Saturday, September 19, 2026

ইসলামী ব্যাংকিং এ সুদ - রিবা - ইন্টারেস্ট প্রতিহতকরণ

 

 ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ হলো কালো টাকা সৃষ্টির প্রথম ধাপ বা উৎস মূল। আর পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সুদ হলো ব্যবসায়ে বিনিয়োগের প্রণোদনা বা অনুপ্রেরণা। তাই কনভেনশনাল সিস্টেম আর ইসলামী সিস্টেম পরস্পর বিরোধী। অর্থ ব্যবস্থায় কালো টাকার প্রভাব, মুদ্রামানের অবক্ষয়, মুদ্রাস্ফীতি ও সুদ একটি উদাহরণে বিষয়টি ব্যাখ্যা করছিঃ ধরুন আপনি একটি সিএনজি ড্রাইভারকে তার ভাড়া বাবদ ৩০০ টাকা প্রদান করলেন এবং ঠিক একই সময় এক অসাধু ব্যবসায়ী অনৈতিক ভাবে ১ কোটি টাকা উপার্জন করলো। ঐ মূহুর্তেই ঐ ১ কোটি কালো টাকা যে মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করবে তাতে ৩০০ টাকার মূল্যমান কমে ২০০ টাকা হয়ে গেছে। অর্থনীতিতে কালো টাকা এক পাত্র বিশুদ্ধ পানিতে এক ফোটা বিষের মত। অন্যান্য অনেক কারণের মধ্যে মূলত কালো টাকার জন্যই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে থাকে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা কেবলমাত্র মুসলমানদের জন্যই নয়, এটি কেবল মাত্র ধর্মীয় বিষয় নয়। ইসলামী শব্দ ব্যবহারের কারণে সবাই প্রথমেই মনে করে যে, এটি একটি ধর্মীয় বিষয়, পবিত্র কোরআন কিংবা হাদিস জানা না থাকলে এটি বুঝা যাবে না, কিংবা মনে করে যে এটি শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য। ধারণাটি ভূল। ইসলাম যেমন শুধুমাত্র মুসলমানদের জীবন বিধান নয়, সর্বসাধারণের জন্য একটি সরল ও নিরাপদ জীবন বিধান প্রদান করে ও সকল ধর্মের মানুষের জন্য নিরাপত্তা প্রদান করে তেমনি ইসলামী অর্থ ব্যবস্থাও সকল মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি নিরাপদ ব্যবস্থা  অর্থাৎ সুদ মুক্ত পরিশোধিত অর্থ ব্যবস্থা প্রদান করে। 

ইসলামী ব্যাংকিং বুঝতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে সুদ / রিবা কি? আর কত ভাবে সুদ অর্থনৈতিক লেনদেনে প্রবেশ করতে পারে? রিবা (সুদ) বা ইন্টারেস্ট দুই প্রকার, যথাঃ-
১) রিবা আন নাসিয়া
কেবলমাত্র সময়ের সাপেক্ষে কোন প্রকার ব্যবসায় বিনিয়োগ না করে মূলধনের অতিরিক্ত পরিশোধ করা হলে বা কেবল সময়ের ব্যবধানে ঋণের মূল অংশের অতিরিক্ত অংশ ফেরত দাবী করা হলে রিবা আন নাসিয়ার উদ্ভব হবে। এটি নগদ অর্থও হতে পারে আবার পণ্যও হতে পারে। এক্ষেত্রে মুদ্রা নিজেই ভোগ্য পণ্যে কমোডিটিতে পরিণত হয়ে যায়।
২) রিবা আল ফাদাল
সমজাতীয় দ্রব্য/পণ্য বিনিময়ে অসমতা কিংবা একই জাতীয় জিনিসের হাতে হাতে ক্রয় বিক্রয় কিংবা বিনিময়ের সময় কম বেশী করে বিক্রয় করলে রিবা আল ফাদাল এর উদ্ভব হবে। যেমন এক ঝুড়ি শুকনো খেজুর এর সাথে এক ঝুড়ি ভিজা খেজুর বিনিময় করলে।

