Thursday, February 19, 2026

ইসলামী ব্যাংকিং শরীয়াহ অডিট ও মুরাকিব প্রসঙ্গে

 

বিগত আগস্ট, ২০২৫ তারিখে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে ইসলামী ব্যাংকিং অডিট এর উপর যে ক্লাসটি নিলাম, তার জন্য পরিশ্রম করতে হয়েছে, সচরাচর যে ক্লাস গুলো নিতাম তা ছিল ডিপোজিট মবিলাইজেশন আর মোডস অব ইনভেস্টমেন্ট এর উপর আর বিগত কয়েক বছর কেবল সিকিউরিটিজ অন ইনভেস্টমেন্ট ও লেন ডকুমেন্টেশনের উপর ক্লাস নিতে নিতে গতানুগতিক হয়ে গিয়েছিলাম। এই বিষয়গুলো আমার কর্মক্ষেত্রে অহরহ করছি তাই তেমন সমস্যা হয়নি ক্লাস নিতে। যখন স্টাফ কলেজ থেকে ফোনে জানতে চাওয়া হলো ইসলামী ব্যাংকিং অডিটের উপর ক্লাস নিতে পারবো কি না, তখন বলেছিলাম একটু প্রিপারেশন নিলেই হয়তো পারবো। সময় কতটা হাতে আছে জানতে চাওয়াতে জানান হলো আনুমানিক তিন দিনের মত। আমি পুর কোর্সের শিরোনাম কি তা জানতে চাইনি যার ফলে পুর কোর্সটি সম্পর্কে ধারনা পাচ্ছিলাম না, তার উপর ক্লাস নেয়ার জন্য আমার আমন্ত্রণ পত্রটি আসে মাত্র একদিন আগে। তার আগ পর্যন্ত আমি অনিশ্চিত ছিলাম পুর কোর্স ও তাতে আমার ক্লাসটির বিষয়বস্তুর পরিধি সম্পর্কে। অফিসের ব্যস্ততা আর ব্যক্তিগত ব্যস্ততার মধ্যে মারাত্মক রকম সময় সংক্ষেপণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। অডিট মানে তো মারাত্মক রকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তার উপর শরীয়াহ্ অডিট, তাই আমি বিষয়টিকে অনেক গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলাম। যখন আমন্ত্রণ পত্র পেলাম তখন দেখলাম ৫০ জনের ক্লাস নিতে হবে যার মধ্যে অনেক আইওবি (IOB or Inspectors of Branches) থাকবেন। তখন বুঝলাম আমাকে উচ্চতর পর্যায়ের অডিট প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে বলতে হবে। বিগত রাতে নতুন ব্যাংকারদের জন্য আমি যে স্ট্রাকচারে লেকচার দিবো ঠিক করেছিলাম তা পুর ঢেলে সাজাতে হবে, কারণ আমার মনে হয়েছিল যারা থাকবেন ক্লাসে তারা এ বিষয়ে নবীন ব্যাংকার বা ইয়াং ব্যাংকার কিন্তু যখন আইওবি থাকবেন জানলাম তখন বুঝলাম প্রবীণরাও থাকবেন তাই সেই উচ্চ স্তরে আমার বক্তব্যটি উপস্থাপন করতে হবে অথচ হাতে সময় আছে মাত্র এক অফিস সন্ধ্যা আর ঘরে রাতের খাবার শেষে রাতে যতটুকু পারি।


রাত জেগে গত রাতের পুর লেকচার কাঠামোটি পুনর্গঠন করে একদম সুনির্দিষ্ট ভাবে শুধু মাত্র ইসলামী ব্যাংকিং অডিট বিষয়েই কেন্দ্রীভূত করে ফেললাম। কাজটা সম্পন্ন করতে পেরে আমি তৃপ্ত কিন্তু অনেক মানবিক শক্তি খরচ হয়ে গেছে, তার উপর তৈরিকৃত ফাইলটি আমি ক্লাসে পাবো কি করে তা জানি না তখনও, কারণ কোর্স কোয়ার্ডিনেটর আমার সাথে কোন যোগাযোগ করেন নি। পরে পেন ড্রাইভে করে নিলাম আর কর্পোরেট মেইলে আমার একাউন্টে আপলোড করে রাখলাম। সব ব্যবস্থা করে যথা সময়ে পৌঁছে ক্লাস নিয়ে বাসায় ফিরে তিন থেকে চার ঘণ্টার ম্যারাথন ঘুম। ক্লাসটা নিয়েছিও আমার মনের মত করে, তবে হতাশা দুই জায়গায়, জাঁদরেল কোন অডিটর ছিল না ক্লাসে, আর তিন বছর আগে ক্লাসে শরীয়াহ্ কি জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, কোন উত্তর পাই নাই, সেদিনও পেলাম না, আশা ছিল ক্লাস থেকে উত্তর কিছু পেলে তার সাথে আমার অর্জিত জ্ঞান কিছুটা যোগ হবে, তা না হয়ে দেখলাম তিন বছর আগের শূন্যতা তখনও কাটেনি। যারা শরীয়াহ্ কাহাকে বলে জানেই না তারা কি করে কোন ব্যাংকের শরীয়াহ্ অডিট করবে তা বোধগম্য হলো না। হয়তো ভবিষ্যতে কোন এক দিন এই অপূর্ণতা আর থাকবে না তখনকার জন্য আমাদের এখনকার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। 

ফটো ক্রেডিটঃ জনাব শাজাহান আলী, আগস্ট, ২০২৫

শরীয়াহ্ নিয়ন্ত্রক অবকাঠামোঃ-
(Shari’ah Governance Framework)
শরীয়া সুপfরভাইজারী বোর্ড (SSB) সকল অর্থিক প্রতিষ্ঠানে সেই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাংকিং সেবা কতটা শরীয়াহ সম্মত হলো তার উপর নজর রাখে, শরীয়া কম্প্লায়েন্স অর্থাৎ প্রদত্ত সেবাটি শরীয়ার নীতি মেনে পরিপালন করা হয় কিনা কিংবা কোন নীতি মালার সাথে সংঘর্ষিক কিনা তা যাচাই করে দেখে। আভ্যন্তরীণ অডিট কোন প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরীক্ষা পদ্ধতি আর বহিঃনিরীক্ষা যা প্রতিষ্ঠানটি থেকে স্বাধীন ও সামগ্রিক বিচারে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকিং সেবা সমূহের শরীয়া ভিত্তি যাচাই করে বা নিরীক্ষা করে।

 

শরীয়াহ্ অডিটরদের মুরাকীব বলা হয়ঃ-
মুরাকীব গণ মুয়ামালাত বা সমাজের পারষ্পরিক আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত ইসলামের নীতিমালায় বিশেষজ্ঞ থাকেন। মুরাকীব অত্যন্ত সম্মানিত ও ব্যাংকিং সমাজে সমাদৃত একটি পদবী। প্রাতিষ্ঠানিক নিরীক্ষায় মুরাকীবগণ একজন সাধারণ অডিটর যে ভূমিকা রাখেন তার চাইতে কিছু বেশি রাখেন যেহেতু তাঁরা শরীয়াহ্ বিষয়েও ওয়াকিবহাল। যারা অডিট সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানেন তারা জানেন যে কোন প্রতিষ্ঠানের প্রধানকেও অডিটের আওতায় আনা যায়। মোদ্দা কথা কোন প্রতিষ্ঠান যে নীতিমালার মাধ্যমে পরিচালনায় প্রতিশ্রুতি বদ্ধ তা যথাযথ ভাবে বাস্তবে প্রতিপালিত হচ্ছে কিনা তা যাচাই বাছাই করে দেখাই নিরীক্ষক বা অডিটরদের কাজ। তা হলে সম্মানিত মুরাকীবগণ এর দায়িত্বর মূল বিষয়টি দাড়ায় যে, প্রতিষ্ঠানটি যে নীতিমালার ভিত্তিতে তার ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিশ্রুতি বদ্ধ সেই নীতিমালায় শরীয়াহ্ লঙ্ঘন করে এমন কোন উপাদান আছে কি না কিংবা উক্ত নীতিমালার আলোকে পরিচালিত ব্যাংকিং সেবা সমূহ যথাযথভাবে পরিপালিত হচ্ছে কিনা। কিংবা থিওরি ইনটু প্রাকটিসে বা বাস্তব প্রয়োগে শরীয়াহ্ এর কোন নীতির সাথে সংঘর্ষিক বা লঙ্ঘন হচ্ছে কি না। যদি হয়ে থাকে তকে শরীয়াহ্ কম্প্লায়েন্স রিস্ক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সম্মানিত মুরাকীব গণের দায়িত্ব হলো এই শরীয়াহ্ কম্প্লায়েন্স রিস্ক, বাংলায় যাকে বলা যেতে পারে শরীয়াহ পরিপালন ঝুঁকি সমূহ যাচাই বাছাই করে দেখা।

