জনাব হুমায়ন কবির মহোদয় সোনালী ব্যাংক, ফকিরাপুল শাখায় ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। তদ্পরবর্তী মাননীয় সিইও এবং এমডি জনাব প্রদীপ কুমার দত্ত সারের সময়কালে প্রকা/এমডিডি/আইবিডি/ফ-০৭৩/উইন্ডোস্থানান্তর/৪০৭ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (নীতি শাখা-৩) এর ১৫-জানুয়ারি-২০১৫ তারিখের ২০১৪-৯১ সংখ্যক পত্রের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ফকিরাপুল শাখার উইন্ডোটি সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, ওয়েজ আরনার করপোরেট শাখা, ৬২ দিলকুশা, ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় ১৫-মে-২০১৫ তারিখে। সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, মার্কেটিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট ডিভিশন, ইসলামী ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্ট, প্রধান কার্যালয়, ঢাকা’র নিয়ন্ত্রণে ২০১০ হতে ৫টি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো পরিচালিত হয়ে আসছিল। বর্তমানে মাননীয় সিইও এবং এমডি জনাব ওবায়েদুল্লাহ আল মাসুদ সারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের পূর্বের ৫টি উইন্ডোর সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনক্রমে আরো ৬টি এবং আরো ৪৬টি মোট ৫৭টি ইসলামী উইন্ডো পরিচালনার অনুমোদন পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১১টি ইতোমধ্যেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে আর বাকী গুলো অতি দ্রুত গ্রাহক সেবায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন আছে।

ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর চলমান কার্যক্রম, আমানত ও বিনিয়োগ প্রডাক্ট সমূহের পরিচিতি, কোর’আন ও হাদিসের আলোকে ইসলামী ব্যাংকিং এর যথার্থতা সম্পর্কে সম্ভাব্য গ্রাহকদের অবহিত করনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, ওয়েজ আরনার করপোরেট শাখা, ঢাকার ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো ২০১৭ সালে প্রচার পত্র বিতরণ করে। প্রচার পত্র সমূহ বিতরণ করার সময়ে এবং সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, মিরপুর প্রিন্সিপাল অফিস ও সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজ আয়োজীত কর্মশালার লেকচার প্রদান পরবর্তী অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে, ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে  গ্রাহকগনের মত ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা/কর্মচারীদের মধ্যও ইসলামী ব্যাংকিং প্রডাক্ট সমূহ সম্পর্কে অস্পষ্টতা ও অজ্ঞতা প্রসূত মতামত বিদ্যমান। ইসলামী ব্যাংকিং বিষয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা/কর্মচারীদের প্রদত্ত মতামত থেকে বুঝা যায় যে, সোনালী ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানেরই ব্যবসায়ীক লক্ষ্যমাত্রা বা করপোরেট অবজেক্টিভ থাকে, কর্মকর্তা/কর্মচারীরা যদি সেই লক্ষ্যের সাথে সহমত না হন তবে সে প্রতিষ্ঠানে প্রবৃদ্ধি হয় না। ব্যাপক প্রচারণা ছাড়া আজকের বিশ্বে ব্যবসায়ীক প্রসার সম্ভব নয়, ইসলামী প্রডাক্ট সমূহ প্রসারে জোরালো প্রচারণা করা না হলে সামগ্রিক অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়বে। উপরন্তু নিজস্ব লোকজনের মধ্যে এ বিষয়ে স্বচ্ছ জ্ঞানের অভাব থাকলে গ্রাহকদের এ বিষয়ে তারা জোরালো ভাবে কোন তথ্য প্রদানেও বার্থ হবে।

