১২ই আগস্ট ২০২৫ তারিখে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে নেয়া ইসলামী ব্যাংকিং অডিটের ক্লাসে একজন প্রশ্ন করেছিলেন যৌথ কারবারে যদি অংশীদাররা ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্টের যথেচ্ছাচার করে তবে কি হবে বা এর প্রতিকার কি, তখন বলেছিলাম আপনি মুশারাকার কথা বলছেন, যা বাস্তবে প্রফিটেবল হয়নি। তার কথা শুনে আমার মনে হলো যে, তিনি আসলে মুসারাকা সম্পর্কে ও তার নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। তাকে বলতে হলো, বিগত সময়ে মুশারাকা কিংবা যৌথ কারবারের অধিকাংশ বিনিয়োগ প্রডাক্ট খেলাপি হওয়াতে ওই মোডে ইনভেস্টমেন্ট নতুন করে কম দেখা যাচ্ছে। বলেই দিলাম, মুশারাকায় প্রডাক্ট ইদানীং আর হচ্ছে বলে আমার জানা নাই। বিষয়টা চিন্তার বিষয় বটে যা নিয়ে আমার মধ্যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আগে থেকেই আছে।
এটা প্রমাণিত সত্য এখন আমার কাছে, এক দশকেরও বেশ আগে চেষ্টা করেছিলাম সুদি কারবার থেকে সরে যাবো, মানে ব্যাংকের সুদ নির্ভর চাকুরী থেকে সরে যাবো তাই কয়েকজন তরুণ ও নিকট জনকে একত্রিত করে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ডেলফি ম্যাথড ব্যবহার করে কোন ব্যবসাতে বিনিয়োগ করা লাভজনক হবে তা নির্ধারণও করেছিলাম। সবার মতামতের ভিত্তিতে আমার গাছা বোর্ড বাজারের জমিতে একটা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে গ্লাডিওলাস ফুল এর গাছ এর চাষ করার পক্ষে সবাই মত দিয়েছিল। বীজ সংগ্রহ করার জন্য একজন এক্সপার্টকেও কন্টাক্ট করা হয়েছিল। শুরুর দিন মানে চুক্তির দিন সবাই উপস্থিত। আমরা বীজ মানে গ্লাডিওলাসের টিউনিকেটেড বাল্ব বা পিয়াজ গুলো কোল্ড স্টোরেজ থেকে নিয়ে আসার জন্য ৫ সদস্য প্রত্যেকে সমান মূলধন বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ওই এক্সপার্টকে টাকা দিবো। সেই উদ্দেশ্যেই গোলটেবিল বৈঠক, ওই দিন আকস্মিক যে নাটক হলো তা আমার জীবনের আরেকটা রিয়ালিটি শক। এক পার্টনার অযথা ওই এক্সপার্ট অহেতুক কারণে সন্দেহ করা শুরু করে দিল। নানা প্রকার তার প্রশ্ন তার কাছে। আমরা তো আগে থেকেই সব জেনে শুনে ওই দিন বিনিয়োগ করতে বসেছিলাম। আমাদের মেমরেন্ডাম আর আরটিক্যালস অফ এসোসিয়েশন তো অনেক যুক্তি তর্ক সাপেক্ষে আগেই সর্ব সম্মতি নিয়ে গঠন করা হয়ে গিয়েছিল। তা হলে ব্যবসা শুরুর টেবিলে বসে হঠাৎ করে এই তর্ক উত্থাপনের কি যুক্তি থাকতে পারে তা আজও আমার কাছে অস্পষ্ট। ওই বৈঠকে সেই অংশীদার তার ক্যাপিটাল কন্ট্রিবিউট করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বসলো। শুধু মাত্র তার মনে হয়েছে যে এক্সপার্টকে আমরা ডেকে এনেছি সে হয়তো মিথ্যা বলছে। আমি পুরাই থ বনে যাই। সেদিনের চুক্তি ভঙ্গ আমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেয় নাই, মাথায় চলছিল সকল প্রকার ভয়ংকর চিন্তার টর্নেডো। একটা পাইলট প্রজেক্টে বিনিয়োগ, তা এই শুরুতেই এত বড় একটা ধাক্কা ! পরে বুঝেছি এ দেশটার মানুষগুলোর রক্ত বহু প্রজাতির মানুষের মিশ্রণে একেবারে একাকার হয়ে গেছে। নানা জেনেটিক সংমিশ্রণে আমরা সমৃদ্ধ হয়ে কি উন্নত হয়ে গেছি না কি বিবর্তিত হয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে গেছি তা বুঝে উঠা শক্ত।