শরীয়াহ্ নন-কম্প্লায়েন্স রিস্ক সম্পর্কেঃ-
Shari’ah non Compliance Risk
বিআরপিডি সার্কুলার নং ৩ তাং ৮-৩-২০১৬ মোতাবেক ৩৬টি শরীয়াহ নন কম্প্লায়েন্স রিস্ক চিহ্নিত করা হয়েছে যাকে তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করে পুন ৬টি উপ-শ্রেণীতে ঝুঁকি সমূহকে শ্রেনীকৃত করা হয়েছে। এই ৩৬টি ঝুঁকি একটি ১০০ মার্কের চেকলিস্ট আকারে মুরাকীবগন যাচাই করে তার ভিত্তিতে তাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদন প্রদান করেন।

দুটি মেজর ভায়োলেশনঃ-
১) শরীয়াহ সম্মত বাই মোয়াজ্জেল আর বাই মুরাবাহা পদ্ধতিতে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় বিনিয়োগ ব্যতিরেকে কেবল নগদ অর্থ প্রদান করা হলে এই ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। কাগজে কলমে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা হয়েছে দেখায়ে ঋণ/বিনিয়োগ প্রদান করা হলে তা সুদে পরিণত হয়ে যায়। আমাদের দেশে এই প্র্যাকটিসটি এত বেশি হচ্ছে যে তা যেন ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে। এটা বুঝা উচিত যে, যদি পণ্য ক্রয়-বিক্রয় কেবল কfগজে থাকে আর তার বিনিময়ে বিনিয়োগ/ঋণ গ্রহীতাকে নগদ টাকা প্রদান করা হয় তবে তা পুরোপুরি সুদে পরিণত হয়ে যায়। এই ঝুঁকি এতটাই ক্ষতিকর যে তা ইসলামের নাম নিয়ে ধোঁকাবাজির পর্যায়ে পড়ে।

২) পুরাতন বিনিয়োগ/ঋণ নিয়েছেন কোন গ্রাহক, সেই বিনিয়োগ/ঋণ পুরোপুরি পরিশোধের পূর্বেই তাকে পুন বর্ধিত লিমিটে পূর্বের বিনিয়োগ/ঋণ সমন্বয় করে নতুন বিনিয়োগের অর্থ প্রদান। এই প্র্যাকটিসটিও অহরহ হচ্ছে আমাদের দেশে যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

মুরাকীবগণ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এই প্রথম দুটি মৌলিক ঝুঁকি হচ্ছে কি না তা নিরীক্ষা করেন।
 

ক্লাস নেয়ার পরের দিন অফিসে আসার পর ফেরদৌস আলী খান স্যার হঠাৎ আমাদের ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো এনক্লেভে এসে আমাকে প্রশ্ন করলেন ক্লাস কবে? আমি তো হতবাক, বললাম গতকাল তো নিয়ে এসেছি, উনি বললেন তার আগের ক্লাসটা উনার ছিল। উনি আমাদের অডিট ডিভিশনের একজন স্বনামধন্য অডিটর। এর পর পুর বিষয়টি পরিষ্কার হলো আমার  কাছে, হঠাৎ করে ইসলামী ব্যাংকিং অডিটের উপর ক্লাস নেওয়ার জন্য আমার ডাক পড়লো কেন ! তার মানে ফেরদৌস স্যার আমার নাম রেকমেন্ড করেছেন বুঝা গেল। অডিট ডিভিশনে মুজিবর ভাই ইসলামী শরীয়া অডিটের উপর বেশ পড়াশুনা করেছেন ও অডিট ম্যানুয়াল তৈরিতে উনার ভূমিকা ছিল জানতাম কিন্তু উনি অতি সম্প্রতি জেনারেল এ্যাডভান্স ডিভিশনে বদলী হয়ে গেছেন। ওদিকে সামিউল ভাই যিনি ফেব্রুয়ারিতে আমাদের উইন্ডো অডিট করে গেলেন, উনিও আর অডিট ডিভিশনে নাই। তখন বুঝলাম শূন্যতাটা তৈরি হয়ে ছিলো। আমার মতে ক্লাসটা নিতে পারতেন উপরের দুই জনই কারণ তারা কর্মক্ষেত্রে সরাসরি এই বিষয়ে কাজ করেছেন। ফেরদৌস স্যার পাক্কা অডিটর কিন্তু ইসলামী অডিটিং এর প্রসঙ্গ আসায় উনি মনে হয় আমার নামটাই রেফার করেছেন। পরের দিন উনি অনেক সময় নিয়ে বুঝায়ে গেলেন সুদ সম্পর্কে উনার বিশ্লেষণটি। আমার দেয়া বিশ্লেষণটিকে উনি বললেন এটা অপারেশন গত ব্যাখ্যা কিন্তু অন্তর্নিহিত আরেকটি ব্যাখ্যা আছে আর তা হলো সুদ সরাসরি মুসলমানদের তাওয়াককুলের সাথে সংঘর্ষিক একটি ধারণা যেখানে রিস্ক ফ্যাক্টরটিকে অস্বীকার করা হয়। মনে পড়ে গেল ইমরান নজর হোসেন যখন ঢাকায় এসেছিলেন, আমি উনার দুটা লেকচার এ্যাটেন্ড করি ও লেকচার পরবর্তীতে উনার সাথে কথাও বলি। উনি এই কথাটাই বলেছিলেন, রিস্ক ফ্যাক্টরটাকে অস্বীকার করা মানে ওই তাওয়াককুলের সাথে সংঘর্ষ করা। এই কথাটাই ফেরদৌস স্যারের কাছ থেকে পুন জানলাম আর পুলকিত হলাম। 
 
সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ১৫আগস্ট২০২৫>১৮জানুয়ারী ২০২৬> ২৫জানুয়ারী২০২৬>১৫ফেব্রুয়ারী২০২৬>২০ফেব্রুয়ারী২০২৬

শরীয়াহ্ ম্যাস্কিম ও এর নীতি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সমূহ

 

গতানুগতিক ধারার মত সরাসরি গুরু গম্ভির বিষয় ভিত্তিক পাঠ্য পুস্তকের মত কোন লেখা লিখতে আমার মন সায় দেয় না, যে লেখার মধ্যে মনের ইচ্ছাটা মিশে না তা আমার কাছে অযত্নে রান্না করা তরকারির মত বিস্বাদ। আমি যেমন পাঠকের জন্য লিখি তেমনি আমার নিজের আনন্দ ও বুঝার জন্যও লিখি। কেউ যদি কেবল তথ্য উপাত্তে ভরা পাঠ্য পুস্তক চান তবে বাজার থেকে খুঁজে নিতে অনুরোধ করবো। আমি আগডুম বাগডুম অনেক কথাই বলবো তার মধ্যে দিয়ে আপনার কাছে মূল বিষয়টির জ্ঞান চলে যাবে তা বলতে পারি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “সেই সময়” উপন্যাস আকারে ইতিহাস লিখেছেন, তা যতটা মন ধরে রেখেছে, যখন পাঠ্য বিষয় হিসেবে ইতিহাস ছিল তখনকার সেই পড়া থেকে গোপালের সিংহাসন আরোহণ এর গল্পটা ছাড়া তেমন কিছুই আর মনে নাই। সরস মন খেজুরের রস খুঁজে আর নিরস মন নিমপাতা জোড়া জোড়া খুঁজে, তা তিতা হলেও তাদের কাছে ভালোই লাগে কারণ হয়তো তারা র‌্যাট রেইসে বা ইঁদুর দৌরে প্রথম সারিতে থাকতে চান। আমি আজীবনই অযথা অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা প্রবণতা থেকে দুরে থেকেছি। অবসর পঠনে যে জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তা আমার প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্য পুস্তকের চেয়ে বেশি। তাই মন মাতান দুপুর,  বিকাল, সন্ধ্যা আমার মনকে চিরায়ত আন্দোলিত করে আসছে আশৈশব, খড় খরা চৈত্রের কাঠ ফাটা রোদ্দুর তাই আমার কাছে বিরক্তিকর। 