বেশ কয়েক বছর আগে (২০০৪ হতে ২০১০ সাল) সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় ইসলামের মৌলিক ধারণাগুলো নিয়ে  কর্মকর্তা/কর্মচারীদের সাথে ইসলামী বিষয় ভিত্তিক আলাপ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। সেই সময়কার অভিজ্ঞতা থেকে আমার যা মনে হয়েছে তা হল, বিষয়টি সরাসরি মানুষের বর্তমান অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডর সাথে সম্পৃক্ত না হওয়ায় কেবলমাত্র আলাপ করার খাতিরে এ বিষয়ে বিতর্ক গুলোকে বারংবার একই ভাবে উল্লেখ করে কেবল সময় ক্ষেপণ করা হয়। প্রকৃত বিষয়টি সম্পর্কে জানার আগ্রহের বদলে কেবল বিতর্কের খাতিরে বিতর্ক করার প্রবণতা লক্ষ করেছি। বিতর্কের খাতিরে বিতর্ক না করে যদি বাস্তব সম্মত সমাধানের বিষয়ে এই রূপ বলা উচিত ছিল যে, ইসলামী ব্যাংকিং প্রডাক্ট সমূহকে পর্যালোচনা করে তাকে আর কি ভাবে গ্রহনযোগ্য করা যায় সে বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংকের কেন্দ্রীয় শরীয়া কাউন্সিলের মাধ্যমে সকল ইসলামী ব্যাংক ও এনবিএফআই এর কার্যক্রম  তদারকির ব্যবস্থা আরো জোরাল ভাবে গ্রহণ করা হলে সার্বিক ভাবে সবার জন্য ভাল হবে। কনভেনশনাল ব্যাংকিং এর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো না ওপেন করে বরং ইসলামী ব্যাংকিং ব্রাঞ্চ বা শাখা চালু করা হলে এই সেবা প্রদান আর সহজতর ও গতিশীল হবে। সে ক্ষত্রে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ইসলামী ব্যাংকিং এর একটি পূর্ণাঙ্গ ডিভিশন সময়ের দাবী মাত্র। প্রচলিত ব্যাংকিং ধারণা হতে ভিন্ন এই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন নতুন প্রডাক্ট উন্মোচন করার অনেক সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে আর তাই এই সেক্টরে মেধাবী ব্যাংকারদের উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ প্রদান ও নিয়োগ দান অত্যন্ত জরুরী।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় আসা উচিত, তা হলো, পুঁজিবাদী অর্থনীতি জনগণকে সঞ্চয় করতে উৎসাহীত করে আর ইসলামী অর্থনীতি জনগণকে কোন প্রকার সঞ্চয় না করে পূর্ণ বিনিয়োগে নির্দেশনা প্রদান করে। এই বিপরীত ধারণার কারণে প্রচলিত ব্যাংকিং এর পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা করা নিতান্ত সহজ কাজ নয়। এই কাজে যারা সচেষ্ট তারা অত্যন্ত সাহসীকতার সাথে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই কাজে যারা সচেষ্ট তারা অন্তত হাশরের ময়দানে শেষ বিচারের সময় বলতে পারবে যে, তারা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল (সা:) সাথে সুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শামিল ছিল। অনেকের মতে মদের ব্যবসায় এটা আবার নতুন কি? মদ কি শত পরিশোধনে বিশুদ্ধ হয়? অবশ্যই নয়, তবে মদের দোকানের পাশে যদি মদ বিহীন পানিয়ের একটি উইন্ডো খোলা হয় তবে যে মদ খায় না, সে যদি তা হতে ক্রয় করে তবে ক্ষতি কোথায়? মনে পরে একবার অফিস শেষে বাড়ী ফেরার পথে স্টাফ বাসে একজনের জানার আগ্রহে ইসলামী ব্যাংকিং ও কনভেনশনাল ব্যাংকিং এর তুলনা বুঝাতে যেয়ে বলেছিলাম একটি ফরমালিন যুক্ত অন্যটি ফরমালিন মুক্ত। এতদ্ বক্তব্যের পর অন্যদের উদ্দেশ্যে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, আমার মগজ ধোলাই করে ফেলা হয়েছে। আমি উত্তরে বলেছিলাম আপনাদেরও মগজ ধোলাই হওয়া দরকার তাহলে আপনাদের মগজও ফরমালীন মুক্ত হয়ে যাবে। এরূপ প্রচুর প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সোনালী ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডোর কার্যক্রম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অদূর ভবিষ্যতে ইসলামী ব্যাংকিং সোনালী ব্যাংকের উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখবে বলে আশা রাখি।

 
এডিট ও আপডেট হিস্ট্রিঃ ২৯নভেম্বর২০১৭> ২৫সেপ্টেম্বর২০১৮> ০৮অগষ্ট২০১৯>১৪আগষ্ট২০১৯>

Tuesday, August 6, 2019

মানুষের মূল্য নির্ভর করে – সময়কে সে যে ভাবে মূল্যায়ন করে তার উপর (A Man’s value corresponds to the value he assign’s to his time)


মানুষের মূল্য নির্ভর করে – সময়কে সে যে ভাবে মূল্যায়ন করে তার উপর, ইংরেজি থেকে অনুবাদ ১৭ডিসেম্বর২০০৯>০৬আগষ্ট২০১৯> সময় যেন স্রষ্টার হাত, যা তার সাথে সব কিছুকে এক নির্দিষ্ট দিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। কেউ এর কারণ বুঝতে পারে আর একে দেখে স্রষ্টার দেয়া অভিজ্ঞ বুদ্ধিমত্তার আলোকে। এরাই প্রত্যেক দিনের সময়কে আকরে ধরে আর স্রষ্টার দেয়া বুদ্ধিমত্তার সাথে তাদের জীবনকে সরল পথে চালিত করতে সক্ষম হয়। অন্যরা সময়কে দেখে খণ্ডিত বিচ্ছিন্ন অবস্থায়, অনেকটা উত্তল বা অবতল আয়নায় দেখার মত,যেখানে কাছের জিনিসকে দূরে আর দূরের জিনিষকে খুব কাছে মনে হয়। এই ভুল বুঝার কারণ তারা সময়কে স্রষ্টার হাতের সাথে তুলনা করতে পারে না। বুঝতে পারে না যে উদ্দেশ্যে স্রষ্টা আমাদের এই “সময় ও স্থানের” এক বদ্ধ জগতে আবদ্ধ করে দিয়েছেন। যে অভাবনীয় সুযোগ তিনি আমাদের দিয়েছেন নিজেদের পরিশুদ্ধ করে নেয়ার ও প্রতিকুল পরিবেশে সংগ্রামের মাধ্যমে উন্নত গুণাবলী অর্জনের। আর এভাবেই যাতে আমরা তৈরি হয়ে উঠি সেই দিনের জন্য যে দিন আমরা তার সাথে পুনর্মিলিত হব।

