Sunday, October 29, 2023

সাধু ভাষার চল কি তবে চিরতরে উঠিয়াই গেল?

 

অতি সম্প্রতি সাহিত্য প্রকাশের শতবার্ষিক সংস্করণ, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র-মজুমদারের ঠাকুরমা’র ঝুলির গল্পগুলা আমার পুত্র মুসাবকে রাত্রিকালীন ঘুমের পূর্বে পড়িয়া শুনাইতেছি। আমি এক পাতা পড়িলে সে কাড়িয়া লইয়া পরের পাতা আমাকে পড়িয়া শুনায়। উদ্দেশ্য মূলত আমার পুত্র ইংরেজি মিডিয়ামে পড়াশুনা করে বিধায় তাহাকে বাংলা সাহিত্য পঠনের প্রতি আকৃষ্ট করা। এরূপে আমরা একের পর এক বাংলার অতি প্রাচীন রূপ কথাগুলোর কল্পনা রাজ্য উন্মোচন করিয়া পিতা পুত্র দারুণ অভিজ্ঞতা লাভ করিতেছি। প্রথম গল্পটি পড়িয়া শুনানর সময় আমার নয় বৎসর বয়সের পুত্র তাহা পুরটা মনোযোগ সহকারে শুনিয় উহা অতি বিরক্তিকর বা বোরিং বলিয়া চলিয়া যায় কিন্তু পরবর্তী রাতগুলোতে পিতার সহিত একই সাথে পড়ার আনন্দ উপভোগ কল্পে এই চর্চা চলমান আছে। বাংলাদেশে ওয়াল্ট ডিজনির মত মহাপুরুষ জন্মগ্রহন করেন নাই বলিয়াই পশ্চিমা রূপকথা যেমন স্নো-হোয়াইট, রূপাঞ্জেল, সিনডারেলার মত রূপকথাগুলো এনিমেশন মুভি আকারে নির্মিত হইলেও বাংলার প্রাচীন রূপকথা, সাত ভাই চম্পা, কলাবতী রাজকন্যা, সোনার কাঠি রূপার কাঠির মত রূপকথাগুলো হারায়ে যাওয়ার পূর্বেই দক্ষিণারঞ্জান মিত্র মজুমদার তাহা ঠাকুরমার ঝুলি গ্রন্থে রক্ষা করিয়াছেন। তাহা তিনি করিয়াছেন বলিয়াই আজ আমি  তা একবিংশ শতাব্দীর সন্তানের হাতে তুলিয়া দিতে পারিতেছি। রবীন্দ্রনাথ দক্ষিণারঞ্জান মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি গ্রন্থের ভূমিকায় বলিয়া গেছেন “দক্ষিণা বাবুকে ধন্য। তিনি ঠাকুরমা’র মুখের কথাকে ছাপার অক্ষরে তুলিয়া পুঁতিয়াছেন, তবু তাহার পাতাগুলো প্রায় তেমনি সবুজ, তেমনি তাজাই রহিয়াছে, রূপকথার সেই বিশেষ ভাষা, বিশেষ ভীতি তাহার সেই প্রাচীন সরলতাটুকু তিনি যে কতটা দূর করিতে পারিয়াছেন, ইহাতে তাঁহার সূক্ষ্ম রসবোধ ও স্বাভাবিক কলানৈপুণ্যের প্রকাশ পাইয়াছে। আমি হইলে ত একাজে সাহসই করিতাম না।” গ্রন্থটির ভূমিকার শেষে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার লিখিয়াছেন “এক্ষণে আমার প্রস্তাব এই যে, বাংলাদেশের আধুনিক দিদিমাদের জন্য অবিলম্বে একটা স্কুল খোলা হউক এবং দক্ষিণাবাবুর এই বইখানি অবলম্বন করিয়া শিশু-শয়ন-রাজ্যে পুনর্বার তাঁহাদের নিজেদের গৌরবের স্থান অধিকার করিয়া বিরাজ করিতে থাকুন’ – বোলপুর, ২০শে ভাদ্র ১৩১৪ বং। বুলবুল চৌধুরী বইটির ভূমিকায় লিখিয়াছেন, দক্ষিণারঞ্জন পাঠকদের প্রতি অকপটে নিবেদন করেনঃ- 

”তোমাদেরই হারাধন, তোমাদেরই বুলি,
আবার এনে ঝেড়ে দিলাম, হাতে তুলি।”

তিনি আরো বলিয়া গিয়াছেন

”ঘুম ঘুম ঘুম,
--সুবাস কুম্ কুম্ –
ঘুমের রাজ্যে ছড়িয়ে দিও
ঠাকুরমা’র

ঝুলি।”

ঠাকুরমা’র এ ঝুলিতে সন্নিবেশিত হইয়াছে দুধের সাগর, রূপ-তারসী, চ্যাং-ব্যাং, আম সন্দেশ এর মত বাংলার প্রাচীন রূপকথার গল্প গ্রন্থ গুলোও। বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত এবং সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত ছায়াছবি “পথের পাঁচালী” তে সুন্দর করিয়া দেখাইয়াছেন কি ভাবে ঠাকুর মা তার নাতিদিগের ঘুম পাড়ানোর সময় এই সব রূপ কথাগুলো শুনাইতেন আর কুপির আলোতে তাহাদের ছায়ার কম্পনে সেই গল্পের জগতকে কতটা মোহনীয়তার সাথে ভয়াবহ রূপ ধারণ করিতো। আমার এ লেখার উদ্দেশ্য ঠাকুরমার ঝুলি নিয়ে নয় বরং আমি উহা পড়িতে পড়িতে মনে পড়িল আমি রবীন্দ্রনাথের “সাহিত্যের সামগ্রী” প্রবন্ধটি সাধু ভাষা হতে চলিত ভাষায় রূপান্তর করিয়াছিলাম ও আমার লেখা “আকাশ খুলে বসে আছি তা’ও কেন দেখছো না” তে অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলাম। আমার মনে হইতো সাধু ভাষায় লেখা বলিয়া অনেকেই প্রবন্ধটি পড়িবে না বরং তা চলতি ভাষায় লেখা হইলে অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বোধগম্য হইবে। আজ যখন রূপকথার গল্পগুলি আমার শিশুপুত্র মুসাব বিন সার্জিল কে পড়িয়া শুনাইতেছি তখন তাহা দেখিলাম সাধু ভাষায় সংরক্ষিত আর তা পড়িতে মোটেও খারাপ লাগিতেছে না আর তা আমার সন্তানের কাছেও স্রুতি কটু লাগিতেছে না। সাধু ভাষা একদা ছিল অভিজাত্যের প্রতীক। বাংলা সাহিত্যের প্রথম যুগে সাধু ভাষাতেই গল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখিত ও পঠিত হইতো। আজ কেন তবে তার প্রচল উঠিয়া যাইতেছে সেই ভাবনা থেকেই সাধুভাষাতেই আমার এই লেখার চেষ্টা। আমার লেখা যাহারা পড়েন তাহাদিগকে একটু চমকিয়া দেয়ার লোভেও বলতে পারেন সাধু ভাষায় অন্তত একটি লেখা লিখিবার চেষ্টা করিলাম।

সাধু ভাষায় লিখিত একটি প্রবন্ধ আর চলতি ভাষায় লেখা একটি প্রবন্ধ পাশাপাশি পড়িলেই বুঝা যায় যে সাধু ভাষা অত্যন্ত মোলায়েম আর অত্যন্ত শুধি জনের ভাষা। ভাষা কখনও একই থাকে না, সংস্কৃত ভাষা থেকে পালি ও বাংলা ভাষায় উত্তরণ একটা স্বাভাবিক সময়ের ঘটনা মাত্র। সংস্কৃত ভাষায় শুকনো কাঠকে বলা হয় শুষ্ঠং কাষ্ঠং বলিয়াছিলেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের প্রথম বাংলা ক্লাসের স্যার, যার সূত্র ধরিয়া আমরা ছেলেরা মজা করিয়া শুকনা কাঠামোর এক মেয়ে সহপাঠীর ছদ্ম নাম রেখেছিলাম শুষ্ঠং কাষ্ঠং। সেই কঠিন সংস্কৃত ভাষায় আজ আর কেউ কোন লিখা লিখিবে না সেটাই যেন স্বাভাবিক। তেমনি করে সাধু ভাষায় পঠন ও লেখনও আজ কাল উঠিয়া গিয়াছে বলিয়া দেখা যাইতেছে। একটি ভাষার উদ্দেশ্য হইতেছে মানুষের মনের ভাব ও ভাষা অন্যের কাছে পৌছিয়ে দেয়া তা যে অক্ষর বা ভঙ্গিমায়ই হোক না কেন। যদি ভাষাটি সঠিক ভাবে মানুষের মনের ভাবকে অন্যের কাছে পৌছিয়া দিতে সক্ষম হয় তবেই সেই ভাষার সার্থকতা। বাংলা ভাষাকে নিম্ন মানের ভাষা বলাতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা ভাষায় সনেট রচনা করিয়া প্রমাণ করিয়া দিয়াছিলেন যে বাংলা ভাষা বিশ্বের যে কোন ভাষার চেয়ে কম উন্নত নহে। এই ভাষা আজ বিশ্ব দরবারে মাতৃভাষার সম্মান অর্জন করিয়াছে। সব ভাষাতেই ক্লাসিকাল ভাষা বলে একটা উন্নত ভাষার সংস্করণ আছে যেমন আরবি ক্লাসিকাল ভাষাতে পবিত্র কোরআন অবতীর্ণ হয়। ইংরেজিরও ক্লাসিকাল সংস্করণ আছে আর বাংলা ভাষার ক্লাসিকাল সংস্করণ এই সাধু ভাষা। তাই বলিতেছি এই ক্লাসিকাল ভাষাটির সময়ের গর্ভে হারায়ে যাওয়া কি উচিত হইতেছে? আমি যখন সিলেটে কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে চাকুরীতে গিয়েছিলাম তখন সেখানকার সেন্টার হেড ছিলেন চন্দ্রশেখর মেহতা, উনি ভারতের লোক ছিলেন, তিনি বলিতেন বাংলাদেশিরা খাইছিলাম, ঘুমাইছিলাম, গেছিলাম এই ভাবে কথা বলিয়া থাকে আর পশ্চিম বংগের ওরা এই শব্দগুলোকেই বলিয়া থাকে খেয়েছিলাম, ঘুমিয়েছিলাম, গিয়েছিলাম এই ভাবে। আরো ভালো করিয়া বলিতে গেলে বলিতে হয়ে তাহারা এই ভাবে বলিত, খেয়েছিলুম, ঘুমিয়েছিলুম, গিয়েছিলুম – তাহা যেন অনেকটা নেকামি করার ছলে ভাষাটিকে আদুরে ভাবে প্রকাশ করার ভঙ্গী। এক বংগ ভঙ্গেই এই অবস্থা মানে হইলো ভাষার মধ্যে পার্থক্য দেখা দিয়াছে তাহা হইলে স্থানভেদে কালভেদে ভাষার বিবর্তন হইবে তাহাই স্বাভাবিক কিন্তু উচ্চতর মর্যাদা সম্পন্ন সাধু ভাষা কেন সকলে পরিত্যাগ করিতেছেন তাহাই এক মহা প্রশ্ন বটে।