এবার তবে প্রসঙ্গে আসা যাক, এর আগে সুকুক নিয়ে আমার লেখা পড়ে পাঠক প্রতিক্রিয়া ছিল, কই সুকুক সম্পর্কে আপনার লেখায় তো তেমন কিছু পেলাম না, অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেছেন, অনেক হাস্যরসও করেছেন কিন্তু সুকুকের সঞ্জা কই? বেশ কয়েকটা ভিন্ন ভিন্ন সোর্স থেকে আমি প্রায় একই রকম মন্তব্য পাওয়ার পর বুঝলাম, লেখাটা যারা পড়েছেন তারা সুকুক সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে পড়েছেন কিন্তু সরাসরি সুকুকের সঞ্জা না বলে আমি এর সামগ্রিক স্কোপ গুলো সম্পর্কে বেশি বলেছি আর এর প্রয়োজনয়িতার দিকে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। আমি সুকুক কি তা বলেছি ঠিকই লেখাটাতে, সাক এর বহুবচন যে সুকুক তাও বলেছি, এটা যে একটা হুন্ডি বা বন্ড তাও বলেছি, কিন্তু পাঠক মনের চাওয়া, ”আরে ভাই সংক্ষেপে বলেন, অত কথা শুনার সময় নাই, এটা কি জিনিস খায় না মাথায় দেয়, সেটা আগে বলেন” এই মানুষিকতার কাছে আমি ধরা খেয়ে গেছি ওই লেখাটাতে। সামগ্রিক প্রেক্ষিতটা না বুঝলে আপনি মূল বিষটা বুঝবেন কি করে? টবে যত্ন করে ফোটানো ফুল আর বনের ঝোপঝাড়ে অযত্নে ফুটে থাকা ফুলে তাই এত তফাত। একটা প্রকৃত জ্ঞান আরেকটা কৃত্রিম বটে, তবে আজকালকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রকৃত জ্ঞান আর কৃত্রিম জ্ঞানের তফাতটা কয় জন বুঝবে তা বলা মুশকিল। সবাই টু দি পয়েন্ট চায়, তাই চলেন টু দি পয়েন্ট ও অতি সংক্ষেপে কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বর্ণনা দিয়েই শুরু করি।

তারও আগে বলে নেই, নিম্নে বর্ণিত বক্তব্য সমূহ আমার অর্জিত জ্ঞান থেকে প্রদত্ত বর্ণনা, যারা আরো অধিক জ্ঞানী তারা যদি দ্বিমত পোষণ করেন তবে অনুরোধ থাকবে এ নিয়ে অযথা বিতর্ক না করে যাহা সঠিক মনে করেন তাতে সন্তুষ্ট থাকতে ও আমার প্রদত্ত মতামতগুলো অগ্রাহ্য করতে। আমি যা জেনেছি তার প্রেক্ষিতে বর্ণনা করেছি। ব্যতিক্রম পেলে বা ভিন্ন মত পেলে সেটাই গ্রহণ করবেন আমার তাতে কোন আপত্তি থাকবে না।

এমন কি যা ইসলামী ব্যাংক করতে পারে অথচ কনভেনশনাল সুদী ব্যাংক গুলো পারে নাঃ-
এই প্রশ্নটা আমি ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর যতগুলো ক্লাস নিয়েছি তার প্রথমেই জানতে চেয়েছি। আগে কেউ বলতে পারতো না, ইদানীং দেখি বিষয়টা অনেকেরই সাধারণ জ্ঞানে চলে এসেছে। তার পরও জানতে চাই কারণ তাতে করে যারা জানে না তাদের তা জানা হয়ে যায়। কনভেনশনাল সুদি ব্যাংকের লেনদেনে একটা নিষেধাজ্ঞা আছে তা হলো সুদি ব্যাংক সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারে না। কনভেনশনাল সুদি ব্যাংক তার গ্রাহক গণকে ঋণ সুবিধা প্রদান করতে পারে মাত্র, অর্থাৎ কনভেনশনাল ব্যাংক সেই গ্রাহককে ঋণ প্রদান করে যার ব্যবসা বিনিয়োগ থেকে মুনাফা অর্জনের মধ্যমে গ্রাহক ব্যাংককে আর্থিক সুবিধা বা গ্রহণকৃত ঋণের অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি মোতাবেক সুদ প্রদান করতে পারে। তার মানে কনভেনশনাল ব্যাংক নিজে সরাসরি কোন ব্যবসায় বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করতে অসমর্থ। অপর পক্ষে ইসলামী ব্যাংঙ্ক এর কাঠামই যেহেতু আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর অনুরূপ আর ইসলামী শরীয়াতে প্রদত্ত নীতিমালার অধীনে গ্রাহকের সাথে অংশিদারিত্বর ভিত্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে তাই ইসলামী ব্যাংক সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে সমর্থ। সেই জন্যই বলা হয় ইসলামী ইতিহাসে ব্যাংকিং ছিল না তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল যা আজকে আমরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে পুন চালু করেছি মাত্র। এক কথায় কনভেনশনাল ব্যাংক সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারে না কিন্তু ইসলামী ব্যাংক তা পারে।

শরীয়াহ্ র সোর্স গুলো প্রসঙ্গেঃ-
অনেকেই ইসলামী ব্যাংকিং কি শরীয়াহ্ সম্মত কিনা তা জানতে চায় কিন্তু কেউ স্বচ্ছ ভাবে জানে না শরীয়াহ্ কি বা অন্তত এর সোর্স কিংবা ম্যাক্সিম গুলো কি কি? ইসলামকে পূর্নাঙ্গ জীবন বিধান বলা হয় যাকে আরবিতে দীন বলে আর যে নীতিমালার ভিত্তিতে ইসলামী উম্মার খলিফা দেশ চালান তার সংবিধিবদ্ধ ব্যবস্থাই হলো শরীয়াহ্ । যত সামাজিক লেনদেন বা আরবিতে মুয়ামালাহ্ আছে তা সঠিক ভাবে করার নীতিমালার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া আছে শরীয়াহতে। এর সোর্স বা ভিত্তি হলো গুরুত্বর ক্রমানুসারে ১) পবিত্র কোরআন, ২) সুন্নাহ্ বা হাদিস, ৩) ইজমা আস সাহাবা (সাহাবা (রাঃ) গণের ঐক্যমত্য) আর ৪) কিয়াস (ভারডিক্ট বেইজড অন রিজেম্বেলেন্স – সমানরূপ উদাহরণের ভিত্তিতে গৃহীত নীতি) এই চারটি। এছাড়া শরীয়াহ্’র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাক্সিম আছে যার ভিত্তিতে আইন গুলো বিধি বদ্ধ ও বৈধ হয়। শরীয়াহ তে নতুন আইন সন্নিবেশের বা সংযোজনার উপায় আছে কেবল ইজতিহাদ এর মাধ্যমে যা সম্মানিত মুজতাহিদ গন এর প্রস্তাবনার প্রেক্ষিতে ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান খলিফা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হতে পারে অন্যথায় নয়। 