আধ্যাত্মিক বাণীতে এমনও বলা হয়ে থাকে যে,“আদমের সন্তানেরা সময়ের মাঝে অভিশপ্ত আর আমিই সময়,আমার হাতেই দিন ও রাত্রির আবর্তন”। যারা এ সত্য এখনও বুঝতে পারেনি, সময় তাদের কাছে ঝামেলা পূর্ণ ও বিরক্তিকর বলে মনে হতে পারে। তাই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত নিজেদের পরিবর্তনের দিকে যাতে সময়ের সাথে আমরা সহজ হয়ে চলতে পারি। সময়কে নিয়ে এই সমস্যা বুঝতে পারা আমাদের জন্য স্রষ্টার আশীর্বাদ। যেমন পেটে ব্যথা হলে আমরা বুঝতে পারি আমাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন দরকার তেমনি সময়ের সমস্যাকে দুর করার জন্য প্রয়োজন আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন। কারো জন্য সময় যেন উড়ে চলে,তাদেরকে অসহায় ভাবে পিঠে নিয়ে যেন তারা পাগলা ঘেরায় চড়ে রওনা হয়েছে কোন পাহাড়ি দুর্গম  পথে। আবার কারো জন্য সময় যেন থেমে আছে নিশ্চল/নিথর হয়ে। সময় আমাদের ইচ্ছামত আমাদের সাথে জোরেও চলবেনা আবার থেমেও থাকবে না।

সবার আগে বুঝা দরকার সময়ের মূল্যটা কত? একবার খরচ করে ফেললে যার পুনরুদ্ধার অসম্ভব। পৃথিবীর সবাই মিলে সব সম্পদ এক করেও সময়ের এক মুহূর্তকে ফিরিয়ে আনতে পারেনা,আর তাই সময়ের মূল্য কল্পনার অতীত। তার পরও মানুষ সময়কে অবহেলা করে ঘন্টার পর ঘণ্টা,আরও সুযোগ খুঁজে অবসর যাপনের। এরূপ অনেক মানুষের পক্ষেই সময়ের সাথে শান্তিপূর্ণ ভাবে যাত্রা করা সম্ভব হয় না (শুধু তারাই নয় যারা ডাক্তারি মতে মানুষিক ভাবে বিষণ্ণ)। প্রত্যেক তরুণ নারী পুরুষ সারা বিশ্বকে দ্রুততার সাথে উপভোগ করতে চায়। তাদের এই আবেগ,উপভোগের দ্রুততাই সময়কে উড়িয়ে নিয়ে চলে। তাই প্রায়ই দেখা যায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত গুলোতে মানুষ তার আবেগ নিয়ন্ত্রণে বার্থ হয় ও আনন্দ উপভোগের উন্মাদনায় সকল শক্তি খরচ করে ফেলে। এই নিয়ন্ত্রনহীন পথে তারা দ্রুত সকল সামর্থ্য হারিয়ে বোকার মত নিঃস্ব হয়ে পরে। জীবন যেন একটি ম্যারাথন দৌর, এ দৌড়ে দম ধরে রাখতে হয়,প্রথমেই দ্রুত দমে চললে খুব অল্প দূরত্বেই তা নিঃশেষ হয়ে যায়। ভবিষ্যতের প্রয়োজনে শক্তি ধরে রাখার মত ধৈর্য খুব কম তরুণের মধ্যেই দেখা যায়।

বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই খুব অল্প সংখ্যক তরুণ আদর্শবাদ বা ধর্মের পথে পা বাড়ায়। তদের অধিকাংশই হয় কোন ব্যর্থতা থেকে উদ্ধার পেতে বা কোন দুঃখ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে এ পথের খোঁজ করে। এটি অত্যন্ত কঠিন কাজ,কেননা সে তার সকল শক্তিই আর্থ হীন ভাবে খরচ করে ফেলেছে। আর তার শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতা অত্যন্ত নিচু স্তরে নেমে গেছে। এদের অনেকেই হয়ত এখনো তরুণ। অতিরিক্ত আনন্দ উপভোগের প্রবল উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে এর বিপরীত অবস্থা অবসাদ ও বিষণ্ণতা ভর করে এ সব তরুণদের মধ্যে। তখন সময় আর উড়ে চলে না বরং সাপের মত একেবেকে ধীর গতিতে তাদের টেনে নিয়ে চলে। একজন বিষন্ন মানুষ আশা করে সময় আবার দ্রুত চলুক কিন্তু তার বদলে মিনিটকে মনে হয় ঘন্টা, ঘন্টাকে মনে হয় দিন আর দিনকে সপ্তাহ। বিশেষ করে যারা তাদের শক্তি ও ক্ষমতা অপব্যবহার করে তারাই এরকম অবস্থার শিকার হয়। মানুষের জন্য এমন ভাবাটা এতটাই বোকার মত যে সময় আবার দ্রুত চলবে যখন আমরা আগেই বলেছি যে সময়ের মুহূর্তগুলো অমূল্য মুক্তা কণার মত।

