
২৬ আগস্ট ২০২৫ এর বণিক বার্তায় প্রকাশিত ইমামুল হাসান আদনানের প্রদত্ত রিপোর্ট ” জিডিপি প্রবৃদ্ধি আছে, অর্থনীতির আকারও বেড়েছে তবে ব্যাংকে লেনদেন বাড়েনি” অনুসারে সরকারি হিসাবে গত অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ, মানে প্রায় ৪ শতাংশ। পূর্বের তুলনায় অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে । দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহও বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, অর্থনীতির এতসব ইতিবাচক ধারার মধ্যেও দেশের ব্যাংক খাতে অর্থের লেনদেন কমে গেছে যা স্বভাবতই বিশ্বয়ের উদ্রেক করে। তার এই বক্তব্য একটা সংকেতই দেয় যা হলো এটা একটি অস্বাভাবিক অবস্থা, ঠিক যেমনটি আমিও বিগত অর্থ বছরের পর্যালোচনায় আমার তথ্য উপাত্ত বিচারে মন্তব্য করেছিলাম। তার মানে হলো ব্যাংক ব্যবস্থায় কিছু অস্বাভাবিক কার্যকলাপ সবার চোখের অন্তরালে গত বছরের মত এ বছরও চালু আছে যারই ফল স্বরূপ প্রকাশ্য বাস্তবতায় এই প্রকার অস্বাভাবিকতার চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে উনি আরো বলেছেন “অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, সময় ও অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সংগতি রেখে ব্যাংকে অর্থ লেনদেনের পরিমাণ বাড়ার কথা। কিন্তু আনুষ্ঠানিক চ্যানেল তথা ব্যাংকে লেনদেন না বেড়ে উল্টো কমে যাওয়া অর্থনীতির নিয়মের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।” এ প্রসঙ্গে আমার প্রাক্তন সহকর্মীর সাথে আলোচনায় তিনি বললেন অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে, মাথা পিছু আয় বেড়েছে, রেমিট্যান্স বেড়েছে অথচ ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন কমার অর্থ হলো ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে দিয়ে লেনদেন হয়েছে বা হচ্ছে। যে সব অর্থ পাচার হয়ে গিয়েছিল কিংবা যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংকের বাইরে আছে তা থেকে লেনদেন হয়েছে। ব্যাংক খাতের উপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়ায় অনেকেই হয়তো বাসার সিন্দুকে (প্রাইভেট ভোল্ট) ক্যাশ জমা করেছেন আর তা থেকে লেনদেন করেছেন। ইদানীং অত্যাধুনিক সিন্দুক (ভল্ট) বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। বড় বড় ব্যবসায়ীরা হয়তো সেরকম অত্যাধুনিক সিন্দুক কিংবা ভল্টে টাকা জমিয়েছেন ও তা থেকে ক্যাশ লেনদেন করেছেন। ইমামুল হাসান আদনানের প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করেছেন,
“অর্থনৈতিক স্থবিরতার প্রভাবে ব্যাংক খাতে লেনদেন কমে গিয়েছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে অনেক আগে থেকেই দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ দিশেহারা। এ শ্রেণীর মানুষের হাতে সঞ্চয় বলতে কিছু অবশিষ্ট নেই। দেশে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। নতুন করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। এ কারণে ব্যাংকে সাধারণ মানুষের লেনদেন কমে যাবে এটিই স্বাভাবিক। ফাহমিদা খাতুন আরো বলেন, ‘দুর্বল কিছু ব্যাংকে লেনদেন করা যাচ্ছে না। ২০ হাজার টাকা তুলতে গিয়ে মানুষ ৫ হাজার টাকা নিয়ে ফিরছেন। ব্যাংকে টাকা না পেয়ে অনেককে ফিরতে হচ্ছে শূন্য হাতেও। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের ওপর আস্থার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে অনানুষ্ঠানিক লেনদেন বেড়ে যায়”
