Monday, January 5, 2026

মুশারাকা বা যৌথ ব্যবসা যে কারণে এদেশে অকার্যকর

 


 ১২ই আগস্ট ২০২৫ তারিখে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে নেয়া ইসলামী ব্যাংকিং অডিটের ক্লাসে একজন প্রশ্ন করেছিলেন যৌথ কারবারে যদি অংশীদাররা ক্যাপিটাল ইনভেস্টমেন্টের যথেচ্ছাচার করে তবে কি হবে বা এর প্রতিকার কি, তখন বলেছিলাম আপনি মুশারাকার কথা বলছেন, যা বাস্তবে প্রফিটেবল হয়নি। তার কথা শুনে আমার মনে হলো যে, তিনি আসলে মুসারাকা সম্পর্কে ও তার নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। তাকে বলতে হলো, বিগত সময়ে মুশারাকা কিংবা যৌথ কারবারের অধিকাংশ বিনিয়োগ প্রডাক্ট খেলাপি হওয়াতে ওই মোডে ইনভেস্টমেন্ট নতুন করে কম দেখা যাচ্ছে। বলেই দিলাম, মুশারাকায় প্রডাক্ট ইদানীং আর হচ্ছে বলে আমার জানা নাই।  বিষয়টা চিন্তার বিষয় বটে যা নিয়ে আমার মধ্যে তিক্ত অভিজ্ঞতা আগে থেকেই আছে।

এটা প্রমাণিত সত্য এখন আমার কাছে, এক দশকেরও বেশ আগে চেষ্টা করেছিলাম সুদি কারবার থেকে সরে যাবো, মানে ব্যাংকের সুদ নির্ভর চাকুরী থেকে সরে যাবো তাই কয়েকজন তরুণ ও নিকট জনকে একত্রিত করে একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ডেলফি ম্যাথড ব্যবহার করে কোন ব্যবসাতে বিনিয়োগ করা লাভজনক হবে তা নির্ধারণও করেছিলাম। সবার মতামতের ভিত্তিতে আমার গাছা বোর্ড বাজারের জমিতে একটা পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে গ্লাডিওলাস ফুল এর গাছ এর চাষ করার পক্ষে সবাই মত দিয়েছিল। বীজ সংগ্রহ করার জন্য একজন এক্সপার্টকেও কন্টাক্ট করা হয়েছিল। শুরুর দিন মানে চুক্তির দিন সবাই উপস্থিত। আমরা বীজ মানে গ্লাডিওলাসের টিউনিকেটেড বাল্ব বা পিয়াজ গুলো কোল্ড স্টোরেজ থেকে নিয়ে আসার জন্য ৫ সদস্য প্রত্যেকে সমান মূলধন বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ওই এক্সপার্টকে টাকা দিবো। সেই উদ্দেশ্যেই গোলটেবিল বৈঠক, ওই দিন আকস্মিক যে নাটক হলো তা আমার জীবনের আরেকটা রিয়ালিটি শক। এক পার্টনার অযথা ওই এক্সপার্ট অহেতুক কারণে সন্দেহ করা শুরু করে দিল। নানা প্রকার তার প্রশ্ন তার কাছে। আমরা তো আগে থেকেই সব জেনে শুনে ওই দিন বিনিয়োগ করতে বসেছিলাম। আমাদের মেমরেন্ডাম আর আরটিক্যালস অফ এসোসিয়েশন তো অনেক যুক্তি তর্ক সাপেক্ষে আগেই সর্ব সম্মতি নিয়ে গঠন করা হয়ে গিয়েছিল। তা হলে ব্যবসা শুরুর টেবিলে বসে হঠাৎ করে এই তর্ক উত্থাপনের কি যুক্তি থাকতে পারে তা আজও আমার কাছে অস্পষ্ট। ওই বৈঠকে সেই অংশীদার তার ক্যাপিটাল কন্ট্রিবিউট করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বসলো। শুধু মাত্র তার মনে হয়েছে যে এক্সপার্টকে আমরা ডেকে এনেছি সে হয়তো মিথ্যা বলছে। আমি পুরাই থ বনে যাই। সেদিনের চুক্তি ভঙ্গ আমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেয় নাই, মাথায় চলছিল সকল প্রকার ভয়ংকর চিন্তার টর্নেডো। একটা পাইলট প্রজেক্টে বিনিয়োগ, তা এই শুরুতেই এত বড় একটা ধাক্কা ! পরে বুঝেছি এ দেশটার মানুষগুলোর রক্ত বহু প্রজাতির মানুষের মিশ্রণে একেবারে একাকার হয়ে গেছে। নানা জেনেটিক সংমিশ্রণে আমরা সমৃদ্ধ হয়ে কি উন্নত হয়ে গেছি না কি বিবর্তিত হয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে গেছি তা বুঝে উঠা শক্ত।