আমার তিন সন্তানের শিশুকাল আমি দারুণ ভাবে উপভোগ করিয়াছি। বয়স এক বৎসরের কম থাকাকালীন প্রত্যেককে বুকের উপর বসাইয়া দুই হাতে তার দুটি হাত মুঠি করিয়া ধরিয়া তালে তালে ছড়া কাটিতাম, “আগডুম, বাগডুম, ঘোড়াডুম সাজে, ঢাক ঢোল ঝাঁজর বাজে, বাজতে বাজতে চললো ঢুলি, ঢুলি গেল কমলাফুলি, কমলা ফুলির টিয়েটা সুর্যি মামার বিয়ে টা”। ওরাও খুব মজা পাইতো। রাতে ঘুম পাড়ানোর সময় ছাড়া কাটিতাম “খুকু ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো বর্গি এলো দেশে, ধান শালিকে ধান খেয়েছে খাজনা দিব কিসে?, ধান ফুরালো পান ফুরালো, খাজনার উপায় কি? আর কটা কাল সবুর করো রশুন বুনেছি”। ওরা যখন একটু একটু বুঝতে শিখিয়াছে ও দু একটি কথা মুখে ফুটিয়াছে তখন জিজ্ঞাসা করিতাম খাজনার উপায় কি? ওঁরা উত্তরে বলিত ”রশুন বুনেছি”। তেমনি আরেকটা ছাড়া ছিল ”নোটন নোটন পায়রা গুলো ঝোটন বেধেছে, ও পারেতে ছেলে মেয়ে নাইতে নেমেছে, এ পারেতে রুই কাতলা ভেসে উঠেছে, কে দেখেছে? কে দেখেছে? দাদা দেখেছে, দাদার হাতে কলম ছিল ছুড়ে মেরেছে, উফ্ বড্ড লেগেছে”। আমার  শিশু কন্যা প্রদীপ্তি বলিয়া উঠিত ”বন্ড লেগেছে”। তা যাহাই হউক, সাধু ভাষায় ছড়া গুলোও তো লেখা হয় নাই কিন্তু এই ছড়া গুলিও আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির অত্যন্ত সমৃদ্ধ উপাদান। আমি জানি না কতজন বাঙ্গালী বাবা মা তাহাদের বাচ্চাদের এই সব ছাড়া শুনাইয়া এখনও ঘুম পাড়ান। তারা মনে হয় ”টুইংকেল টুইংকেল লিটিল স্টার” ইংরেজি কবিতাটিকেই অধিকতর যুতসই মনে করিয়া থাকিবেন। কিন্তু বলিয়া রাখি বাংগালিয়ানা আমাদের মাঝে আজো টিকিয়া আছে আর প্রজন্ম প্রজন্মান্তরে এই বংলাই তাহার সুপ্রাচীন সমৃদ্ধ উপাদানগুলো বহন করিয়া চলমান থাকিবে বলিয়া আমি বিশ্বাস করি।

আমাদের দেশের সুধী সমাজ, সুশীল সমাজ, শিক্ষিত সমাজ ও বাংলা একাডেমীর কাছে সবিনয় আবেদন এই যে, বাংলার ক্লাসিকাল ভাষা, এই সাধু ভাষাকে সময়ের গর্ভে হারায়ে যাইতে দেওয়া উচিত নহে, বরং ইহাকে সংরক্ষণের তাগিদে সাধু ভাষায় সাহিত্য রচনার প্রচলন অব্যাহত রাখা উচিত। চলতি ভাষার প্রয়োজন আছে কারণ তাহা প্রায়োগিক ভাষা কিন্তু পুঁথিগত বিদ্যায় সাধু ভাষার অস্তিত্ব একেবারে বিলীন হইয়া যাইবে তাহা যেন মানিয়া লওয়া যায় না। বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে বদলাইয়া দিয়াছে দেখিয়া অনেকের মুখেই ইদানীং শুনা যায় সাহিত্যের আর কি বা দরকার রহিয়াছে। অন্তর্জলে বা ইন্টারনেট ঘাঁটিলে বহু জন আজকাল বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে নানা বক্তব্য নিমেষেই বলিয়া সকলকে অবগত করাইতেছেন। আমার পরিচিত দুই সুধীজনকে বিতর্ক করিয়া বুঝাইতে হইয়াছে যে সাহিত্যের প্রয়োজন যতকাল মানব সম্প্রদায় থাকিবে ও মানব হৃদয় উদ্বেলিত হইতে থাকিবে ততকাল সাহিত্যের প্রয়োজন ফুরাইবে না। এমনকি যুদ্ধ বা সংঘাতেও সাহিত্য তার অবদান রাখিয়া আসিয়াছে। ভাষা আন্দোলনের সময়কার স্লোগান, ”ওরা আমার মায়ের ভাষা কাইরা নিতে চায়”, কিংবা নজরুলের বিদ্রহী কবিতা গুলোই তাহার প্রমাণ বহন করিয়া থাকে। আমার জানা মতে পৃথিবীর আর কোন ভাষা নাই যাহার অধিকারের জন্য সালাম, বরকত, রফিকের মত কাউকে আত্মত্যাগ বা মৃত্যুবরণ করিতে হইয়াছে। বাংলাই একমাত্র ভাষা যাহার জন্য মানুষ রক্তদান করিয়াছে।নব্য বাঙ্গালী সমাজ পাশ্চাত্যের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এতটাই মোহাচ্ছন্ন হইয়া পরিয়াছে যে নিজেদের সাহিত্য নিয়া তাহারা ততটা চিন্তা ভাবনা করার প্রয়োজন বোধ করেন বলিয়া মনে হয় না। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক শব্দরও আজকাল বাংলা প্রতিশব্দ হইতেছে। যেমন পারটিকেল এক্সিলারেটরের বাংলা হইয়াছে কণা ত্বরক যন্ত্র। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর বাংলা প্রতিশব্দ হইয়াছে কণা বলবিদ্যা। ব্ল্যাক হোলের বাংলা প্রতিশব্দ হইয়াছে কৃষ্ণ গহ্বর। বাংলা সাহিত্যের বিকাশে বাংলা একাডেমীর অবদান অনস্বীকার্য আর তদ কর্তৃক প্রতি বৎসর বই মেলার আয়োজন বাংলা ভাষার বিস্তার ও বিকাশে অভূতপূর্ব অবদান রাখিয়া আসিতেছে। বাংলা একাডেমীর ভাষা শহীদ গ্রন্থমালার বই গুলো অত্যন্ত জ্ঞান গর্ভ আর তদ কর্তৃক বাংলায় অনুবাদ কৃত বহু পুস্তিকা বাংলা ভাষাকে উত্তর উত্তর সমৃদ্ধ করিয়া চলিয়াছে। বাংলা একাডেমীর পাশাপাশি সাধারণ বাঙ্গালীদের মাঝের বাংলার প্রতি মমতা থাকা উচিত আর তার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা উচিত বলিয়া আমি মনে করি। বাংলা সাহিত্যে ঢাকা কলেজের জনপ্রিয় অধ্যাপক আবদুল্লা আবু সাঈদ ও তাঁর বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রর অবদানও বিশাল। আমি ক্লাস ফাইভ কি সিক্সে পড়ার সময়কালীন তিনি বিশ্ব সাহিত্যের বই পড়া প্রতিযোগিতা নিয়া আমাদের ধানমন্ডি গভ. বয়েজ হাই স্কুলে আসিয়াছিলেন। তাহার দেয়া বক্তব্য ও অনুপ্রেরণাতেই আমার পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বিশ্ব সাহিত্যের বিভিন্ন বই পড়ার অভ্যাস গড়িয়া উঠে। তাঁহার আলোকিত মানুষ চাই আন্দোলন ও গাড়িতে চলমান পাঠাগার প্রকল্পও সমাজের মানুষদিগের মাঝে পঠন পাঠনের অভ্যাস গড়িয়া তোলার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়া চলিয়াছে। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর পায়ে হাঁটিয়া গ্রামে গ্রামে নারী শিক্ষা বিস্তারের প্রয়াস চালাইয়া ছিলেন বলিয়া শুনিয়াছি। এই সব গুনি মানুষ জন যুগে যুগে আমাদের পথ দেখাইতে আসেন আর কিছুকাল তাহাদের কৃত কর্মের উন্নয়নে আমরা উপকৃত হই। তাহার পর যেই সেই সব ভুলিয়া নিজ নিজ স্বার্থ ও ধান্দা লইয়া ব্যস্ত হইয়া পড়ি। বর্তমান বাঙ্গালী সমাজের সমৃদ্ধ জনগণের মাঝে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার উদ্যোগ রচিত হউক ও চলতি ভাষার পাশাপাশি সাধু ভাষাতেও সাহিত্য রচনা যাহাতে অব্যাহত থাকে সেই দিকে তাহাদের সদয় দৃষ্টি নিবদ্ধ হউক এই প্রত্যাশা রাখিয়া, লেখাটি শেষ করিলাম।