প্রচলিত আদর্শ নীতিমালার একটি সহজ নীতি এই যে,“মানুষের মূল্য নির্ভর করে – সময়কে সে যেভাবে মূল্যায়ন করে তার উপর”। যদি সময়কে তুমি মূল্যহীন মনে কর যা দ্রুত চলে যাবে তবে তুমি নিজেই এই পৃথিবীতে আর্থহীন হয়ে পরবে, বেচে থাকার চেয়ে মৃত্যুই সে ক্ষেত্রে উত্তম। কেন? কারণ তুমি চেয়েছিলে কেবলমাত্র মানবিক শক্তির আর্থহীন/নিয়ন্ত্রনহীন উপভোগ। মানবিক শক্তি একটি অমূল্য সম্পদ। এখন যখন আরেকটি অমূল্য সম্পদ সময় আর তোমার হাতে নেই বরং তুমি এর নিচে চাপা পরে গেছ। তোমার মানবিক শক্তি এমন ভাবে ব্যবহার কর যেন তা সময়ের সাথে সঠিকভাবে মূল্যায়নযোগ্য হয়। সময়কে যখন মুক্তার মত খরচ করবে মানুষের চোখে তোমার উন্নতি ও উচ্চতর অবস্থায় উত্তরণই কেবল দেখতে পাবে। আরেকটি আদর্শ  ছোট নীতি এরকম ‍”একজন সফল ব্যক্তি তার সময়ের সন্তান” এর মানে হল ব্যক্তিটি তার সময়কে ততটাই গভীরভাবে শ্রদ্ধা করবে যতটা তার বাবা/মাকে করে। একজন প্রকৃত সফল ব্যক্তি কখনই সময়ের মুহূর্তকে অপব্যয় করে না বরং একে এমনভাবে আঁকড়ে ধরে যেমন একজন ঘোড়সাওয়ার তার ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়াটিকে সঠিক পথে চালিত করে।  একজন প্রকৃত সফল ব্যক্তিকে দেখ, দেখবে সে সব সময় কোন না কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত রয়েছে আর কখনই অপরের জন্য ক্ষতিকর বা অযথা কাজে ব্যস্ত নয়। একজন ব্যক্তি যদি এভাবেই নিজেকে চালিত করে তবে সে নিজেকে পরিপূর্ণতার পথেই নিয়ে যাবে কারণ সে জানবে তার কি করণীয়। তার আত্মদৃষ্টি কখনই অন্ধ হবে না। সে অনাহুত যে কোন অবস্থা সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক থাকবে।

আমাদের গ্র্যান্ড শেখ এরূপ বলতেন যে, “হে মানুষেরা কিভাবে তোমরা দিন অতিবাহিত করছ? সময়ের অপচয় করোনা, বরং সময় ও স্থানকে এমনভাবে বুনে চল যেন তা গৌরবময় অতীতে পরিণত হয় ও সম্মান নিয়ে আসে ভবিষ্যৎ ও তার পরবর্তী জীবনের জন্য”। যারা আদর্শ পথের অনুসরণ করে তাদের জন্য সময়ের অপচয় ও অপব্যবহার একটি অপরাধ। নিজের মানবিক শক্তি ও অমূল্য সময়কে নিয়ন্ত্রণ কর, প্রতিটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তোল।

৩০ডিসেম্বর১৮> ২০০২ সালে আমার বিজু মামার কম্পিউটার মেরামত করতে গিয়ে ‘সময়’ নিয়ে লেখকের নামবিহীন ইংরেজি একটি আরটিক্যাল পেয়েছিলাম, তা এতই ভাল লেগেছিল যে, অনুবাদ করে ফেলি, কিন্তু তখনকার বিজয়-সুলেখা ফন্টে অনুবাদ করায় তা আর ইদানীং পড়া যাচ্ছে না, ভাগ্য ভাল যে হার্ড কপি সংগ্রহ করা ছিল, যা থেকে তাকে আবার নির্মাণ করা যাচ্ছে। আমার হিসাবে অনুবাদটি ভালই করেছিলাম, ইংরেজি আরটিক্যালটা এখনো ঐ রকমই আছে। ‘সময়’কে বুঝার ক্ষেত্রে আরটিক্যালটি আমার অনেক কাজে