এতেই যদি শেষ চমক হতো তা না হয় মেনে নিতাম, এর পরের ঘটনা আরও নাটকীয়। বাকি যে চার জন ছিলেন তারা আমাকে প্রধান করে একটা কনসোর্টিয়াম ধরনের জয়েন্ট ভেনচারে সম্মত হলো। তো আমি সেই মত তা পরিচালনা করতে রাজি হলাম। একজন কে দায়িত্ব দেয়া হলো যে, নতুন একটা প্রডাক্ট লঞ্চ করা হবে তো সে গণযোগাযোগ করবে। সে রীতি মত ওভার কনফিডেন্ট হয়ে জানালো লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে অডিটোরিয়াম। বাস্তবতা হলো সেদিন লোকজনই এল না। যাও বা এলো তা সংখ্যায় খুব নগণ্য। তার পরের ঘটনা আরো হৃদয় বিদারক, আমার সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রজেক্ট সম্পর্কে এর ভবিষ্যৎ ও পরিচালন ব্যয় বিবেচনায়, আমি যখন তা বন্ধ করে দিতে বললাম সে আমার দিকে কলম ছুড়ে মারলো, সেই ছড়াটার মত, দাদুর হাতে কলম ছিল ছুঁড়ে মেরেছে, উহ্ বড্ড লেগেছে। ছড়াটা আমার প্রথম সন্তানকে ছোট্ট বেলায় শিখিয়েছিলাম, ও বলতো বন্ড লেগেছে। আমার সেই দিনকার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছুড়ে মারা কলমটাও আমার কাছে বন্ড লেগেছিল। বুঝেছিলাম এদেশের মানুষজন যৌথ করাবারের জন্য এখনও যোগ্য হয়ে উঠে নাই। প্রধান সমস্যা মনে হয় স্বার্থপরতা ও আত্মপ্রেম আর দ্বিতীয়টা মনে হয় পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মনে মনে শপথ নিয়েছিলাম আর না, এর পর যা করবো একক উদ্যোগে করবো, কাউকে সাথে নিয়ে নয়।

মুশারাকা কেন বার্থ হয় তা নিয়ে তাই আমার চিন্তা চলছিল বহু দিন আগে থেকেই তাই ভাবলাম একটা জরিপ করে দেখি অন্যরা কি বলেন এ প্রসঙ্গে। জরিপের ফলাফলটা নিম্নরূপঃ 


উপরোক্ত জরিপটি ১৫আগস্ট হতে ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখের মধ্যে তিনটি অনলাইন ফোরামে (3R forum, Officer-IT forum 2004, CEMBA Alumin Association ) ও হাতে হাতে SB PLC Wage Earner’s corp. Br. Dhaka এ কারা হয়। স্যাম্পল সাইজ ২৫০ জন, ডেমোগ্রাফিক্সঃ Professionals  in Services majority Bankers। জরিপটির ফলাফল হিসেবে নিচের উক্তিটি সঠিকত্বর বিচারে সঠিক বলা যায়।

ফলাফল হলো
“স্বল্প শ্রমে ও সময়ে অতি মুনাফার লাভের প্রত্যাশায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব দ্রুত চরমে পৌঁছে যায়, যার ফলে সদস্যগণ শুদ্ধাচার কিংবা নৈতিকতা লঙ্ঘন করে বসে আর সেই কারণেই আমাদের দেশের যৌথ কারবার বা মুশারাকা উদ্যোগ সমূহ বেশি দিন টিকে না।”