এডিট ও আপডেট হিস্ট্রিঃ ২৯অক্টোবর২০২৩>

Wednesday, October 18, 2023

যথার্থতার মানদণ্ডই বিবেক (Generally accepted common judgment ) বা সর্বজন গ্রাহ্য সাধারণ বিচার বোধ

 

বিবেক বা ন্যায্যতা নিয়ে নানা রকম কথাবার্তা শুনা যায় আমাদের সমাজে। রিকশাওয়ালাকে কম ভাড়[ দিলে বলে আপনি ন্যায্য ভাড়া দেন নাই বা আপনার কি বিবেক নাই? এই বিবেকটা আসলে কি তা নিয়ে আমার মতে বিভিন্ন মানুষের মনে বিভিন্ন রকম ধারণা রয়েছে যাকে সাধারণীকৃত করা হয় নাই। সবাই বিবেক বলতে একই জিনিসকে বুঝায় না তা জানা সত্যেও সবাই বিবেকের দোহাই দেয়। আমার মনে হয়েছে জনসাধারণ যে বিবেকের কথা বলে তাকে তারা সাধারণিকৃত (স্টেনডারডাইজইড) মানদণ্ড (স্কেল) ধরে নেয়। কিন্তু দিলখুশা থেকে সিদ্ধেশ্বরীর ভাড়া ৬০ টাকা নাকি ৮০ টাকা হবে তার ন্যায্যতা কোন মানদণ্ডে বিচার হওয়া উচিত? যখন অফিস ছুটির সময় তখন তারা ৮০ টাকা চাওয়াকে ন্যায্য মনে করে আর অন্য সময় ৬০ টাকা। বৃষ্টি হলে বা রাস্তায় প্রচুর যানজট হলে ১০০ টাকা দাবি করে, কাউকে আবার ১২০ টাকাও চাইতে শুনেছি। তাহলে এই যথার্থতার মানদণ্ডটা কি হওয়া উচিত? সরকার সিএনজি ট্যাক্সির মিটার রেট নির্ধারণ করে দিলেও তারা মিটার চালায়ে রাখে কিন্তু দামাদামি করে ভাড়া ঠিক করে নেয়। সরকারের বেধে দেয়া রেটকে তারা ন্যায্য মনে করে না বলেই তারা এই কাজটা করে থাকে। আমার কথা হলো ন্যায্যতা বা যথার্থতার একটা মাপকাঠি অবশ্যই আছে না হলে লোকজন বিবেক বিবেক বলে এত চেঁচায় কেন? বিশ্ব বিবেক বলেও একটা ধারনা আছে তা হলে বিবেক কি আর বিশ্ব বিবেকটাই বা কি? যারা সিভিক্স সায়েন্স কিংবা সমাজ বিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করেন তারা মনে হয় আমার কথা শুনে হাসছেন। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম তার পর নানা চড়াই উৎরাই পার হয়ে বাণিজ্য বিদ্যা দিয়ে পড়াশুনার শেষ করেছি। তাই আমার কাছে সমাজ বিদ্যা ডিগ্রিতে পাঠ্য হলেও যারা অনার্স কিংবা মাস্টার্স করেছেন তাদের তুলনায় আমার জ্ঞান কম থাকাটাই স্বাভাবিক। যে টুকু বুঝি তা হলো বিবেক বলতে সমাজের গণ মানুষের সম্মিলিত মনোভাবের স্বীকৃত মানদণ্ডকে বুঝান হয়। সহজ করে যদি বলি, ইংরেজিতে একটা মাত্র শব্দ দিয়ে যাকে বলা হয় কনসেনসাস, মানে হলো জনমত আর এই জনমতই মূলত বিবেকের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। 

আমার উপরের স্বব্যাখ্যাত সঞ্জাটি সত্য হলে অনেকে বিবেককে যে ঐশ্বরিক কিংবা অলৌকিক কিছু ভাবে তা সম্পূর্ণ রূপে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। যথার্থতার মানদণ্ড নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। দিলখুশা থেকে সিদ্ধেশ্বরীর রিকশা ভাড়া ৬০ টাকা যথার্থ নাকি ৮০ টাকা ঠিক, একজন ১২০ টাকা চাওয়াতে পাসের কিকশাওয়ালাই হেসে দিল। লোকজন বলে বসলো তুমি তো জায়গাটা না চিনেই আন্দাজে ভাড়া চাইছো। আমার কথা হলো এই ভাড়াটা যে ৮০ টাকা ঠিক হবে তা কে নির্ধারণ করে দিল আর ১২০ টাকা চাওয়াতে পাশের রিকশাওয়ালা কেন হাসলো ও তাকে অন্যায্য মনে করলো? রিকশায় তো সিএনজি ট্যাক্সির মত মিটার লাগানো নাই যে সরকার ঠিক করে দিয়েছে প্রতি কিলোমিটার এত টাকা। এই যে ৮০ টাকা ন্যায্য ভাড়া হবে এটা সকল রিকশাওয়ালা ও যাত্রীদের সামগ্রিক কনসেনসাস বা জনমত। এটা গড়ে উঠেছে দু পক্ষের দর কষাকষি বা ইংরেজিতে যাকে বলে বারগেইনিং পাওয়ারের উপর নির্ভর করে। তবে প্রত্যেক মানবের মনে একটা নৈতিকতার ধারনা আছে যা তার শিক্ষা, পরিবেশ, বড় হয়ে উঠার সময় তৈরি হয়, আর এটাও তৈরি হয় সেই কনসেনসাস বা জনমতের ভিত্তিতে। যদি তাই হয় তবে সামাজিক মানব মনের নৈতিকতার ধারণাই বিবেক যা সে যে সমাজে বসবাস করে তার সর্বগ্রাহ্য জনমতের প্রতিফলন মাত্র। মুক্ত বাজারে দ্রব্যমূল্যের উঠা নামা চাহিদা সরবরাহ নিতির উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় তেমনি রাস্তায় রিকশার সংখ্যা কমে গেলে তারাই হয়ে যায় মূল্য নির্ধারক বা প্রাইস সেটার আর বেশি রিক্সা থাকলে আরোহী প্রাইস সেটার মানে দর কষা কষি চলতে থাকে। কিন্তু সেটাও হয়ে ওই ন্যায্য ভাড়ার কতটা উপরে বা কতটা নিচে নামা হলো তা নিয়ে । আমার প্রশ্ন হলো ওই ন্যায্যতার মানটি কে নির্ধারণ করে দিয়েছে? সরকার তো রিক্সা ভাড়ার রেট ফিক্স করে দেয় না। কিংবা ধরুন চুল কাটার রেট বা জুতা পালিশের রেট এই সেবা গুলোর ন্যায্যতা কিভাবে নির্ধারিত হয়? পণ্যর দাম নির্ধারণের একটা পদ্ধতি আছে, কাঁচামাল এর দাম, কারখানা খরচ, শ্রমিকের মজুরী, পরিবহন খরচ, মজুত খরচ, অফিস খরচ ইত্যাদি মিটানোর পর একটা মার্জিন মার্ক আপ করে মিনিমাম রিটেল প্রাইস নির্ধারণ করা হয় কিন্তু সেবা সমূহের মূল্য কিসের ভিত্তেতে নির্ধারিত হয়?

