Sunday, January 4, 2026

অর্থনীতি ও ব্যাংকিং সেক্টর পর্যালোচনা - ২০২৫ বর্ষ সমাপনী

 

 আমার মত অতি সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং সেক্টর ও অর্থনীতি নিয়ে কথা বলাই সাজে না, তার পরও চেষ্টা করে দেখি, অন্তত একজন অতি সাধারণের মন্তব্য যারা ব্যাংকিং ও অর্থনীতি একদমই বুঝে না তাদের কাজে লাগলেও লাগতে পারে। বিগত দুয়েক বছর একটা করে পর্যালোচনা করে যাচ্ছি, এবারেরটা বাদ যাবে কেন। আগের বছর গুলোতে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিকতা প্রকট ছিল তা মন্তব্য করেছিলাম, এ বছর কি ব্যাংকিং সেক্টর সেই সংকট কাটায়ে উঠতে পেরেছে? প্রশ্নটা এখানেই, আর বিগত বছরগুলোতে যে ইসলামী ব্যাংক গুলো মারাত্মক রকম তারল্য সংকটে পরেছিল তা কি এত সহজেই কাটবে? এই সব প্রশ্নরই উত্তর খুঁজবো এই আলোচনায়। বিগত ২০ বছরে ব্যাংক সম্পর্কে নানান অভিজ্ঞতা হয়েছে, অনেকের সাথে কথা বলে যা বুঝেছি, তা হলো এ দেশের অনেক মানুষই ব্যাংকিং সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানে না। সাধারণ মানুষের কথা না হয় বাদ দিলাম, ব্যাংকে নতুন জয়েন করা অনেক ইয়াং ব্যাংকারের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা কম থাকায় বেশ কিছু বিষয়ে সংশয়ে ভুগে। মোদ্দা কথা যেহেতু ব্যাংকিং সম্পর্কে প্রাইমারি, সেকেন্ডারিতে তেমন কিছু পাঠ্য পুস্তকে থাকে না যার ফলে এ বিষয়ে ধরে নেয়া হয়, যখন টাকা হবে, যখন বয়স বাড়বে তখন চলতি পথেই শিখে নিবে এসব। বিষয়টা এরকম হওয়াতে এই জ্ঞান স্বল্পতা দেখা যায় সাধারণের মধ্যে, এরকমই আমার মনে হয়েছে।

আমাদের ব্যাংক গুলোর সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো খেলাপি ঋণ মানে যে ঋণ আর ফেরত আসে না, যাকে এনপিএল বা নন পারফর্মিং লোনও বালা হয়ে থাকে। এযাবৎ যত ব্যাংকিং পর্যালোচনা দেখেছি তাতে এ বিষয়টি কমন, মানে পড়লে পরীক্ষায় কমন পড়বেই। ঋণ খেলাপির এটা করতে পারে না, ওটা করতে পারবে না ইত্যাদিও শোনা যায়, কিন্তু চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী এই বাগধারাটা সঠিক প্রমাণ করতে বিগত সময়ের মত এই প্রবণতাটি আমাদের দেশে মরণ ব্যাধির মত অর্থনীতি আর ব্যাংকিং সেক্টরে আঁশটে পৃষ্ঠে লেগে আছে যেন তা কাঁঠালের আঠা, কষ্মিণ কালেও ছাড়বে না। নিচের তথ্যচিত্রটি সেই  বিদঘুটে ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা প্রকাশ করে মাত্র। 