আমার লেখাটাতে যদি প্রাপ্ত ফলাফল আমি লিখতাম জনমত যাচাই না করেই তবে তা হতো ফতোয়া, মানে যে মন্তব্য বা ফয়সালার বিপরীতে বা পেছনে কোন গবেষণা থাকে না, আর যা মনগড়া হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আমাদের দেশের জনগণ এমন যে হরিণের মত নিজের পেটে ঢেকুর উঠলেও ভয় পায়, মানে সামান্য একটা ইমুজি দিয়ে নিজের মত প্রকাশেও দ্বিধা বোধ করে, ১০ রকমের চিন্তা করে, দিবো কি দিবো না, দিলে না জানি কি থেকে কি হয়। সেই দেশে জনমত জরীপ, ওরে ব্বাবা তা কি করা সহজ? সাধারণ একটা জরীপ যাতে সাপ, ব্যাঙ কেঁচো কিছুই বের হওয়ার সম্ভাবনা নাই বা একদম শূন্য, তা নিয়েও অনেকের অনেক মন্তব্য সহ্য করতে হয়েছে। কেউ বলেছে কে এই কারণগুলো ঠিক করেছে? কেউ বলেছে সবগুলোই তো কারণ ইত্যাদি ইত্যাদি। যে কোন জরীপের একটা উদ্দেশ্য থাকে, আমি সেই উদ্দেশ্যটা উল্লেখ করেছি। আমার একটা লেখায় আমি এই প্রসঙ্গটা আনবো তার আগে জনমনে এ বিষয়ে কি রকম মনোভঙ্গী বিরাজ করছে তার একটা ইঙ্গিত আমার দরকার ছিল, এর বেশি কিছু না। এটা থিসিস পেপার না কিংবা এর উপর পিএইচডিও করছি না, সাধারণ একটা জনমত যাচাই। এদেশের জনগণ এতটাই লিডারশীপ শূন্য যে তারা ঐক্যবদ্ধ কোন সিদ্ধান্তেই পৌছাতে হিমশিম খায় বা মনে হয় চায় না। দার্শনিক কিংবা মনস্তাত্মিক কোন চিন্তার ঐক্য নাই বা কোন একটা বিষয়েও সকলের একক ঐক্যমত্য পাওয়া সহজ হয় না। তার পরও বলতে হবে, উপরোক্ত জরিপে পরিষ্কার ভাবে একটি জনমত পাওয়া গেছে, যা আমি লেখক হিসেবে মনে করি একটি অনন্য উদাহরণ। বন্ধু তারেককে তাই বলেছিলাম, তুই যে আমার উপরোক্ত মতামত নিয়ে দ্বিমত পোষণ করবি তা আমি আগে থেকেই জানতাম। সমস্যাটা ওই যে আমরা যতই ঐক্যমত্য মতামতে আসতে চাই না কেন, সমস্যা হলো পেটে ঢেকুর উঠলেও মনে হতে পারে বাইরে কোথাও কেউ পটকা ফুটাইছে।