যেহেতু বিষয়টি সমাজবিদ্যার তাই সমাজ সম্পর্কে আপনার স্পষ্ট ধারণা থাকতেই হবে। সমাজ কাকে বলে তা নিয়ে পুথি গত বিদ্যা অনেকেরই আছে কিন্তু আমি যখন লিখি তখন পাঠ্য পুস্তক থেকে নিয়ে লিখি না বরং আমি যা জানি বা আমার মনে আছে তার ভিত্তিতে লিখি। তাতে করে আমার মনের যুক্তির কাঠামোটা আমার কাছেই ধরা পরে আগে। আমার জানা বা জ্ঞান যতদূর যায় তাতে আমি জানি মুসলমানদের সমাজবিদ্যা শুরু হয় হাদিসে সাফিনা দিয়ে যেখানে বলা হয়েছে সমাজ হলো দ্বিতল নৌকার মত যেখানে উপরের তলার লোকেরা সুপেয় পানি পায় কিন্তু নিচের তলার লোকেরা পনির কাছে থাকলেও তারা তা পায় না আর উপর তলার লোকেরা যদি নিচের তলার লোকদের পানি না দেয় তবে তারা নৌকার তলা ফুটো করে পানি নিবে আর তাতে পুরো নৌকা তথা সমাজটাই ডুবে যাবে। মূলত মুসলিম সমাজ যেভাবে সমাজের ব্যাখ্যা দেয় তা হলো এক গুচ্ছ লোকজন যাদের মধ্যে আর্থিক ও অনআর্থিক লেনদেন এর একটা সমঝোতা হয় যা একটি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সংরক্ষিত হয় যাকে বলে অথারেটারিয়ান সিস্টেম। এই কর্তৃপক্ষ ভিত্তিক সমাজের নেতৃস্থানীয় অল্পসংখ্যক লোকজন যারা সমাজের মোড়ল বা মাথা হিসেবে কাজ করে। এ তো গেল মুসলমানদের কথা। পশ্চিমা সভ্যতায় মারগারেট থেচারের প্রদত্ত সঞ্জা অনুযায়ী এক দল লোক যারা তাদের ভাগ্য উন্নয়নের স্বার্থে একত্রে বসবাস করছে তাদের একটা সমাজ বলা যায়। আর সম্যবাদীদের চোখে সমাজ হলো একটা চাকার মতে যার স্পোকগুলো ব্যক্তি বিশেষ আর তাদের সম্মিলিত কাঠামোতে চাকাটা চলতে থাকে। তাদের কাছে সমাজ একটা শ্রমিক মালিক সম্পর্ক বা শোষিত আর শাসকের সম্মিলন একটা রূপ। এই তিন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের বিবেক ভিন্ন ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। মুসলমানরা দান দক্ষিণা কে পূণ্যময় কাজ মনে করবে, পশ্চিমা সভ্যতা স্বার্থপরতাকে ও ব্যক্তি কেন্দ্রিকতাকে যথার্থ জ্ঞান করবে আর সাম্যবাদিরা ধনি গরিব সবাইকে কেটে ছেঁটে এক সমান করতে চাইবে। তাই যদি হয় তবে মোটা দাগে বিশ্ব বিবেক বলে আসলে তিন রকমের বিবেককে আমরা দেখতে পাবো। রিক্সা ভাড়ার বিষয়ে ইসলাম তিন রকম বিবেকের কথা বলে, যে কোন চুক্তিতে যদি রিকশাওয়ালা বলে যা ভাড়া তাই দিয়েন তবে রিক্সা আরোহী গন্তব্যে পৌঁছে যা দিবে তাই রিকশাওয়ালাকে নিতে হবে। কিন্তু রিকশাওয়ালা যদি নির্দিষ্ট করে বলে এত দিতে হবে আর তাতে আপনি রাজি হন তবে তাই দিতে হবে। আর যদি আপনি একটা রিক্সা ডেকে তাতে উঠে পরে বলেন যে অমুক জায়গায় নিয়ে যাও যা ভাড়া তাই দিব তবে গন্তব্যে পৌঁছে রিকশাওয়ালা যা চাইবে তাই আপনাকে মানে রিক্সা আরোহীকে দিতে হবে। ইসলামে চুক্তির এই তিনটা নিয়ম খাটে। ইসলাম আরো বলে মার্জিন দিতে মানে যা ভাড়া তার চেয়ে দু এক টাকা বেশি দিয়ে দিতে। ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে। কিন্তু আপনি পশ্চিম বঙ্গে যান ওখানে সাম্যবাদ বা বস্তুবাদী জনমত ওখানে কোন রিকশাওয়ালাকে আপনি একটাকা বেশি দিলে পাশের লোকটা আপনাকে বলবে এই তো ওর চাহিদা বাড়িয়ে দিলেন আজ আপনার কাছ থেকে পেল কাল আমার কাছে চাইবে। পশ্চিমা বিশ্ব তাই রাস্তায় বিবেকের বিচারের কোন অবকাশ রাখে নাই ওখানে ট্যাক্সি ভাড়া কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত তাই প্রতিবার দামাদামির বা দর কষাকষির দরকার পরে না। কোন ট্যাক্সি কোন গন্তব্যে যাবে কি যাবে না তা জানারও প্রয়োজন পরে না। আপনি যেখানে যেতে চান সেখানে সেই ট্যাক্সি আপনাকে নিয়ে যেতে বাধ্য। তাই বলছিলাম সমাজ ভেদে বিবেক ভিন্ন ভিন্ন রকম সমাধান দেয়। উন্নত সভ্যতায় এই রকম বিভ্রান্তিকর শব্দকে ডিকশনারি বা অভিধান থেকে উচ্ছেদ করে দেয়া হয়েছে কিন্তু আমরা বাঙ্গালীরা বিদেশী শব্দ যত পারি অন্তস্থকরণ করে পুরাতন গুলোর বিভ্রান্তিকর বিষয়গুলো দুর করার বিষয় ভুলে বসে আছি। ভাষা নিয়ে ভাবে এরকম ভাষাবিদ কি কেউ আছে এখন আমাদের দেশে কিংবা বৃহত্তর বংগ দেশে? সবাই এখন বিদেশী টেকনিকাল টার্মগুলো বাংলা ভাষায় আত্তীকরণে ব্যস্ত।

বিবেক নিয়ে আমাদের সমাজে ভ্রান্ত ধারনা বিরাজমান রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে তাও বহু বছর আগে থেকেই। বিবেক কোন ধ্রুব কিংবা স্থির বিষয় না, এটা সমাজ ভেদে ধর্ম ভেদে পরিবর্তিত হতে বাধ্য। লোকজন বিবেকের দোহাই দেয় বিবেক কাকে বলে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা না থাকা সত্যেও। কারণ সে ওই ব্যক্তির নৈতিক ভিত্তির কাছে আবেদন করে আর ভাবে যে তার নৈতিক ভিত্তি আর ওই লোকের নৈতিক ভিত্তি একই হবে। কিন্তু এটা এক নাও হতে পারে, কারণ আগেই বলেছি ব্যক্তি বিশেষের সমাজ, ধর্ম, বড় হওয়ার পরিবেশ ইত্যাদি নানা বিধ উপাদানের সামষ্টিক প্রতিফলন ঘটে তার নৈতিক ভিত্তি তথা বিবেকের উপর যা ব্যক্তি পার্থক্যে ভিন্ন হতে বাধ্য। সাধারণ জনগণ মনে করে সবার বিবেক একই কিন্তু এই ধারণাটি পুরোপুরি ভ্রান্ত ধারণা। সবার বিবেক এক হওয়া প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার, একই সমাজে তা অনেক কাছাকাছি হবে কিন্তু কখনই একই হবে না। একটা সমাজের বিবেককে কাছাকাছি আনতে ও প্রায় একই করতে সাহিত্যের ভূমিকা অনেক যা বিজ্ঞান মনষ্ক লোকজন আজ ভুলতে বসেছে। ধর্ম ভিত্তিক যে নিতিবোধ বা নৈতিকতা তা আরোপিত নৈতিকতা আর তাই সমাজে যখন তা প্রযুক্ত হয় তখন তাতে নানা স্খলন দেখা যায়। যেমন একজন পাচওয়াক্ত নামাজী ঘুষের টাকা নিয়ে ধর্মের নিতিবোধের যুক্তি দেয় যে ঘুষের টাকায় কাজ হয়ে যাবে না হলে তাকে তার স্রষ্টার কাছে শেষ বিচার দিবসে জবাবদিহি করতে হবে। ধর্মে রাস্তায় পড়ে থাকা একটা ময়লা বা কলার ছাল সরায়ে তা পরিষ্কার করার বিষয়ে বলা থাকলেও লোকজনকে তা তেমন একটা করতে দেখা যায় না। তাই ধর্মীয় নীতিবোধ সমাজে প্রভাব ফেললেও তার চাইতে বেশি প্রভাব ফেলে সেই সমাজের মোড়ল শ্রেণী ও ওই সমাজের লোকজনদের মানসিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের সমঝোতা এক কথায় ইংরেজিতে যাকে বলে কনসেনসাস। ধর্মীয় নীতিবোধই যদি কনসেনসাস বা বিবেক গঠন করতো তা হলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোন দেশের অর্থনীতি সুদ ভিত্তিক হওয়া সম্ভবই ছিল না কিন্তু তা হয়েছে আমাদের দেশ সহ বহু দেশেই।