এসেছিল, এখনও যতবারই পড়ি মনে হয় সময় সম্পর্কে ধারণাটির পুনরায় ঝালাই হয়ে গেল। ‘সময়’ নিয়ে আমার আরো বেশ কিছু নতুন ধরনা/ভাবনা আর সংশয় জন্ম নিয়েছে যা নিয়ে পরে এক সময় লিখার ইচ্ছা আছে। যেখানে আমি বলতে চাই যে ঘড়ির সময়ের আপত ধারণাটি সম্পূর্ণ রূপে মনব সভ্যতার নিজের প্রয়োজনে তৈরি করা সূর্য নির্ভর মানব সৃষ্ট একটি ধারণা মাত্র, মূল সময় বা মহাকালের সাথে যার কোন সম্পর্ক  নাই। আমরা সঠিক সময় মাপতে পারিনা আর মহাকাল পরিমাপক কোন যন্ত্র মানব জ্ঞানে সম্ভব নয়। ০৬আগষ্ট১৯> বর্তমান  বাস্তব প্রেক্ষিতে সময়ের মূল্য তাই শূন্য বা মূল্যহীন অথবা তা প্রকৃত বাস্তবতার নামান্তর, আর তাই বাস্তবতার অন্তরনীহিত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বলেছিলাম “বাস্তবতা সর্বদাই সতেজ ও কখনই পেছন ফিরে তাকায় না”। বিগ ব্যাং থেকে যে সময় বা মহাকালের শুরু তা জানতে হলে হকিং এর বই পড়লেই যথেষ্ট, মাল্টি ইউনিভার্স সত্য হলে সময়ের শুরু কখন তা জানা প্রায় অসম্ভব আর আমরা যাকে সময় বলি তা মূলত আমাদের প্রয়োজনে নিজেদের কাজ গুছানর কাজে সৃষ্টি করা সূর্য নির্ভর সর্বজনস্বীকৃত একটি পরিমাপ পদ্ধতি মাত্র। সময় সচেতনতার বিষয়টি তাই ব্যবহারিক সময় নিয়ে বলা মহাকাল নিয়ে নয়। অতীত – বর্তমান – ভবিষ্যৎ নিয়ে সময়ের এই যে প্রবহমানতা তা না দেখা যায় না অনুভব করা যায়, কেবল বুদ্ধি দিয়ে অনুধাবন করা যায়। হকিং এর ব্রিফ হিষ্ট্রি অব টাইম, গ্র্যান্ড ডিজাইন আর থিউরি অফ এভরিথিং বইগুলা পড়লে বুঝা যায় সময়ের এই ধারণাটি কতটা জটিল। তাঁর লেখায় কয়েকটি উক্তি খুব মজার, এক জায়গায় যেমন বলছে, আমাদের অতীত মনে থাকে তাহলে ভবিষ্যৎ কেন মনে থাকবে না? আর বিগ ব্যাং ব্যাখ্যায় কণা বিশ্বের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব ব্যবহার করে সে বলছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মত অনিশ্চিত অতীত রয়েছে। তার এ যুক্তি প্রমাণিত হলে সাইন্স ফিকশনের টাইম ট্রাভেল সম্ভব হবে না, কারণ অলটারনেটিভ ভবিষ্যতের মত অতীতেরও রয়েছে একাধিক ধারা। হুমায়ুন আহমেদও তাঁর একটি উপন্যাসে উল্লেখ করেছিলেন এই প্যারালাল বা সমান্তরাল বিশ্বের সম্ভাবনার কথা। মানব মনে সময় অনুধাবনেরও ভিন্নতা রয়েছে, সময়কে সঠিক মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রেও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মতামত। সময় নিয়ে হয়ত অনেক বিশ্লেষণী মন্তব্য পাওয়া যাবে তবে আমার ধারনা সময়কে আমরা সঠিকভাবে বুঝতে পারি না আর তাই এই সময়ের প্রেক্ষাপটে জীবন ও জগতের ধারণাগুলোও নান ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে দিয়ে স্থাপন করি বলেই তা কখনই সঠিক হয় না।