আরো দুই ভাবে সুদ (বা ইসলামের দৃষ্টিতে কালো টাকার) সৃষ্টি হয়ে থাকে, যথাঃ

৩) কৃত্রিম মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি করেঃ-
ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় রিবা/ সুদ/কালো টাকা সমার্থক। সরকার যদি অনৈতিক ভাবে জনগণের টাকা লুণ্ঠন করতে চায় তবে কৃত্রিম ভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটিয়ে রিবার উৎপত্তি ঘটাতে পারে। মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে এটি করা সম্ভব, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এরূপ করা হয়েছিল।

৪) অসম মুদ্রার বিনিময় হার এর মাধ্যমেঃ-
উন্নত অর্থনীতির দেশের মুদ্রার সাথে অনুন্নত দেশের মুদ্রার মানের পার্থক্য ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা স্বীকার করে না। যেমন যে কোন জ্ঞান ভিত্তিক বিষয়ের উপর কপি-রাইট/স্বত্বাধিকার ইসলামী ব্যবস্থা স্বীকার করে না।

এক কথায় সুদ হলো অর্থ/পণ্য যথাযথ ভাবে ব্যবসায় ব্যবহার না করে বসে বসে এর বৃদ্ধি যার মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক জুলুম, অগোচরে সম্পদ লুণ্ঠন, জনসাধারণের সম্পদের অবক্ষয় সাধিত হয় । ১৪০০ বছর পরও বহু মানুষের মধ্যে সুদ নিয়ে স্পষ্ট ধারনা দেখতে পাওয়া যায় না কেন তা একটা বিস্ময় বটে। হতে পারে যারা সুদি ব্যবস্থায় বা সুদ ভিত্তিক অর্থনীতির সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন আর যারা সুদ ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থা পরিচালনার সুবিধা নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তারা এটাকে জনমনে তমসাচ্ছন্ন করে রাখার সব ব্যবস্থা পাকা পোক্ত করে রেখেছেন। অনেকেই বলে থাকেন যে, বহু আগে গ্রামে গঞ্জে যে দাদন ব্যবসা ছিল, উচ্চ হারে সুদে ঋণ দান করা হতো, যার ফলে অনেকে জমি জমা বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন সেটা ছিল সুদ আর এখনকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা অনেক উন্নত তাই ওরকম হওয়ার সম্ভাবনা নাই। তারা মূলত সুদ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বসে আছে। অনেকে বলে যে, যদি ফিক্সড রেটে মুনাফা প্রদান করা হয় তবে সেটা সুদ হয়ে যাবে। তাদের কাছে ফিক্সড রেট হলেই সেটা সুদ আর ভেরিয়েবল রেট হলে সেটা সুদ মুক্ত। এতসব ভুল ধারনা কি ভাবে জনমনে সঞ্চারিত হলো তা নিয়ে ইতিহাসবিদ গন মাথা ঘামাবেন। বিষয়টা যে ভ্রান্ত ধারনা তা সময়েই প্রমাণ হয়ে যাবে। নিচে সুদ কি আর অর্থ ব্যবস্থায় কি হলে সুদ হবে না তা নিয়ে দটি ছকে পার্থক্য সুস্পষ্ট করা হলো।


কিভাবে সুদ হয় আর কিভাবে সুদ-মুক্ত ব্যবস্থায় ব্যাংকিং করা যায় তা নিচের ছকে আরো স্পষ্ট করা হলো। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রথম সর্তই হলো সুদ মুক্ত করতে হবে অর্থব্যবস্থাকে। এই প্রধান ও প্রথম শর্ত সম্পর্কে যদি জানা না থাকে তবে ইসলামী ব্যাংকিং কোন ভাবেই বুঝা সম্ভব নয়। সুদ সম্পর্কে যেহেতু বহু বছর ধরে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে, তাই এই বিষ বাষ্প দূরীকরণে প্রতিষেধক হিসেবে কড়া ভ্যাকসিনের প্রয়োজন আছে। প্রচুর মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা সমূহ দুর করা জরুরী আর যারা ইসলামী ব্যাংকিং পরিচালনা করবেন তাদের তো এই বিষয়টা জনসাধারণের চেয়ে আরো বেশি স্পষ্ট করে জানতে হবে।