এতেই যদি শেষ চমক হতো তা না হয় মেনে নিতাম, এর পরের ঘটনা আরও নাটকীয়। বাকি যে চার জন ছিলেন তারা আমাকে প্রধান করে একটা কনসোর্টিয়াম ধরনের জয়েন্ট ভেনচারে সম্মত হলো। তো আমি সেই মত তা পরিচালনা করতে রাজি হলাম। একজন কে দায়িত্ব দেয়া হলো যে, নতুন একটা প্রডাক্ট লঞ্চ করা হবে তো সে গণযোগাযোগ করবে। সে রীতি মত ওভার কনফিডেন্ট হয়ে জানালো লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে অডিটোরিয়াম। বাস্তবতা হলো সেদিন লোকজনই এল না। যাও বা এলো তা সংখ্যায় খুব নগণ্য। তার পরের ঘটনা আরো হৃদয় বিদারক, আমার সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রজেক্ট সম্পর্কে এর ভবিষ্যৎ ও পরিচালন ব্যয় বিবেচনায়, আমি যখন তা বন্ধ করে দিতে বললাম সে আমার দিকে কলম ছুড়ে মারলো, সেই ছড়াটার মত, দাদুর হাতে কলম ছিল ছুঁড়ে মেরেছে, উহ্ বড্ড লেগেছে। ছড়াটা আমার প্রথম সন্তানকে ছোট্ট বেলায় শিখিয়েছিলাম, ও বলতো বন্ড লেগেছে। আমার সেই দিনকার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছুড়ে মারা কলমটাও আমার কাছে বন্ড লেগেছিল। বুঝেছিলাম এদেশের মানুষজন যৌথ করাবারের জন্য এখনও যোগ্য হয়ে উঠে নাই। প্রধান সমস্যা মনে হয় স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রেম আর দ্বিতীয়টা মনে হয় পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মনে মনে শপথ নিয়েছিলাম আর না, এর পর যা করবো একক উদ্যোগে করবো, কাউকে সাথে নিয়ে নয়।
মুশারাকা কেন বার্থ হয় তা নিয়ে তাই আমার চিন্তা চলছিল বহু দিন আগে থেকেই তাই ভাবলাম একটা জরিপ করে দেখি অন্যরা কি বলেন এ প্রসঙ্গে। জরিপের ফলাফলটা নিম্নরূপঃ
উপরোক্ত জরিপটি ১৫আগস্ট হতে ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখের মধ্যে তিনটি অনলাইন ফোরামে (3R forum, Officer-IT forum 2004, CEMBA Alumin Association ) ও হাতে হাতে SB PLC Wage Earner’s corp. Br. Dhaka এ কারা হয়। স্যাম্পল সাইজ ২৫০ জন, ডেমোগ্রাফিক্সঃ Professionals in Services majority Bankers। জরিপটির ফলাফল হিসেবে নিচের উক্তিটি সঠিকত্বর বিচারে সঠিক বলা যায়।
ফলাফল হলো “স্বল্প শ্রমে ও সময়ে অতি মুনাফার লাভের প্রত্যাশায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব দ্রুত চরমে পৌঁছে যায়, যার ফলে সদস্যগণ শুদ্ধাচার কিংবা নৈতিকতা লঙ্ঘন করে বসে আর সেই কারণেই আমাদের দেশের যৌথ কারবার বা মুশারাকা উদ্যোগ সমূহ বেশি দিন টিকে না।”
আমার লেখাটাতে যদি প্রাপ্ত ফলাফল আমি লিখতাম জনমত যাচাই না করেই তবে তা হতো ফতোয়া, মানে যে মন্তব্য বা ফয়সালার বিপরীতে বা পেছনে কোন গবেষণা থাকে না, আর যা মনগড়া হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমাদের দেশের জনগণ এমন যে হরিণের মত নিজের পেটে ঢেকুর উঠলেও ভয় পায়, মানে সামান্য একটা ইমুজি দিয়ে নিজের মত প্রকাশেও দ্বিধা বোধ করে, ১০ রকমের চিন্তা করে, দিবো কি দিবো না, দিলে না জানি কি থেকে কি হয়। সেই দেশে জনমত জরীপ, ওরে ব্বাবা তা কি করা সহজ? সাধারণ একটা জরীপ যাতে সাপ, ব্যাঙ কেঁচো কিছুই বের হওয়ার সম্ভাবনা নাই বা একদম শূন্য, তা নিয়েও অনেকের অনেক মন্তব্য সহ্য করতে হয়েছে। কেউ বলেছে কে এই কারণগুলো ঠিক করেছে? কেউ বলেছে সবগুলোই তো কারণ ইত্যাদি ইত্যাদি। যে কোন জরীপের একটা উদ্দেশ্য থাকে, আমি সেই উদ্দেশ্যটা উল্লেখ করেছি। আমার একটা লেখায় আমি এই প্রসঙ্গটা আনবো তার আগে জনমনে এ বিষয়ে কি রকম মনোভঙ্গী বিরাজ করছে তার একটা ইঙ্গিত আমার দরকার ছিল, এর বেশি কিছু না। এটা থিসিস পেপার না কিংবা এর উপর পিএইচডিও করছি না, সাধারণ একটা জনমত যাচাই। এদেশের জনগণ এতটাই লিডারশীপ শূন্য যে তারা ঐক্যবদ্ধ কোন সিদ্ধান্তেই পৌছাতে হিমশিম খায় বা মনে হয় চায় না। দার্শনিক কিংবা মনস্তাত্মিক কোন চিন্তার ঐক্য নাই বা কোন একটা বিষয়েও সকলের একক ঐক্যমত্য পাওয়া সহজ হয় না। তার পরও বলতে হবে, উপরোক্ত জরিপে পরিষ্কার ভাবে একটি জনমত পাওয়া গেছে, যা আমি লেখক হিসেবে মনে করি একটি অনন্য উদাহরণ। বন্ধু তারেককে তাই বলেছিলাম, তুই যে আমার উপরোক্ত মতামত নিয়ে দ্বিমত পোষণ করবি তা আমি আগে থেকেই জানতাম। সমস্যাটা ওই যে আমরা যতই ঐক্যমত্য মতামতে আসতে চাই না কেন, সমস্যা হলো পেটে ঢেকুর উঠলেও মনে হতে পারে বাইরে কোথাও কেউ পটকা ফুটাইছে।