Sunday, July 7, 2019

আমরা বাঙ্গালীরা বড়ই অনিয়ম প্রিয়

এমনি এমনি বলছি না, আসলে নিয়ম ভাংতে আমারও মাঝে মধ্যে ভালই লাগে। পৃথিবীর অন্য কোথাও মনে হয় না মানুষ এত স্বচ্ছন্দে ও নিশ্চিন্তে রাজপথের মাঝখান দিয়ে হাটতে পারে। পাশে ফুটপাথ খালি থাকা সত্বেও পিচ-ঢালা রাস্তায় গাড়ির তেয়াক্কা না করে একমাত্র বাঙ্গালীরা রাজপথে নিশ্চিন্তে চলাচল করে। একেবারেই স্বতন্ত্র এই জনপদ। কয়েক বছর আগে মিঠু মামা মজার কথা বলেছিল, বাংগালীদের আলু খাওয়া শিখিয়েছে পর্তুগীজরা কিন্তু তারা কখনই আলু ভর্তা করে খায় নাই, আলু ভর্তা করে খাওয়াটা আমরা ওদের শিখিয়েছি। সকল নিয়ম ভেঙ্গেচুরে নিজেদের মত করে নেই কেবল আমরাই, আর যাই হোক আমরা, আমরাই তো। আজ থেকে ১২ কি ১৫ বছর পর হয়ত হাজার চেষ্টা করেও কাউকে রাজপথে ফুটপাথ খালি থাকা স্বত্বেও স্বাধীন ভাবে চলতে দেখা যাবে না, কারণ ততদিনে এই জনপদ অনেক সভ্য হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। হয়ত এখনকার কেউ তখনকার জনতাকে দেখে অবাক হয়ে বলবে, হুদাই বাংগালী কয় নিজেরে, আচার বিচারে বাংগালীগো মত না। বাংগালী মানেই স্বাধীনচেতা, যা খুশি তাই করব – তোর বাপের রাস্তা নাকি, আমার ইচ্ছা হইছে রাস্তার মাদ্দিখান দিয়া হাটমু তর তাতে কি? এই মানুষীকতা।
    শুধু রাজপথে হাটার কথাই নয়, কোন বাংগালী ব্যাংকারকে জিজ্ঞাসা করুন বলবে, ভাই নিয়ম কানুন অনেক আছে কিন্তু প্র্যাকটিস ভিন্ন, মানে হল, নিয়ম থাকবে বইয়ে কিন্তু আমরা হাটব রাস্তার মদ্ধিখান দিয়ে । নিয়ম ঠিক করা হলে আমরা নতুন প্র্যাকটিস বানায়ে নিব। ঋণ নিব কিন্তু ভুয়া কাগজপত্র দিব, আরে ভাই ব্যবস্থা করেন, টাকা পয়সা/ চা-পানি যা লাগে নিয়েন। এই যে মনভঙ্গি এর আদি কারণটা কি হতে পারে? নিয়মই যদি না মানি তবে নিয়মের কথা বলব কেন? এই তো সেদিন ফেইসবুকে আমার প্রোফাইল ব্যাংকার দেখে কয়েকজন তরুণ বড় আশা করে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল এই উদ্দেশ্য নিয়ে যদি কোন ভাবে ভুয়া ঋণ নেয়া যায়। তাদের নিরাশ করতে হয়েছে, সঠিক রাস্তা দেখায়েও দিয়েছি, কি কি করতে হবে তাও বলে দিয়েছি। ব্যবসা করা এত সহজ না, অনেক ঝুঁকি আর বাস্তব প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে ব্যবসা করতে হয়, হয়ত তারা তা এতদিনে বুঝে গেছে। সহজ সর্তে ঋণ নয়, মানুষ চায় সর্ট-কাট রাস্তায়, পন্থায় ঋণ। সেই মজ্জাগত আইন ভাঙ্গার প্রবণতা এখানেও আছে।
    গত বছর ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফর্ম সঠিক ভাবে পূরণ করে জমা দিতে গেলাম বাড্ডা থানায়, এক গুচ্ছ ফরম জমা যে নিলো সে কেবল প্রথম ফটোকপিতে প্রাপ্তিস্বীকার সই করল, বাকিগুলোতে দিতে বললাম, বলল লাগবে না। এর পর দেখলাম সে ওই ফরমগুলো আরেকজনকে দিল, সে আমার সামনেই ‍উনাকে বলল, আরে রাখেন তো এই সব, বলে ঢিল দিয়ে কাগজগুলো একপাশে রাখল যেন ট্রাস ক্যানটা খুঁজে পেলে তাতে ফেলে দিত। সেই সনাতন মজ্জাগত নিয়ম ভাঙ্গার প্রবণতা – আরে রাখেন তো ভাই এইসব। এই বছর শুনলাম থানার দারগা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে আর কেয়ার টেকারদের ধমকাচ্ছে, ডিএমপি ফরম দেওয়ার জন্য। আগে হোক আর পরে হোক সবাইকেই নিয়মের আওতায় আসতেই হবে।, সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থেই পুলিশ ডেটাবেজে ভাল মন্দ সবার খবর থাকতে হবে এবং তা তাদের দেয়া ফরমেট অনুযায়ীই হতে হবে আর এই কাজটা সঠিক তথ্য সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব উভয় পক্ষের। এই সাধারণ জ্ঞানটি সবার মনে একই রকম গুরুত্ব পেতে সময় লাগছে বটে, --এই যা।
    বড় রাস্তার মোড়ে সুলতান ভাই এর দোকানে চুরি হয়ে গেছে গত শনিবার। চোর তালা ভেঙ্গে ৬০ হাজার টাকা মূল্যের মজুত মালামাল নিয়ে গেছে, সুলতান ভাই বলল, কি হবে পুলিশকে জানায়ে, ওরা এসে আস পাসের এপার্টমেন্টের দারোয়ানদের অযথা হয়রানী করবে, কাজের কাজ কিচ্ছু হবে না, মাঝখান থেকে আমার কিছু টাকা যাবে আর সময় নষ্ট হবে। এই হল সাধারণ জনমত বা মানসিকতা, আমি বললাম জানায়ে রাখেন ভাই, ওরা জানুক এই রাস্তায় চুরি বেড়ে গেছে, ওরা সেই মত ওদের টহল বাড়াবে বা বিশেষ ব্যবস্থা নিবে। আপনি কিছুই জানাবেন না আর ওদের কাছ থেকে বাড়তি নিরাপত্তা আশা করবেন তা কি হয়? বিগত ৩০ বছর যাবত আমি এই এলাকায় আছি, নিয়মিত পুলিশ টহল তো হচ্ছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে, তার পরও কেন জনমনে ধারণা বদল হচ্ছে না? নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা’র দায়িত্বতো কেবল পুলিশের একার না, এটা তো সকল পক্ষেরই, সাধারণ দায়িত্ব।