ফিগার আর এমাউন্টের মধ্যে পার্থক্য এই যে একটি শুধ সংখ্যা আরেকটি ওই সংখ্যার অর্থবহ উচ্চারণ, ৬,৪৪,৫১৫,00,00,000/- BDT সংখ্যাটি কথায় না লিখলে বোধগম্যতায় আসে না, তাই বলেই দেই, এটা ছয় লক্ষ চৌচল্লিশ হাজার পাঁচ শত পনের কোটি টাকা মাত্র। আমার ক্লাস ফাইভে পড়া ছেলেটা বুঝতেই পারছে না এত বড় সংখ্যা মানে এটা কত বড়, ওর বোধগম্যতায় লক্ষ টাকার উপর কোটি টাকা না হয় বিলিয়ন হবে কিন্তু এত টাকা !!, তাও ব্যাংক থেকে লোন দেয়? এটা ওর প্রশ্ন, আমি হাসলাম, মনে মনে বললাম, দেয় না মানে, ওই টাকা থেকে নিজেদের পকেটে যে কত পারসেন্ট যায় তা ওরাই ভালো জানে। আমারও তো টাকার দরকার তবে এতটা না, এই ধরেন কয়েক লক্ষ টাকা দিলেই হবে, তবে ভাই কবে যে ফেরত দিতে পারবো তা জানি না, এই ফাঁদে ধরা দিয়ে যদি দিয়েই ফেলেন তো মরেছেন ওই টাকা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন পেস্টের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, জীবনেও ওই পেস্ট তার টিউবের ফিতর ঢুকান যাবে না। এই সব ঋণ আদতে জন্মলগ্ন থেকেই কুঋণ তা সবাই জানে, জেনে বুঝেই দেয়, গোপনে নিজের পকেটে তার কিছুটা তো অবশ্যই যায়, তাই মনে হয় লোভ সামলাতে পারে না। বলছিলাম কি, প্রাইমারি থেকেই যদি সার্জিলের শুদ্ধাচার স্লোক গুলো মুখস্থ করানো হতো তা হলে মনে হয় কিছু মিছু সত্য নিষ্ঠ শুদ্ধাচরীর জন্ম হতেও পারতো এ দেশে। ভবিষ্যতে হয়তো হবে কোন একদিন, সেই আশায় বসে বসে দিখতে থাকি, দেঁকি না কি করে!।


ভুয়া প্রতিষ্ঠান কিংবা কাগুজে প্রতিষ্ঠান এর নামে অর্থ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করাটা একটা মারাত্মক রকম ক্ষতিকর প্রবণতা আমাদের দেশে, ছোট ছোট ঋণ গুলো ঠিকই ফিরে আসে কিন্তু বড় সর লোনগুলো করাই হয় যেন তা বার বার রিশিডিউল করে একটা অনৈতিক সুবিধা নেয়ার ইচ্ছাতে। এতে করে ক্যাশ টাকা কিংবা আমরা যাকে বলি লিকুইডিটির সুবিধাটা ব্যবসায় কার্যকর থাকে। হাতে টাকা থাকলে কত কি না করা যায়। মানুষকে বাকিতে বিক্রয় আর অগ্রিম ক্রয় এর সুযোগ দিতে গিয়ে অর্থনীতিকে কতগুলো রিস্ক ফ্যাক্টর হজম করতে হয়। একটা ব্যাংকিং এর বই পড়তে গিয়ে দেখি লেখক কেবল বাকিতে টাকা ফেরত প্রসঙ্গে বেশি কথা বলেছেন, মনে হচ্ছিল যেন বাকিতে টাকা’র লেন দেনই সব থেকে গুরুত্ব বহ বিষয়, বইটা আমি ঘৃণা ভরে ফেলে দিয়েছিলাম, পড়ি নাই। আমি বাকিতে বিশ্বাস করি না, নগদ যা পাও হাত পেতে না বাকির খাতা শূন্য, এই প্রবাদটা আমার মনের অনেক গভীরে প্রথিত, তাই বাকিতে বিক্রয় আর ভবিষ্যৎ ক্রয়ের ধারণা গুলোর সাথে যে ঝুঁকি জড়িত আছে তার সাথে আমার মাথার নিউরন গুলোর সংবেদন সংঘর্ষিক মনে হয়।

ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতাটা আমার মতে এদেশের মানুষের দর্শনের সাথে জড়িত। যারা ছা-পোষা মানুষ মানে “ভাই আমি কোন দল করি না, এই দু মুঠো খেয়ে পড়ে শান্তিতে থাকতে পারলেই আমাদের চলে যায়” এই টাইপের মানুষ গুলো আসলে বলতে চায় তারা সমাজের সকল জটিলতা থেকে নিজেদেরকে দুরে সরায়ে রাখতে পছন্দ করে। এরা সৎ কিংবা অসৎ তা কিন্তু বলছি না, বলছি যে এরা দুষ্ট লোকদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে যারা জানে তারা অনেক মানুষের দেশে জন্মেছে, এখানে কেউ সেধে দিবে না, কাইরা নিতে হবে, তারা তা নেয়ও ওই ছা-পোষা মানুষ গুলোর নাকের ডগার সামনে দিয়ে আর উনারা তা দেখে কেবল ছে ছে করে, তার বেশি কিছু করতে গেলে ওই যে আবার জটিলতা আর শৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে হয়, এই ভয়ে বেশি কিছু বলে না। তার চেয়ে চা এর আড্ডায় কিংবা সমবয়সীদের সাথে দেখা হলেই, দেশটা গেল, কোনদিন এই দেশের কিচ্ছু হবে না এই মন্তব্য করে নিজেদেরকে প্রবোধ দেয় মাত্র। যার ফলশ্রুতি হলো ওই খেলাপি ঋণ, যারা করে তারা জানে দেশের অধিকাংশ ওই ছা-পোষা মানুষ, তারা গর্ত থেকে মাথা উঁচু করে দেখবে ঠিকই কিন্তু গর্ত থেকে বের হয়ে কিছু করবে না। অন্য কেউ যদি তাদের হয়ে কিছু করে দেয় তবে তাকে বাহবা দিবে তাও দুর থেকে।

যা হোক, সাধারণ মানুষের এহেন মানুষিকতার প্রতি বিরূপ মন্তব্য না করি, কি আর বলবো ভাই, আমি নিজেও তো ওদেরই দলের। উহাদিগের বোধোদয় আমার বিচার্য বিষয় নয়, বরং জুলাই ২০২৪ অর্থ বছর থেকে এই ২০২৫ এর বর্ষ সমাপনীর কিছু প্রাথমিক তথ্য উপাত্ত থেকে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করি যাতে সুস্থতা আর অসুস্থতার কিছু চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। 

ইসলামী ব্যাংকিং এর একটি ইউনিট পর্যালোচনায় দেখা যায় বিগত হিস্টোগ্রামের প্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ তিন মাসের প্রজেকশনে অর্থাৎ মার্চ ২০২৬ এ এর আমানত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর, যা এপ্রিল ২০২৫ এর পর আর পূর্বের অবস্থায় পৌছায় নাই। যে ফান্ড সরে গেছে তা আর ফিরে আসেনি, হতে পারে তা অন্যত্র রাখা হয়েছে কিন্তু সাম্প্রতিক ইসলামী ব্যাংক গুলোর যা অবস্থা তাতে তা অন্য কোন ইসলামী ব্যাংকে সরে না গিয়ে বরং মানি মার্কেট থেকেই সরে গেছে বলে আমার মনে হচ্ছে, হয় তা ব্যবসায় বিনিয়োগ হয়ে গেছে না হয় তা স্থাবর কোন সম্পত্তিতে ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে। দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদ্যমান তখন অর্থনীতির সূত্র গুলো ঠিক মত কাজ করে না, তাই সর্বত্রই অসংগতি নজরে আসে। এটাও সেরকম রহস্যজনক কোন অসংগতি আমার দৃষ্টিতে।


আলোচ্য ব্যাংকিং ইউনিটটির বছর শুরুর বিনিয়োগ টার্গেটের বছরান্তের অর্জন তার ধারে কাছেও না। বিষয়টা কি চমৎকার ভাবে দেশের বর্তমান অবস্থা টা তুলে ধরেছে, সম্প্রতি যে শোনা যাচ্ছে বিনিয়োগ কমে গেছে বিপুল পরিমাণে, এটা তার একটা সুন্দর প্রমাণ। ইউনিটটি বিনিয়োগ করতে পারছে না, ফোর কাস্টিং বলছে পরবর্তী তিন মাসে তা আরে নিম্নমুখী প্রবণতা প্রকাশ করবে। আসন্ন কয়েক মাসে দেশে যদি শক্তিশালী কোন সরকার দক্ষতার সাথে হাল না ধরে তবে যেমন ম্যাক্র ইকনমি’র পতন হবে, তার সাথে সাথে মাইক্রো ইকনমিও মারাত্মক রকম ভাবে ধসে পড়বে, এটা মনে হয় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে।