বিষয়টার একটা মনস্তাত্ত্বিক দিক আছে যার প্রতিফলন আমরা আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ার গ্রুপ ডাইনামিক্সে দেখতে পাই। ১০০ জন সদস্যর একটা অনলাইন গ্রুপের মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৬ জন সক্রিয় অংশ গ্রহণ করে থাকে যা দেখে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ৮ থেকে ১০ জন আর এই পুর ঘটনা প্রবাহ নির্বাক হয়ে পর্যবেক্ষণ করে বড়জোর ২৫ জন, বাকিরা পুরাই ঘুমন্ত মানে স্লিপিং সদস্য। এটাই আমাদের দেশের গ্রুপ ডাইনামিক্স আমার অভিজ্ঞতায়। ২০১০ সাল থেকে ফেইসবুকের উত্থান আমি দেখে আসছি, তার আগে ইয়াহু ইমেইল গ্রুপের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ার চেষ্টাও করে দেখেছি। ফেইসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার আর এখনকার হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপ গুলো সব গুলোতেই আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল ও আছে। তারই প্রেক্ষিতে উপরের  গ্রুপ ডাইনামিক্স অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান থেকে বলতে বাধ্য হচ্ছি এটা আমাদের দেশের চিত্র, আমার ধারণা ইউরোপ আমেরিকা কিংবা চায়নার গ্রুপ ডাইনামিক্সটা ভিন্ন হবে হয়তো। যার মানে হলো এদেশের মানুষগুলো আসলে কচ্ছপের মত মাথা বের করে আবার খোলসের ভিতর মুখ লুকায়, পাছে লোকে কি বা বলের ভয় পায়, সহজে নিজেকে প্রকাশ করে না বা করতে ভয় পায়। এদের মাঝেই কিছু লোক আছে যারা চোরা গোপ্তা হামলা করে আপনার অর্থ সম্পদ লোপাট করার উপায় খোজে আর তাতে সফলও হয়। আমি নিজেই এরকম কয়েকটা হামলার শিকার হয়েছি সম্প্রতি তবে যত দ্রুত সম্ভব নিজেকে বাঁচিয়ে গর্ত থেকে উঠেও এসেছি । এদেশের মানুষগুলোর এরকম আচরণ কেন তা প্রত্নতাত্ত্বিক ও সমাজ বিদদের গবেষণার বিষয় হতে পারে তবে যা পাওয়া যাবে তা রবীন্দ্রনাথ বহু আগেই বলে গেছেন, বহু রক্ত ধারার সংমিশ্রণে আমরা মিশ্র জাতি বা কালারড পিপলস। আমাদের মনটাতেও তাই নানান রংয়ের খেলা চলে। কখন সবুজ, কখন পিঙ্গল, কখন তামার রং এ রঞ্জিত। এত নানান রং ঢেলে যে সমাজ তাতে ঐক্যের চেয়ে অনৈক্যই বেশি। এ সমাজে মুশারাকা প্রয়োগ উলু বনে মুক্তা ছিটান ছাড়া আর কিছুই ফল দিবে না। আমার হিসেবে একারণেই এদেশে মুশারাকা বা যৌথ কারবার বিফলে যায়।

প্রশ্ন উঠতেই পারে যখন মুশারাকা বিফল হচ্ছে তবে প্রতিকারটা কি? প্রতিকার ওই মুরাবাহা, মুদারাবা আর বাই মওয়াজ্জল কিংবা বাই-সালাম আর বাই ইশতিশনা। তবে শুঁকুক এ দেশে ভালো ফল দিবে তাতে সন্দেহ নাই, কেন যে এই শরিয়া ম্যাকানিজমটার বহুল ব্যবহার হচ্ছে না তার পেছনের কারণ মনে হয় মানুষজন আসলে এ বিষয়গুলো কেবল জানতে শুরু করেছে। সকলের যখন এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান হয়ে যাবে তখন আর বলতে হবে না, সবার দাবীর প্রেক্ষিতেই এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়াগুলো নির্ভর করে নতুন নতুন ডিপোজিট ও বিনিয়োগ সেবা গুলো আমরা বাস্তবে দেখতে পাবো।
 

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ১৫আগস্ট২০২৫> ২১আগস্ট২০২৫> ২৩অক্টোবর২০২৫> ২৫ডিসেম্বর২০২৫> ০৬জানুয়ারী২০২৬>

 

Sunday, January 4, 2026

অর্থনীতি ও ব্যাংকিং সেক্টর পর্যালোচনা - ২০২৫ বর্ষ সমাপনী

 