    অর্থনৈতিক লেনদেন যাতে সমাজে বিশৃঙ্খলা করতে না পারে তার জন্য ব্যাংক ব্যবস্থাই যথাযথ, অথচ দেখুন বিকাশের মত জনপ্রিয় মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা যত্রতত্র যে কেউ একটা টেবিল পেতে শুরু করে দিল। এখানে প্রচুর বিশৃঙ্খলা হচ্ছে ঠিকই, একজনের টাকা অন্য জনের কাছে চলে যাচ্ছে, আবার অপারেটর ফোন নম্বর লেখার সময়  তার বন্ধু পিছন থেকে খোঁচা দিয়ে মজা পাচ্ছে, এই সব ছোট খাট বিশৃঙ্খলার ব্যাপারে এই জনপদ উদাসীন। বরঞ্চ লেনদেনের মাত্রা বৃদ্ধি করা হয়েছে আর ব্যবস্থাটি আরো জনপ্রিয় হয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক লেনদেনে টেলর ব্যবস্থার নিরাপত্তায় একটি স্বাভাবিক সর্বজনস্বীকৃত অবকাঠামো আছে, এমনকি এটিএম মেশিনের ক্ষত্রেও সেই সব নীতিমালা অনুসরন করা হয়, অথচ মোবাইল ব্যাংকিং আউটলেট গুলোর ব্যাপারে ও-সব বিবেচনায় আনা হয় নাই, কারণ? বাংগালিদের দিয়ে সবই সম্ভব। নিয়ম কানুন ওদের ওপর কাজ করে না। ওরা স্বতন্ত্র ও অভিনব।
নিয়ম ভাঙ্গার গান আরো আছে, যেমন ধরুন ঢাকার রাস্তায় সর্বত্র বাস স্ট্যান্ড, যখন যেখানে খুশি বাস থেকে নামতে বা উঠতে পারবেন, এই রকম সুযোগ পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নাই। অবশ্য বাসগুলো ইদানীং রাস্তার যানজটে বেশিরভাগ সময় দাড়ায়ে থাকে তাই কারো উঠতে বা নামতে কোন অসুবিধা হয় না। অনেক সময় স্টাফ বাস কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বাস অবস্থা বুঝে পাবলিক বাসে রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর সকাল বিকাল রাস্তায় যে ময়লার গন্ধ নাকে আসে, তার কারণ সিটি কর্পোরেশনের ওয়েস্ট কন্ট্রোল এর কিছু ৫ টনি ট্রাক ত্রিপলে ঢেকে অসময়ে ময়লা স্থানান্তর করে, ওই ট্রাকগুলো ময়লা ঢাকতে পারলেও ময়লার পানি আটকাতে পারে না আর এই পচা-গন্ধযুক্ত পানি দিয়ে রাস্তা ধৌত করতে করতে চলে। এতে করে এক কাজে দুই কাজ হয়ে যায় কিন্তু পচা গন্ধটা সারা দিনই থাকে। ভিআইপি আর বড় লোকেরা কাঁচবদ্ধ এসি গাড়ীতে চলাচল করে বলে তাঁরা এই গন্ধ পয় না।
মটরসাইকেল যে ভাড়ায় চলতে পারে তা এ জনপদের একক অভিনব আবিষ্কার, এ্যাপ ব্যবহার করে ভাড়া গাড়ীর জন্য এই ব্যবস্থা উবার প্রথম নিয়ে আসে বিশ্বের কয়েকটি উন্নত শহরে কিন্তু তাদের মথায়ও আসে নাই এই রকম ব্যবস্থা মটরসাইকেলের ক্ষেত্রও চলতে পারে। এ দেশের প্রতিষ্ঠান পাঠাও সেই কৃতিত্বের অধিকারী, অবশ্য এখন তাদেরকেও বুড়া আঙ্গুল দেখিয়ে এই জনপদ এ্যাপ ছাড়াই রিক্সা ভাড়া নেয়ার মত যত্র তত্র পাঠাও-বাইক স্ট্যান্ড বানায়ে ভাড়ায় যাচ্ছে। এতে করে সাধারণ মোটরবাইক চালক (যারা পাঠাও রাইড নেয় না) সবাই বিপদে পড়ে গেছে, সবাই তাদের পাঠাও ভাবে আর ভাড়ার দরদাম করতে চায়। এদের একজনের আক্ষেপের উত্তরে বলেছিলাম আপনারা হলুদ ষ্টিকার সম্বলিত হেলমেটের প্রচলনের প্রস্তাব করুন। যারা ভাড়া যাবে তাদের হলুদ হেলমেটে লেখা থাকবে রেন্ট-এ-রাইড, এতে করে যারা পাঠাও নয় তারা অযথা হয়রানী থেকে বেচে যাবে। আর যারা এ্যাপ ছাড়া মোটরবাইক ভাড়া নিতে চায় তারা শুধু রেন্ট-এ-রাইড হলুদ হেলমেটদের সাথে দরদাম করবে। তারা সরকারীভাবে নথিভুক্ত ও রোড পারমিট প্রাপ্তও হতে পারে যাতে জনস্বার্থ  সংরক্ষিত হয়। অবশ্য এদেশে এসব নীতিমালা ছাড়াই সব চলে, এ সব নীতি ফিতি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
    যারা সমাজ নিয়ে গবেষণা, চিন্তা-ভাবনা করেন তাঁরা হয়তবা আমার সাথে একমত হবেন যে, সকল পুঁজিবাদী সমাজের জনগোষ্ঠি তাদের বয়স অনুযায়ী প্রায় একই রকম বা কাছা কাছি আচরণ করে থাকে। যেমন উন্নয়নশীল অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয়াদী ও মৈৗলিক চাহিদা সম্পৃক্ত ব্যবসার প্রচুর প্রসার হয়, যা এ দেশেও দেখা যাচ্ছে, খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবসার অবস্থা রমরমা। দুঃখজনক যে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ব্যবসার সুযোগ মনে করে আথচ এগুলো মানুষের মৈৗলিক চাহিদা তাই দিনের আলো, বাতাস, নদীর পানির মত এগুলো ব্যবসার বাইরের জিনিস হওয়াই উচিত ছিল। যা হোক, ধন-সম্পদ, গাড়ী, বাড়ী ও বিলাস-ব্যসনের প্রতি এই জনগোষ্ঠির খাই খাই ভাবটা কেটে গেলেই এই বাংগালীরাই নিয়ম নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হব হলে আশা রাখি। নিজে নিয়ম মত চলবে আর অন্যকেও চলতে বলবে।