ইসলামী ব্যাংকিং এ শরিয়া সম্মত আমনত সংগ্রহ (Diposit mobilization) পদ্ধতিঃ-

শরিয়া ভিত্তিক যে সকল পদ্ধতিতে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হয় তার মধ্যে আমানত সংগ্রহ প্রডাক্টগুলো বিন্যাস্ত যে সকল পদ্ধতিতে তা নিচে আলোচনা করা হলো ।

আল-ওয়াদিয়া

কারেন্ট একাউন্ট বা চলতি হিসাবের অনুরূপ একটি ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে গ্রাহক কর্তৃক ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের উপর ব্যাংক কোন লভ্যাংশ প্রদান করে না। যে পরিমাণ টাকা গ্রাহক আল-ওয়াদিয়া একাউন্টে রাখে সেই পরিমাণ টাকার কোন বৃদ্ধি বা হ্রাস হয় না। ব্যাংক গ্রাহকের অনুমতি সাপেক্ষে সেই টাকা ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারে এই শর্তে যে গ্রাহকের চাহিবা মাত্র তার টাকা তাকে ফেরত প্রদান করতে ব্যাংক বাধ্য থাকবে।

মুদারাবা পদ্ধতি
মুদারীব {ফান্ড দিয়ে ব্যবসা কারী} ও “সাহেব-আল-মাল” {ফান্ডের মালিক} এর ধারণার উপর ভিত্তি করে যে কারবার পদ্ধতি তার উপর ভিত্তি করে ইসলামী ব্যাংক এ আমানত গ্রহণ করা হয় আবার একই পদ্ধতি ব্যবহার করে ব্যাংক চাইলে কোন বিনিয়োগ প্রডাক্টও বানাতে পারে। সেভিংস একাউন্ট বা সঞ্চয়ী হিসাব এর অনুরূপ একটা পদ্ধতি এটি যখন ব্যাংক হলো মুদারীব আর গ্রাহক সাহেব আল মাল। অর্থাৎ মুদারাবা পদ্ধতিতে দুটি পক্ষ থাকে যেখানে এক পক্ষ ফান্ডের মালিক আরেক পক্ষ ফান্ডের ব্যবহারকারী। এটা এমন একটি যৌথ কারবার যেখানে ফান্ডের মালিক বা সাহেব আল মাল স্লিপিং পার্টনার এর মত আচরণ করে থাকে। আর মুদারীব ব্যবসা করে মুনাফা অর্জন করে পূর্ব শর্তানুযায়ী সেই মুনাফার লভ্যাংশ গ্রহণ করে। মুনাফার একাংশ পায় মুদারীব আর বাকি অংশ পায় সাহেব আল মাল।


মুদারাবা পদ্ধতিতে সাহিব আল মাল ফান্ডের মালিক, কনভেনশনাল ব্যাংকিং এ যখন গ্রাহক ব্যাংকে টাকা জমা রাখে তখন সে আর ওই ফান্ডের মালিক থাকে না, বরং ব্যাংকের সাথে সে চুক্তি করে যে সে যদি তার ফান্ড ফেরত চায় তখন ব্যাংক তা মুনাফা সহ ফেরত দিবে আর সেই মুনাফা যেহেতু কোন ব্যবসায় খাটে না তাই তা রিবা আন নাসায়ি হয়ে যায় বা সুদ হয়ে যায়। কিন্তু মুদারাবা পদ্ধতিতে ফান্ডের মালিক থাকে গ্রাহক, সে ব্যাংককে বা ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবসায় তার ফান্ড বিনিয়োগ করে এই শর্তে যে যদি লাভ হয় তবে সে চুক্তি মোতাবেক লভ্যাংশ পাবে আর লোকসান হলে সে সেই লোকসানের দায়ভার বহন করবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক গ্রাহকের সাথে যে চুক্তি করে তাতে গ্রাহক হয় ফান্ডের মালিক অপর পক্ষে সেই ফান্ড যদি ব্যাংক কোন ব্যবসায়ীর সাথে চুক্তিতে আসে তখন ব্যাংক হয়ে যায় সাহেব আল মাল আর ব্যবসায়ী তখন হয় মুদারিব। দু পক্ষের চুক্তিতেই লাভ ভাগাভাগি হয় কিন্তু লোকসান হলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার সাহেব আল মালের উপর বর্তায়। 