 আমার মত অতি সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং সেক্টর ও অর্থনীতি নিয়ে কথা বলাই সাজে না, তার পরও চেষ্টা করে দেখি, অন্তত একজন অতি সাধারণের মন্তব্য যারা ব্যাংকিং ও অর্থনীতি একদমই বুঝে না তাদের কাজে লাগলেও লাগতে পারে। বিগত দুয়েক বছর একটা করে পর্যালোচনা করে যাচ্ছি, এবারেরটা বাদ যাবে কেন। আগের বছর গুলোতে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিকতা প্রকট ছিল তা মন্তব্য করেছিলাম, এ বছর কি ব্যাংকিং সেক্টর সেই সংকট কাটায়ে উঠতে পেরেছে? প্রশ্নটা এখানেই, আর বিগত বছরগুলোতে যে ইসলামী ব্যাংক গুলো মারাত্মক রকম তারল্য সংকটে পরেছিল তা কি এত সহজেই কাটবে? এই সব প্রশ্নরই উত্তর খুঁজবো এই আলোচনায়। বিগত ২০ বছরে ব্যাংক সম্পর্কে নানান অভিজ্ঞতা হয়েছে, অনেকের সাথে কথা বলে যা বুঝেছি, তা হলো এ দেশের অনেক মানুষই ব্যাংকিং সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানে না। সাধারণ মানুষের কথা না হয় বাদ দিলাম, ব্যাংকে নতুন জয়েন করা অনেক ইয়াং ব্যাংকারের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা কম থাকায় বেশ কিছু বিষয়ে সংশয়ে ভুগে। মোদ্দা কথা যেহেতু ব্যাংকিং সম্পর্কে প্রাইমারি, সেকেন্ডারিতে তেমন কিছু পাঠ্য পুস্তকে থাকে না যার ফলে এ বিষয়ে ধরে নেয়া হয়, যখন টাকা হবে, যখন বয়স বাড়বে তখন চলতি পথেই শিখে নিবে এসব। বিষয়টা এরকম হওয়াতে এই জ্ঞান স্বল্পতা দেখা যায় সাধারণের মধ্যে, এরকমই আমার মনে হয়েছে।

আমাদের ব্যাংক গুলোর সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো খেলাপি ঋণ মানে যে ঋণ আর ফেরত আসে না, যাকে এনপিএল বা নন পারফর্মিং লোনও বালা হয়ে থাকে। এযাবৎ যত ব্যাংকিং পর্যালোচনা দেখেছি তাতে এ বিষয়টি কমন, মানে পড়লে পরীক্ষায় কমন পড়বেই। ঋণ খেলাপির এটা করতে পারে না, ওটা করতে পারবে না ইত্যাদিও শোনা যায়, কিন্তু চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনী এই বাগধারাটা সঠিক প্রমাণ করতে বিগত সময়ের মত এই প্রবণতাটি আমাদের দেশে মরণ ব্যাধির মত অর্থনীতি আর ব্যাংকিং সেক্টরে আঁশটে পৃষ্ঠে লেগে আছে যেন তা কাঁঠালের আঠা, কষ্মিণ কালেও ছাড়বে না। নিচের তথ্যচিত্রটি সেই  বিদঘুটে ট্র্যাজেডির ভয়াবহতা প্রকাশ করে মাত্র। 

ফিগার আর এমাউন্টের মধ্যে পার্থক্য এই যে একটি শুধ সংখ্যা আরেকটি ওই সংখ্যার অর্থবহ উচ্চারণ, ৬,৪৪,৫১৫,00,00,000/- BDT সংখ্যাটি কথায় না লিখলে বোধগম্যতায় আসে না, তাই বলেই দেই, এটা ছয় লক্ষ চৌচল্লিশ হাজার পাঁচ শত পনের কোটি টাকা মাত্র। আমার ক্লাস ফাইভে পড়া ছেলেটা বুঝতেই পারছে না এত বড় সংখ্যা মানে এটা কত বড়, ওর বোধগম্যতায় লক্ষ টাকার উপর কোটি টাকা না হয় বিলিয়ন হবে কিন্তু এত টাকা !!, তাও ব্যাংক থেকে লোন দেয়? এটা ওর প্রশ্ন, আমি হাসলাম, মনে মনে বললাম, দেয় না মানে, ওই টাকা থেকে নিজেদের পকেটে যে কত পারসেন্ট যায় তা ওরাই ভালো জানে। আমারও তো টাকার দরকার তবে এতটা না, এই ধরেন কয়েক লক্ষ টাকা দিলেই হবে, তবে ভাই কবে যে ফেরত দিতে পারবো তা জানি না, এই ফাঁদে ধরা দিয়ে যদি দিয়েই ফেলেন তো মরেছেন ওই টাকা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন পেস্টের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, জীবনেও ওই পেস্ট তার টিউবের ফিতর ঢুকান যাবে না। এই সব ঋণ আদতে জন্মলগ্ন থেকেই কুঋণ তা সবাই জানে, জেনে বুঝেই দেয়, গোপনে নিজের পকেটে তার কিছুটা তো অবশ্যই যায়, তাই মনে হয় লোভ সামলাতে পারে না। বলছিলাম কি, প্রাইমারি থেকেই যদি সার্জিলের শুদ্ধাচার স্লোক গুলো মুখস্থ করানো হতো তা হলে মনে হয় কিছু মিছু সত্য নিষ্ঠ শুদ্ধাচরীর জন্ম হতেও পারতো এ দেশে। ভবিষ্যতে হয়তো হবে কোন একদিন, সেই আশায় বসে বসে দিখতে থাকি, দেঁকি না কি করে!।