ওই যে আগে বলা হলো যে, যখন দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে একটি বিশৃঙ্খলা থাকে তখন অর্থনীতির সূত্রগুলো ঠিক মত কাজ করে না, উপরের মুনাফার ট্রেন্ড লাইনটি তারই প্রমাণ। বিনিয়োগ ও আমানত উভয়েই নিম্নমুখী থাকা সত্যেও মুনাফা ঊর্ধ্বমুখী, বছর শুরুর প্রদত্ত টার্গেট ছাড়ায়ে উপরে উঠে গেছে। বিষয়টা এমন যে ফুটবল খেলায় মেসি আপনার দল থেকে সরে গেছে অথচ চিন্তার বাইরে একাধিক গোল করে আপনার দল জিতে গেল। মেসি কিন্তু নাই অথচ সাধারণ প্লেয়াররাই মেসির চাইতে ভালো খেলা দেখাল, বিশ্বাস যদি না হয় তবে উপরের চিত্রটাও আপনার বোধগম্যতায় আসবে বলে মনে হয় না।

বর্তমান বাজার ও অর্থনীতি নিয়ে আমার মধ্যে একটা চরম বিস্ময় চলমান আছে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না একে কি বলা যায়। পারফেক্ট মার্কেট হলো যেখানে প্রচুর বিক্রেতা ও প্রচুর ক্রেতা বর্তমান থাকে। আমাদের শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরলে দেখা যাবে অজস্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ফুটপাথে, রাস্তার দু ধারে ভ্যানে করে কিংবা সকল বিপণী বিতানে প্রচুর দোকান পাটে সর্বত্র জমজমাট ব্যবসা চলছে, নিত্য নতুন দেশি বিদেশি পণ্য তার পাশাপাশি ক্রেতা ও বিক্রেতার হাঁক ডাক যেন মনে হবে ২৪ গুণন ৭ ঘণ্টাই বিশাল মেলা চলছে। একেই কি সেই পাঠ্য পুস্তকে পড়া আদর্শ বাজার বা পারফেক্ট মার্কেট বলে না? কিন্তু তা কি করে সম্ভব, যখন দেশে একটি স্থিতিশীল সরকার নাই, পুর জাতি চলছে কেয়ার টেকার গভর্নমেন্টের তত্বাবধানে তখন এরকম আদর্শ বাজার হয় কি করে? ম্যাক্রো ইকোনমিক ইনডিকেটর গুলো দুর্বলতা দেখাচ্ছে, ভয়ংকর রকম ভবিষ্যৎ বিপর্যায় এর সঙ্কেত দিচ্ছে অথচ দেশের মাইক্রো ইকনমি চাঙ্গা তা হয় কোন যুক্তিতে। একটা আপাত যুক্তি মনে হয় তা হলো, দেশের রাস্তা-ঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হওয়ায় পণ্য পরিবহনে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। গন মানুষের মুভমেন্ট বা স্থানান্তর সহজতর হয়েছে যার একটা ইনারশিয়াল বা গতি জড়তা জনিত ধাক্কায় এই অভাবনীয় মাইক্রো ইকনমিক উচ্ছলাত দেখা দিতে পারে, তবে এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত অনুমান, কোন তথ্য উপাত্তর বিচারে না। খালি চোখে দেখে যা মনে হয়িছে তা বলে দিলাম অকপটে। তবে এখন পর্যন্ত এটাই আমার কাছে একমাত্র গ্রহণ যোগ্য যুক্তি। নানা মুনির নানা মত থাকতেই পারে, আমিও এক মুনি তাই বলছিলাম কি, কয়লার ময়লা ধুইলেও যায় না, এ দেশের সাধারণ জনতা যতদিন গর্তে লুকায়ে থাকবে ততদিন ঋণ খেলাপিরা ঋণ নিয়ে লোপাট করতেই থাকবে আর ওদিকে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসে তবে দেশের ম্যাক্র-মাইক্রো ইকনমিতে ধস নামবে ব্যাংকিং সেক্টর খোকলা থেকে খোকলা তর হবে, আমরা আম জনতা কাঁঠাল পাতা খেয়ে বেচে থাকবো।
 

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ০১জানুয়ারী ২০২৬> ৩জানু২০২৬>

No comments:

Post a Comment