 

ইসলামী ব্যাংকিং এ শরীয়া সম্মত বিনিয়োগ (Modes of Investment) পদ্ধতি সমূহ 


মুশারাকা পদ্ধতি
জয়েন্ট ভেঞ্চার বা যৌথ কারবার এর অনুরূপ একটি পদ্ধতি যেখানে এক বা একাধিক গ্রাহক একটি ব্যবসায় ব্যাংকের সাথে বিনিয়োগ করে যেখানে ব্যাংক একজন অংশীদারের মত অংশগ্রহণ করে। যৌথ কারবারে লাভ ও ক্ষতি সমভাবে কিংবা পূর্ব শর্তানুযায়ী বণ্টন হয়। মূলধন অনুপাতে লাভ কিংবা লোকসানে সবাই অংশীদার হয়।


ডেমিনিশিং মুশারাকা পদ্ধতি কিংবা এইচপিএসএম (হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিল্ক)
অংশিদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসায়িক চুক্তিটি যদি এমন হয় যে কিস্তি প্রদানের সাথে সাথে এর মালিকানার অংশও গ্রাহকের দিকে সরে যাবে তবে তাকে ডেমিনিশিং মুশারাকা পদ্ধতি বলে, যাকে প্রকারান্তরে সংক্ষেপে এইচপিএসএম বা হায়ার পারচেজ আন্ডার শিরকাতুল মিল্ক পদ্ধতিও বলা যায়। বিষয়টা এরকম যে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয়ে মিলে ৪০ লক্ষ টাকা মূলধন এর ৩০ লক্ষ ব্যাংক ও ১০ লক্ষ গ্রাহক এই রেশিওতে বা অনুপাতে একটি বাড়ি ক্রয় করলো, বাড়িটিতে গ্রাহক বসবাস করলে সে তার ভাড়া বাবদ অর্থ প্রদান করবে আর তার সাথে ব্যাংকের ৩০ লক্ষ টাকার কিছু অংশও প্রদান করবে। ধরা যাক গ্রাহক ৫০০০০ টাকা করে ব্যাংকে কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করবে । এই পঞ্চাশ হাজারের ২০০০০ টাকা ভাড়া আর ৩০০০০ টাকা ব্যাংকের বিনিয়োগ কৃত টাকা। এভাবে ১০ মাস প্রদান করার পর বড়িটার পূর্ণ মালিকানা ব্যাংক গ্রাহককে প্রদান করবে। প্রতি মাসে অর্থ বা কিস্তি প্রদানের সাথে সাথে মালিকানার (মিল্ক=মালিকানা) অংশিদারিত্ব (শরিকানা) ব্যাংক হতে গ্রাহকের দিকে স্থানান্তরিত হতে থাকবে ও ১০ম মাসে পুরটা স্থানান্তরিত হয়ে যাবে গ্রাহকের পক্ষে। তখন ব্যাংক তখন সেই বাড়ি গ্রাহকের নামে রেজিস্ট্রি করে দিবে।

ডেমিনিশিং মুশারাকা আার এইচ-পি-এস-এম এর পার্থক্য এই টুকুই যে, এইচ-পি-এস-এম এর লোন রি-পেমেন্টে দুটা অংশ থাকে, একটা ভাড়া বাবদ আরেকটা মূল বা প্রিন্সিপাল বাবদ, দুয়ে মিলে মোট কিস্তির টাকা কিন্তু ডেমিনিশিং মুশারাকায় ভাড়ার অংশটি নাও থাকতে পারে কিংবা বলা যায় থাকাটা বাধ্যতামূলক নয়।