ব্যাংকের বাইরে দিয়ে লেনদেনকেই অনানুষ্ঠানিক লেনদেন বলা হচ্ছে। আমাদের দেশে সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব অনেক আগে থেকেই আছে। লোকজন সত্য বলতে লজ্জা কিংবা ভয় পায় যেন, পেছন দিয়ে হাতি ঘোড়া চুড়ি করার বাসনায় সামনে স্তুতি-স্তাবকতার অভাব রাখে না। ঋণ নিয়ে অর্থ লোপাটের গোপন ইচ্ছা বা উদ্দেশ্যে জাঁদরেল হিসাব রক্ষক নিয়োগ দেয় যে চতুরতার সাথে অংক কোষে এমন প্রতিবেদন তৈরি করে যাতে ওভার ইনভয়েসিং কিংবা আন্ডার ইনভয়েসিং এরকম যত কারচুপি কৌশল কোন কিছুই যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের চোখে ধরা না পরে। শুদ্ধাচারের অভাব তাই এ দেশে খুব স্বাভাবিক, ওই যে বলে না অভাবে স্বভাব নষ্ট, এখানে অতি উচ্চাভিলাষের বাসনায় স্বভাব নষ্ট। তাই সহজেই শুদ্ধাচারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান হয়। যারা শুদ্ধাচারের কথা বলে তাদের জাঁদরেল ব্যবসায়ীরা সাধু-সন্ন্যাসী বলে গালি দেয়। তারা বলে “তুই বেটা কোন মাজারে গিয়ে গাজা খেয়ে গলাবাজি কর গিয়ে, আমাদেরকে কাজে বাধা দিস না”। যতদিন কাল টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হবে বাজেটে, ততদিন এই উইন্ডো ড্রেসিং এর প্রবণতা কমবে না। একদিকে বামেলকো, কেমেলকো বানাবেন মানি লন্ডারিং প্রতিরোধের নাটক সাজাবেন, আরেকদিকে কাল টাকাকে সাদা বানাতে প্রশ্রয় দিবেন তা হলে শিয়ালের মোরগ চুড়ি বন্ধ হবার নয়। ব্যাংক খাতে অস্বাভাবিক লেনদেনের পরিস্থিতি তাই এদেশে এবছরও অস্বাভাবিক ঘটনা।

বিগত জুলাই বিপ্লবের পর থলের বিড়াল সব বেড় হচ্ছে আর বুঝা যাচ্ছে যে, স্বনামধন্য বড় ব্যবসায়ী গ্রুপটি যে কয়টি ব্যাংকে ভিতর থেকে খেয়ে ফেলেছে তার প্রকান্ড প্রভাবে দেশের ব্যাংক খাতে একটা বিপর্যয় চলমান আছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহকগণ অল্প পরিমাণ টাকা চাহিদা মাত্র তো পাচ্ছেই না, বড় অংকের টাকা চাইলে তা পাওয়ার আশা দুরাশা। এমতাবস্থায় দেশের গ্রাহকগণ ব্যাংকিং বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও একটা ক্রান্তি লগ্ন চলমান আছে যা ২০২৬ সালের আগে সমাধা হবে না বলে মনে হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে একটা পোক্ত কো-রিলেশন বা আন্ত সংযোগ আছে। দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক একটি স্থবিরতা বা ইংরেজিতে যাকে বলে পজ সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হঠাত থমকে আছে যেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মহোদয় ও তত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা মহোদয় বিচক্ষণতার সাথে ব্যাংকিং সেক্টরে যাতে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় তার সর্বত ব্যবস্থা করছেন ও দক্ষতার সাথে তা সামাল দিচ্ছেন।
এবার ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর নিচের তথ্য চিত্র গুলো পর্যালোচনা করে দেখা যাক পরিস্থিতি আসলে কোন পর্যায়ে আছে। একটি স্যাম্পল ইউনিটের বিগত জুলাই ২০২৪ হতে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত উপাত্ত সংগ্রহ করে তার তথ্যচিত্রর মাধ্যমে নিচের পর্যালোচনাটি করা হয়েছে ।

উপরের তথ্য চিত্র থেকে দেয়া যাচ্ছে যে, এপ্রিল ২০২৫ মাসে হঠাত করে আমানতে একটি নিম্নপাত চোখে পড়ছে যা পরবর্তী মাসগুলোতে পুনরুদ্ধার যায়নি। যার মানে হলো যে ডিপোজিটটি সরে গেছে তা আর ফেরত আসেনি। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ১০০ কোটি টাকার মত ফান্ড হঠাত করে সরে গেছে যা পুনরুদ্ধার করা যায়নি। ব্যাংক খাতে বিপর্যয় তো চলমানই ছিল, হঠাত করে ফান্ড সরে যাওয়ার একটাই মানে হতে পারে যে, অসুস্থ ব্যাংক গুলো পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পদক্ষেপ গুলো নিয়েছিল তার ফলশ্রুতিতে কিছু আমানতকারী অন্যান্য ব্যাংকে উচ্চ মুনাফার লোভে ফান্ড সরায়ে নিয়ে গেছে। স্বভাবতই দুর্বল অবস্থায় থাকা ব্যাংক গুলো উঠে দাঁড়াবার জন্য হাই কস্ট ডিপোজিট সংগ্রহ কল্পে উচ্চ মুনাফায় আমানত আহ্বান করছে যার ফাঁদে অনেকে হয়তো ঝুঁকি থাকা সত্যেও ধরা দিয়েছেন। পরবর্তী তিন মাসের প্রেডিকশনে বা ফোরকাস্টিং এ দেখা যাচ্ছে যে, আমানত আরো কমে যাওযার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