বিবেক সম্পর্কে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স চেট জেপিটিকে প্রশ্ন করায় সে বিভ্রান্তিকর উত্তর দিল যেটা ঘষা মাজা করে যা পেলাম তা এরকম ["বিবেক" শব্দটি একটি বাংলা শব্দ, এবং এটি বিভিন্ন ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে, নির্ভর করে সন্দর্ভে এবং বাক্যের সম্পর্কে। কিছু সাধারণ বাংলা অর্থ সম্পর্কে "বিবেক" শব্দটি ব্যবহৃত হয় জ্ঞান এবং কিছু ব্যাপারের সঠিকতা বুঝতে সহযোগিতা করে। সচেতনা এবং মেধা অর্থে "বিবেক" প্রকৃত সচেতনা, মেধা, এবং তা বুঝে প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষমতা অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। নীতি এবং নীতিনির্ধারণ ক্ষেত্রে "বিবেক" শব্দটি এমন একটি ধারণা দেয় যা প্রাথমিক বিচার এবং নীতি নির্ধারণে ব্যবহৃত হতে পারে। সূচনা করা অর্থে "বিবেক" শব্দটি সাধারণভাবে কোনও বিষয় বা সমস্যা সম্পর্কে বুঝানো বা সূচনা করা মাধ্যমে ব্যবহৃত হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে, "বিবেক" শব্দটি সামাজিক নীতি, নীতি নির্ধারণ, অথবা আদেশের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে, সাধারণভাবে সরকার বা সংগঠনের অধিকারপ্রাপ্ত নীতি নির্ধারণ সংক্রান্ত হতে পারে। এই শব্দটির অর্থ এবং ব্যবহার সাম্প্রতিক সন্দর্ভ এবং বাক্যের সম্পর্কে ব্যবহারের সম্পূর্ণ ভাব স্পষ্ট করতে ব্যক্তিগত বা সূত্রসূচক হতে পারে। ]

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে বিবেক সম্পর্কে যা পেলাম তা এরকম [“বিবেক একটি জ্ঞানীয় প্রক্রিয়া যা কোনও ব্যক্তির নৈতিক দর্শন বা মান পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে আবেগ এবং যুক্তিযুক্ত অনুষঙ্গ প্রকাশ করে। সহানুভূতিশীল কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হিসাবে তাৎক্ষণিক সংজ্ঞাবহ ধারণাগুলি এবং প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিক্রিয়াগুলির উপর ভিত্তি করে বিবেক আবেগ বা চিন্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। সাধারণ পরিভাষায়, যখন কোনও ব্যক্তি এমন একটি কাজ করে যা তাদের নৈতিক মূল্যবোধের সাথে দ্বন্দ্ব ঘটায়, তখন বিবেক প্রায়শই অনুশোচনার অনুভূতির দিকে পরিচালিত করে বলে বলা হয়। মনোবিজ্ঞানের অনুশীলন এবং অধ্যয়ন উভয়ক্ষেত্রেই সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা পরীক্ষায়, একজন ব্যক্তির নৈতিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক দর্শনের পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার সাথে তাদের অনৈক্য বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিবেক কোন কাজের আগে নৈতিক বিচারকে কতটা অবহিত করে এবং এই ধরনের নৈতিক বিচার যুক্তির উপর ভিত্তি করে হয় বা হওয়া উচিত কিনা, তা নিয়ে মধ্যযুগের শেষের পর ও আধুনিক ইতিহাসের বিভিন্ন সময় বিতর্কের জন্ম হয়েছে।]

এই সব উত্তর থেকেই বুঝা যায় বিবেক নিয়ে কেন নানা রকম ভ্রান্ত ধারণা বিরাজ করছে আমাদের সমাজে। বিবেককে একেক জন একেক ভাবে উপস্থাপন ও ব্যবহার করে আসছে যার ফলে মানুষে মানুষে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে। বিবেক কে যে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলো হলো ন্যায়পরায়ণতা, নীতি, ধর্মবুদ্ধি, সাধুতা, চৈতন্য, বিচার, ফয়সালা, সিদ্ধান্ত, বিচক্ষণতা, বিবেচনা, বিচারবুদ্ধি, ইত্যাদি। প্রকৃত পক্ষে এর একমাত্র গ্রহণযোগ্য অর্থই হলো একটি সমাজের সর্বসম্মত জনমত যাকে ইংরেজিতে একটি শব্দে বলা হয় কনসেনসাস। গুগল ট্রেন্সেলেটরও বিবেকের ইংরেজি করলো conscience যার মানে ওই কনসেনসাস। আর এটাই মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক দর্শনের পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত একটি মৌলিক ধারণা। তাই বলছিলাম মানুষজনকে এতটা বিভ্রান্তিকর শব্দ ব্যবহার করতে না বলে শুধু বলেন এ বিষয়ে আপনার বিচার কি বলে বা বিবেক কি বলে? তাই আমার লেখাটির শিরোনাম যথার্থতার মানদণ্ডই বিবেক বলাটা সঠিক ও এক কথায় প্রকাশ বলে আমি মনে করি। নিচের ছবিটা দেখুন, বুঝবেন কনসেনসাস কি জিনিস, সবাই এক বাক্যে বলবেন এটা অনেয্য, তার জন্য কাউকে বিতর্ক করতে হবে না। এটাকেই আমি বলেছি Generally accepted common judgment বা সর্বজন গ্রাহ্য সাধারণ বিচার বোধ।


অনেকে আমার লেখাকে ভালো বলেছেন, কেউ কেউ বলেছেন আপনার ধৈর্য আছে দেখে লিখতে পারেন, আবার বলেছেন খুব খাটা খাটনি করেন বুঝা যায়। লেখায় গভীরতা আছে। আসলে আমি তো তেমন খাটা খাটনি করি না তবে পাঠকের পরামরর্শ ও মতামত শুনে লেখার মধ্যে তার প্রতিফলনের চেষ্টা করি। আমার লেখা ভাল বলার কারণটা মনে হয় আমি ধরতে পেরেছি। আমি মূলত আমার চিন্তা ভাবনা গুলো বিষয়ভিত্তিক ভাবে লেখায় তুলে আনি, তাই যখন পাঠক তা পড়েন তখন তার নিজের ওই বিষয়ে যে পূর্ব ধারণা বা প্রি-কনসেপশন আছে তার সাথে আমার লিখিত চিন্তার একটা মিথস্ক্রিয়া (ডায়ালেকটিক্স) চলে আর এর ফলশ্রুতিতে পাঠক একটা পর্যায়ে তার মনের আভ্যন্তরীণ নানা  গ্রহণ বর্জন করে একটা সিদ্ধান্তে পৌছাতে সক্ষম হন। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আনন্দই তাকে লেখাটাকে ভাল বলার জন্য যুক্তি প্রদান করে। সে যাই হোক, কেউ আমার চিন্তাগুলো পড়ে তাকে ভাল বললে আমার ভালো লাগে আর খারাপ বলে যদি যুক্তি দিয়ে তা তুলে ধরে বা আমাকে বুঝায়ে দেয় তা হলে আমি উপক্রিত হই। বিষয়টা তাই লেখক পাঠক উভয়ের জন্যই ফলপ্রসূ। আর তখন তা পরিচ্ছন্ন না করে উপায় থাকে না। তাতে চিন্তার গাঁথুনিও মজবুত হওয়া লাগে। যারা পড়ে তারা উপক্রিত হয় কিনা জানি না কিন্তু আমার চিন্তার স্বচ্ছতা আরো স্পষ্ট হয়। তাই আমার লেখা পড়া মানে আমার মনোজগতে আপনাকে স্বাগতম।

এডিট ও আপডেট হিস্ট্রিঃ ১৪অক্টোবর২০২৩> ১৬অক্টোবর২০২৩> ১৯অক্টোবর২০২৩> ২৪নভেম্বর২০২৩>

 

Wednesday, October 11, 2023

প্রায়োগিক বিদ্যাই প্রজ্ঞা (Applied knowledge is wisdom)

 