বাই-মুরাবাহা পদ্ধতি
চুক্তির ভিত্তিতে লাভে বিক্রয় করে যে ব্যবসা করা হয় তাকে বাই-মুরাবাহা পদ্ধতি বলা হয়। এর দুটি প্রক্রিয়া বা প্রেক্ষিত নিচের তথ্যচিত্রে প্রদান করা হলো। 


প্রেক্ষিত ১) পণ্যবিক্রেতা ব্যাংকে যে পণ্য ১০০ টাকায় প্রদান করলো তা ব্যাংক গ্রাহককে ১১০ টাকায় বিক্রয় করলো। গ্রাহক কিস্তিতে কিংবা চুক্তি মোতাবেক নির্ধারিত সময় পর পণ্য মূল্য পরিশোধ করলো। পণ্য প্রদানের সাথে সাথে গ্রাহক তা ব্যবহার করতে পারলো কিংবা এর মালিকানার সুবিধা গ্রহণ করলো। ব্যাংক এভাবে পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে ১০ টাকা মুনাফা উপার্যন করলো। কেবল মেশিনারি নয়, গাড়ি ক্রয়-বিক্রয় বা কার লোনের ক্ষেত্রেও বাই-মুরাবাহা পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। আবার উপরে বর্ণিত এইচপিএসএম পদ্ধতিতেও কার লোন প্রদান করা যায়।

প্রেক্ষিত ২) পণ্যবিক্রেতা ও গ্রাহক উভয়ের সাথে ব্যাংকের পেরাল্যাল (সমান্তরাল) চুক্তি হতে পারে যেখানে ব্যাংক পণ্যবিক্রেতা বা পণ্য সরবরাহকারীর (সাপ্লাইয়ার) এর মাধ্যমে গ্রাহককে তার চাহিদা কৃত পণ্য প্রদান করে, গ্রাহক কিস্তিতে তার মুনাফা সংযুক্ত দাম পরিশোধ করে আর ব্যাংকও সরবরাহকারীকে নির্দিষ্ট সময়ান্তরে চুক্তি মোতাবেক মূল্য পরিশোধ করে ব্যবসা পরিচালনা করে। এভাবে চুক্তির ভিত্তিতে মুনাফা সংযুক্ত (মার্ক আপ) মূল্যে পণ্য বিক্রয় করে যে ব্যবসা করা হয় তাকে বাই-মুরাবাহা পদ্ধতি বলে।

বাই-মুয়াজ্জল পদ্ধতি
যখন ব্যাংক গ্রাহককে পণ্য ক্রয় করে বাকিতে অগ্রিম প্রদান করে এবং গ্রাহক কিস্তিতে মুনাফা সংযুক্ত মূল্য পরিশোধ করে তবে তাকে বাই-মুয়াজ্জাল পদ্ধতি বলে। সাধারণত ভোগ্যপণ্য বিনিয়োগে বাই-মুয়াজ্জাল পদ্ধতি ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকে পণ্য ক্রয় করে রাখতে হয় যাতে সে তার গ্রাহককে তা বিনিয়োগের সময় প্রদান করতে পারে। এখানে ব্যাংক নিজেই পণ্য বিক্রেতা হিসেবে কাজ করে।

বাই মুয়াজ্জল ও বাই মুরাবাহা’র মধ্যে মূল পার্থক্য এই যে, বাই মুরাবাহাতে ক্রয়মূল্য, লাভের অংশ, পরিবহন খরচ ইত্যাদি বিক্রেতা জানে আর বাই মুয়াজ্জলে এই খরচ গুলো উল্লেখ করা কিংবা গ্রাহককে জানানো বাধ্যতামূলক না, আর এই মূল্য সাধারণত বাই মুয়াজ্জলে কিস্তিতে পরিশোধ করা হয়ে থাকে।  বাই মুরাবাহা কিস্তিতে না হয়ে বরং একটা নির্দিষ্ট সময় পর পরিশোধ করা যায়।