বিনিয়োগের চিত্র দেখলে এপ্রিল ২০২৫ মাসের আমানত এর হঠাত নিম্নপাত কিন্তু বুঝা যাচ্ছে না, স্বাভাবিক হলো আমানত নিচে নেমে গেলে বিনিয়োগেও তার প্রভাব হওয়ার কথা কিন্তু এডি রেশিও কম বেশি হলেও বিনিয়োগের ট্রেন্ড লাইন প্রায় একই আছে আর পরবর্তী তিন মাসের ভবিষ্যৎ বা ফোরকাস্টিংও বলছে বিনিয়োগ রেখায় তেমন একটা প্রভাব পড়বে না। এটি একটি হাস্যরসাত্মক প্রবণতা বলা যায়। আমানত কমেছে অথচ বিনিয়োগে তার কোন প্রভাব নাই, যা অস্বাভাবিক।

বছরান্তে হিসাবায়ন পুন চালু হওয়ায় স্বভাবতই মুনাফার হিসাবটি জানুয়ারি থেকে পুন শুরু হয়েছে, তাই বিগত বছরান্তে ৯.৪ কোটি টাকা মুনাফা পরবর্তী মাস জানুয়ারিতে শূন্য ধরে নিয়ে উপাত্ত চিত্রায়ন করা হয়েছে। মুনাফা রেখা ক্রমাগত বৃদ্ধি দেখাচ্ছে যা প্রথম তিন মাস প্রায় একই ছিল। এপ্রিল মাসে যখন ডিপোজিট নিম্নপাত পেল ঠিক সেই মাসে মুনাফা বৃদ্ধি পেল কি করে? এ এক অদ্ভুত চিত্র, বিনিয়োগ রেখায় এপ্রিল মাসে তো তেমন কোন টার্বুলেন্স চোখে পড়ে নি। তা হলে হঠাত করে ঠিক ওই মাসেই কেন মুনাফা ঊর্ধ্বগতি পেতে শুরু করলো? এটি আরেকটি অস্বাভাবিকতা প্রদর্শন করছে, হতে পারে যে বিনিয়োগ-কৃত ফান্ডের মুনাফা অর্জন শুরু হয়েছে এপ্রিল মাস থেকে, যার আগের তিন মাসে বিনিয়োগের মুনাফা অর্জিত হয়নি। তিন মাসের ফোর-কাস্টিং দেখাচ্ছে যে, মুনাফা ঊর্ধ্বমুখীই থাকবে। প্রথম তিন মাসে মুনাফার একই থাকা আর ঠিক এপ্রিল ২০২৫ থেকে মুনাফার ঊর্ধ্বগতি একটি বিস্ময়কর চিত্র প্রদর্শন করেছে।
প্রথমেই বলে রাখি, এটা একটি আপ ঝাপ পর্যালোচনা। আমি যখন ২০০৩ সালে টেকনোকিড্স ধানমন্ডিতে কম্পিউটার প্রশিক্ষক (ফ্যাকাল্টি) হিসেবে কর্মরত ছিলাম তখন ঢাকা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগদানকৃত এক ভাই এর আলাপ শুনছিলাম আমার তখনকার বস দেলোয়ার ভাই এর সাথে, সাথে ছিল টপ-ক্লিন ধানমন্ডির সত্ত্বাধিকারী নোমান ভাই। ওই ভাই বলছিলেন আমরা ভাই ফাঁকিবাজ ছিলাম পুর ছাত্র জীবন ।পরীক্ষায় যা আসবে সাজেশন দেখে পড়তাম, বাকি সময় বই খাতা কাপড় শুকা দেয়ার মত টাঙ্গায় রাখতাম। উনার যা বক্তব্য তাতে বুঝা যায় আমরা আপ ঝাপ দিয়েই পার পেয়ে গেছি পড়ুয়া বা বই এর পোকা কখনই ছিলাম না। আমিও আপ ঝাপ দিতে জানতাম, তই ২৪ তম বিসিএস এই আপ ঝাপ দিয়ে ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলাম, প্রিপারেশন ভালো না থাকায় ভাইভাতে বাদ পড়ে যাই। আমি ওই একবারই ট্রাই করেছি আলী ভাই এর সাথে আর দুজনেই তীরে এসে তরী ডুবায়ে দিয়েছি। হ্যাঁ, আপ ঝাপ দিয়ে সব সময় চলে না কিন্তু যে বিষয়টি সম্পর্কে লিখছি তা আমার পেশাগত ধারনা থেকে তাই অতি খুঁটি নাটির প্রয়োজন বোধ করি নাই তেমন একটা। যে ডাটাবেইজ ব্যবহার করছি তা সর্বত ভাবে স্বচ্ছ, প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি ডাটার সমন্বয়ে তৈরিকৃত, তাই এই উপাত্ত সমূহের ভিত্তিতে যে পর্যালোচনা করা হলো, তা মনে হয় সঠিকের কাছাকাছি যাবে আর এ বিষয়ে শতকরা শত ভাগ নিশ্চিত কোন পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয় না বলেই আমার ধারণা। নানান দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে এই বিষয়বস্তুর বিভিন্ন ধরনের কিন্তু কাছাকাছি চিত্র পাওয়া যাবে। যে এনামলিস বা অসংগতি গুলো ধরা পড়েছে তাতে বুঝা যায় বিগত বছরের অস্বাভাবিকতা বর্তমান বছরেও চলমান আছে আর এ অবস্থা বেশি দিন চলমান থাকলে বিপর্যয় ঠেকান যাবে না।
সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ০২জুলাই২০২৫> ২৬
আগস্ট২০২৫>
No comments:
Post a Comment