ভুয়া প্রতিষ্ঠান কিংবা কাগুজে প্রতিষ্ঠান এর নামে অর্থ ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করাটা একটা মারাত্মক রকম ক্ষতিকর প্রবণতা আমাদের দেশে, ছোট ছোট ঋণ গুলো ঠিকই ফিরে আসে কিন্তু বড় সর লোনগুলো করাই হয় যেন তা বার বার রিশিডিউল করে একটা অনৈতিক সুবিধা নেয়ার ইচ্ছাতে। এতে করে ক্যাশ টাকা কিংবা আমরা যাকে বলি লিকুইডিটির সুবিধাটা ব্যবসায় কার্যকর থাকে। হাতে টাকা থাকলে কত কি না করা যায়। মানুষকে বাকিতে বিক্রয় আর অগ্রিম ক্রয় এর সুযোগ দিতে গিয়ে অর্থনীতিকে কতগুলো রিস্ক ফ্যাক্টর হজম করতে হয়। একটা ব্যাংকিং এর বই পড়তে গিয়ে দেখি লেখক কেবল বাকিতে টাকা ফেরত প্রসঙ্গে বেশি কথা বলেছেন, মনে হচ্ছিল যেন বাকিতে টাকা’র লেন দেনই সব থেকে গুরুত্ব বহ বিষয়, বইটা আমি ঘৃণা ভরে ফেলে দিয়েছিলাম, পড়ি নাই। আমি বাকিতে বিশ্বাস করি না, নগদ যা পাও হাত পেতে না বাকির খাতা শূন্য, এই প্রবাদটা আমার মনের অনেক গভীরে প্রথিত, তাই বাকিতে বিক্রয় আর ভবিষ্যৎ ক্রয়ের ধারণা গুলোর সাথে যে ঝুঁকি জড়িত আছে তার সাথে আমার মাথার নিউরন গুলোর সংবেদন সংঘর্ষিক মনে হয়।

ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার প্রবণতাটা আমার মতে এদেশের মানুষের দর্শনের সাথে জড়িত। যারা ছা-পোষা মানুষ মানে “ভাই আমি কোন দল করি না, এই দু মুঠো খেয়ে পড়ে শান্তিতে থাকতে পারলেই আমাদের চলে যায়” এই টাইপের মানুষ গুলো আসলে বলতে চায় তারা সমাজের সকল জটিলতা থেকে নিজেদেরকে দুরে সরায়ে রাখতে পছন্দ করে। এরা সৎ কিংবা অসৎ তা কিন্তু বলছি না, বলছি যে এরা দুষ্ট লোকদের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে যারা জানে তারা অনেক মানুষের দেশে জন্মেছে, এখানে কেউ সেধে দিবে না, কাইরা নিতে হবে, তারা তা নেয়ও ওই ছা-পোষা মানুষ গুলোর নাকের ডগার সামনে দিয়ে আর উনারা তা দেখে কেবল ছে ছে করে, তার বেশি কিছু করতে গেলে ওই যে আবার জটিলতা আর শৃঙ্খলার মধ্যে পড়তে হয়, এই ভয়ে বেশি কিছু বলে না। তার চেয়ে চা এর আড্ডায় কিংবা সমবয়সীদের সাথে দেখা হলেই, দেশটা গেল, কোনদিন এই দেশের কিচ্ছু হবে না এই মন্তব্য করে নিজেদেরকে প্রবোধ দেয় মাত্র। যার ফলশ্রুতি হলো ওই খেলাপি ঋণ, যারা করে তারা জানে দেশের অধিকাংশ ওই ছা-পোষা মানুষ, তারা গর্ত থেকে মাথা উঁচু করে দেখবে ঠিকই কিন্তু গর্ত থেকে বের হয়ে কিছু করবে না। অন্য কেউ যদি তাদের হয়ে কিছু করে দেয় তবে তাকে বাহবা দিবে তাও দুর থেকে।