বাই সালাম বা অগ্রিম ক্রয়ঃ
যখন ব্যাংক গ্রাহককে কোন পণ্য উৎপাদনের পূর্বেই তার ক্রয়মূল্য প্রদান করে বা কাঁচামালের জন্য ও পণ্য উৎপাদন ব্যয় বহনের খরচ সহ মুনাফা প্রদান করে পণ্য উৎপাদনের পর তা গ্রহণ করে, এরকম চুক্তিকে বাই সালাম বলা হয়। কোন কৃষক আলু উৎপাদন করে, তো ব্যাংক তাকে তার কৃষি জমির উপর অগ্রিম ঋণ প্রদান করে যাতে সে আলু উৎপাদনে সক্ষম হয়, উৎপাদিত আলুর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সে আগেই ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন যদি সে সেই পরিমাণ আলু উৎপাদন করতে না পারে তবে তাকে সেই পরিমাণ আলু বাজার থেকে ক্রয় করে দিতে বাধ্য থাকবে, এরকম চুক্তিতেই সাধারণত বাই সালাম এগ্রিমেন্টে বিনিয়োগ হয়।


আর প্যারালেল সালাম হলো, ব্যাংক যখন অগ্রিম বিক্রয় করে দেয়। উপরের উদাহারনের থেকে নিয়ে বলা যায়, যদি ওই কৃষক পাঁচ মন আলু দিতে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হয় তবে সেই চুক্তি কিংবা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ব্যাংক অধিক মুনাফায় তৃতীয় কোন ব্যক্তির কাছে ৫ মন আলু অগ্রিম বিক্রয় করতে পারবে আর একেই প্যারালাল সালাম বলে। অগ্রিম ক্রয়ের ভিত্তিতে অগ্রিম বিক্রয়। ক্রেতা ও বিক্রেতা, বিনিয়োগকারী ও উৎপাদক কিংবা উদ্যোক্তা উভয়েই ভিন্ন ভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। যেহেতু প্যারালাল বাই সালাম চুক্তি তাই সব পক্ষই জানে কিভাবে এই বিনিয়োগ ও ক্রয় বিক্রয়টি সম্পন্ন হচ্ছে।


বাই ইসতিসনা মূলত ওই বাই-সালামের অনুরূপ একটি চুক্তি, বাই সালাম মূলত কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় আর বাই ইসতিসনা মূলত ম্যানুফেকচারিং কিংবা মেশিন দ্বারা তৈরি পণ্য উৎপাদনের বিনিয়োগে বেশি ব্যবহৃত হয়।  বাই সালাম প্রদানের সময় (কৃষি) পণ্য উৎপাদিত হয় নি, বরং নির্দিষ্ট সময় পর পণ্য হাতে আসবে বা বাস্তবে আসবে, তাই সচরাচর এটা ধাপে ধাপে প্রদান করা যায় না। কিন্তু বাই ইসতিসনা যেহেতু কৃষি পণ্য নয়, বরং ম্যানুফেকচারিং সংক্রান্ত উৎপাতন, তাই সচরাচর তা ধাপে ধাপে প্রদান করা যায় ও ফেরতও নেয়া যায়।

ইসলামী ব্যাংকিং একটি নতুন ধারণা কারণ ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দিকে এমনকি খেলাফত থাকাকালীন ইসলামী ব্যাংক বলে কিছুই ছিল না। সর্বশেষ খেলাফত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কামাল আতা তুর্ক কর্তৃক বিলুপ্ত ঘোষিত হয়। যা ছিল তা হলো স্টেট ট্রেজারি বা বায়তুল মাল। খলিফা ওমর রা. এর সময় এসে এই বায়তুল মালে একাউন্টিং পাকাপোক্ত ভাবে চালু হয়। বর্তমান কালের কনভেনশনাল ব্যাংক গুলো সুদ ভিত্তিক কারবার পরিচালনার পাশাপাশি ইসলামী ব্যাংকিং নামে যে সমান্তরাল উইন্ডো ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করছে যাকে তারা শরিয়া ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা বলছে তার বয়স খুব বেশি দিন আগের নয়। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকিং করছে এরকম ব্যাংক এখন অনেকগুলো এটি একটি সম্পূরক প্রক্রিয়া, যারা সুদ বিহীন ব্যবস্থায় ব্যাংকিং করতে চায় তাদের জন্য একটি উপায় মাত্র। ব্যাংক ব্যবস্থাটি সৃষ্টি ও প্রবর্তিত হয়েছিল ইহুদিদের দ্বারা কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষিতে ইসলামী ব্যাংকিং সেই ধারাতেই ইসলামী শরিয়া ভিত্তিক পদ্ধতি সমূহ প্রয়োগ করে সুদ মুক্ত ব্যাংকিং করছে।