ইজতিহাদ ও মুজতাহিদ প্রসঙ্গঃ-
ইজতিহাদ বলতে বুঝায় উম্মাহ বা সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জাতির সামনে যদি কোন নতুন মুয়ামালাত (পারষ্পরিক লেনদেন) সংক্রান্ত জটিল প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, তখন যে বিজ্ঞ জন কোরআন, সুন্নাহ্, ইজমা আর কিয়াসের মাধ্যমে তার গবেষণার প্রেক্ষিতে ফয়সালা প্রদান করেন যা মাসালাহ্ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে সুরা বোর্ড ও খলিফা কর্তৃক সমর্থিত হয়ে চূড়ান্ত ভারডিক্টে আকারে শরীয়ার আইনে সন্নিবেশিত হয়। ইজতিহাদ করতে পারেন কেবল মুজতাহিদগণ যারা অত্যন্ত সম্মানিত ও বিজ্ঞ, যারা কোরআনে হাফেজ তো বটেই, তার চাইতেও তাদের লক্ষাধিক হাদিস মুখস্থ কিংবা নখদর্পণে থাকে। যে কেউ তাই মুজতাহিদ হতে পারেন না। তাই আজকাল ফতোয়ার ভিত্তিতে যে সকল বিতর্ক গুলোর ঝড় শুনা যায় তা শরীয়াহ্’র অংশ নয় মোটেও। ফতোয়া মূলত কোন আলেম কর্তৃক তার জ্ঞান লব্ধ বিচারের ফলাফল কিন্তু মাসালাহ্ হলো কোন মুজতাহিদ কর্তৃক ইজতিহাদ প্রদত্ত তার গবেষণা লব্ধ মীমাংসা। মাসালাহ্ যতই গবেষণা সিদ্ধ হোক না কেন তা যদি সুরা বোর্ড কর্তৃক সুপারিশকৃত হয়ে খলিফার চূড়ান্ত সমর্থন বা স্বাক্ষর না পায় তবে তা শরীয়াহ’র অন্তর্ভুক্ত হয় না। তাই যতদিন মুসলিম উম্মাহ (বিশ্বজনীন মুসলিম জাতি)র খলিফা থাকছে না ততদিন শেষ খলিফা কর্তৃক চুড়ান্তকৃত শরিয়াহ্ ই বর্তমান মুসলিমদের জন্য অবশ্য পালনীয় নথি যার অন্যথা করার মানে শরীয়াহর লঙ্ঘন বা ভায়োলেশন অব শরীয়াহ। 

শরীয়াহ্’র ৫টি মৌলিক নীতিসূত্র বা  ম্যাকসিম (Sariah’s 5 Maxims) নিন্মে অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলোঃ


নীতিসূত্র ১: বিষয়গুলি তাদের উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল।
Maxim 1: Matters are determined to their intentions. 
আরবিতে যাকে নিয়ত বলা হয়, অর্থাৎ কাজটির উদ্দেশ্য কি, কিংবা লেনদেনের উদ্দেশ্য কি সেটা বিচার্য বিষয়। যদি উদ্দেশ্য হয় খারাপ কিংবা বৈষম্য পূর্ণ কিংবা অসাধুতা বা অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করা তবে তা সঠিক নিয়মে করলেও তা গ্রহণ যোগ্যতার বিচার অনুপযুক্ত ও  শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। তাই সবার আগে উদ্দেশ্য বিচার করা জরুরী। 

নীতিসূত্র ২: সন্দেহ দ্বারা নিশ্চয়তাকে প্রতিস্থাপন যায় না।
Maxim 2: Certainty can not be overruled by doubt.
যে বিষয়টি নিশ্চিত তাকে অযথা সন্দেহ দ্বারা দ্বিধান্বিত করা যাবে না। অনেক সময় আমাদের সমকালীন জুরিসপ্রডেন্সে ”বেনিফিট অফ ডাউট” কিংবা ”সন্দেহের সুবিধা” টার্মটি শুনে থাকি, যাকে আইনের ফাঁক ফোকর বলে অনেকে, শরিয়াহ্ আইনে এরকম বেনিফিট অব ডাউট সুযোগটি থাকে না। যা নিশ্চিত তাতে সন্দেহ প্রবেশ না করা আর যার মধ্যে সন্দেহ আছে তা নির্মূল না করা পর্যন্ত ভারডিক্ট দেয়া হয় না।

নীতিসূত্র ৩: কষ্ট থেকেই সকল সুযোগ-সুবিধা বুঝা যায়।
Maxim 3: Hardship begets facility.
সমস্যাটির জটিলাটা কিংবা লেনদেনটির জটিলতা প্রকট আকারে বিচার করলেই এর আভ্যন্তরীণ ভুল ত্রুটি গুলো স্পষ্টতর হয়। তাই কোন মাইক্রো ইকনমিক সমস্যাকে অধিকতর গভীরতায় চিন্তা করে এর প্রতিকারের উপায় গুলো নির্ধারণ করা হয়।


নীতিসূত্র ৪: প্রথা, রীতি, রেওয়াজ হলো সালিসকারী বা ফয়সালাকারী (সমাধানকারী)।
Maxim 4: Custom is an arbitrator.
সমাজে প্রচলিত রীতি ও রেওয়াজ সমূহ যা ইসলামের মৌলিক ধারনা সমূহের সাথে সাংঘর্ষিক নয় সেগুলোকে সমাধান হিসেবে শরিয়াহ্ সমর্থন করে থাকে।

নীতিসূত্র ৫: লা দিহারার ওয়ালা ধিরার।   ( ضِرَارَ وَلَا ضَرَرَ لَا )
Maxim 5: Laa diharara walaa dhirar
"ক্ষতিও করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না।"

এর সহজ অর্থ হলো কারো ক্ষতি করা যাবে না এবং কারো মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না। ইসলামে নিজের বা অন্যের কোনো প্রকার ক্ষতি করা বা অনিষ্ট সাধন করা নিষিদ্ধ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এটি ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি (আইনি নীতি) এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি প্রসিদ্ধ হাদিস, ক্রয়-বিক্রয় সম্পর্কিত কিছু বিধি-নিষেধ, ইবনে আব্বাস (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, হাদিস নং ২৫০১ । এটি মূলত সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ক্ষতিকর কর্মকান্ড থেকে দূরে থাকার এবং পারস্পরিক সহানুভূতি বজায় রাখার শিক্ষা দেয়।

নীতিসূত্র ৫ এর উপ- নীতি (১): ক্ষতি দূর করতে হবে।
Sub Maxim of 5 (1): Harm shall be dispelled.
লেনদেনে হতে পারে এমন সকল ক্ষতির সম্ভাবনাকে  আগেই নির্মূল করতে হবে।

নীতিসূত্র ৫ এর উপ- নীতি (২): এক ক্ষতি অন্য আরেকটি ক্ষতির মাধ্যমে দূর করা যাবে না।
Sub Maxim of 5 (2): Harm can't be eliminated by another harm.
একটি ক্ষতি নির্মূল করতে গিয়ে যদি আরেকটি ক্ষতির সৃষ্টি হয় তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। বর্তমান সময়ে যেমন বলা হয় বৃহত্তর ভালোর জন্য সামান্য ক্ষতি হলে দোষ নাই, এই বক্তব্যটি শরিয়াহ্ অস্বীকার করে এই ম্যাক্সিম এর মাধ্যমে। 

উপরোক্ত পাঁচটি ম্যাক্সিম বা নীতিসূত্র বুঝতে পারলে এটা পরিষ্কার হয় যে, শরীয়া নীতিমালা অন্যান্য যে কোন নীতিশাস্ত্র থেকে স্বতন্ত্র ও মানব কল্যাণে অত্যন্ত কার্যকর। এই ম্যাক্মিম সমূহ অনুসরণ করে যে পদ্ধতি প্রণালীবদ্ধ হয় তা কখনই মানবতার বিরুদ্ধে যাবে না। আর্থিক লেনদেনে যত প্রকার জুলুম কিংবা অন্যায্যতা হতে পারে তা শরীয়াহ নীতিমালা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়। এই কারণেই শরীয়াহ ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা মানব কল্যাণে নিবেদিত বলে দাবি করতে পারে।

শরীয়াহ্ স্ট্যান্ডার্ড নীতি নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমূহঃ-

সমকালীন প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনের শরীয়াহ্ স্ট্যান্ডার্ড যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত হলো ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অ্যাকাউন্টিং এবং অডিটিং সংস্থা বা এএওআইএফআই, AAOIFI = Accounting and Auditiong Organization for Islamic Financial Institutions যাকে সংক্ষেপে বলা হয় আইওফাই। এটি বাহরাইন ভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা যা শরীয়াহ মান বজায় রাখা এবং প্রচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে। ১৯৯১ সালের ২৭ মার্চ এটি বাহরাইনে নিবন্ধিত হয় যাতে ৪৫টিরও বেশি দেশের সদস্যপদ রয়েছে। 


বাংলাদেশে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরীয়া সুপারভাইজারী বোর্ড (SSB) মূলত সেই ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের ক্ষেত্রে শরীয়ার নীতিমালা কতটা পরিপালিত হচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার নীতিমালা প্রকাশ করেছে। 

বাংলাদেশে শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ কল্পে সেন্ট্রাল শরীয়াহ্ বোর্ড ফর ইসলামী ব্যাংকস অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যাকে সিএসবিআইবি CSBIB  “Central Shariah Board for Islamic Banks of Bangladesh” বলা হয়। সঠিকতার সাথে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিএসবিআইবি বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ কর্মশালা সহ নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে চলেছে।

