বিগত আগস্ট, ২০২৫ তারিখে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে ইসলামী ব্যাংকিং অডিট এর উপর যে ক্লাসটি নিলাম, তার জন্য পরিশ্রম করতে হয়েছে, সচরাচর যে ক্লাস গুলো নিতাম তা ছিল ডিপোজিট মবিলাইজেশন আর মোডস অব ইনভেস্টমেন্ট এর উপর আর বিগত কয়েক বছর কেবল সিকিউরিটিজ অন ইনভেস্টমেন্ট ও লেন ডকুমেন্টেশনের উপর ক্লাস নিতে নিতে গতানুগতিক হয়ে গিয়েছিলাম। এই বিষয়গুলো আমার কর্মক্ষেত্রে অহরহ করছি তাই তেমন সমস্যা হয়নি ক্লাস নিতে। যখন স্টাফ কলেজ থেকে ফোনে জানতে চাওয়া হলো ইসলামী ব্যাংকিং অডিটের উপর ক্লাস নিতে পারবো কি না, তখন বলেছিলাম একটু প্রিপারেশন নিলেই হয়তো পারবো। সময় কতটা হাতে আছে জানতে চাওয়াতে জানান হলো আনুমানিক তিন দিনের মত। আমি পুর কোর্সের শিরোনাম কি তা জানতে চাইনি যার ফলে পুর কোর্সটি সম্পর্কে ধারনা পাচ্ছিলাম না, তার উপর ক্লাস নেয়ার জন্য আমার আমন্ত্রণ পত্রটি আসে মাত্র একদিন আগে। তার আগ পর্যন্ত আমি অনিশ্চিত ছিলাম পুর কোর্স ও তাতে আমার ক্লাসটির বিষয়বস্তুর পরিধি সম্পর্কে। অফিসের ব্যস্ততা আর ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মধ্যে মারাত্মক রকম সময় সংক্ষেপণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। অডিট মানে তো মারাত্মক রকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার উপর শরীয়াহ্ অডিট, তাই আমি বিষয়টিকে অনেক গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলাম। যখন আমন্ত্রণ পত্র পেলাম তখন দেখলাম ৫০ জনের ক্লাস নিতে হবে যার মধ্যে অনেক আইওবি (IOB or Inspectors of Branches) থাকবেন। তখন বুঝলাম আমাকে উচ্চতর পর্যায়ের অডিট প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে বলতে হবে। বিগত রাতে নতুন ব্যাংকারদের জন্য আমি যে স্ট্রাকচারে লেকচার দিবো ঠিক করেছিলাম তা পুর ঢেলে সাজাতে হবে, কারণ আমার মনে হয়েছিল যারা থাকবেন ক্লাসে তারা এ বিষয়ে নবীন ব্যাংকার বা ইয়াং ব্যাংকার কিন্তু যখন আইওবি থাকবেন জানলাম তখন বুঝলাম প্রবীণরাও থাকবেন তাই সেই উচ্চ স্তরে আমার বক্তব্যটি উপস্থাপন করতে হবে অথচ হাতে সময় আছে মাত্র এক অফিস সন্ধ্যা আর ঘরে রাতের খাবার শেষে রাতে যতটুকু পারি।
রাত জেগে গত রাতের পুর লেকচার কাঠামোটি পুনর্গঠন করে একদম সুনির্দিষ্ট ভাবে শুধু মাত্র ইসলামী ব্যাংকিং অডিট বিষয়েই কেন্দ্রীভূত করে ফেললাম। কাজটা সম্পন্ন করতে পেরে আমি তৃপ্ত কিন্তু অনেক মানবিক শক্তি খরচ হয়ে গেছে, তার উপর তৈরিকৃত ফাইলটি আমি ক্লাসে পাবো কি করে তা জানি না তখনও, কারণ কোর্স কোয়ার্ডিনেটর আমার সাথে কোন যোগাযোগ করেন নি। পরে পেন ড্রাইভে করে নিলাম আর কর্পোরেট মেইলে আমার একাউন্টে আপলোড করে রাখলাম। সব ব্যবস্থা করে যথা সময়ে পৌঁছে ক্লাস নিয়ে বাসায় ফিরে তিন থেকে চার ঘণ্টার ম্যারাথন ঘুম। ক্লাসটা নিয়েছিও আমার মনের মত করে, তবে হতাশা দুই জায়গায়, জাঁদরেল কোন অডিটর ছিল না ক্লাসে, আর তিন বছর আগে ক্লাসে শরীয়াহ্ কি জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, কোন উত্তর পাই নাই, সেদিনও পেলাম না, আশা ছিল ক্লাস থেকে উত্তর কিছু পেলে তার সাথে আমার অর্জিত জ্ঞান কিছুটা যোগ হবে, তা না হয়ে দেখলাম তিন বছর আগের শূন্যতা তখনও কাটেনি। যারা শরীয়াহ্ কাহাকে বলে জানেই না তারা কি করে কোন ব্যাংকের শরীয়াহ্ অডিট করবে তা বোধগম্য হলো না। হয়তো ভবিষ্যতে কোন এক দিন এই অপূর্ণতা আর থাকবে না তখনকার জন্য আমাদের এখনকার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