আমি যথা সম্ভব সংক্ষেপে ইনফোগ্রাফিক্স ব্যবহার করে পদ্ধতি গুলো বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। কনভেনশনাল ব্যাংক আর ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, কনভেনশনাল ব্যাংক বাজারে সরাসরি বিনিয়োগ কিংবা কোন ব্যবসায় সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারে না, কেবল গ্রাহককে ব্যবসায় বিনিয়োগে অর্থ প্রদান করতে পারবে কিন্তু ইসলামী ব্যাংক এর মৌলিক নীতিই হলো তার আমানত ব্যবসায় বিনিয়োগ করে তা হতে অর্জিত মুনাফা বণ্টন করে নেয়া। তাই ইসলামী ব্যাংক সরাসরি ব্যবসায় একক ভাবে কিংবা অংশীদারি পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করতে পারে।

ইসলামী ব্যাংকিং এর উপর কিছু সাধারণ প্রশ্নউত্তরঃ-

প্রচলিত ব্যাংকিং এর সাথে ইসলামী ব্যাংকিং এর মূল তফাতটি কোথায়?
>কনভেনশনাল ব্যাংকিং আর ইসলামী ব্যাংকিং এর মৌলিক পার্থক্য এই যে, ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুদে লগ্নি করার উপর নির্ভরশীল ও ব্যাংক কখনই সরাসরি বাজারের ব্যবসায় অংশ নিতে পারে না, তাকে তার কোন গ্রাহক কে অর্থ প্রদান করার     মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকিং এর মূল নীতিই হলো তাকে ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে হবে, কারণ শরিয়া মতে ব্যবসা হালাল ও সুদ হারাম। সুদ ভিত্তিক ব্যবসা আর সুদ বিহীন ব্যবসার মধ্যকার পার্থক্য খুব সহজে বুঝা সম্ভব যা নিচে দেয়া হলো।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং এর শুরু হয় যে ভাবেঃ
>বাংলদেশে ইসলামী ব্যাংকিং এর সূত্রপাত সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজ হতে। স্টাফ কলেজের প্রথম প্রিন্সিপাল জনাব আজিজুর রহমান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও মালয়েশিয়াতে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষণা করে আমাদের দেশে কি ভাবে তা প্রবর্তন করা যায় তার উপর একটি কর্মশালার আয়োজন করেন। ঐ কর্মশালায় আগত সদস্যবৃন্দ পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এর প্রতিষ্ঠা করেন।

শরিয়া সুপারভাইজারি বোর্ডঃ- (এসএসবি)
>ইসলামী ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়নের ও তাকে অনুমোদন দানের জন্য নির্ধারিত বিজ্ঞ ব্যক্তি সমন্বয়ে প্রত্যেক ব্যাংকে শরিয়া সুপারভাইজারি বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ড এর অন্যতম কাজ হলো নীতিমালা প্রণয়ন ও নজরদারী যাতে ব্যাংক কোন ইসলামী শরিয়া বহির্ভূত ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করে কিংবা সুদ/কালো টাকা সৃষ্টি হতে পারে এমন কর্মকাণ্ডে না জড়িয়ে পরে। ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা যেহেতু ইসলামী বিধিবিধান মেনে চলে সেহেতু ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম শরিয়া বোর্ড ছাড়া পরিচালনা করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রায় অসম্ভব।