জনাব শাহ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এর বই “ইসলামী ব্যাংকিং বৈশিষ্ট্য ও কর্মপদ্ধতি” থেকে জানা যায় বেসরকারি পর্যায়ে  এদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গণসচেতনতা ও প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ শুরু হয় ১৯৭৯ সালের শুরু থেকে। ওই বছরই জুলাই মাসে ইসলামিক ইকোনমিকস রিসার্চ ব্যুরোর (IERB) উদ্যোগে ইসলামী অর্থনীতির উপর তিন দিন ব্যাপী এক সফল আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে নভেম্বর, ১৯৮১ তে এটি বাংলাদেশ ইসলামিক ব্যাংকার্স এ্যাসোসিয়েশন (BIBA) নামে পুনর্গঠিত হয় যার শ্লোগান ছিল “BIBA to fight against RIBA” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রিবা মানে সুদ, আরবিতে সুদকে রিবা বলা হয় যা ইসলামী শরীয়াহ্ ও অর্থনীতিতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। ১৯৮১ সালে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজ ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর এক মাস মেয়াদী আন্তঃব্যাংক আবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। এই প্রশিক্ষণ কোর্সে বাংলাদেশ ব্যাংক, সকল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিআইবিএম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ হতে সর্বমোট ৩৭ জন অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশে বর্তমানের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম মূলত এই প্রশিক্ষণ কর্মশালা থেকেই বিস্তার শুরু করে। একে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং এর বীজ (Seed) বলা যায় যা থেকে আজকের বিশাল ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা সবাই আমারা দেখেতে পাচ্ছি। 


সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ১৫আগস্ট২০২৫>১৮জানুয়ারী ২০২৬>২৫জানুয়ারী২০২৬>১৯ফেব্রুয়ারী২০২৬> 

 

Monday, January 5, 2026

মুশারাকা বা যৌথ ব্যবসা যে কারণে এদেশে অকার্যকর

 


 ১২ই আগস্ট ২০২৫ তারিখে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে নেয়া ইসলামী ব্যাংকিং অডিটের ক্লাসে একজন প্রশ্ন করেছিলেন যৌথ কারবারে যদি অংশীদাররা ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্টের যথেচ্ছাচার করে তবে কি হবে বা এর প্রতিকার কি, তখন বলেছিলাম আপনি মুশারাকার কথা বলছেন, যা বাস্তবে প্রফিটেবল হয়নি। তার কথা শুনে আমার মনে হলো যে, তিনি আসলে মুসারাকা সম্পর্কে ও তার নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। তাকে বলতে হলো, বিগত সময়ে মুশারাকা কিংবা যৌথ কারবারের অধিকাংশ বিনিয়োগ প্রডাক্ট খেলাপি হওয়াতে ওই মোডে ইনভেস্টমেন্ট নতুন করে কম দেখা যাচ্ছে। বলেই দিলাম, মুশারাকায় প্রডাক্ট ইদানীং আর হচ্ছে বলে আমার জানা নাই।  বিষয়টা চিন্তার বিষয় বটে যা নিয়ে আমার মধ্যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আগে থেকেই আছে।

এটা প্রমাণিত সত্য এখন আমার কাছে, এক দশকেরও বেশ আগে চেষ্টা করেছিলাম সুদি কারবার থেকে সরে যাবো, মানে ব্যাংকের সুদ নির্ভর চাকুরী থেকে সরে যাবো তাই কয়েকজন তরুণ ও নিকট জনকে একত্রিত করে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ডেলফি ম্যাথড ব্যবহার করে কোন ব্যবসাতে বিনিয়োগ করা লাভজনক হবে তা নির্ধারণও করেছিলাম। সবার মতামতের ভিত্তিতে আমার গাছা বোর্ড বাজারের জমিতে একটা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে গ্লাডিওলাস ফুল এর গাছ এর চাষ করার পক্ষে সবাই মত দিয়েছিল। বীজ সংগ্রহ করার জন্য একজন এক্সপার্টকেও কন্টাক্ট করা হয়েছিল। শুরুর দিন মানে চুক্তির দিন সবাই উপস্থিত। আমরা বীজ মানে গ্লাডিওলাসের টিউনিকেটেড বাল্ব বা পিয়াজ গুলো কোল্ড স্টোরেজ থেকে নিয়ে আসার জন্য ৫ সদস্য প্রত্যেকে সমান মূলধন বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ওই এক্সপার্টকে টাকা দিবো। সেই উদ্দেশ্যেই গোলটেবিল বৈঠক, ওই দিন আকস্মিক যে নাটক হলো তা আমার জীবনের আরেকটা রিয়ালিটি শক। এক পার্টনার অযথা ওই এক্সপার্ট অহেতুক কারণে সন্দেহ করা শুরু করে দিল। নানা প্রকার তার প্রশ্ন তার কাছে। আমরা তো আগে থেকেই সব জেনে শুনে ওই দিন বিনিয়োগ করতে বসেছিলাম। আমাদের মেমরেন্ডাম আর আরটিক্যালস অফ এসোসিয়েশন তো অনেক যুক্তি তর্ক সাপেক্ষে আগেই সর্ব সম্মতি নিয়ে গঠন করা হয়ে গিয়েছিল। তা হলে ব্যবসা শুরুর টেবিলে বসে হঠাৎ করে এই তর্ক উত্থাপনের কি যুক্তি থাকতে পারে তা আজও আমার কাছে অস্পষ্ট। ওই বৈঠকে সেই অংশীদার তার ক্যাপিটাল কন্ট্রিবিউট করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বসলো। শুধু মাত্র তার মনে হয়েছে যে এক্সপার্টকে আমরা ডেকে এনেছি সে হয়তো মিথ্যা বলছে। আমি পুরাই থ বনে যাই। সেদিনের চুক্তি ভঙ্গ আমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেয় নাই, মাথায় চলছিল সকল প্রকার ভয়ংকর চিন্তার টর্নেডো। একটা পাইলট প্রজেক্টে বিনিয়োগ, তা এই শুরুতেই এত বড় একটা ধাক্কা ! পরে বুঝেছি এ দেশটার মানুষগুলোর রক্ত বহু প্রজাতির মানুষের মিশ্রণে একেবারে একাকার হয়ে গেছে। নানা জেনেটিক সংমিশ্রণে আমরা সমৃদ্ধ হয়ে কি উন্নত হয়ে গেছি না কি বিবর্তিত হয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে গেছি তা বুঝে উঠা শক্ত।

এতেই যদি শেষ চমক হতো তা না হয় মেনে নিতাম, এর পরের ঘটনা আরও নাটকীয়। বাকি যে চার জন ছিলেন তারা আমাকে প্রধান করে একটা কনসোর্টিয়াম ধরনের জয়েন্ট ভেনচারে সম্মত হলো। তো আমি সেই মত তা পরিচালনা করতে রাজি হলাম। একজন কে দায়িত্ব দেয়া হলো যে, নতুন একটা প্রডাক্ট লঞ্চ করা হবে তো সে গণযোগাযোগ করবে। সে রীতি মত ওভার কনফিডেন্ট হয়ে জানালো লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে অডিটোরিয়াম। বাস্তবতা হলো সেদিন লোকজনই এল না। যাও বা এলো তা সংখ্যায় খুব নগণ্য। তার পরের ঘটনা আরো হৃদয় বিদারক, আমার সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রজেক্ট সম্পর্কে এর ভবিষ্যৎ ও পরিচালন ব্যয় বিবেচনায়, আমি যখন তা বন্ধ করে দিতে বললাম সে আমার দিকে কলম ছুড়ে মারলো, সেই ছড়াটার মত, দাদুর হাতে কলম ছিল ছুঁড়ে মেরেছে, উহ্ বড্ড লেগেছে। ছড়াটা আমার প্রথম সন্তানকে ছোট্ট বেলায় শিখিয়েছিলাম, ও বলতো বন্ড লেগেছে। আমার সেই দিনকার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছুড়ে মারা কলমটাও আমার কাছে বন্ড লেগেছিল। বুঝেছিলাম এদেশের মানুষজন যৌথ করাবারের জন্য এখনও যোগ্য হয়ে উঠে নাই। প্রধান সমস্যা মনে হয় স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রেম আর দ্বিতীয়টা মনে হয় পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মনে মনে শপথ নিয়েছিলাম আর না, এর পর যা করবো একক উদ্যোগে করবো, কাউকে সাথে নিয়ে নয়।