Sunday, April 21, 2019

Regarding Human alike robots and Cloning?


17apr19> It seems like this evolving human race has reached a critical level and now by its own innovative approach it is trapped and trying to destroy itself. Time has come to a stage when we are expecting human alike robots. Japanese robotics has already gave some prototypes and BBC click is enough to show you all practical evidences. The VR (virtual reality) and Ai (Artificial intelligence) and the robotics are now inevitable in picturing emerging reality. Using VR simulation and Ai are necessary technology advancements to solve many real life problems. The artificial robot hands are doing plenty of works in unbelievable quick and in bulk mode. Machine-humans will not fall into sickness, the productivity will increase and they will contribute more then we do to the corporate world. But if anyone think that robots will solve all problems of the world and we human are to put out of order in this fast rolling over world, shouldn’t I disagree? If so then how? My point of bringing up this issue is not putting question on VR or Ai, nor it is on their practical applications, and or about Robot hands or Robotic automations, they are doing real good. My concern is more to the discussion on cloning vis a vis human alike robots.
Few days back the idea of robots were like steel bodied boxed faced machine type mechanical structure which has Ai and which listens to the human commands only. But today this picture has been changed, we are seeing inventors are trying to make robots more alike human beings. These new models are having silicon based skin more alike human body and their expressions in face and in body movement viz, the why they walk, talk all are made in a way that it shall look exactly like human beings. My point of concern is just here.
May we remember what were the issues concerning against human cloning? Wasn’t it like, If we see another alike me in front of me standing, why should I feel afraid or abnormal? Or in which point the issue of denial comes in human cloning? Is it the identity question that we may face, or is it some thing not natural that we might get into and therefore shall deny the situation? As per my thinking, cloning hadn’t been so easy or successful and its research created a kind of fear among some powerful people that maybe the reason on why it has been stopped. More or less it hurt’s the human pride of being the self. “I made this, I was this and that, I did this and that which no other could have done before”, these are the pride and if we look broadly this is the tendency among people to claim that he or she is unique and no other can be alike him or her, now if this happens that somehow similar to his body another looks and does alike things then how to comprehend or compare it to own self? or measure it’s value against us, I think these are the main issues on rejection of its reality ?
Well now lets stop thinking on cloning of human alike bodies, and focus on robotics? If I find a robot just alike me and not clone of me then what is the difference? Well it is not human and it do not have a human soul or free will claiming to be me, it has to obey me as it has been created by Ai, so I am having here my another body directed by me, then what is the problematic issue here?, rather it is a kind of extended another me, it shall help me in increasing my working ability, Now if we put this two variables into the burning Question’s equation, I think we can solve it now. The same me if made by cloning is not acceptable by my intellect but if it is done by a completely look alike robot then I have no problem, isn’t it the scenario? If so then it clearly reflects that we deny cloning of self as it might put own self into conflict but if we can extend its ability by clon robots then our intellect or soul shows no problem. It therefore is very clear that it is our pride “of Me or I did it, made it and is unique” related paradox.
Long ago, not so long ago a young boy asked the panel in a conference that okay agreed let cloning be forbidden as per religious view points, then, what about cloning of human body parts. We see sometime we are in need of a broken arm or a malfunction heart, to fix with a new one, if cloning can give us a new flesh body arm or heart then what is the problem, rather this should be appreciated. My question is if another human is possible by cloning and it become a new way of giving birth in human race then exactly where does the full stop mechanism occur. Why we to put a full stop here? Prior birth control technology there were a random new born scenario, after the technology wide spread now we have a new situation and human race is dealing with it normally. If there be an alternative new way to give birth where does the problem stands? Another critical question may I wish to raise?, why people wish to make human alike robots, why not they think of making supreme alike robots? Well in cartoons and cinemas they have brought in the thought already but it is the inherent desire of human that they seek to make human alike robots perhaps to feel being creator of their same image, they wish to create human as like they believe their creator created them in his image, or for those who don’t believe in God, it is their wish to become the ultimate supreme God, the unmoved mover but even then they wish to make their creatures in their images? By this are they are willing to add a meaning to the existing universe? Or don’t they have the ability to think beyond human. 
 

Looking from a broader angle we see, this human race couldn’t solve the big question on God, created many explanations, theories, myths and religions and then divided their concepts and made it more and more complex day by day. Whether God is alone or many hasn’t yet or ever been solved unanimously, Some even denied the concept of creator and believed in evolution of the Nature. They couldn’t solve the core question of creation rather they are now willing to play God. zenno’s famous paradox which says, there can’t be two or many but one alone as many will eventually derivate into many more and will continue to dissolve into eternity as like the mirror inside mirror tends to infinity affect. So the concept of one can’t be living with the concept of many, they may become contradictory. If there is one alone and He created two or many, then is he among many or stand alone one? If He is the one then is the creation derivative of him? Well we better not loose our focus point discussion.
If we shift the focus to a different angle, say for example a state leader willing to manufacture his entire army based on cloning or by human alike robots based on the best performance human solders he had of all times then what is the obstacle here on doing so? Or say for in the case of male or female partner choosing among general people, if anyone wish to have a clone or human alike robot friend of his or her choice then where is the problem? Moreover it maybe adjustable to any new upgrade or modification and can have multiple face or body change facility including attitude control by Ai interfacing.
What will then be the reality? aren’t we talking about Man made reality? The dramatic changes in reality has been evident during past few decades. Just think about the telephone facility shifts, think about the traveling systems and yes these changes created great impact in our daily living and for sure the emerging trends are vigorously trying to change our next era life styles. This shifts in life style surely demands a change in our background philosophy but human tendencies is that they won’t change their philosophy only because they have fallen in love with it. No matter it contradicts the reality, they will stick to the plan and the grad design. Any threat to their belief system they will protect as if that belief is saving them from being demolished.
21apr19> I am  not concluding this article with a complete judgment as I  myself is yet unclear what new technologies may bring up next. And I have no intention to impose my thoughts on others or say against any belief system. Here I have raised some queries regarding the subject matter which went through my mind with an objective to seek other’s opinion on the same.