মুক্ত বাজার অর্থনীতি কিংবা পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার সাথে ইসলামী ব্যাংকিং এর বিরোধটি কোথায়?
>বিরোধটি হলো, একটি অপরটির সম্পূর্ণ বিপরীত। মুক্ত বাজার বলে টাকা জমা কর নইলে বিপদ, ইসলামী ব্যবস্থা বলে টাকা যদি জমাও তবে মহা বিপদ, সকল অর্থ বাজারে বিনিয়োগ কর নতুবা হুতামা নামক দোজখে নিক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। একটি সোজা পানির গ্লাস হলে অপরটি উল্টো করে রাখা গ্লাস। সোজা পানির গ্লাস পানি জমা করে আর উল্টো গ্লাসে পানি জমা করা যায় না। দ্রুত চলমান অর্থনীতি কখনই টাকা জমা করতে বলবে না, সব অর্থ বাজারে বিনিয়োগ কৃত থাকবে যাতে অর্থনীতির চাকা দ্রুত ঘুরে। কিন্তু সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে বাজারে বিনিয়োগ কৃত অর্থের মূল্য মানের নিশ্চয়তা দিতে হয়। মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে রাষ্ট্র সুদ কে অর্থ বিনিয়োগের প্রণোদনা বলে, এবং রাষ্ট্র মুদ্রাস্ফীতিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে যা মূলত অর্থের মূল্য মানের অবক্ষয়, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এর নিশ্চয়তা প্রদান করে না। পুঁজিবাদী অর্থনীতি সুদকে অর্থনীতির চালিকা শক্তি মনে করে আর ইসলামী ব্যবস্থা সুদকে কালো টাকা মনে করে।

মুক্ত বাজার অর্থনীতি কিংবা পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থা ও ইসলামী ব্যবস্থা পরস্পর বিরোধী হলে একসাথে চলবে কি করে?
>সোজা পথে চলবে না বলেই তো উইন্ডো দিয়ে কিংবা বিকল্প পথে চালানো হচ্ছে। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থা কখনই ইসলামী ব্যবস্থাকে অগ্রবর্তী হতে দিবে না, তাকে অনুবর্তী রেখে চলতে দিবে হয়তো।

সব ব্যাংকই তো বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে, তাহলে আর পার্থক্য রইলো কই, সেই তো সুদেই আসতে হলো?
>না সুদে আসতে হলো না, কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকেংর সাথে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সিআরআর ও এসএলআর পৃথক ভাবে হিসাবায়ন করা হয় যা অন্যান্য কনভেনশনাল ব্যাংকের সাথে হিসাবায়ন হয় না। তাই সুদের হিসাবের সাথে কখনই সুদবিহিন হিসাবের মিশ্রণ হয় না।

লোকজন বলে ইসলামী ব্যাংকিং মূলত এক প্রকার ভাঁওতাবাজি, তাদের দাবী কি ঠিক?
>তাদের দাবী ঠিক নয়। আমানত প্রডাক্ট সমূহের মধ্যে যদি কেউ পণ্য মজুত করে দাম বৃদ্ধি করে পরে বিক্রয় করে তবে তা ব্যাক ডোর রিবা/সুদ এর সৃষ্টি করবে, কোন কোন ইসলামী ব্যাংক এরূপ করে থাকলে এটি তাদের প্রাকটিসের ভুল। ইসলামী ব্যাংকিং এর ভুল নয়, লোকজন একে ইসলামী ব্যাংকিং এর ভুল বলে মনে করে। তেমনি বিনিয়োগ এর ক্ষেত্রে কোন ইসলামী ব্যাংক যদি ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা না মেনে নিজের খেয়াল খুশি মত বিনিয়োগ করে তবে সেটি হবে তাদের প্রাকটিসের ভুল, তত্ত্বের ভুল নয়।

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ২৩এপ্রিল২০২৪>২৯এপ্রিল২০২৪>২৩জুলাই২০২৬ দিলখুশা>১৯সেপ্টেম্বর২০২৬, পুষ্পধাম>


No comments:

Post a Comment