বিদ্যা, বুদ্ধি আর প্রজ্ঞা এক জিনিস না, অনেককেই দেখেছি এর ভেদ করতে পারেন না। আমিও পারতাম না যদি না শেখ তাকিউদ্দিন নাভায়ানীর “থট” বইটা পড়তাম। পুরটা পড়া হয় নাই কিন্তু যে টুকু পড়েছি তাতে বুদ্ধি কাকে বলা হয় তা কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছি। প্রজ্ঞা বা উইসডম তো সবাই জানে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আর বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে তার প্রয়োগ ক্ষমতা। তা হলে বুদ্ধি টা কি? শেখ তাকিউদ্দিন নাভায়ানী যে উদাহরণ দিয়েছেন তার থট বইয়ে তা এরকম, আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন কোন পাহাড়ি অঞ্চলে এবং দুরে দেখলেন পনির মত কিছু একটা রাস্তায় আছে। ভাবলেন ও আরে এমনকি, পানি তো থাকতেই পারে তাই স্বাভাবিক গতিতেই গাড়িটা চালিয়ে গেলেন কিন্তু ওটা আসলে পানি ছিল না ছিল তেল যার ফলে আপনার গাড়ি স্কিড করে খাদে পড়ে গেল। আপনি যদি সজাগ থাকতেন তবে গাড়ির গতি কমায়ে ওই জায়গাটা ধীরে পার হতেন। তার উদাহারনে এটাই হলো বুদ্ধি। তার মানে হলো আপনি সজাগ ছিলেন না, অবহেলা করেছিলেন। এই এলার্টনেস বা সজাগ থাকাই হলো বুদ্ধি। জ্ঞান (বিদ্যা) বা নলেজ হলো সাধারণ ভাবে Know how বা জানা। একজন দরজি সেলাই করতে জানে আপনি জানেন না তার মানে ওই দরজির সেলাই এর জ্ঞান বা বিদ্যা আছে, যা আপনার নাই। একজন কম্পিউটার চালাতে জানে আপনি জানেন না তার মানে আপনার কম্পিউটারের জ্ঞান নাই। দক্ষতা আবার ভিন্ন জিনিস। সেলাই মেশিন চালাতে চালাতে কার দক্ষতা মানে ওই মেশিন চালানর পারদর্শিতা বৃদ্ধি পাবেই আর তা পাবে তার অভিজ্ঞতার জন্যই আর সেটাই তার দক্ষতা। সুতরাং জ্ঞান ও দক্ষতার মধ্যে পার্থক্য হলো অর্জিত জ্ঞানের চর্চার মাধ্যমে তাতে পারদর্শী হওয়া। এখানেই অভিজ্ঞতার মূল্য যা মানুষকে দক্ষ করে তুলে। অভিজ্ঞতাই মানুষকে অর্জিত জ্ঞানে দক্ষ করে তোলে কিন্তু অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান মানে বুদ্ধি নয় মোটেও। বরং বুদ্ধি হলো সজাগ থেকে অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করার সামর্থ্য। গুগল মামা বললেন অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে আছে the ability to acquire and apply knowledge and skills is intelligence, তাহলে তো বুদ্ধি আর প্রজ্ঞা একই হয়ে গেলে। প্রজ্ঞার সাথে বুদ্ধির ধারনার কোন সংযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। প্রজ্ঞার সঞ্জা হলো অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার ক্ষমতা। আর বুদ্ধি হলো সাধারণ ভাবে সজাগ থাকা যাতে পরিস্থিতির সাপেক্ষে সময় মত প্রজ্ঞাকে বাস্তবে প্রয়োগ করা যায়। আপনার প্রজ্ঞা কোন কাজেই আসবে না যদি না আপনি সজাগ বা সচেতন থাকেন। আমাদের শিক্ষকগণ এই সকল ধারণাগুলোকে আলাদা আলাদা ভাবে আমাদের শিক্ষা দেন নাই। তারা সবগুলোকে প্রায় সমার্থক ভাবে শিক্ষা দেয়াতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিদ্যা, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা আর অভিজ্ঞতা কে আলাদা আলাদা ভাবে সনাক্ত করতে পারেন বলে আমার মনে হয় না। এই সব ধারণাগত বিশৃঙ্খলাই পরবর্তীতে আমাদের প্রায়োগীক জীবনে মতভেদ ও ঝগড়া বিবাদের সৃষ্টি করে বলে আমার ধারণা। আমাদের স্কুল গুলোতে শারীরিক শিক্ষার একটা স্থান আছে কিন্তু মানুষিক শিক্ষার কোন জায়গা নাই। পুঁথিগত বিদ্যাগুলো ছাত্রদেরকে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করে থাকে অর্থাৎ Know how প্রদান করে কিন্তু বাস্তবে তা কি ভাবে প্রয়োগ করতে হবে তা শিখায় না। আমাদের সময় বিজ্ঞানের বই এর বিভিন্ন জায়গায় ”এসো নিজে করি” বলে একাধিক বক্স থাকতো যেখানে এই প্রায়োগিক বিষয়গুলোর প্রতি শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করা হতো কিন্তু শিক্ষক গন তা গুরুত্ব সহকারে পড়াতেন না। পড়াতেন না কারণ তা পরীক্ষায় আসতো না। আজকালকার কারিকুলামে সৃজনশীল ব্যবস্থাটি মূলত মুখস্থ বিদ্যা থেকে ছাত্রদেরকে অধিকতর জ্ঞান অর্জনের দিকে নেয়ার উদ্দেশ্যে করা কিন্তু সেই প্রায়োগিক এসো নিজে করি বিষয়টি কিন্তু অন্তরালেই রয়ে যাচ্ছে। শুধু মুখস্থ বিদ্যা থেকে সরায়ে আনলে তার জ্ঞান বাড়তে পারে কিন্তু প্রজ্ঞা বাড়বে না। তার পাণ্ডিত্য বাড়বে কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ করার ক্ষমতা বা দক্ষতা বাড়বে বলে মনে হয় না। 

শৈশব থেকে কৈশোরে মানুষের মনের মধ্যে যে ভাব বৈচিত্রের ক্রিয়া কলাপ চলমান থাকে তা সম্পর্কেও স্কুলের পাঠ্য পুস্তকে তাদের তেমন কিছুই শেখান হয় না। বিশেষ করে কৈশোরে যে পরিবর্তন গুলো আসে মানুষের মনে তার জন্য যে তাদের সাম্যক জ্ঞান প্রয়োজন তা যেন আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভুলে গেছে। তাই দেখা যায় স্কুল ড্রেস পড়া অনেকেই স্কুল ফাঁকি দেয়ে বিভিন্ন রেস্তোরায় বন্ধু বান্ধব নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। এখন আসা যাক শিক্ষা বিষয়টি কিরকম। আমার চাকুরী জীবনের শুরু শিক্ষকতার ট্রেনিং দিয়ে। ওই ট্রেনিং এর সময়ই আমি দেখেছি যে আমার মধ্যে শিক্ষা প্রদানের একটা স্বাভাবিক ও সাবলীল দক্ষতা আছে যা আমার সাথে যারা ট্রেনিং এ ছিল তাদের মধ্যে অবর্তমান। আমি যেটা তিন বছর শিক্ষকতা জীবনে বুঝতে পেরেছি তা হলো শিক্ষক তার চিন্তাধারায় ছাত্রদের টেনে নিয়ে আসে, শিক্ষকের চিন্তাধারায় ছাত্ররা আবিষ্ট হয়ে যায় ও তার কাছ থেকে জ্ঞানের ধারার একটা ট্রান্সমিশন ঘটে আর এভাবে একজন শিক্ষকের কাছ থেকে জ্ঞান ছাত্রদের মনে প্রবাহিত হয়। শিক্ষককে তাই নজর রাখতে হয়ে যাতে তার বক্তব্য ছাত্রদের আকৃষ্ট করে। শিক্ষা প্রদানের টেকনিক্যাল না না কৌশল আমি ১৯৯৯ সালে এনআইআইটির শিক্ষক প্রশিক্ষণে শিখেছিলাম যার জন্য কৈশিক দা’র কাছে আমি ঋণী। ২০০২ তে যখন কমনওয়েলথ এমবিএ করলাম যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরগন ক্লাস নিতেন তখন দেখলাম তারা ওই সব টেকনিক ফলো করেন না। সোনালী ব্যাংকের ওরিয়েন্টেশন কোর্সে স্টাফ কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার আমাদের শিখিয়েছিলেন Learning/Training is function of ASK or L or T=f(ASK) where A=Attitude, S=Skill, and K=Knowledge । রাজার বাগের সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে যারা পড়াতেন তারা সিনিয়র ফ্যাকাল্টি মেম্বার ছিলেন।  কেউ কেউ ক্লাসে এসেই ৪৫ মিনিট নন স্টপ হ্যামারিং করে যেতেন, তিনি ওই বিসয়ে যা জানেন তা নন স্টপ বলে যেতেন আবার কামাল স্যারও ছিলেন যিনি গল্প করার ছলে তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করতেন। কবিতা কল্পনা লতা আপা ছিলেন একদম পারফেক্ট টিচার, অত্যন্ত ধীরে ছাত্রদের মন বুঝে তিনি পড়াতেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক প্রশিক্ষণে এত বিচিত্রতা প্রমাণ করে যে, এই ক্ষেত্রটাতে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন আছে। শিক্ষক যত ভাল হবে জাতির পরবর্তী প্রজন্ম তত উন্নত ভাবে শিক্ষিত হবে।

আমার ভার্সিটি জীবনের এক বন্ধুর কথা বলি, সে নামাজী সেই তখন থেকেই আবার যখন সে পদার্থ বিদ্যায় পিএইচডি করে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে তখন সে কেবল নামাজীই না বরং চরম রকম ধার্মিক। এমন ধার্মিক যে ফেইসবুকে কোন মেয়ের দেয়া পোস্টে লাইক দেওয়াও তার জন্য পাপ। সে ধার্মিক বটে কিন্তু দাড়ি রাখে নাই বিয়েও করে নাই। পদার্থ বিদ্যার শিক্ষক কিন্তু পদার্থ বিদ্যা দর্শনে যে বিপুল প্রভাব ফেলেছে সে বিষয়ে সে একেবারে অজ্ঞ বা তা বুঝতে অসমর্থ। এরা পুথি গত বিদ্যায় পারদর্শী কিন্তু জীবন দর্শনে ক অক্ষর গো মাংস। নর্থ সাউথ ইউনিভারসিটির একদল তরুণ এক উপজাতীয় সংগীতের ফিউশন করে নতুন গান গাচ্ছে ছেলে মেয়ে সিঁড়িতে বসে, গানের এক পর্যায়ে একমাত্র ছেলেটা বাংলায় সেই উপজাতিয় ভাষার বাংলা অনুবাদটা একই গানের ছন্দে দারুণ ভাবে উপস্থাপন করলো। এই ভাইরাল ভিডিও দেখে আমার সেই প্রাক্তন বন্ধুর মন্তব্য ছিল নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় নাকি অশ্লীলতার বিভাগ খুলেছে। পদার্থ বিদ্যায় পিএইচডি করা লোক যদি জীবন বিদ্যায় এতটা অজ্ঞ হয় তবে কি করে বলি তার প্রজ্ঞা আছে। জাফর ইকবালের মত প্রসিদ্ধ লেখক ও বিজ্ঞ ব্যক্তি সম্পর্কে তার রয়েছে মারাত্মক নিকৃষ্ট ধারণা। নিজেকে সে মহা পণ্ডিত মনে করে। এসব লোক শিক্ষিত হতে পারে কিন্তু তারা সমাজের বা তার নিজের জীবনেও তার বিদ্যাকে প্রয়োগ করতে অক্ষম। ওই যে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন না ”যথাসাধ্য ভালো বলে ওগো আরো ভালো কার স্বর্গ পুরি করে তুমি থাকো আলো? আরো ভালো কেঁদে বলে আমি থাকি হায় অকর্মণ্য দাম্ভিকের অক্ষম ঈর্ষায়।” এই সব লোকেরা অকর্মণ্য দাম্ভিক বটে। আমি যখন বলিউডের নায়িকা দীপিকা পাদুকনের থ্রি এল (লিভ, লাফ, লাভ) ফাউন্ডেশনের পত্রিকার সংবাদ কাটিং হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপে পোস্ট করলাম তখন সে এডমিন মডারেটর হওয়ায় তা মুছে দিল তখন বুঝলাম ও মনুষ্যত্বই অর্জন করে নাই। থ্রি এল ফাউন্ডেশন ইন্ডিয়ার বিভিন্ন স্থানে লোকজনদের মানুষিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে। মানুষের অস্তিত্বের সংকট নিয়ে যেখানে শিক্ষাবিদরা কিছুই ভাবেন না সেখানে এঁরা উন্নত মানুষিক শিক্ষা প্রচারে প্রয়াস নিয়েছেন। এই মহৎ উদ্দেশ্যকে যে মানুষ দেখতে পায় না সে পিএইচডি করুক আর যাই করুক তার বাস্তব জ্ঞান শূন্যের কোঠায়। আমি তাকে কয়েকটা কটু কথা শুনায়ে গ্রুপ থেকে সরে আসি। ওকে বলেছি সে মানুষ হতে পারে নাই, আর মনুষত্বহীন দের গ্রুপে আমি থাকবো না। 