বিষয়টার একটা মনস্তাত্ত্বিক দিক আছে যার প্রতিফলন আমরা আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপ ডাইনামিক্সে দেখতে পাই। ১০০ জন সদস্যর একটা অনলাইন গ্রুপের মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৬ জন সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে থাকে যা দেখে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ৮ থেকে ১০ জন আর এই পুর ঘটনা প্রবাহ নির্বাক হয়ে পর্যবেক্ষণ করে বড়জোর ২৫ জন, বাকিরা পুরাই ঘুমন্ত মানে স্লিপিং সদস্য। এটাই আমাদের দেশের গ্রুপ ডাইনামিক্স আমার অভিজ্ঞতায়। ২০১০ সাল থেকে ফেইসবুকের উত্থান আমি দেখে আসছি, তার আগে ইয়াহু ইমেইল গ্রুপের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ার চেষ্টাও করে দেখেছি। ফেইসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার আর এখনকার হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপ গুলো সব গুলোতেই আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল ও আছে। তারই প্রেক্ষিতে উপরের গ্রুপ ডাইনামিক্স অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান থেকে বলতে বাধ্য হচ্ছি এটা আমাদের দেশের চিত্র, আমার ধারণা ইউরোপ আমেরিকা কিংবা চায়নার গ্রুপ ডাইনামিক্সটা ভিন্ন হবে হয়তো। যার মানে হলো এদেশের মানুষগুলো আসলে কচ্ছপের মত মাথা বের করে আবার খোলসের ভিতর মুখ লুকায়, পাছে লোকে কি বা বলের ভয় পায়, সহজে নিজেকে প্রকাশ করে না বা করতে ভয় পায়। এদের মাঝেই কিছু লোক আছে যারা চোরা গোপ্তা হামলা করে আপনার অর্থ সম্পদ লোপাট করার উপায় খোজে আর তাতে সফলও হয়। আমি নিজেই এরকম কয়েকটা হামলার শিকার হয়েছি সম্প্রতি তবে যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে বাঁচিয়ে গর্ত থেকে উঠেও এসেছি । এদেশের মানুষগুলোর এরকম আচরণ কেন তা প্রত্নতাত্ত্বিক ও সমাজ বিদদের গবেষণার বিষয় হতে পারে তবে যা পাওয়া যাবে তা রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই বলে গেছেন, বহু রক্ত ধারার সংমিশ্রণে আমরা মিশ্র জাতি বা কালারড পিপলস। আমাদের মনটাতেও তাই নানান রংয়ের খেলা চলে। কখন সবুজ, কখন পিঙ্গল, কখন তামার রং এ রঞ্জিত। এত নানান রং ঢেলে যে সমাজ তাতে ঐক্যের চেয়ে অনৈক্যই বেশি। এ সমাজে মুশারাকা প্রয়োগ উলু বনে মুক্তা ছিটান ছাড়া আর কিছুই ফল দিবে না। আমার হিসেবে একারণেই এদেশে মুশারাকা বা যৌথ কারবার বিফলে যায়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে যখন মুশারাকা বিফল হচ্ছে তবে প্রতিকারটা কি? প্রতিকার ওই মুরাবাহা, মুদারাবা আর বাই মওয়াজ্জল কিংবা বাই-সালাম আর বাই ইশতিশনা। তবে শুঁকুক এ দেশে ভালো ফল দিবে তাতে সন্দেহ নাই, কেন যে এই শরিয়া ম্যাকানিজমটার বহুল ব্যবহার হচ্ছে না তার পেছনের কারণ মনে হয় মানুষজন আসলে এ বিষয়গুলো কেবল জানতে শুরু করেছে। সকলের যখন এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান হয়ে যাবে তখন আর বলতে হবে না, সবার দাবীর প্রেক্ষিতেই এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়াগুলো নির্ভর করে নতুন নতুন ডিপোজিট ও বিনিয়োগ সেবা গুলো আমরা বাস্তবে দেখতে পাবো।
সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ১৫আগস্ট২০২৫> ২১আগস্ট২০২৫> ২৩অক্টোবর২০২৫> ২৫ডিসেম্বর২০২৫> ০৬জানুয়ারী২০২৬>


No comments:
Post a Comment