ফটো ক্রেডিটঃ জনাব শাজাহান আলী, আগস্ট, ২০২৫
শরীয়াহ্ নিয়ন্ত্রক অবকাঠামোঃ-
(Shari’ah Governance Framework)
শরীয়া সুপfরভাইজারী বোর্ড (SSB) সকল অর্থিক প্রতিষ্ঠানে সেই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাংকিং সেবা কতটা শরীয়াহ সম্মত হলো তার উপর নজর রাখে, শরীয়া কম্প্লায়েন্স অর্থাৎ প্রদত্ত সেবাটি শরীয়ার নীতি মেনে পরিপালন করা হয় কিনা কিংবা কোন নীতি মালার সাথে সংঘর্ষিক কিনা তা যাচাই করে দেখে। আভ্যন্তরীণ অডিট কোন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরীক্ষা পদ্ধতি আর বহিঃনিরীক্ষা যা প্রতিষ্ঠানটি থেকে স্বাধীন ও সামগ্রিক বিচারে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকিং সেবা সমূহের শরীয়া ভিত্তি যাচাই করে বা নিরীক্ষা করে।
শরীয়াহ্ অডিটরদের মুরাকীব বলা হয়ঃ-
মুরাকীব গণ মুয়ামালাত বা সমাজের পারষ্পরিক আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত ইসলামের নীতিমালায় বিশেষজ্ঞ থাকেন। মুরাকীব অত্যন্ত সম্মানিত ও ব্যাংকিং সমাজে সমাদৃত একটি পদবী। প্রাতিষ্ঠানিক নিরীক্ষায় মুরাকীবগণ একজন সাধারণ অডিটর যে ভূমিকা রাখেন তার চাইতে কিছু বেশি রাখেন যেহেতু তাঁরা শরীয়াহ্ বিষয়েও ওয়াকিবহাল। যারা অডিট সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানেন তারা জানেন যে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধানকেও অডিটের আওতায় আনা যায়। মোদ্দা কথা কোন প্রতিষ্ঠান যে নীতিমালার মাধ্যমে পরিচালনায় প্রতিশ্রুতি বদ্ধ তা যথাযথ ভাবে বাস্তবে প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা তা যাচাই বাছাই করে দেখাই নিরীক্ষক বা অডিটরদের কাজ। তা হলে সম্মানিত মুরাকীবগণ এর দায়িত্বর মূল বিষয়টি দাড়ায় যে, প্রতিষ্ঠানটি যে নীতিমালার ভিত্তিতে তার ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিশ্রুতি বদ্ধ সেই নীতিমালায় শরীয়াহ্ লঙ্ঘন করে এমন কোন উপাদান আছে কি না কিংবা উক্ত নীতিমালার আলোকে পরিচালিত ব্যাংকিং সেবা সমূহ যথাযথভাবে পরিপালিত হচ্ছে কিনা। কিংবা থিওরি ইনটু প্রাকটিসে বা বাস্তব প্রয়োগে শরীয়াহ্ এর কোন নীতির সাথে সংঘর্ষিক বা লঙ্ঘন হচ্ছে কি না। যদি হয়ে থাকে তকে শরীয়াহ্ কম্প্লায়েন্স রিস্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সম্মানিত মুরাকীব গণের দায়িত্ব হলো এই শরীয়াহ্ কম্প্লায়েন্স রিস্ক, বাংলায় যাকে বলা যেতে পারে শরীয়াহ পরিপালন ঝুঁকি সমূহ যাচাই বাছাই করে দেখা।
শরীয়াহ্ নন-কম্প্লায়েন্স রিস্ক সম্পর্কেঃ-
Shari’ah non Compliance Risk
বিআরপিডি সার্কুলার নং ৩ তাং ৮-৩-২০১৬ মোতাবেক ৩৬টি শরীয়াহ নন কম্প্লায়েন্স রিস্ক চিহ্নিত করা হয়েছে যাকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করে পুন ৬টি উপ-শ্রেণীতে ঝুঁকি সমূহকে শ্রেনীকৃত করা হয়েছে। এই ৩৬টি ঝুঁকি একটি ১০০ মার্কের চেকলিস্ট আকারে মুরাকীবগন যাচাই করে তার ভিত্তিতে তাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রদান করেন।
দুটি মেজর ভায়োলেশনঃ-২) পুরাতন বিনিয়োগ/ঋণ নিয়েছেন কোন গ্রাহক, সেই বিনিয়োগ/ঋণ পুরোপুরি পরিশোধের পূর্বেই তাকে পুন বর্ধিত লিমিটে পূর্বের বিনিয়োগ/ঋণ সমন্বয় করে নতুন বিনিয়োগের অর্থ প্রদান। এই প্র্যাকটিসটিও অহরহ হচ্ছে আমাদের দেশে যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
মুরাকীবগণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এই প্রথম দুটি মৌলিক ঝুঁকি হচ্ছে কি না তা নিরীক্ষা করেন।







No comments:
Post a Comment