 অনেক আগে একটা মুভি দেখেছিলাম, নামটা বোধ হয় ছিল “দ্যা ল’স অব থারমোডাইনামিক্স” এক জটিল মুভি ছিল সেটা, পাত্র পাত্রীদের অভিনীত এক প্রেম কাহিনীর মধ্য দিয়ে থারমোডাইনামিক্সের সকল সূত্র সহ ফিজিক্সের মৌলিক সূত্রগুলোও বলে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে ডকুমেন্টারির মত তথ্যচিত্র ভাষ্যও আছে তাতে। এটা দেখে মনে হচ্ছিল একাধারে ডকুমেন্টারি, ড্রামা ও পদার্থবিদ্যার সকল সূত্রের এক ছন্দবদ্ধ উপস্থাপনা। জগত বিখ্যাত পদার্থবিদ মিচিও কাকুর ডকুমেন্টারি দেখে মনে হয়েছিল পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্রগুলো নতুন ভাবে জানলাম, আগে যা জানতাম তার থেকে উনার সরলীকৃত উপস্থাপনা গুলো মনোমুগ্ধকর তো বটেই তার চেয়েও বড় কথা তা মারাত্মক রকম অর্থবহ। তার ব্যাখ্যাগুলো পদার্থবিদ্যার অনেক জটিল বিষয় অত্যন্ত সহজ করে বুঝতে সহায্য করেছে তাও কিনা মাত্র ৪৫ মিনিটের ডকুমেন্টারিতেই। উনি স্ট্রিং থিউরির উপর বেশ কিছু সূত্ররও প্রবর্তন করেছেন। একবার আমি খুব ধাঁধাঁয় পরে গিয়েছিলাম বল, শক্তির পার্থক্য নিয়ে মানে হলো এনার্জি আর ফোর্স এর মধ্যে পার্থক্য করতে পারছিলাম না। আমাদের ক্লাস সিক্সের বই এ কার্য, শক্তি, ক্ষমতা নিয়ে একটা অধ্যায় ছিল, ওই অধ্যায়টার কথা মনে করে মাথাটা আরো গোলায়ে গেলো। আমার বার বার মনে হচ্ছিল বল আর শক্তি বুঝি একই। শক্তির নিত্যতা তো আমরা পড়েছি, যা বলে শক্তি এক অবস্থা হতে ভিন্ন অবস্থায় রূপান্তরিত হলেও মোট শক্তি একই থাকে, তা হলে বল বা ফোর্স বলতে আমরা কি বুঝি আর শক্তি বলতে মূলত কোন বিষয়টিকে বলা হয়? এই ধাঁধাঁটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল তো আমার সেই গ্রন্থ গর্ধব বন্ধুটি তখন কর্জন হলে পিএইচডি করছে আর তার সাথে ঘটনা ক্রমে আমার দেখা হয়ে যায়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করায় সে হেসে বললো এগুলো তো ক্লাস সিক্সের বই এই আছে। কিন্তু আমার চিন্তার জট ছুটানোর মত কিছুই বললো না। এই ঘটনার বহু বছর পর আজ যখন অ লিটিল বুক অব স্ট্রিং থিওরি, স্টিভেন স্কট গাবসার অনুবাদঃ আবুল বাসার বইটা পড়ছি তখন হটাতই জটটা খুলে গেল। আরে আমরা তো ফোর্স কি তা জানি, নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রই তো তা বলে দেয় বল=ভরবেগ ও ত্বরণের গুণফল (F=ma) আর শক্তির সূত্র তো আইনস্টাইনের ই=এমসি স্কোয়ার (E=mc2) এই বলা আছে। শক্তি হলো কোন ভরের আলোর বর্গ গতিতে সরণ আর ভর হলো বস্তুর মধ্যে সকল প্রোটন সংখ্যার ভরের সমান। বস্তুর স্থানান্তর কিংবা সরণ বা ত্বরণ হলো তার মধ্যস্থিত স্থিতিশক্তিকে গতিশক্তিতে রূপান্তর প্রক্রিয়া। আর বল হলো ভরের সরণ আর ত্বরণের গুণফল। প্রকৃতিতে যে চারটি বল আছে তা কেন আছে কেউ জানে না কিন্তু তা আছে, যথা ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক বল, মহাকর্ষ বল, দুর্বল নিউক্লিয় বল আর সবল নিউক্লিয় বল। নিউটনের প্রথম গতির সূত্রই বলে দিচ্ছে কোন বস্তুর অবস্থার পরিবর্তন হয় না বা তার গতিবেগের পরিবর্তন হয় না যতক্ষণ না তাতে কোন একটা বল প্রযুক্ত হয় বা কার্যকর হয়। আমার বন্ধুটি আজ শিক্ষকতা করে ও আমাকে সেদিন এই কথা গুলো কেন বললো না? ও যদি সহজ মনের হতো তবে একটা খালি কাগজ নিয়ে উপরের দুটো সূত্র লিখে একটা পেন পিকচার একে আমাকে সব বুঝায়ে দিতে পারতো। তা না করে সে হাসলো আর বললো এটা কোন বিষয়ই না। ওর জায়গায় মিচিও কাকু হলে তিনি উপরের চারটা লাইনে আমার মনের জটটা খুলে দিতেন যা ও করে নাই। ও যে শিক্ষকতা করে তাও কি এভাবেই করে? মানে ছাত্রদের প্রশ্নের উত্তরে বলে দেয়, ও ওটা? সেটা তো ক্লাস সিক্সের বই এই আছে, ওটা দেখে নিও। আমার চাকুরী জীবনের শুরু শিক্ষকতা দিয়ে আগেই বলেছি, আমি জানি শিক্ষকতার কৌশলগুলো। আমার প্রথম চাকুরীদাতা দেভজিত সরকার সিলেটে কম্পিউটার ট্রেনার হিসেবে আমাকে পাঠানোর আগে শুধু একটা কথা কানে কানে বলে দিয়েছিলেন, বলেছিলেন যদি কোন ছাত্র এমন একটা প্রশ্ন করে যা আপনি জানেন না তবে সরাসরি জানি না বলবেন না, বরং বলবেন বিষয়টা আমি একটু ভেবে নিয়ে তোমাকে কালকে জানাচ্ছি। উনার সেই পরামর্শ আজো আমি অনুসরণ করি যখন ব্যাংকিং সম্পর্কে কেউ কিছু জানতে চায় আমার কাছে। একজন শিক্ষক কখনই ছাত্রকে বা যে জানতে চাচ্ছে তাকে বলতে পারে না, ও এটা জানতে চাচ্ছো, ওটা তো ক্লাস টেন এর বইতেই আছে। এই সব প্রফেসর নামধারী গর্ধবেরা সেই সকল কৌশল না শিখেই শিক্ষকতা করছে দেখে শত শত গাধা টাইপ গ্র্যাজুয়েট পয়দা হচ্ছে আমাদের দেশে। মিচিও কাকু দের দেখলে বুঝা যায় তারা কতটা জ্ঞানী, তাদের বক্তব্য কতটা সরল ও বাস্তব সম্মত। স্টিভেন স্কট গাবসার তার অ লিটিল বুক অব স্ট্রিং থিওরি তে কত সহজ উদাহারণ ব্যবহার করে পদার্থবিদ্যার জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেছেন সাধারণের বুঝার উপযোগী করে অথচ আমার সেই বন্ধু যাকে আমি ত্যাজ্য করেছি সে তার দাম্ভিকতাতেই বাচে না। এরূপ বন্ধু থাকার চেয়ে না থাকা ভালো, এরকম গ্রন্থ গর্ধবরা যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে সেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় থাকার চেয়ে না থাক আরো ভালো। ওই যে বলে না দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো, বিষয়টা ওই রকম।