মুশারাকা কেন বার্থ হয় তা নিয়ে তাই আমার চিন্তা চলছিল বহু দিন আগে থেকেই তাই ভাবলাম একটা জরিপ করে দেখি অন্যরা কি বলেন এ প্রসঙ্গে। জরিপের ফলাফলটা নিম্নরূপঃ 


উপরোক্ত জরিপটি ১৫আগস্ট হতে ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখের মধ্যে তিনটি অনলাইন ফোরামে (3R forum, Officer-IT forum 2004, CEMBA Alumin Association ) ও হাতে হাতে SB PLC Wage Earner’s corp. Br. Dhaka এ কারা হয়। স্যাম্পল সাইজ ২৫০ জন, ডেমোগ্রাফিক্সঃ Professionals  in Services majority Bankers। জরিপটির ফলাফল হিসেবে নিচের উক্তিটি সঠিকত্বর বিচারে সঠিক বলা যায়।

ফলাফল হলো
“স্বল্প শ্রমে ও সময়ে অতি মুনাফার লাভের প্রত্যাশায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব দ্রুত চরমে পৌঁছে যায়, যার ফলে সদস্যগণ শুদ্ধাচার কিংবা নৈতিকতা লঙ্ঘন করে বসে আর সেই কারণেই আমাদের দেশের যৌথ কারবার বা মুশারাকা উদ্যোগ সমূহ বেশি দিন টিকে না।”

আমার লেখাটাতে যদি প্রাপ্ত ফলাফল আমি লিখতাম জনমত যাচাই না করেই তবে তা হতো ফতোয়া, মানে যে মন্তব্য বা ফয়সালার বিপরীতে বা পেছনে কোন গবেষণা থাকে না, আর যা মনগড়া হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমাদের দেশের জনগণ এমন যে হরিণের মত নিজের পেটে ঢেকুর উঠলেও ভয় পায়, মানে সামান্য একটা ইমুজি দিয়ে নিজের মত প্রকাশেও দ্বিধা বোধ করে, ১০ রকমের চিন্তা করে, দিবো কি দিবো না, দিলে না জানি কি থেকে কি হয়। সেই দেশে জনমত জরীপ, ওরে ব্বাবা তা কি করা সহজ? সাধারণ একটা জরীপ যাতে সাপ, ব্যাঙ কেঁচো কিছুই বের হওয়ার সম্ভাবনা নাই বা একদম শূন্য, তা নিয়েও অনেকের অনেক মন্তব্য সহ্য করতে হয়েছে। কেউ বলেছে কে এই কারণগুলো ঠিক করেছে? কেউ বলেছে সবগুলোই তো কারণ ইত্যাদি ইত্যাদি। যে কোন জরীপের একটা উদ্দেশ্য থাকে, আমি সেই উদ্দেশ্যটা উল্লেখ করেছি। আমার একটা লেখায় আমি এই প্রসঙ্গটা আনবো তার আগে জনমনে এ বিষয়ে কি রকম মনোভঙ্গী বিরাজ করছে তার একটা ইঙ্গিত আমার দরকার ছিল, এর বেশি কিছু না। এটা থিসিস পেপার না কিংবা এর উপর পিএইচডিও করছি না, সাধারণ একটা জনমত যাচাই। এদেশের জনগণ এতটাই লিডারশীপ শূন্য যে তারা ঐক্যবদ্ধ কোন সিদ্ধান্তেই পৌছাতে হিমশিম খায় বা মনে হয় চায় না। দার্শনিক কিংবা মনস্তাত্মিক কোন চিন্তার ঐক্য নাই বা কোন একটা বিষয়েও সকলের একক ঐক্যমত্য পাওয়া সহজ হয় না। তার পরও বলতে হবে, উপরোক্ত জরিপে পরিষ্কার ভাবে একটি জনমত পাওয়া গেছে, যা আমি লেখক হিসেবে মনে করি একটি অনন্য উদাহরণ। বন্ধু তারেককে তাই বলেছিলাম, তুই যে আমার উপরোক্ত মতামত নিয়ে দ্বিমত পোষণ করবি তা আমি আগে থেকেই জানতাম। সমস্যাটা ওই যে আমরা যতই ঐক্যমত্য মতামতে আসতে চাই না কেন, সমস্যা হলো পেটে ঢেকুর উঠলেও মনে হতে পারে বাইরে কোথাও কেউ পটকা ফুটাইছে।

বিষয়টার একটা মনস্তাত্ত্বিক দিক আছে যার প্রতিফলন আমরা আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপ ডাইনামিক্সে দেখতে পাই। ১০০ জন সদস্যর একটা অনলাইন গ্রুপের মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৬ জন সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে থাকে যা দেখে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ৮ থেকে ১০ জন আর এই পুর ঘটনা প্রবাহ নির্বাক হয়ে পর্যবেক্ষণ করে বড়জোর ২৫ জন, বাকিরা পুরাই ঘুমন্ত মানে স্লিপিং সদস্য। এটাই আমাদের দেশের গ্রুপ ডাইনামিক্স আমার অভিজ্ঞতায়। ২০১০ সাল থেকে ফেইসবুকের উত্থান আমি দেখে আসছি, তার আগে ইয়াহু ইমেইল গ্রুপের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ার চেষ্টাও করে দেখেছি। ফেইসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার আর এখনকার হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপ গুলো সব গুলোতেই আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল ও আছে। তারই প্রেক্ষিতে উপরের  গ্রুপ ডাইনামিক্স অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান থেকে বলতে বাধ্য হচ্ছি এটা আমাদের দেশের চিত্র, আমার ধারণা ইউরোপ আমেরিকা কিংবা চায়নার গ্রুপ ডাইনামিক্সটা ভিন্ন হবে হয়তো। যার মানে হলো এদেশের মানুষগুলো আসলে কচ্ছপের মত মাথা বের করে আবার খোলসের ভিতর মুখ লুকায়, পাছে লোকে কি বা বলের ভয় পায়, সহজে নিজেকে প্রকাশ করে না বা করতে ভয় পায়। এদের মাঝেই কিছু লোক আছে যারা চোরা গোপ্তা হামলা করে আপনার অর্থ সম্পদ লোপাট করার উপায় খোজে আর তাতে সফলও হয়। আমি নিজেই এরকম কয়েকটা হামলার শিকার হয়েছি সম্প্রতি তবে যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে বাঁচিয়ে গর্ত থেকে উঠেও এসেছি । এদেশের মানুষগুলোর এরকম আচরণ কেন তা প্রত্নতাত্ত্বিক ও সমাজ বিদদের গবেষণার বিষয় হতে পারে তবে যা পাওয়া যাবে তা রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই বলে গেছেন, বহু রক্ত ধারার সংমিশ্রণে আমরা মিশ্র জাতি বা কালারড পিপলস। আমাদের মনটাতেও তাই নানান রংয়ের খেলা চলে। কখন সবুজ, কখন পিঙ্গল, কখন তামার রং এ রঞ্জিত। এত নানান রং ঢেলে যে সমাজ তাতে ঐক্যের চেয়ে অনৈক্যই বেশি। এ সমাজে মুশারাকা প্রয়োগ উলু বনে মুক্তা ছিটান ছাড়া আর কিছুই ফল দিবে না। আমার হিসেবে একারণেই এদেশে মুশারাকা বা যৌথ কারবার বিফলে যায়।

প্রশ্ন উঠতেই পারে যখন মুশারাকা বিফল হচ্ছে তবে প্রতিকারটা কি? প্রতিকার ওই মুরাবাহা, মুদারাবা আর বাই মওয়াজ্জল কিংবা বাই-সালাম আর বাই ইশতিশনা। তবে শুঁকুক এ দেশে ভালো ফল দিবে তাতে সন্দেহ নাই, কেন যে এই শরিয়া ম্যাকানিজমটার বহুল ব্যবহার হচ্ছে না তার পেছনের কারণ মনে হয় মানুষজন আসলে এ বিষয়গুলো কেবল জানতে শুরু করেছে। সকলের যখন এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান হয়ে যাবে তখন আর বলতে হবে না, সবার দাবীর প্রেক্ষিতেই এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়াগুলো নির্ভর করে নতুন নতুন ডিপোজিট ও বিনিয়োগ সেবা গুলো আমরা বাস্তবে দেখতে পাবো।
 