যা হোক, সাধারণ মানুষের এহেন মানুষিকতার প্রতি বিরূপ মন্তব্য না করি, কি আর বলবো ভাই, আমি নিজেও তো ওদেরই দলের। উহাদিগের বোধোদয় আমার বিচার্য বিষয় নয়, বরং জুলাই ২০২৪ অর্থ বছর থেকে এই ২০২৫ এর বর্ষ সমাপনীর কিছু প্রাথমিক তথ্য উপাত্ত থেকে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করি যাতে সুস্থতা আর অসুস্থতার কিছু চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। 

ইসলামী ব্যাংকিং এর একটি ইউনিট পর্যালোচনায় দেখা যায় বিগত হিস্টোগ্রামের প্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ তিন মাসের প্রজেকশনে অর্থাৎ মার্চ ২০২৬ এ এর আমানত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর, যা এপ্রিল ২০২৫ এর পর আর পূর্বের অবস্থায় পৌছায় নাই। যে ফান্ড সরে গেছে তা আর ফিরে আসেনি, হতে পারে তা অন্যত্র রাখা হয়েছে কিন্তু সাম্প্রতিক ইসলামী ব্যাংক গুলোর যা অবস্থা তাতে তা অন্য কোন ইসলামী ব্যাংকে সরে না গিয়ে বরং মানি মার্কেট থেকেই সরে গেছে বলে আমার মনে হচ্ছে, হয় তা ব্যবসায় বিনিয়োগ হয়ে গেছে না হয় তা স্থাবর কোন সম্পত্তিতে ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে। দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদ্যমান তখন অর্থনীতির সূত্র গুলো ঠিক মত কাজ করে না, তাই সর্বত্রই অসংগতি নজরে আসে। এটাও সেরকম রহস্যজনক কোন অসংগতি আমার দৃষ্টিতে।


আলোচ্য ব্যাংকিং ইউনিটটির বছর শুরুর বিনিয়োগ টার্গেটের বছরান্তের অর্জন তার ধারে কাছেও না। বিষয়টা কি চমৎকার ভাবে দেশের বর্তমান অবস্থা টা তুলে ধরেছে, সম্প্রতি যে শোনা যাচ্ছে বিনিয়োগ কমে গেছে বিপুল পরিমাণে, এটা তার একটা সুন্দর প্রমাণ। ইউনিটটি বিনিয়োগ করতে পারছে না, ফোর কাস্টিং বলছে পরবর্তী তিন মাসে তা আরে নিম্নমুখী প্রবণতা প্রকাশ করবে। আসন্ন কয়েক মাসে দেশে যদি শক্তিশালী কোন সরকার দক্ষতার সাথে হাল না ধরে তবে যেমন ম্যাক্র ইকনমি’র পতন হবে, তার সাথে সাথে মাইক্রো ইকনমিও মারাত্মক রকম ভাবে ধসে পড়বে, এটা মনে হয় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে।