আমার জীবনে বিদ্যার প্রয়োগের কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি, হতে পারে তা অতি সামান্য কিন্তু তা বিদ্যা ও বুদ্ধির প্রয়োগ বটে। (১) ৫০০ মিলি পানির বোতলঃ আমি যখন সোনালী ব্যাংকের এমডিস স্কোয়াডে কর্মরত তখন আমার টেবিলে ৫০০ মিলি পনির বোতল দেখে আমার স্বাস্থ্যর অবস্থা বুঝার চেষ্টা করতাম। মানে হলো যেদিন শরীরটা খারাপ সেদিন দেখতাম বোতলটা দ্রুত খালি হয়ে যাচ্ছে আর যেদিন দেখতাম খালি হতে সময় নিচ্ছে বুঝে নিতাম শরীর পানি ধরে রাখতে পারছে আর আমি অপেক্ষাকৃত সুস্থ আছি। (২) ইয়ার প্লাগ ফোনে সাউন্ড ভলিউম এর উঠানামাও একটা ইনডিকেটর বটে। যে সময় অনেক উচ্চ ভলিউম লাগে গানটা মনে প্রবেশ করাতে তার মানে মন অনেকটাই বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে আর যখন মনটা শান্ত তখন কম ভলিউমেও গানটা ঠিকই মন ছুঁয়ে যায়। বিষয়গুলো আমার ধারণা কিন্তু এই ধারণা গুলো আমার বিদ্যা ও বুদ্ধির প্রয়োগের ফলে প্রাপ্ত ধারণা। তাই এগুলোকে প্রজ্ঞা বলা যায়। আরেকটা মজার কাজ করতাম এমডিস স্কোয়াডের কম্পিউটার সেলে, যেহেতু আমি কম্পিউটার ইনচার্জ ছিলাম তাই ঠিক সম্মুখভাগটায় বসতাম আর গান শোনার নামে কানে ইয়ার প্লাগ লাগায়ে গান না শুনে কারা কি বলছে শুনতাম, যদি কেউ আমার সম্পর্কে কিছু বলে এই ভেবে যে আমি তো কান বন্ধ করে গান শুনছি, আসলে আমি ইয়ার প্লাগ করেও তাদের কথা শুনতে পেতাম। এবার আমার জীবন রক্ষাকারী একটা প্রজ্ঞার কথা বলবো। ঘটনাটা ছিল ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কোন এক শিতের রাতে অফিস শেষে বাসায় ফিরে খাওয়ার পরে ভোর ৩ টার দিকে ভীষণ পেটে ব্যথা ও বুকে ব্যথা অনুভব করলাম। সাধারণত এন্টাসিড সিরাপ খেলে এরকম ব্যথা চলে যায় কিন্তু তা যাচ্ছিল না, বরং ঘাম হচ্ছিল। মাকে ডেকে উঠালাম, মা আমার ডাক্তার বড় মামাকে ফোন করতে বললো, মামা শুনে বললো হৃদরোগ হাসপাতালে যা আমার শ্যাওড়াপাড়া বাসা থেকে কাছে ওখানে যেয়ে একটা ইসিজি করাতে। সাথে সাথে আমি বিষয়টা ধরতে পারলাম। মামা ইসিজি করতে বলছে কারণ কয়েক দিন আগে মেঝ মামার এ রকম হয়েছিল আর তার পর ইসিজি করার পর ধরা পরে তার একটা ভাল রকম হার্ট এটাক হয়ে গেছে। আমার মনে পড়লো আমার বাবা ৪৮ বছর বয়সে হার্ট এটাকে মারা যান, তার বাম হাতে চিড়িক দেয় উঠতো তাও আমি সেই ছোট বেলা থেকেই তা দেখেছি। আমার বুকের ব্যথাটা বাম হাতে ছাড়ায়ে গিয়েছিল। আমি মাকে নিয়ে তৎক্ষণাৎ হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমি মাকে নিয়ে ওখানে আগেও গিয়েছি তাই জানতাম হৃদরোগের চেয়ে ওখানের ইমারজেন্সিটা অনেক প্রম্পট চেকআপ করে আর রুগী হার্টের না হলে ভর্তি নেয় না। ভোর রাতের রাস্তায় একটা মাত্র রিক্সা তাতে মাকে নিয়ে উঠে রওনা হলাম হার্ট ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্যে। আমি বুকের ব্যথাটার পিন পয়েন্ট ও বাম হাতে ছড়ায়ে যাওয়ায় বুঝতে পারছিলাম এটা আমার পারিবারিক হার্ট সমস্যা। দ্রুত হার্ট ফাউন্ডেশনের ইমারজেন্সিতে গিয়ে ইসিজি করালাম, ওখানকার ডাক্তার গুরুত্ব দিচ্ছিল না আর উপর থেকে ইসিজি করাতে কিছুই ধরা পরে নাই। আমি বললাম আমার বুকের ব্যথা যায় নাই, তখন তারা আমার পিঠের দিক থেকে আরেকবার ইসিজি করলো, ওটা করার পর পরই তাদের কন্ঠ পরিবর্তন হয়ে গেল বললো আমরা আপনাকে ভর্তি নিচ্ছি। এর পর ওরা আমাকে সোজা আইসিইউতে নিয়ে যায় ও জীবন রক্ষাকারী ইনজেকশনটা দেয়। ওই ইনজেকশন দেয়ার পর পরই আমি টের পাই আমার বুকের বাম দিকের ও বাম হাতের ব্যথাটা বুকের মাঝখানে আসলো তার পর তা ডান হাতের দিকে ছড়ায়ে গিয়ে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে গেল। তার পর আমি ঘুমায়ে যাই। এই পুরো ঘটনায় আমার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান বা বিদ্যা, ও বুদ্ধি সবই আমি প্রয়োগ করেছি। আমার প্রজ্ঞাই আমাকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে চালিত করেছে। বিশেষ মুহূর্তে মানুষের সব কটি ইন্দ্রিয় এভাবে সজাগ হয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধির পরিচায়ক। তৎপরতাই বুদ্ধি আর বাস্তবতার সমস্যা সমাধানে বিদ্যার প্রয়োগই প্রজ্ঞা।

বিদ্যার প্রয়োগ সম্পর্কে ছোটবেলায় শোনা বায়েজিদ বোস্তামীর বা ইমাম গাজ্জালীর সেই গল্পটা মনে পড়ে যায়। মা কাপড়ে সেলাই করে টাকা দিয়ে দিয়েছিলেন আর সে কয়েকটা বই সব সময় বুকে জড়ায়ে রাখতো তো যখন ডাকাত দল ট্রেন আক্রমণ করলো তখন সে সেলাই করা গোপন জায়গা থেকে টাকা বের করে দেয়ায় ডাকাত সরদার তার সততায় মুগ্ধ হয়ে তার টাকা ফেরত দিয়ে দেয় আর তার বুকে ধরে রাখা বইগুলো নিয়ে নিয়ে বলে যে, বই বুকে নয় বরং এর বিদ্যা মাথার মধ্যে রাখতে হবে যা কেউ শত চেষ্টা করেও কেড়ে নিতে পারবে না। আমাদের দেশের শিক্ষা নীতির উদ্দেশ্য তাই হওয়া উচিত বিদ্যা অর্জন নয় বরং প্রজ্ঞা অর্জন। যে বিদ্যা বাস্তবে প্রয়োগ করা যায় না সেই বিদ্যা শিক্ষার কোন দরকার আছে বলে আমার মনে হয় না। তাই বলছিলাম প্রায়োগিক বিদ্যাই প্রজ্ঞা যাকে ইংরেজিতে বলা যায় Applied knowledge is wisdom, but applied where? in the real life context. সংক্ষেপে তাই বলা যায় “বাস্তবতার সমস্যায় প্রয়োগকৃত জ্ঞানই প্রজ্ঞা”।

আমার লেখা গুলো আসলে কি ধরনের তা নিয়ে আমিও চিন্তা করেছি বেশ, আমার মনে হয়েছে এগুলো আমার ব্রেইন স্টরমিং টাইপের আত্মকথা। সেই ছোট বেলা থেকেই আমি নিজের সাথে কথা বলি, নিজেকে দুই পক্ষ করে কথা বলে চিন্তা করার অভ্যাসটা মূলত কোন বিষয়ে ভালো করে বুঝে দেখার একটা মানবিক প্রক্রিয়া বা কৌশল মাত্র। সেই আত্মকথা গুলো আমি এক সময় লিখে রাখতাম। তবে সেগুলো এতই অগোছালো ছিল যে কারো কাছে প্রকাশ যোগ্য ছিল না। সংকোচ বোধও ছিল অনেক। এখনকার লেখাগুলো গোছালো ও অপরকে পড়তে দেয়ার মত পরিচ্ছন্ন। যখন অপরকেও আমার কথাগুলো পড়তে দেয়া হবে এই মনোভাব নিয়ে লেখা হয় তখন তা পরিচ্ছন্ন না করে উপায় থাকে না। তাতে চিন্তার গাঁথুনিও মজবুত হওয়া লাগে। যারা পড়ে তারা উপক্রিত হয় কিনা জানি না কিন্তু আমার চিন্তার স্বচ্ছতা আরো স্পষ্ট হয়। তাই আমার লেখা পড়া মানে আমার মনোজগতে আপনাকে স্বাগতম।

এডিট ও আপডেট হিস্ট্রিঃ ০২অক্টবর২০২৩> ০৬অক্টবর২০২৩> ০৮অক্টবর২০২৩ > ১১অক্টবর২০২৩> ২৫অক্টবর২০২৪>