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ১৫আগস্ট২০২৫> ২১আগস্ট২০২৫> ২৩অক্টোবর২০২৫> ২৫ডিসেম্বর২০২৫> ০৬জানুয়ারী২০২৬>

 

Sunday, January 4, 2026

অর্থনীতি ও ব্যাংকিং সেক্টর পর্যালোচনা - ২০২৫ বর্ষ সমাপনী

 

 আমার মত অতি সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং সেক্টর ও অর্থনীতি নিয়ে কথা বলাই সাজে না, তার পরও চেষ্টা করে দেখি, অন্তত একজন অতি সাধারণের মন্তব্য যারা ব্যাংকিং ও অর্থনীতি একদমই বুঝে না তাদের কাজে লাগলেও লাগতে পারে। বিগত দুয়েক বছর একটা করে পর্যালোচনা করে যাচ্ছি, এবারেরটা বাদ যাবে কেন। আগের বছর গুলোতে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিকতা প্রকট ছিল তা মন্তব্য করেছিলাম, এ বছর কি ব্যাংকিং সেক্টর সেই সংকট কাটায়ে উঠতে পেরেছে? প্রশ্নটা এখানেই, আর বিগত বছরগুলোতে যে ইসলামী ব্যাংক গুলো মারাত্মক রকম তারল্য সংকটে পরেছিল তা কি এত সহজেই কাটবে? এই সব প্রশ্নরই উত্তর খুঁজবো এই আলোচনায়। বিগত ২০ বছরে ব্যাংক সম্পর্কে নানান অভিজ্ঞতা হয়েছে, অনেকের সাথে কথা বলে যা বুঝেছি, তা হলো এ দেশের অনেক মানুষই ব্যাংকিং সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানে না। সাধারণ মানুষের কথা না হয় বাদ দিলাম, ব্যাংকে নতুন জয়েন করা অনেক ইয়াং ব্যাংকারের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা কম থাকায় বেশ কিছু বিষয়ে সংশয়ে ভুগে। মোদ্দা কথা যেহেতু ব্যাংকিং সম্পর্কে প্রাইমারি, সেকেন্ডারিতে তেমন কিছু পাঠ্য পুস্তকে থাকে না যার ফলে এ বিষয়ে ধরে নেয়া হয়, যখন টাকা হবে, যখন বয়স বাড়বে তখন চলতি পথেই শিখে নিবে এসব। বিষয়টা এরকম হওয়াতে এই জ্ঞান স্বল্পতা দেখা যায় সাধারণের মধ্যে, এরকমই আমার মনে হয়েছে।

আমাদের ব্যাংক গুলোর সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো খেলাপি ঋণ মানে যে ঋণ আর ফেরত আসে না, যাকে এনপিএল বা নন পারফর্মিং লোনও বালা হয়ে থাকে। এযাবৎ যত ব্যাংকিং পর্যালোচনা দেখেছি তাতে এ বিষয়টি কমন, মানে পড়লে পরীক্ষায় কমন পড়বেই। ঋণ খেলাপির এটা করতে পারে না, ওটা করতে পারবে না ইত্যাদিও শোনা যায়, কিন্তু চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী এই বাগধারাটা সঠিক প্রমাণ করতে বিগত সময়ের মত এই প্রবণতাটি আমাদের দেশে মরণ ব্যাধির মত অর্থনীতি আর ব্যাংকিং সেক্টরে আঁশটে পৃষ্ঠে লেগে আছে যেন তা কাঁঠালের আঠা, কষ্মিণ কালেও ছাড়বে না। নিচের তথ্যচিত্রটি সেই  বিদঘুটে ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা প্রকাশ করে মাত্র। 

ফিগার আর এমাউন্টের মধ্যে পার্থক্য এই যে একটি শুধ সংখ্যা আরেকটি ওই সংখ্যার অর্থবহ উচ্চারণ, ৬,৪৪,৫১৫,00,00,000/- BDT সংখ্যাটি কথায় না লিখলে বোধগম্যতায় আসে না, তাই বলেই দেই, এটা ছয় লক্ষ চৌচল্লিশ হাজার পাঁচ শত পনের কোটি টাকা মাত্র। আমার ক্লাস ফাইভে পড়া ছেলেটা বুঝতেই পারছে না এত বড় সংখ্যা মানে এটা কত বড়, ওর বোধগম্যতায় লক্ষ টাকার উপর কোটি টাকা না হয় বিলিয়ন হবে কিন্তু এত টাকা !!, তাও ব্যাংক থেকে লোন দেয়? এটা ওর প্রশ্ন, আমি হাসলাম, মনে মনে বললাম, দেয় না মানে, ওই টাকা থেকে নিজেদের পকেটে যে কত পারসেন্ট যায় তা ওরাই ভালো জানে। আমারও তো টাকার দরকার তবে এতটা না, এই ধরেন কয়েক লক্ষ টাকা দিলেই হবে, তবে ভাই কবে যে ফেরত দিতে পারবো তা জানি না, এই ফাঁদে ধরা দিয়ে যদি দিয়েই ফেলেন তো মরেছেন ওই টাকা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন পেস্টের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, জীবনেও ওই পেস্ট তার টিউবের ফিতর ঢুকান যাবে না। এই সব ঋণ আদতে জন্মলগ্ন থেকেই কুঋণ তা সবাই জানে, জেনে বুঝেই দেয়, গোপনে নিজের পকেটে তার কিছুটা তো অবশ্যই যায়, তাই মনে হয় লোভ সামলাতে পারে না। বলছিলাম কি, প্রাইমারি থেকেই যদি সার্জিলের শুদ্ধাচার স্লোক গুলো মুখস্থ করানো হতো তা হলে মনে হয় কিছু মিছু সত্য নিষ্ঠ শুদ্ধাচরীর জন্ম হতেও পারতো এ দেশে। ভবিষ্যতে হয়তো হবে কোন একদিন, সেই আশায় বসে বসে দিখতে থাকি, দেঁকি না কি করে!।


ভুয়া প্রতিষ্ঠান কিংবা কাগুজে প্রতিষ্ঠান এর নামে অর্থ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করাটা একটা মারাত্মক রকম ক্ষতিকর প্রবণতা আমাদের দেশে, ছোট ছোট ঋণ গুলো ঠিকই ফিরে আসে কিন্তু বড় সর লোনগুলো করাই হয় যেন তা বার বার রিশিডিউল করে একটা অনৈতিক সুবিধা নেয়ার ইচ্ছাতে। এতে করে ক্যাশ টাকা কিংবা আমরা যাকে বলি লিকুইডিটির সুবিধাটা ব্যবসায় কার্যকর থাকে। হাতে টাকা থাকলে কত কি না করা যায়। মানুষকে বাকিতে বিক্রয় আর অগ্রিম ক্রয় এর সুযোগ দিতে গিয়ে অর্থনীতিকে কতগুলো রিস্ক ফ্যাক্টর হজম করতে হয়। একটা ব্যাংকিং এর বই পড়তে গিয়ে দেখি লেখক কেবল বাকিতে টাকা ফেরত প্রসঙ্গে বেশি কথা বলেছেন, মনে হচ্ছিল যেন বাকিতে টাকা’র লেন দেনই সব থেকে গুরুত্ব বহ বিষয়, বইটা আমি ঘৃণা ভরে ফেলে দিয়েছিলাম, পড়ি নাই। আমি বাকিতে বিশ্বাস করি না, নগদ যা পাও হাত পেতে না বাকির খাতা শূন্য, এই প্রবাদটা আমার মনের অনেক গভীরে প্রথিত, তাই বাকিতে বিক্রয় আর ভবিষ্যৎ ক্রয়ের ধারণা গুলোর সাথে যে ঝুঁকি জড়িত আছে তার সাথে আমার মাথার নিউরন গুলোর সংবেদন সংঘর্ষিক মনে হয়।

ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতাটা আমার মতে এদেশের মানুষের দর্শনের সাথে জড়িত। যারা ছা-পোষা মানুষ মানে “ভাই আমি কোন দল করি না, এই দু মুঠো খেয়ে পড়ে শান্তিতে থাকতে পারলেই আমাদের চলে যায়” এই টাইপের মানুষ গুলো আসলে বলতে চায় তারা সমাজের সকল জটিলতা থেকে নিজেদেরকে দুরে সরায়ে রাখতে পছন্দ করে। এরা সৎ কিংবা অসৎ তা কিন্তু বলছি না, বলছি যে এরা দুষ্ট লোকদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে যারা জানে তারা অনেক মানুষের দেশে জন্মেছে, এখানে কেউ সেধে দিবে না, কাইরা নিতে হবে, তারা তা নেয়ও ওই ছা-পোষা মানুষ গুলোর নাকের ডগার সামনে দিয়ে আর উনারা তা দেখে কেবল ছে ছে করে, তার বেশি কিছু করতে গেলে ওই যে আবার জটিলতা আর শৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে হয়, এই ভয়ে বেশি কিছু বলে না। তার চেয়ে চা এর আড্ডায় কিংবা সমবয়সীদের সাথে দেখা হলেই, দেশটা গেল, কোনদিন এই দেশের কিচ্ছু হবে না এই মন্তব্য করে নিজেদেরকে প্রবোধ দেয় মাত্র। যার ফলশ্রুতি হলো ওই খেলাপি ঋণ, যারা করে তারা জানে দেশের অধিকাংশ ওই ছা-পোষা মানুষ, তারা গর্ত থেকে মাথা উঁচু করে দেখবে ঠিকই কিন্তু গর্ত থেকে বের হয়ে কিছু করবে না। অন্য কেউ যদি তাদের হয়ে কিছু করে দেয় তবে তাকে বাহবা দিবে তাও দুর থেকে।

যা হোক, সাধারণ মানুষের এহেন মানুষিকতার প্রতি বিরূপ মন্তব্য না করি, কি আর বলবো ভাই, আমি নিজেও তো ওদেরই দলের। উহাদিগের বোধোদয় আমার বিচার্য বিষয় নয়, বরং জুলাই ২০২৪ অর্থ বছর থেকে এই ২০২৫ এর বর্ষ সমাপনীর কিছু প্রাথমিক তথ্য উপাত্ত থেকে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করি যাতে সুস্থতা আর অসুস্থতার কিছু চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। 

ইসলামী ব্যাংকিং এর একটি ইউনিট পর্যালোচনায় দেখা যায় বিগত হিস্টোগ্রামের প্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ তিন মাসের প্রজেকশনে অর্থাৎ মার্চ ২০২৬ এ এর আমানত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর, যা এপ্রিল ২০২৫ এর পর আর পূর্বের অবস্থায় পৌছায় নাই। যে ফান্ড সরে গেছে তা আর ফিরে আসেনি, হতে পারে তা অন্যত্র রাখা হয়েছে কিন্তু সাম্প্রতিক ইসলামী ব্যাংক গুলোর যা অবস্থা তাতে তা অন্য কোন ইসলামী ব্যাংকে সরে না গিয়ে বরং মানি মার্কেট থেকেই সরে গেছে বলে আমার মনে হচ্ছে, হয় তা ব্যবসায় বিনিয়োগ হয়ে গেছে না হয় তা স্থাবর কোন সম্পত্তিতে ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে। দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদ্যমান তখন অর্থনীতির সূত্র গুলো ঠিক মত কাজ করে না, তাই সর্বত্রই অসংগতি নজরে আসে। এটাও সেরকম রহস্যজনক কোন অসংগতি আমার দৃষ্টিতে।


আলোচ্য ব্যাংকিং ইউনিটটির বছর শুরুর বিনিয়োগ টার্গেটের বছরান্তের অর্জন তার ধারে কাছেও না। বিষয়টা কি চমৎকার ভাবে দেশের বর্তমান অবস্থা টা তুলে ধরেছে, সম্প্রতি যে শোনা যাচ্ছে বিনিয়োগ কমে গেছে বিপুল পরিমাণে, এটা তার একটা সুন্দর প্রমাণ। ইউনিটটি বিনিয়োগ করতে পারছে না, ফোর কাস্টিং বলছে পরবর্তী তিন মাসে তা আরে নিম্নমুখী প্রবণতা প্রকাশ করবে। আসন্ন কয়েক মাসে দেশে যদি শক্তিশালী কোন সরকার দক্ষতার সাথে হাল না ধরে তবে যেমন ম্যাক্র ইকনমি’র পতন হবে, তার সাথে সাথে মাইক্রো ইকনমিও মারাত্মক রকম ভাবে ধসে পড়বে, এটা মনে হয় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে।

ওই যে আগে বলা হলো যে, যখন দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে একটি বিশৃঙ্খলা থাকে তখন অর্থনীতির সূত্রগুলো ঠিক মত কাজ করে না, উপরের মুনাফার ট্রেন্ড লাইনটি তারই প্রমাণ। বিনিয়োগ ও আমানত উভয়েই নিম্নমুখী থাকা সত্যেও মুনাফা ঊর্ধ্বমুখী, বছর শুরুর প্রদত্ত টার্গেট ছাড়ায়ে উপরে উঠে গেছে। বিষয়টা এমন যে ফুটবল খেলায় মেসি আপনার দল থেকে সরে গেছে অথচ চিন্তার বাইরে একাধিক গোল করে আপনার দল জিতে গেল। মেসি কিন্তু নাই অথচ সাধারণ প্লেয়াররাই মেসির চাইতে ভালো খেলা দেখাল, বিশ্বাস যদি না হয় তবে উপরের চিত্রটাও আপনার বোধগম্যতায় আসবে বলে মনে হয় না।

বর্তমান বাজার ও অর্থনীতি নিয়ে আমার মধ্যে একটা চরম বিস্ময় চলমান আছে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না একে কি বলা যায়। পারফেক্ট মার্কেট হলো যেখানে প্রচুর বিক্রেতা ও প্রচুর ক্রেতা বর্তমান থাকে। আমাদের শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরলে দেখা যাবে অজস্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ফুটপাথে, রাস্তার দু ধারে ভ্যানে করে কিংবা সকল বিপণী বিতানে প্রচুর দোকান পাটে সর্বত্র জমজমাট ব্যবসা চলছে, নিত্য নতুন দেশি বিদেশি পণ্য তার পাশাপাশি ক্রেতা ও বিক্রেতার হাঁক ডাক যেন মনে হবে ২৪ গুণন ৭ ঘণ্টাই বিশাল মেলা চলছে। একেই কি সেই পাঠ্য পুস্তকে পড়া আদর্শ বাজার বা পারফেক্ট মার্কেট বলে না? কিন্তু তা কি করে সম্ভব, যখন দেশে একটি স্থিতিশীল সরকার নাই, পুর জাতি চলছে কেয়ার টেকার গভর্নমেন্টের তত্বাবধানে তখন এরকম আদর্শ বাজার হয় কি করে? ম্যাক্রো ইকোনমিক ইনডিকেটর গুলো দুর্বলতা দেখাচ্ছে, ভয়ংকর রকম ভবিষ্যৎ বিপর্যায় এর সঙ্কেত দিচ্ছে অথচ দেশের মাইক্রো ইকনমি চাঙ্গা তা হয় কোন যুক্তিতে। একটা আপাত যুক্তি মনে হয় তা হলো, দেশের রাস্তা-ঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হওয়ায় পণ্য পরিবহনে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। গন মানুষের মুভমেন্ট বা স্থানান্তর সহজতর হয়েছে যার একটা ইনারশিয়াল বা গতি জড়তা জনিত ধাক্কায় এই অভাবনীয় মাইক্রো ইকনমিক উচ্ছলাত দেখা দিতে পারে, তবে এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত অনুমান, কোন তথ্য উপাত্তর বিচারে না। খালি চোখে দেখে যা মনে হয়িছে তা বলে দিলাম অকপটে। তবে এখন পর্যন্ত এটাই আমার কাছে একমাত্র গ্রহণ যোগ্য যুক্তি। নানা মুনির নানা মত থাকতেই পারে, আমিও এক মুনি তাই বলছিলাম কি, কয়লার ময়লা ধুইলেও যায় না, এ দেশের সাধারণ জনতা যতদিন গর্তে লুকায়ে থাকবে ততদিন ঋণ খেলাপিরা ঋণ নিয়ে লোপাট করতেই থাকবে আর ওদিকে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসে তবে দেশের ম্যাক্র-মাইক্রো ইকনমিতে ধস নামবে ব্যাংকিং সেক্টর খোকলা থেকে খোকলা তর হবে, আমরা আম জনতা কাঁঠাল পাতা খেয়ে বেচে থাকবো।
 

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ০১জানুয়ারী ২০২৬> ৩জানু২০২৬>