ওই যে আগে বলা হলো যে, যখন দেশে রাজনৈতিক পরিবেশ পরিস্থিতিতে একটি বিশৃঙ্খলা থাকে তখন অর্থনীতির সূত্রগুলো ঠিক মত কাজ করে না, উপরের মুনাফার ট্রেন্ড লাইনটি তারই প্রমাণ। বিনিয়োগ ও আমানত উভয়েই নিম্নমুখী থাকা সত্যেও মুনাফা ঊর্ধ্বমুখী, বছর শুরুর প্রদত্ত টার্গেট ছাড়ায়ে উপরে উঠে গেছে। বিষয়টা এমন যে ফুটবল খেলায় মেসি আপনার দল থেকে সরে গেছে অথচ চিন্তার বাইরে একাধিক গোল করে আপনার দল জিতে গেল। মেসি কিন্তু নাই অথচ সাধারণ প্লেয়াররাই মেসির চাইতে ভালো খেলা দেখাল, বিশ্বাস যদি না হয় তবে উপরের চিত্রটাও আপনার বোধগম্যতায় আসবে বলে মনে হয় না।

বর্তমান বাজার ও অর্থনীতি নিয়ে আমার মধ্যে একটা চরম বিস্ময় চলমান আছে, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না একে কি বলা যায়। পারফেক্ট মার্কেট হলো যেখানে প্রচুর বিক্রেতা ও প্রচুর ক্রেতা বর্তমান থাকে। আমাদের শহরের বিভিন্ন রাস্তায় ঘুরলে দেখা যাবে অজস্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ফুটপাথে, রাস্তার দু ধারে ভ্যানে করে কিংবা সকল বিপণী বিতানে প্রচুর দোকান পাটে সর্বত্র জমজমাট ব্যবসা চলছে, নিত্য নতুন দেশি বিদেশি পণ্য তার পাশাপাশি ক্রেতা ও বিক্রেতার হাঁক ডাক যেন মনে হবে ২৪ গুণন ৭ ঘণ্টাই বিশাল মেলা চলছে। একেই কি সেই পাঠ্য পুস্তকে পড়া আদর্শ বাজার বা পারফেক্ট মার্কেট বলে না? কিন্তু তা কি করে সম্ভব, যখন দেশে একটি স্থিতিশীল সরকার নাই, পুর জাতি চলছে কেয়ার টেকার গভর্নমেন্টের তত্বাবধানে তখন এরকম আদর্শ বাজার হয় কি করে? ম্যাক্রো ইকোনমিক ইনডিকেটর গুলো দুর্বলতা দেখাচ্ছে, ভয়ংকর রকম ভবিষ্যৎ বিপর্যায় এর সঙ্কেত দিচ্ছে অথচ দেশের মাইক্রো ইকনমি চাঙ্গা তা হয় কোন যুক্তিতে। একটা আপাত যুক্তি মনে হয় তা হলো, দেশের রাস্তা-ঘাট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক উন্নত হওয়ায় পণ্য পরিবহনে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। গন মানুষের মুভমেন্ট বা স্থানান্তর সহজতর হয়েছে যার একটা ইনারশিয়াল বা গতি জড়তা জনিত ধাক্কায় এই অভাবনীয় মাইক্রো ইকনমিক উচ্ছলাত দেখা দিতে পারে, তবে এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত অনুমান, কোন তথ্য উপাত্তর বিচারে না। খালি চোখে দেখে যা মনে হয়িছে তা বলে দিলাম অকপটে। তবে এখন পর্যন্ত এটাই আমার কাছে একমাত্র গ্রহণ যোগ্য যুক্তি। নানা মুনির নানা মত থাকতেই পারে, আমিও এক মুনি তাই বলছিলাম কি, কয়লার ময়লা ধুইলেও যায় না, এ দেশের সাধারণ জনতা যতদিন গর্তে লুকায়ে থাকবে ততদিন ঋণ খেলাপিরা ঋণ নিয়ে লোপাট করতেই থাকবে আর ওদিকে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসে তবে দেশের ম্যাক্র-মাইক্রো ইকনমিতে ধস নামবে ব্যাংকিং সেক্টর খোকলা থেকে খোকলা তর হবে, আমরা আম জনতা কাঁঠাল পাতা খেয়ে বেচে থাকবো।
 

সম্পাদনা ও উন্নয়ন ইতিহাসঃ ০১জানুয়ারী ২০২৬> ৩জানু২০২৬>